রাত ২:৩০। আরিশ তখন ইনায়ার সাথে আধ ঘন্টা ছিল এরপর চলে এসেছিল। আরিশের কাছে সেটি ছিল শ্রেষ্ঠ রাত। কত স্বপ্ন ছিল প্রিয়সির সাথে চন্দ্রবিলাস করবে। তার প্রিয়সি চাঁদ দেখবে এবং সে তার প্রিয়সি কে দেখবে।আর আজ তার সেই আকুল ইচ্ছে পূরণ হলো।
সব কিছু ভাগ্যে থাকে না, কিন্তু হাদিসে বলা হয়েছে, দোয়া ব্যতীত কোনো কিছুই ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে না। এর মানে হলো, বান্দা যখন আল্লাহর কাছে কোনো কিছুর জন্য দোয়া করে, তখন আল্লাহ তার সেই দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন। দোয়া হলো মুমিনের অস্ত্র, এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ অসম্ভবকে সম্ভব করেন। আর আরিশের দোয়ার কারণেই হয়তো এত অসম্ভব কিছু সম্ভব হচ্ছে।
আরিশ রুমে এসে সাদমান কে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিল।তার কোনো ইচ্ছা ছিল না এত রাতে সাদমান কি নিয়ে বের হবার কিন্তু কিছু করার নেই। সেই জানোয়ার কে তার শাস্তি দেওয়া এখনো বাকি যে ইনায়া বাজেভাবে স্পর্শ করেছিল। তাই আজ রাতেই ঝামেলা শেষ করে দিবে। কারণ পরে বাড়ির কিছু ঝামেলা সামলে আরিশ কে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লন্ডনে যেতে হবে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার।হাতে গুনা ১/২ জন্য লোক রাস্তা দিয়ে আসা যাওয়া করছে। আরিশ এবং সাদমান নিরব রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে তাদের লক্ষ্যে যাচ্ছে। আরিশ তার Black Diamond লুকে আছে। কালো রঙের টাওজার, কালো রঙের গেঞ্জি এবং কালো রঙের মাস্ক।তার ধূসর বাদামি রঙের চোখ যেন আরো বেশি আকৃষ্ট লাগছে।সাদমানের সেইম ড্রেসআপ।
গাড়ি চলছে আপন গতিতে।তাদের গাড়ি এসে থামল মাওনার উত্তরপাড়ার এক পতিতা*লয়ের সামনে। মূলত সেই ব্যক্তি এখানে আসে।আরিশের গা গুলিয়ে উঠলো যার নিজের স্ত্রী সন্তান আছে তারপরও সে এখানে আসে।আসল সমস্যা হলো চরিত্রের।
সময় ৩:৩০। একদম তাদের প্লেন মতো লোকটি আসছে।আরিশ সব খোঁজখবর রেখে এখানে এসেছে। আরিশ সাদমান কে ইশারা দিতেই সাদমান গাড়ি থেকে নেমে পরে এবং সেই লোকটির কাছে চলে যায়।
লোকটি মাতাল থাকার কারণে এঁকেবেঁকে হাঁটছিল। সাদমান আর সময় নষ্ট না করে নিজের পকেট থেকে বন্দুক বের করে সেই লোকটির মাথায় বাড়ি মারে। লোকটি সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যায়। সাদমান সে লোকটিকে টেনে হিচড়ে গাড়ির ডিকিতে তুলে এবং গাড়ির দিকে বন্ধ করে এসে আরিশের পাশে বসে। নিঃশব্দে গাড়ি চলছে। তাদের উদ্দেশ্য এখন মাওনার একটি পুরাতন ফ্যাক্টরিতে যাবার।
