ইনায়া রুমে ঢুকতেই চোখ আটকে গেলো বিছানায় শুইয়ে থাকা আরিশের দিকে। বেড-শীটটা কোমর পর্যন্ত টানা, শরীরের বাকিটা খালি। উপুড় হয়ে শোয়ায় তার প্রশস্ত পিঠের পেশীগুলো যেন নিখুঁত আঁকা রেখার মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—একেকটা ভাঁজ যেন জিমে গড়া শরীরের নিখুঁত পরিচয় বহন করছে। চামড়ার উপর হালকা আলো পড়ে একধরনের পুরুষালি আভা তৈরি করেছে।শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সাথে সেই পিঠের ওঠানামা অদ্ভুত এক আকর্ষন তৈরি করছে, যা থেকে দৃষ্টি সরানো যায় না।
ইনায়া অনেক কষ্টে নিজের দৃষ্টি হেফাজতে আনলো। এমন দৃশ্য থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নেওয়া কোনো অংশে কম কঠিন না। সপ্তদর্শীর মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি দোলা দিয়ে গেল। ইনায়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।সে দ্বিতীয় বার মন কেড়ে নেওয়া সেই আকর্ষণীয় দৃশ্যের দিকে তাকানোর সাহস করলো না। বরং নিজের আবেগ কে নিয়ন্ত্রন করে, নিজের চোখ কে হেফাজতে এনে রুম ত্যাগ করল।
ইনায়া রুম থেকে বের হয়ে কয়েক বার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। আসলে এমন দৃশ্য সে শুধু ইনস্টাগ্রামে রিলসে, Pinterest scroll করলে এবং Wattpad Story তে লেখিকাদের বর্ণনা অনুযায়ী ছবি দেওয়া থাকতো সেখানে দেখেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রথম।তাই হয়তো এমন অবস্থা।
ইনায়া মাথা ঝাঁকায়। নিজেকে বলল,,,,
--"ছিঃ ইনু। এইসব নিয়ে আর ভাববি না। কোথায় আরিশ আর কোথায় তুই।আর সে তো বড় ভাই। তাকে নিয়ে এসব ভাবা পাপ।"
এইসব বলে ইনায়া নিজেকে শাশাচ্ছিল তখনি ইরিন এসে ইনায়া কে বলল,,,,
--"কি গো?কি এত ভাবছো? ভাইয়া ঘুমাচ্ছে তাই না? হয়তো ফজরের পরে ঘুমিয়েছে। আরে সাদমান আসলে এমনি হয়। চলো আমরা সোফায় বসি।"
ইনায়া ইরিনের সাথে গিয়ে সোফায় বসল। আসলে কিছুক্ষণ আগে যখন ইনায়া ইরিনের রুমে ছিল তখন ইরিন নিজের মনে থাকা সাদমানের জন্য সব অনুভূতির কথা বলে দিয়েছিল। ইনায়া কিছু বলতে যেত তখনই আরিশের মা এসে তাদের কে এখানে পাঠিয়ে দেয়।
ইনায়া ইরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,
--"আসলে যে কথাটা আমি তখন বলতে চাচ্ছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি। এখন বলছি। এবং আশা করছি তুমি কিছু মনে করবেনা।"
ইরিন সিরিয়াস ভঙ্গিতে ইনায়ার দিকে তাকালো এবং সায় জানালো। ইনায়া বলতে শুরু করল,,,,,
--"নারীরা কোন পুরুষের কাছ থেকে সত্তিকারের ভালোবাসা পেলে সেখানে গলে যায়। যখন কোন নারী জানতে পারে যে কোন পুরুষ তাকে সত্তিকারের ভালবাসে তাহলে নারী সেই ভালোবাসার বিপরীতে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসতে শুরু করে।"
--"কিন্তু যখন কোনো পুরুষ বুঝতে পারে যে কোন নারী তাকে সত্যিকারের ভালোবাসে তখন সে সেই নারীকে তুচ্ছ মনে করে, সেই নারীর ভালোবাসা তার কাছে মূল্যহীন।"
তাই কখনো নিজের ভালোবাসাকে বেশি প্রকাশ করবে না। কারণ মানুষটা যদি সঠিক না হয় তাহলে অবহেলা এবং অপমান ব্যতীত আর কিছুই পাবে না। তাই নিজের আবেগ অনুভূতিকে কন্ট্রোল করবে। পুরুষ মানুষ পেয়ে গেলে মূল্য দিতে জানে না। এবং এইসব কথা তোমাকে বলার একটাই কারণ, আমি চাইনা তুমি ভবিষ্যতে নিজের অনুভূতির জন্য কষ্ট পাও। একতরফা ভালোবাসা যে বড়ই কষ্টদায়ক। তাই ইরিন সময় থাকতে নিজের ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতিকে কন্ট্রোল করতে শিখে নেও। নয়তো ভবিষ্যতে তোমার আফসোস করতে হবে।"
