ইরিন খুব আশা নিয়ে বসে আছে তার মনের মানুষ কে দেখবে বলে।ইরিন সাদমানের প্রিয় রঙের পোশাক পড়েছে। আকাশি রঙের সেলোয়ার কামিজ। চোখে দিয়েছে কাজল। একদম বাঙালি নারীর মতোন।
ইরিন নিজে নিজে বিড়বিড় করে বলল,,,,,
--"আমার লাজুক বাবুর জন্য তো এতো আয়োজন কিন্তু পরে দেখা যাবে আমার লাজুক বাবু আমার দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত দেখছে না।"
ইরিনের ভাবনায় ছেদ পড়ে ড্রয়িং রুম থেকে আসা শব্দের ধ্বনি হতে। তার মা কারোর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।ইরিনের বুঝতে দেরি হল না সাদমান এসে পরেছে।ইরিন তারাতাড়ি করে চুলে খোপা করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিজের রুম থেকে বের হয়।
ইরিন নিজের রুম থেকে বের হতেই তার নজর প্রথম এ গিয়ে পরে তার সেই কাঙ্ক্ষিত লাজক পুরুষের উপর।
সাদমানের গায়ের রং শ্যামলা, শরীরের গঠন লম্বাটে ও সুগঠিত। তার চুল ঘন কালো আর চোখ গাঢ় বাদামি। পরনে আছে ধূসর লিনেন শার্ট, গাঢ় নেভি ব্লু চিনো প্যান্ট এবং পায়ে সাদা স্নিকার্স।
ইরিন আবার নতুন করে তার লাজুক পুরুষের প্রেমে পড়ে গেল। ইরিন নিজের বুকে হাত রেখে বলল,,,,
--"ইশ্,,,, আল্লাহ ওরে কি দিয়ে বানিয়েছে। দেখলেই শুধু ফিদা হয়ে যাই। এই লাজুক পুরুষ আমাকে নির্লজ্জ বানিয়ে দিচ্ছে দিনে দিনে।"
ইরিনের এই দশা আরিশের চোখে পরল।সে খুব ভালো করেই জানে তার বোন তার বন্ধু কে পছন্দ করে। এবং তাতে তার কোনো সমস্যা নেই।
সাদমান আরিশের মার সাথে কথা বলছিল।আরিশের মা সেখান থেকে উঠে রান্না ঘরে চলে গেলেন খাবার দাবার রেডি করার জন্য। তখনই আরিশ নিজের হাতের কুনি দিয়ে সাদমানের হাতে গুঁতো দিলো। সাদমান আরিশের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকালে।
আরিশ সাদমানের কানে ফিসফিস করে বলল,,,,
--"দেখ ভাই আমার বোনটি একদম তোর উপর ফিদা।দেখ দেখ কিভাবে তাকিয়ে আছে। ইশ্ কত ভালোবাসা।"
আরিশের নিজের বোনের পক্ষ নিয়ে এমন লাগামহীন কোথায় সাদমানের কাশি উঠে পড়ে। বেচারা এমনিতেই লজ্জা পাচ্ছিল। এতক্ষণ ধরে যে ইরিন তাকে দেখছিল সেটি সে আড় চোখে দেখেছিল। কিন্তু সরাসরি তাকানোর সাহস পায়নি। তারপর আবার আরিশের এইসব কথা তার তো ইচ্ছে করে আবার লন্ডনে চলে যেতে।
সাদমানের কাশি দেখে ইরিন তার ভাইয়ের দিকে রাগের দৃষ্টি নিক্ষেপ করল এবং একটু রাগ দেখিয়ে বলল,,,
--"উফ্ ভাইয়া কি এমন বলেছ যে উনার এমন কাশি উঠে গেছে। আর উনি এত দূর থেকে জার্নি করে এসেছেন উনাকে বসতে না দিয়ে তুমি এখনো দাঁড়া করিয়ে রেখেছো। উনাকে বসতে দাও। আমি পানি নিয়ে আসছি।"
এই বলে ইরিন রান্না ঘরে চলে গেল।আরিশ হাসলো তারপর সাদমানের পিঠে থাবা দিতে দিতে বলল,,,
--" আরে আস্তে আস্তে মেরি ছোট বেহেন কা হোনে ওয়ালা পাতি। নয়তো বিয়ের আগেই আমার বোন বিধবা হয়ে যাবে। এবং আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। তাই একটু দয়া করো আমার উপর।"