আসলে যারা এজেন্ট তাদের সব দেশের সম্পর্কে কিছু না কিছু জানতে হয়। কারণ সিক্রেট মিশনে কখন কোন জায়গায় যেতে হয় বা কোন জায়গা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয় তা বলা যায় না। আর সেই সূত্রে আরিশের বাংলাদেশী অনেকের সাথে যোগাযোগ ছিল। এবং একজনের মাধ্যমে এই পুরনো খালি ফ্যাক্টরির খোঁজ পেয়েছে।তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আপতত লোকটিকে সেই পুরাতন ফ্যাক্টরিতে বেঁধে রেখে আসবে। এবং কিছু লোক ঠিক করেছে যারা ফ্যাক্টরির বাইরে পাহারা দিবে। আজ আর কিছু করবে না।যতই হোক সাদমান লং জার্নি করে এসেছি। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। তারা তাদের প্লেন মোতাবেক কাজ করে বাড়িতে ফিরলো ভোর ৫ টায়।তাই আরিশ আগে গোসল করে নামাজ পড়ে একবারে ঘুমিয়েছে। সাদমান ও তাই।
___________
আজ ইনায়া কলেজ যাবে না।সে খুবই বিরক্ত এই কলেজ নিয়ে। এখন প্রতিনিয়ত আফসোস করে এই কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য। মানুষ সরকারি কলেজের সহজে চান্স পায়না। কিন্তু সে নিজের এলাকার সরকারি কলেজ ছেড়ে মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তার পিছনে দুটো কারণ।এক হলো এখানে সব মেয়ে, যদি সরকারি কলেজে ভর্তি হত সেখানে ছেলে মেয়ে উভয় থাকতো। এবং সেই কিছুটা আনকম্ফোর্টেবল ফিল করতে। ইউনিভার্সিটিতে উঠার পর একসাথে ছেলে মেয়ে পড়া বিষয়টা আলাদা। তখন এই বয়সে আবেগ চলে যায়। নিজেকে সামলানো যায়।
এবং আরেকটি কারণ হলো সে শুনেছিল এই কলেজের নিয়ম অনেক কড়া, পড়ালেখা খুব ভালো হয়, রেজাল্ট খুব ভালো হয়। মূলত এই দুটি কারণে সে এই কলেজে ভর্তি হয়েছে।
কিন্তু এখন দেখছে সব উল্টো। ভালো ইংরেজি শিক্ষক নেই। আইসিটি স্যারের কাছে ২০০০ টাকা দিয়ে প্রাইভেট না বললে স্যার পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়। কষ্ট করে একবার পাস করেছিল। এবার সে নিশ্চিত যে সে ফেল করবে। অবশ্যই এতে তার কোন আফসোস নেই। কারণ সে জানে সে যথেষ্ট পারদর্শী আইসিটি নামক সহজ সাবজেক্টে। এই বিষয়টি অনেকের কাছে খুব জটিল, অনেকের কাছে মোটামুটি, আবার অনেকের কাছে খুব সহজ। ইনায়ার কাছে এটি একটি মজার সাবজেক্ট। সে বেশি মাথা ঘামায় না পরীক্ষার পাশ ফেল নিয়ে। কারণ তার মূল লক্ষ্য বোর্ড পরীক্ষা এবং পাবলিক পরীক্ষা। ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে চান্স পেলেই তা চলবে।
ইনায়া ভাবল ইরিনদের ঘরে গিয়ে তার সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আসবে।যেই ভাবা সেই কাজ। ইনায়া দেরি না করে তার মা কে জানিয়ে মাথায় সুন্দর ভাবে ঘোমটা দিয়ে ঢেকে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।
সে ইনায়াদের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে কলিং বেল বাজানো। এক দুইবার কলিং বেল দেই বাজাতে না বাজাতেই ইমরান খান এসে দড়জা খুলে দিলেন। তারপর ইনায়া কে দেখতে পেয়ে এক সৌজন্যমূলক হাসি দিলেন।
ইনায়া হাসির বিপরীতে মুচকি হাসি উপহার দিয়ে তারপর সালাম দিল। ইমরান খান সালামের জবাব দিয়ে তাকে ঘরে আসার সুযোগ দিলেন। ইনায়া ঘরে ঢুকে পড়লো। চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল।
মনে মনে বলল,,,
--"কত সুন্দর এবং পরিপাটি।"
ইমরান খান ইনায়াকে বসতে বলে তার স্ত্রী এবং মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,,,,
--"দেখে যাও তোমরা কে এসেছে।"
