অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৩৭

🟢

আজ দুদিন হলো ইনায়ার আরিশের সাথে কথা তো দূরের কথা দেখা পর্যন্ত হয়নি। ইনায়ার মন আজ ভিশন আচ্ছন্ন। কেমন জানি অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার মনে।যেন কিছুই ভালো লাগছে না।কোনো কিছুর কমতি আছে। কিন্তু কিসের তা সে বুঝতে পারছে না।

ইনায়া পড়ার টেবিলে বই সামনে নিয়ে বসে আছে কিন্তু পড়াতে মন বসছে না।কেন জানিনা বারবার তার আরিশের কথা মনে পড়ছে।

কিন্তু সে নিজের চিন্তা ভাবনা কে বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকতে দিল না। তৎক্ষণাৎ নিজেকে শাসিয়ে উঠলো এবং বলতে লাগলো,,,,

--"তুই বেশি বেশি ভাবছিস। সেই আগের ইনায়ার পথে হাঁটছিস। তোর যে কত স্বপ্ন তা ভুলে গেলে কি চলবে? খামোখা কিছু দিনের আশা মেহমান কে নিয়ে ভাবছিস।আরিশ আজ এসেছে কাল চলে যাবে। শুধু শুধু তাকে নিয়ে কেন ভাবছিস। একদিন তো তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে তাকে ভালোবেসে ফেলবি।তখন কি করবি?এক ভুল আর কতো। আগের বার না হয় পরিবারের জন্য তোকে ভুগতে হয়েছে। কিন্তু এইবার তো‌ কেউ কিছু বলছে না। কেন তুই সেধে সেধে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছিস। এইবার কষ্ট পেলে কার কথা বলবি।আর কারোর কথা বলাটা আসল কথা না আসল কথা হলো দিন শেষে তোকেই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।তাই সব চিন্তা ভাবনা কে দূরে রেখে পড়াশোনায় মন দে। হয়তো তোর এই পাড়ও থাকবে না আর না‌ ঐই পাড়।"

ইনায়ার চিন্তা ভাবনায় ছেদ পড়ল যখন তার ফোনে ম্যাসেজের শব্দ আসল।সে তারাতাড়ি ফোন হাতে নিল।সে‌ মনে মনে একজনের কথাই ভাবছে।ফোন‌ হাতে নিয়ে ইনায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল সে যার কথা ভাবছিল সেই মেসেজে করেছে।

তার Personal Diary. অর্থাৎ তার রিফাত ভাই। রিফাতই তার জীবনের এমন একজন মানুষ যে নিজের অজান্তেই তার সবথেকে খারাপ সময় তার পাশে থাকে। ঠিক যেমন এখন তার মন ভার ছিল আর এখনি সে মেসেজ দিয়েছে।

ইনায়া আর দেরি না করে সোজাসুজি কল লাগলো। রিফাত কল ধরল। সবসময়ের মতোন রিফাত আসলো ভিডিও কলে আর ইনায়ার ক্যামেরা ওফ।

কিন্তু রিফাত কে দেখে ইনায়ার চোখ ছানাবড়া। তার মুখ হা হয়ে গেল।সে কিছু বলার ভাষাই খুঁজে পেল না।

অন্যদিকে রিফাত বলতে লাগলো,,,,

--"কিরর,,,রে,,,,,(টান মেরে) কি ভাউ চাউ তোর।ভুইলাইতো গেছোত আমারে।এহন আর এই গরিব ভাইয়ের কথা মনে পড়ে না। বুঝি বুঝি সব বুঝি। আসলে এই দুনিয়া ডা বড়ই নিষ্ঠুর।সবাই সবাইকে ভুলে যায়।আর তুই তো প্রিন্সেস উগান্ডা।আমারে যে কল দিছোত এইডাই আমার সাত কপাল ভাগ্য।"

রিফাত কথা গুলো একদম নিজের মুখ ক্যামেরা সামনে নিয়ে এসে বলছিল।

ইনায়ার রাগ বেড়ে গেল সে বিরক্ত হয়ে বলল,,,,

--"ইউহহহ,,,,কি করেছো কি তুমি? তোমার দাড়ি মোচ কোই?কাটছো কেন? আল্লাহ্,,, এখন তো‌ তোমাকে রিফাত ভাই কম রিফাতী আফা বেশি লাগছে।এই শুনো ক্যামেরা ওফ করো। এখন আমার তোমাকে দেখে রাগ উঠছে। কেমন ছিলা মুরগির মত লাগছে। ছিইইইইইইই।"

ইনায়া নাক ছিটকে কথা গুলো বলল।

রিফাত ভাব নিয়ে বলল,,,,

--"ইহ,,,আইছে আমার নাক ছিটকানি।শোন একবার যদি আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারি তারপর দেখবি আমার নতুন লুক। ইউনিভার্সিটিতে ঢুকতে না ঢুকতেই মেয়েরা আমাকে দেখে পাগল হয়ে যাবে। মেয়েদের লাইন পড়ে যাবে আমার পিছনে।"

ইনায়া মুখ ভেংচি কেটে বলল,,,,

--"হ্যাঁ এতোই পাগল হয়ে যাবে তারা তোমাকে দেখলেই গর্ভবতী হয়ে যাবে।"

রিফাতের কাশি উঠে গেল। তারপর বলল,,,

--"আস্তগফিরুল্লাহ কি যাতা বলিস।এইসব বলতে নেই প্রিয়।"

ইনায়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,,,

--"আরে আমি তো বলছি গর্ব বোধ করবে। এখন যদি তুমি উল্টো পাল্টা শুনো তাতে আমার কি প্রিয়?"