সাদমানের কাশি যেন বেড়ে গেল।সে নিজেকে সামলিয়ে বলল,,,,
--"লজ্জা করে না নিজের বোনের সম্পর্ক এরকম বলতে? তোর তো ওকে আরো বোঝানো উচিত।"
আরিশ গর্বিত স্বরে বলল,,,
--"লজ্জা তো আমার তখন করত যখন সে তোকে ভালোবেসেও চুপ করে থাকবে, নিজের ভালোবাসার প্রকাশ করবে না। কিন্তু যে জায়গাই সে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করছে সেই জায়গায় আমার নিজের বোনের প্রতি গর্ব বোধ হচ্ছে। আমার বোন আমার মতই হয়েছে। আমি তাকে নিয়ে খুব গর্বিত। "
সাদমান রাগ দেখিয়ে বলল,,,,
--"বেশি গর্বে গর্বিত হতে যেয়ে আবার গর্ভবতী হয়ে যেও না।'
আরিশ হাসলো তারপর বললো,,,,
--"না গর্ভবতী হবো না বানাবো। আমার ইনু কে তাও বিয়ের কিছুদিন পরেই।তখন তুমি মামা ডাক শুনতে পারবে।আর যদি বাবা ডাক শুনতে চাও তাহলে বল আমার বোনের সাথে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করে,,,,"
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সাদমান আরিশের মুখ চেপে ধরে। তারপর অসহায় দৃষ্টি এবং অসহায় কন্ঠে বলে,,,,
--"তুই আমার ভাই, তুই আমার বন্ধু, আপনি আমার বস। আপনার লজ্জা শরম, Hesitation না থাকলেও আমার আছে। তাই আমার নিষ্পাপ কান কে প্লিজ অপবিত্র করবেন না।"
আরিশ নিজের মুখের ওপর থেকে সাদমানের হাত সরালো তারপর বলল,,,
--"যখন তখন একদম আমার কাছে আসবি না, কেউ দেখলে অন্য কিছু ভাববে। আর আমি আমার ইনুর প্রতি খুব লয়েল।সে ছাড়া আর কারোর অধিকার নেই আমাকে স্পর্শ করার। তাই দূরে থাক। এবং হ্যাঁ।আমি যেমন আমার বোনও তেমন। তাই সে যদি একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে সে তোকে চায় তার মানে সে তোকে নিজের করেই ছাড়বে। এখন তুই এইটা কে হুমকি মনে করতে পারিস অথবা সাবধানতা।"
এই বলে আরিশ ভাব নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল।
সাদমান শুকনো ঢোক গিলল। মনে মনে বলল,,,,
--"ভাই যেমন জল্লাদ তার বোন তেমনি।"
এই বলে থেমে গেল তারপর আবার বিড়বিড় করে বলল,,,,
--"অবশ্য ইরিন জল্লাদ না মা শা আল্লাহ অনেক কিউট।"
ব্যাস,এতটুকু বলেই যেন আপনাদের মুখ একদম লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সাদমান নিজের দুই গালে নিজেই চড় মারল তারপর বলল,,,,
--"ছিঃ সাদমান তুই দিনে দিনে নির্লজ্জ হয়ে পড়ছিস। আরিশ থেকে তোর যত সম্ভব তত দূরে থাকা উচিত।"
ঠিক তখনই ইরিন ঠান্ডা পানির গ্লাসে নিয়ে এলো এবং সাদমানের দিকে বাড়িয়ে দিল। সাদমান ভদ্রতার খাতিরে মুচকি হাসি দিয়ে পানির গ্লাস নিল। এই হাসিতেই যেন ইরিন ফিদা হয়ে গেল।
সাদমান পানি খেয়ে ক্লাস টেবিলে রাখতে না রাখতেই ইরিন নিজের মনে জমিয়ে রাখা প্রশ্নগুলো সাদমানের দিকে ছুড়ে ফেলল।
--"কেমন আছেন? আমার ফোন ধরেননি কেন? এমন কি আমার মেসেজ পর্যন্ত দেখেননি। এত কিসের ব্যস্ততা। একটাবার তোমার খোঁজ নিতে পারতেন?"