ইনায়া চুপচাপ বসার রুমের সোফাতে বসেছিল। আয়েশা খানম এবং ইরিন নিজেদের রুম থেকে বের হয়ে এসে ইনায়া কে দেখতে পেয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
ইরিন দৌড়ে এসে বসে পড়ল ইনায়ার গা ঘেঁষে তারপর কানে কানে বলল,,,,,
--"জানো আমি আজকে অনেক খুশি। সেই খুশির কারণ তোমাকে বলার জন্য অনেকক্ষণ যাবত উসখুস করছি।"
ইনায়া হাসলো। তারপর আয়েশা খানমের সাথে কথাবার্তা বলল কিছুক্ষণ। তাদের কথা বার্তার মাঝেই ইরিন ইনায়ার হাত ধরে টানতে লাগলো এবং বললো,,,,,
--"উফ্ এখানে বসে আর গল্প করতে হবে না। আমার সাথে আমার রুমে চলো আমার কিছু কথা আছে।"
আয়েশা খানম এবং ইমরান খান হাসলো। ইনায়া মুচকি হেসে ইরিনের সাথে তার রুমে চলে গেল।
ইমরান খান এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,,,,
--"দুজনের মধ্যে কত মিল দেখেছো? মনে হচ্ছে দুজন দুজনকে কত বছর ধরে যেন চিনে। মনে হচ্ছে একদম আপন বোন।"
আয়েশা খানম স্বামীর কথায় সায় জানায় এবং বলে,,,,,,
--"হ্যাঁ।আর ইনায়া মেয়েটা একদম লক্ষী।আচ্ছা তোমার ছেলে তো ইনায়া কে পাগলের মতন ভালোবাসে, এবং তোমার ছোট ভাইও তো নিজের মেয়েকে আরিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য রাজি ছিল। তুমি কি এই বিষয়টি নিয়ে শারমিন আপা এবং তোমার ছোট বোনের সাথে আলোচনা করতে পারো না? তোমার ছেলে তো জানোই কতটা রাগী এবং জেদি। তখন তো ছোট ছিল এবং ইনায়া কে দেখেনি তখনই যা পাগলামি করেছে সেই যায়গায় তো এখন বেশিরভাগ ইনায়ার সাথে সময় কাটাচ্ছে।"
ইমরান খান চুপ করে স্ত্রীর কথা শুনছিল।তিনি নিজেও জানেন তার ছেলে ইনায়ার জন্য পাগল। কিন্তু এখনো যে সঠিক সময় হয়নি।
তিনি নিজের স্ত্রীকে স্বাভাবিক কণ্ঠে শুধালেন,,,,
--"আরিশ বলেছে সঠিক সময় হলে সে নিজে থেকে সবাই কে বলবে। তাই জীবনটা যেহেতু ছেলে সিদ্ধান্তটাও না হয় ছেলের উপর ছেড়ে দিলাম।আর আমার আরিশের উপর সম্পূর্ণ ভরসা আছে।"
আয়েশা খানম আর কিছু বললেন না।উনার নিজেরও ছেলের ওপর যথেষ্ট পরিমাণে ভরসা আছে। তারপরও মনের কোণে ভয় থেকে যায়।
_________________
ইনায়া এবং ইরিন মিলে আরিশের ফ্ল্যাটে গেল খাবার নিয়ে। এক্সট্রা চাবি দিয়ে তালা খুলল। এতক্ষণ ইরিন এবং ইনায়া ইরিনের রুমে বসে কথা বলছিল তখনই আয়েশা খানম এসে দুজন কে বলল আরিশ এবং সাদমানের খাবার তাদের রুমে রেখে এসে যেন এখানে বসে খেয়ে নেয়। ইনায়া না করতে চাইলেও শুনলেন না।
ইনায়া এবং ইরিন মিলে খাবার টেবিলের উপর রাখল। ইনায়া পুরো রুমে চোখ বুলায়। একজন পুরুষের ঘুম হওয়া সত্ত্বেও কত সুন্দরভাবে পৌঁছানো। ইনায়ার মন জুড়িয়ে গেল।সে হাঁটতে হাঁটতে একটি রুমের সামনে চলে গেল। সে জানে না এইটা কার রুম। সে ২-৩ বার দরজায় নক করলো কিন্তু কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে আস্তে আস্তে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু ভিতরে ঢুকে যা দেখল তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। পেটের ভেতর প্রজাপতিরা উড়তে লাগলো এক কথায় "Butterfly Stomach."