বিকেলের সূর্য ডুবে গেছে।এখন সবার বাড়ি ফেরার সময়।সবাই প্রস্তুত হচ্ছে বাড়ি ফিরবে বলে। এইবার আরিশ ইনায়া ইরিন রা বাড়ির সকলের সাথেই যাবে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তাই গাড়ি দিয়েই যাবে।
ইনায়া আবার হিজাব বেঁধে নিল। তারপর রুম থেকে বের হল।দেখল বড়রা রিকশা দার করিয়ে রেখেছে।একে একে সবাই রিকশায় উঠল।আরিশ, ইনায়া, ইরিন,ইশান, ইনায়ার দুই ভাতিজি সবাই মিলে এক রিকশায় উঠল।বাকিরা অন্য রিকশায় উঠল।
ইনায়া লক্ষ্য করল আরিশের হাব ভাব জানি কেমন। মনে হচ্ছে খুব রেগে আছে। আরিশের চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে যার উপর রেগে আছে তাকে যদি এখন পেতো তাহলে এখনই খুন করে ফেলত।
ইনায়া মনে মনে বলল,,,
--"দুপুরে তো ঠিকই ছিল।কত সুন্দর আমাকে খাইয়ে দিয়ে নিজেও খেয়ে উঠলো। অথচ এখন আবার কি হলো।"
আর অন্যদিকে আরিশ বারবার নিজের ফোন চেক করছে এবং মনে মনে বলছে,,,,,
--"একবার যদি জানতে পারি কে আমার ইনুর সাথে এমন বাজে কাজ করেছে তাহলে তার হাত কেটে টুকরো টুকরো করে হায়নাদের খেতে দিব।"
সন্ধ্যা ৭ টার দিকে সবাই বাড়ি এসে পৌছালো।আরিশ নিজেই সবার ভাড়া দিল।সবাই একে একে বাড়ির ভিতর চলে যাচ্ছে।ইনায়া পিছনে ছিল। কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল আরিশ কে জিজ্ঞেস করার যে সে ঠিক আছে কিনা। সবাই যখন ভিতরে ঢুকে গেল ইনায়া আরিশের কাছে এসে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,,,,
--"আপনি কি ঠিক আছেন? আপনাকে দেখে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। এবং খুব রাগান্বিত মনে হচ্ছে। কিছু কি হয়েছে?
আরিশ উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল ইনায়া কে,,,,
--"আচ্ছা ধরো কেউ তোমার সাথে খুব বড় অন্যায় করেছে, তোমাকে কাঁদিয়েছে,কষ্ট দিয়েছে, ক্ষতি করার চেষ্টা করেছ।আর তোমার জীবনে একজন আসল।যে তাদের কে শাস্তি দিল। বলতে পার মেরে ফেলল।তুমি কি তাকে গ্রহণ করবে?"
ইনায় কিছুক্ষণ থ হয়ে রইল।হয়তো আরিশের কথার মানে বোঝার চেষ্টা করছে। তারপর কথার মানে বুঝতে পেরে উৎসাহিত কণ্ঠে বলবো,,,,,
--"হ্যাঁ অবশ্যই। আপনি জানেন "Jannat Ke Patty" Novel তে Jihan sikandar তার wife কে protect করার জন্য 4 character apply করছে।আর একটা character তো Mafia ছিল। আমার খুব ভালো লেগেছিল।কিন্তু বাস্তবে তো আর কেউ আমার জন্য এত এত বড় কিছু মহৎ কোন কাজ করবে না। ইশ্ করলে ভালোই হতো।"
আরিশের মুখে হাসি ফুটে উঠল তারপর বলল,,,
--"এইটা তো সামান্য কাজ। তুমি চাঁদ চাইলে চাঁদ এনে না দিতে পারলেও চাঁদে নিয়ে যেতে পারব।"
কথা গুলো আরিশ আস্তে বলাতে ইনায়া শুনতে পেল না। তাই ইনায়া জিজ্ঞেস করল,,,,
--"কিছু বললেন?"
আরিশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,,,,
--"বিনা শব্দে চুপচাপ রুমে চলে যাবে। রেস্ট নিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পরবে।আর হ্যাঁ তোমাকে আমি যেই ফোন দিয়েছিলাম সেই ফোনে আমার নাম্বার, ফেসবুক আইডি ইনস্টাগ্রাম আইডি সব আছে। নিজের অ্যাকাউন্ট লগইন করে তারপর আমাকে মেসেজ দিবে। সাথে সাথে রিপ্লাই আশা করবে না আমি সময় মত রিপ্লাই দিয়ে দেব।"
আরিশ ভাব নিয়ে বলল কথা গুলো।
ইনায়া মুখ ভেংচি কেটে বাড়ির গেট পর্যন্ত গেল। তারপর বাড়ির ভেতর ঢোকার আগে ভাব নিয়ে বলল,,,,
--"আমার বয়েই গেছে আপনাকে মেসেজ বা কল দিতে। যদি আমার কল বা মেসেজ দিতে হয় তাহলে আমি উগান্ডার পাগলা গারদে দিব যাতে আপনাকে এসে নিয়ে যায়।"
এই কথা বলে ইনায়া এক দৌড় দিল।আরিশ শব্দ করে হেসে উঠলো।
___________
ইনায়া রুমে এসে চেন্জ করে নিল। আজকে দিন তার খুব ভালো গেছে। হ্যাঁ সে খুব কেঁদেছিল কিন্তু এই কান্নায় কোনো কষ্ট ছিল না বরং ছিল নিজের মন থেকে জমে থাকা কষ্টের পাহাড়ের কিছুটা অংশ কেটে ফেলে দেওয়া।ইনায়া বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিল। তারপর ভাবতে লাগল,,তার আগের কান্না এবং এখন এর কান্নার ভিতর কতটা ফারাক আছে। আগে কান্না করতে করতে panic attack হয়ে যেত।আর আজকে কান্না করার পর মন কতটা শান্ত হয়ে গেছে।
অতীতের কথা মাথায় আসতে ইনায়ার ঠোঁট তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।কি যন্ত্রণাই না সইতে হয়েছিল তার।সে তো এখনো তারিখ মনে রেখেছে।
--"২০২৩ সালের ২৩ মার্চ,২০২৩ সালের ৯ আগস্ট সময় বিকাল ৩:১৫,,,,,২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর,২১ নভেম্বর,১১ ডিসেম্বর,২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি দুপুর ১২:৫৫. এই সময় তো ইনায়া কখনোই ভুলতে পারবে না। কখোনোই না। তাছাড়াও ৭ ফেব্রুয়ারি, এবং লাস্ট ছিল ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল বিকাল ৪:৪৯. সবকিছু সমাপ্ত এখানেই ঘটে। ইনায়ার বিশ্বাসের, কাউকে ভালোবাসার সাহসের সব কিছুর সমাধি ঘটে।আর এর পর থেকে ইনায়া দিব্যি ভালো আছে।না আছে কোনো আফসোস আর না কোনো চাওয়া। এখন সে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে কারণ সে যা চেয়েছে তা পায়নি।"
_________________
আরিশ প্রায় দুই ঘন্টা যাবত শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল।তার মাথা ভিশন গরম।সে মেনেই নিতে পারছে না তার ইনু যখন নিষ্পাপ ছিল তখন কেউ তাকে খুব বাজে ভাবে স্পর্শ করেছিল।তার ইচ্ছে করছে স্পর্শকারী ব্যক্তিটির হাতে জ্বালিয়ে দিতে, কেটে ফেলতে, এসিড দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু এই সব কিছু করা জায়গায় সে এখনো সেই লোকটির খবর পর্যন্ত পেতে পারল না।তার এইসব সহ্য হচ্ছে না। মাথায় অনেক চিন্তা।