এই বলে ইনায়া থামলো। ইরিনের দিকে তাকিয়ে তার মতিগতি বোঝার চেষ্টা। দেখলো ইরিন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিল এবং চিন্তা করছিল। তখন ইনায়া আবার বলতে শুরু করল,,,,
--"আমি এইটা বলছি না যে তুমি তাকে ভালোবাসা বন্ধ কর, অথবা নিজের Efforts কমিয়ে দাও। আমি শুধু এতটুকু বলতে চাচ্ছি তাকে পাওয়ার জন্য দোয়া কর, নিজের তরফ থেকে প্রথম সর্বোচ্চ Efforts দাও। যদি তার দিক থেকে কোন রেসপন্স না পাও, তাহলে সেখান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে আনো। এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর যদি সেই জিনিস তোমার জন্য উত্তম হয় তাহলে তোমাকে ফিরিয়ে দিতে। আর উত্তম না হলে সেই জিনিসটিকে তোমার জন্য উত্তম বানিয়ে তোমাকে দিতে।"
ইনায়া থামলো তারপর আবারো বলতে লাগলো ,,,,
--"বিশ্বাস করো ইরিন এই পৃথিবীতে সব থেকে বড় মিথ্যা কথা হল যখন কেউ বলে কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবে না। এইটা কখনো সত্যি হতেই পারে না। কাউকে ছাড়া কেউ মরে যায় না। কিন্তু কষ্ট হয়। এবং সে যদি আল্লাহর উপর ভরসা না করে নিজের আবেগ, ভালোবাসা এইসবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন তাকে সেই কষ্ট বয়ে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সে যদি হাজারো কষ্ট, ভালোবাসা, অনুভূতি থাকার পরেও আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখে, এবং সন্তুষ্ট থাকে তাহলে আল্লাহ ঠিকই তার মন থেকে সকল দুঃখ-কষ্ট এমন ভাবে সরিয়ে দিবে যে তার কখনো মনে থাকবে না তার জীবনে কোন দুঃখ ছিল। অথবা তার জীবনে সেই দুঃখের কারণ কে আর কারণ থাকতে দিবে না। তার চাওয়াকে তার পাওয়াতে পরিণত করে দিবে।তাই নিজেকে সামলাও।"
ইরিন মন দিয়ে ইনায়ার কথা শুনছিল। আসলেই এই কথাগুলোর ভেতর কোন মিথ্যে ছিল না। সত্যি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোন কিছু সম্ভব না। তাই তাকে যা করতে হবে তা শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের জন্য করতে হবে, নয়কি সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে নিজের পাওয়াকে পূর্ণ করার লোভে। কারণ বদ নিয়তে কখনো বরকত হয় না। যেমন কোরবানি দেওয়া জিনিসটা হালাল কিন্তু গরু চুরি করে কোরবানি দেয়া এটা কখনোই হালালা না। তাই সে যদি সাদমানকে পাওয়ার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চাই তাহলে সেটি সঠিক নয়। বরং তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায় করে তারপর নিজের সব ইচ্ছা আল্লাহর কাছে পেশ করতে হবে।
______________
আরিশের ঘুম ভেঙে ছিল কিছুক্ষণ আগে। মূলত যখন ইনায়া তার রুম থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দরজা লাগায়, সেই দরজা লাগানোর আওয়াজে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন সে দরজার বাইরে থেকে নিজের বোনের এবং ইনায়ার কন্ঠের আওয়াজ শুনতে পায়। তার বুঝতে বাকি থাকে না কারা এসেছে।তাই সে বিছানা থেকে উঠে রুমের ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসে। নিজের রুম থেকে বের হতে যাবে ঠিক তখনই ইনায়ার কথা শুনে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। এবং দরজার আড়াল থেকে সমস্ত কথা শুনে ফলে।