সাদমান পরলো বিপদে এখন সে কি বলবে। আসলে সে মূলত চায় না তার নিজের জীবনের সাথে ইরিনের মতো এক নিষ্পাপ ভালো মেয়ের জীবন জড়িয়ে যাক। তাই সে মূলত ইরিনকে উপেক্ষা করে। কিন্তু এই মেয়ে তো নাছোড়বান্দা। সাদমান বুঝতে পারছে না এখন কি উত্তর দিবে ।
ইরিন সাদমানের অবস্থা,মনের কথা খানিকটা বুঝতে পারল।তাই সে আর সাদমান কে বেশি জালালো না। বরং সাদমান কে অবাক করে দিয়ে বলল,,,
--"অনেক দূর থেকে এসেছেন। পাশের ফ্ল্যাট হচ্ছে ভাইয়ার সেই ফ্ল্যাটে চলে যান সেখানেই থাকবেন। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিন। আমি পরে খাবার দিয়ে যাব।"
সাদমান কিছুটা অবাক হলো। তার জানামতে ইরিন অনেক জেদি এবং নাছোড়বান্দা। নিজের প্রশ্নের উত্তর না জানা পর্যন্ত সে কখনোই সাদমানকে ছাড়ার ব্যক্তি না। কিন্তু এখন কত সহজেই ছেড়ে দিচ্ছি।
ইরিন আগের ভঙ্গিতেই বলল,,,
--"আমাকে বেশি ভালো ভাবার দরকার নেই। শুধুমাত্র লং জার্নি করে এসেছেন বলে এখন যেতে দিচ্ছি। বিয়ের পর প্রত্যেকটি জিনিসের হিসাব নিব।"
সাদমান হা হয়ে গেল।সে ভাবছে এই মেয়ে কি করে তার মনের কথা জেনে ফেলল। কিন্তু ইরিনের বলা শেষের কথাগুলো সাদমানের কানে বাজতেই সাদমানের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।সে আর দেরী না করে স্থান ত্যাগ করল।
_____________________
অন্যদিকে আরিশ বিছানায় শুয়ে আছে। সেই দুপুরের আগে ইনায়ার সাথে কথা হয়েছে তারপর আর হয়নি। কিন্তু বিকেলের দিকে কেন জানি আরিশের খুব মনে হচ্ছিল যে তার ইনায়া কষ্ট পাচ্ছে।তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। খারাপ কিছুর আশঙ্কা।
আরিশ মনে মনে আল্লাহকে বলেছিল,,,,,
--"আল্লাহ আমার ইনু কে তুমি সুস্থ রাখো। তাকে তার জীবনে আসা সব সমস্যা সামলানোর শক্তি এবং ধৈর্য দাও। তাকে ভরসা দাও যে তার আরিশ তার পাশে আছে।"
হয়তো আরিশের আল্লাহর কাছে করা এই প্রার্থনাই তখন ইনায়াকে কিছুটা সাহস দেয়।
আরিশ আর কিছু না ভেবে ফোন হাতে নিল।ফোন অন করতেই ওয়ালপেপার এ ভেসে উঠলো ইনায়ার সেই নৌকাতে বসে থাকা ছবি। আরিশ মুচকি হেসে ফোনের লক খুলল। তার ফোনের লক ছিল ইনায়া জন্ম সাল,মাস ও তারিখ।23/09/2007.
আরিশ হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে ইনায়া কে মেসেজ দিল।
--"ইনু ঘুমিয়ে পড়েছো?"
তখন রাত প্রায় ১২টা ছুঁই ছুঁই।আরিশ ভেবেছে হয়তো ইনায়া ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তার ভাবনা ভুলে প্রমাণিত হলো যখন ইনায়া তৎক্ষণাৎ তার মেসেজের রিপ্লাই দিল।
--"না। আপনি কখন এসেছেন?আর রাতে খেয়েছেন।"
ইনায়া নিজেও জানে না সে কেন আরিশের ক্ষেত্রে এত অধিকারী হয়ে উঠে।আর অন্যদিকে আরিশ ইনায়ার এমন অধিকার এবং যত্ন দেখানোর মেসেজ পড়ে মুচকি হাসলো।
তারপর মনে মনে বলল,,,,,
--"আস্তে আস্তে আমার লাইনে আসছো তুমি ইনু পাখি। খুব শীঘ্রই তোমাকে নিজের মনের কথা বলব।আর কিছুদিন পরেই তোমার জন্মদিন। তুমি সপ্তদর্শী থেকে অষ্টদর্শী হয়ে যাবে। এবং তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার বয়স ১৫ বছর থেকে ১৬ বছর হয়ে যাবে।২০০৭ সালে তোমার জন্মদিনের দিনই তোমার বাবার কাছে তোমাকে আবদার করেছিলাম। এবং ২০২৫ সালের তোমার জন্মদিনের দিনে তোমাকে নিজের মনের কথা বলবো।"