প্রথমত তার সিক্রেট মিশনের, তারপর ইনায়ার এখানে নিরাপত্তার, তার উপরে ইনায়ার অতীত সম্পর্কে জানতে হবে। এখন আবার এই লোকের সন্ধান।
আরিশ নিজের চুল খামচে ধরলো। তারপর নিজেকে বলল,,,
--"Arish Cool Just Cool. তোকে শান্ত থাকতে হবে তাহলে তুই সব সামলাতে পারবি।"
আরিশ একটি টাওয়েল পড়ে বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো। হেয়ার ডায়ার দিয়ে নিজের চুল শুকিয়ে নিল। আয়নার সামনে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। আর ভাবলো,,,,
--"আমি জানি আমি দেখতে যথেষ্ট পরিমাণের হ্যান্ডসাম মাশাল্লাহ। কিন্তু ইনায়ার কথা ভাবলে কেন জানিনা কনফিডেন্ট পাইনা। মনে হয় আমি তার যোগ্য না হয়তো সে আমাকে গ্রহণ করবে না।"
এইসব ভেবে আরিশ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর নিজের ফোন চেক করল এবং দেখতে পেল তার সেই বন্ধু মেসেজ দিয়েছে। মেসেজের লিখেছে,,,,
--"I have found out the name of that man. I have collected his picture. I do not know his exact address yet. But I have knew this much that he is in Sreepur.So it will not take long to find him.And most importantly, this man has several cases filed against him at the police station for harassing women."
(আমি সে লোকটির নাম জানতে পেরেছি।আমি তার ছবি সংগ্রহ করেছি। তার সঠিক ঠিকানা এখনো জানতে পারিনি। কিন্তু এতোটুকু জানতে পেরেছি সে শ্রীপুরেই আছে। তাই খুঁজতে বেশি সময় লাগবে না।আর সবচেয়ে বড় কথা, এই লোকটির নামে পুলিশ স্টেশনে অনেকগুলো কেস আছে মেয়েদেরকে হ্যারেজমেন্ট করার জন্য।)
আরিশের চেহারার রাগ স্পষ্ট । সে সেই ছবিতে ক্লিক করলো।৩০ বছরের হবে হয়তো।আরিশের মুখ থেকে ঘৃণিত শব্দ বের হলো,,,
--"ছিঃ।নিজেও তো কোন নারীর সন্তান, কোন নারীর ভাই, কোন নারীর হাজব্যান্ড এবং কোন মেয়ের বাবা। তারপরও অন্য মেয়েদের সাথে এরকম কিছু করতে লজ্জা করে না। এইসব পুরুষ পুরুষ নামে কলঙ্ক। অনেক পাপ কামিয়েছিস। এখন তোকে সাজা দেওয়ার পালা। তোকে আমি মারব না। শুধু দুটো হাত কেটে ফেলবো। যে হাত দিয়ে তুই নিষ্পাপ মেয়েদের বাজে ভাবে স্পর্শ করেছিস।"
আরিশের ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
তারপর নিজের ফোন অন করল।ভাবলো ইনায়া কে মেসেজ দিবে কিন্তু whatsapp খুলে দেখলে ইনায়া নিজেই মেসেজ দিয়েছে।,,,,
--"আসসালামুয়ালাইকুম। আমি নিজে থেকেই মেসেজ দিলাম। ভাবলাম আপনি বড় মানুষ কিছু বলেছেন,না শুনলে বেয়াদবি দেখায়।আর হ্যাঁ তখন তো আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। যাইহোক সে সব কথা থাক। আপনাকে দেখে তখন খুব বেশি চিন্তিত মনে হয়েছিল তাই জিজ্ঞেস করেছিলাম। যদি কোন বিষয় নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত থাকেন তাহলে বেশি চিন্তা করবেন না। নয়তো উগান্ডার পাগলা গারদেও আপনার জায়গা হবে না।তখন আবার আরেক সমস্যা।"