আরিশ থমকে যায় ইনায়ার মুখে এত গভীর কথা শুনে। কথাগুলো হয়তো বলতে বেশি সময় লাগেনি, কিন্তু এই কথাগুলোর মানে অনেক গভীর। বোঝা যাচ্ছে ইনায়া নিজের জীবনের এক্সপেরিয়েন্স থেকে কথাগুলো বলছে। তার কন্ঠের মধ্যে অস্পষ্ট কষ্ট ভেসে আসছিল যা আরিশের কান হতে হৃদয়ে স্পর্শ করছিল।আরিশ এখন আরো বেশি উতলা হয়ে পড়েছে ইনায়ার অতীত সম্পর্কে জানতে। কি এমন আছে ইনায়ার অতীতে যে মেয়েটিকে এত বুঝমান বানিয়ে দিয়েছে।
আরিশ নিজেকে বলতে লাগলো,,,,
--"ইনায়ার অতীত যাই হোক না কেন তাতে আমি ইনায়ার বর্তমান খারাপ হতে দিব না। এবং তার বর্তমান সহ ভবিষ্যৎ কে সুন্দর এবং সুখের করো তুলবো। আল্লাহ তুমি শুধু আমার ভালোবাসায় রহমত নাজিল করো যাতে আমি খুব শীঘ্রই হালাল ভাবে ইনায়াকে পাই এবং ওকে এত ভালবাসা দিতে পারি যাতে সে তার অতীতের সমস্ত কষ্ট যন্ত্রণা এক নিমিষে ভুলে যায়।"
এইসব বলে আরিশ রুম থেকে বের হলো। হঠাৎ দড়জা খুলে যাওয়ার আওয়াজে ইনায়া এবং ইরিন দুজনেরই ধ্যান ভাঙ্গল। দুজনেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আরিশের দিকে তাকালো। আরিশও নিজের স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখল।
ইরিন নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালো এবং বলল ,,,,
--"ভাইয়া তোমরা বসে গল্প করো আমি তোমার রুমটা গুছিয়ে দিয়ে আসছি।"
এই বলে ইরিন আরিশের রুমের দিকে চলে গেল। সে মূলত আরিশ এবং ইনায়া কে কথা বলার জন্য সুযোগ দিল।
আরিশ ইনায়ার দিকে তাকালো। তারপর ইনায়ার পাশের এক সিঙ্গেল সোফায় বসলো তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করল,,,,,
--"খুব ভালোই তো বোঝাতে পারো।তাও আবার মনের আবেগ, অনুভূতি এইসব বিষয়ে। সত্যি, চাইলে ভবিষ্যতে মনোবিজ্ঞানী হতে পারবে। অবশ্য আমি সেটির লক্ষণই দেখছি।"
ইনায়া মুচকি হাসলো।আরিশের এইসব কথা তার কাছে মন্দ লাগে না বরং ভালোই লাগে।সে আরো উৎসাহ পায়।
কিন্তু হঠাৎ আরিশের তার দিকে ছুড়ে দেওয়া এক প্রশ্নে তার মুখের মুচকি হাসি নিমিষেই হারিয়ে যায়।মখে অন্ধকার ছড়িয়ে যায়। বুকে এক চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। মনে হয় অতীতের কোনো স্মৃতি নাড়া দিয়েছে। যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি।যা ইনায়া চাইলেও ভুলতে পারবে না আর না পারবে নিজের জীবন থেকে মুছতে । বরং এটি বয়ে নিয়ে হাসি মুখে তার বাকি জীবন পার করতে হবে।
কিছু মুহূর্ত আগে আরিশের করা প্রশ্ন _____
--"কাউকে ভালোবাসতে ইনু? খুব খুব ভালোবাসতে কী? নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসতে?"
এক বাক্যে করা ৩ টি প্রশ্নই যথেষ্ট ছিল, ইনায়ার মুখ থেকে হাসি কেড়ে নিতে। ইনায়া কে অতীতের যন্ত্রণা মনে করিয়ে দিতে। ইনায়া কে নিরব করে ফেলতে।
আর ইনায়ার এই নিরবতায় আরিশ তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে। নিমিষেই আরিশের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়লো। --"সবসময় এমন হয় কেন?আমরা যাদের চাই তারা আমাদের চায় না কেন?এই নীতির কি কোনো পরিবর্তন হতে পারে না?"
আরিশ ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে নিজের মনে মনে বিড়বিড় করলো।সে যে সহ্য করতে পারছে না যাকে সে ১৫ বছর যাবৎ না দেখে ভালোবেসে এসেছে সে অন্য কাউকে নিজের মন দিয়ে ফেলেছে।কি করে মেনে নিবে আরিশ।কি করে????
আরিশ আর সেখানে বসে থাকতে পারলো না। সোফা থেকে উঠে ফ্ল্যাটের বাইরে চলে গেল।
আর ইনায়া? সে এখনো চুপচাপ বসে আছে।না পারছে কাঁদতে আর না পারছে সহ্য করতে।সে বারবার নিজেকে বলল,,,,
--"মেয়েদের অতীত থাকতে নেই। মেয়েদের অতীত থাকতে নেই। মেয়েদের অতীত মানে অভিশাপ।এক ভয়ংকর অভিশাপ।