আরিশ মেসেজগুলো পড়ে হাসতে হাসতে শেষ। এমন কথা ও কি কেউ বলতে পারে। যেদিন সে ইনায়া কে প্রথম দেখেছিল সেদিন ভেবেছিল ইনায়া কথাই বলতে জানে না। আর এখন তো কথার বলি ফুটছে। কিন্তু আরিশ অবশ্যই এতে অনেক খুশি হচ্ছে। কারণ ইনায়া কে তো বাকিটা জীবন তার সাথেই কাটাতে হবে। আগে থেকে কমফোর্টেবল হয়ে যাওয়াই ভালো। তারপর আরিশ চলে গেল অতীতের চিন্তায়।
অতীত________________
আরিশ ছোট থেকেই বড় হয়েছে তার বাবার কাছে ইফতেখারুল খানের (ইনায়ার বাবা) গল্প শুনে বড় হয়েছে। এমনকি তার বাবা যখন ফোনে নিজের ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলতো তখন আরিশও কথা বলতো।তাই আরিশের তার চোট চাচার প্রতি এক ভিন্ন সম্মান এবং এক ভিন্ন ভালোবাসা।
আরিশের বয়স তখন ১১ যখন ইনায়ার জন্ম হয়েছিল।ইফতেখারুল খানের এই খুশির সংবাদ সবার আগে নিজের বড় ভাইকে জানাই। তখন আরিশ বলেছিলে ,,,,
--"ছোট চাচ্চু তোমার মেয়ে বড় হলে আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে করবো।"
ইফতেখারুল খান হেসে উঠলো তারপর বলল,,,
--"তোমার মত ছেলে কে মেয়ে জামাই হিসেবে পেলে আমি ধন্য হয়ে যাব। আমি আমার আরিশ বাবাকেই আমার মেয়ে দিব।"
আরিশ সেই কথাই ধরে নেয়। প্রথম প্রথম কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। সবাই ভেবেছিল হয়তো বাচ্চা মানুষ তাই বলেছে। কিন্তু ইনায়ার জন্মের দুদিন পর ইনায়ার ভয়ানক নিউমোনিয়া ধরা পরে। মেয়েটার জান যায় যায় অবস্থা ছিল। কেউ আশা রাখতেই পারিন যে ইনায়া এই বাচ্চা মেয়েটি বাঁচবে।
তখন এই খবর আরিশ পাওয়া পর পাগলের মতো কেঁদেছিল এবং তার বাবার কাছে কান্না করতে করতে আবদার করেছিল,,,
--"বাবা আমার পিচ্চি পরী কে চাই।আমি বড় হলে তো ওকেই বিয়ে করব। ওকে আমার লাগবেই বাবা। আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাও অথবা ওকে আমার কাছে নিয়ে আস।বাবা আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে আত্মা বের হয়ে পরবে।আমার স্বপ্নে দুদিন ধরে আসছে এক অচেনা ছায়া।আমি আমি ,,, বার বার জিজ্ঞেস করছি,,,,"কে
#অচেনা_ছায়া_তুমি ? কিন্তু কোনো উত্তর পাই না।"
আরিশের এই পাগলামি আরিশের মা-বাবা নিজের চোখে দেখেছিল। আর ইফতেখারুল খান নিজের কানে আরিশের আত্মনাত শুনেছিল।সে তখনই বুঝে গিয়েছিল আরিশ তার মেয়ের জন্য সঠিক।
বর্তমান ________________
এইসব ভাবতে ভাবতে আরিশের চোখে পানি চলে এল।সে কখনো ইনায়াকে বোঝাতেই পারবে না সে তাকে কতটা ভালোবাসে।
আরিশ মনে মনে বলল,,,
--"ইনায়া আমার স্বপ্নের #অচেনা_ছায়া_তুমি কিন্তু আমি কি সেই ব্যক্তি যাকে তুমি তোমরা স্বপ্নে জিজ্ঞেস কর,,,কে