রিফাত মুখ ভেংচি কেটে বলল,,,,

--"নাটক কম কর প্রিয়,তুমি যে কথা ঘুরিয়ে ফেলছো তা তোমার কথার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়।"

বিজ্ঞাপন

ইনায়া হাসতে লাগলো।এই একটা ব্যক্তি যার সাথে কথা বললে ইনায়া নিজের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়। ঠিক যেমন একটু আগেই তার মনে কালো মেঘ জমেছিল। মনে হচ্ছিল এই না চোখ দিয়ে বৃষ্টি ঝড়ে পরবে। কিন্তু এখন সেই কালো মেঘ কেটে গিয়ে হাস্যোজ্জ্বল সূর্য ভেসে উঠলো। যেখানে না আছে কোনো মিথ্যা আর না কোনো লুকোচুরি। এখানে সব প্রকাশিত।

ইনায়ার মাথায় এক সয়তানি বুদ্ধি আসলো।সে ন্যাকামি করে বলল,,,

--"আজকে আমার জন্মদিন ছিল আর তুমি ভুলে গেলে? লজ্জা করে না?"

রিফাত কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। প্রথমে সেও ভেবেছিল সে হয়তো ভুলে গেছে, কিন্তু ইনায়ার এমন ন্যাকি স্বরে বুঝতে পারল ইনায়া নাটক করছে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে ইনায়া অন্য পাঁচ, দশটা মেয়ের মতোন ন্যাকামি করে না। বরং যা বলে সরাসরি।আর সবসময় Non-serious থাকে।

রিফাত কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলল,,,

--"আমি মানলাম আমার তোর জন্মদিন মনে থাকে না। কিন্তু I'm Damn Sure,,যে আজকে তোর জন্মদিন ‌না। সম্ভবত এই‌ মাসেরই ১৭,২৩ অথবা ২৮ তারিখ তাই না?"

ইনায়া কপাল চাপড়ালো।আর মনে মনে বলল,,,

--"হায় আল্লাহ কোন লোকের পাল্লায় পরলাম? একটা মানুষ কত বার জন্ম গ্ৰহণ করতে পারে? এই বেডা তো আমার এক মাসেই তিন বার জন্ম গ্ৰহণ করিয়ে দিল। এইতো গত বছর সে পড়ালেখার জন্য অফলাইন যাবে। লাস্ট কথা হয়েছিল ২৩ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিনের দিন। সেই দিন আমাকে উইশ করে অফলাইন যায়। কিন্তু আবার ডিসেম্বরের ১২ তারিখ অনলাইন এসে আমাকে বার্থডে উইশ করে।কি লেভেলের গাঞ্জা খেলে মানুষ এমন গাঞ্জাইটা মার্কা কাজ করতে পারে তা রিফাত ভাই না‌ দেখলে জানতেই‌ পারতাম না।"

ইনায়া নিজের চিন্তা ভাবনা কে দূরে রেখে বলল,,,

--"যাক এইবার অন্তত মাস টা ঠিক বলতে পেরেছো! এইটাই অনেক।যাই হোক All Most Correct.23 September.

রিফাত খুশি হয়ে নিজের বড় বড় দাঁত বের করে বললো,,,,

--"হিহিহিহি,,,,আমি জানতাম।যাক অনেক টা কাছে আগাইছি।"

এই বলে রিফাত হাসতে লাগলো।

ইনায়া রিফাতের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল। তারপর রিফাত কে মন দিয়ে পড়তে বলে ফোন কেটে দিল।তার মন এখন একদম হালকা। মনে হচ্ছে বুক থেকে এক পাহাড় ভেঙ্গে গড়িয়ে পড়ল।

ইনায়া মনে মনে বলল,,,,,

--"সবার জীবনে রিফাত ভাইয়ের মতোন একজন ভাই থাকা উচিত। এমন মানুষ কয়জন পায়?পায় না। কিন্তু আমি পেয়েছি। এবং রিফাত ভাইকে নিজের জীবনে পাওয়ার জন্য আমি খুব খুশি। আমার জীবনে যখন কোন একজন ব্যক্তির খুব বেশি প্রয়োজন ছিল আমাকে সামলানোর জন্য তখন একমাত্র রিফাত ভাই আমার সাথে ছিল। আর তার দেওয়া সেই সাপোর্ট আমি কখোনোই ভুলতে পারবোনা কখোনোই না।"

ইনায়া বসে বসে এইসব ভাবছিল ঠিক তখনই তার ফোনে আবার একটা মেসেজ আসলো। মেসেজটি ছিল আরিশের।

--"ইনু তোমার ফুপির বাড়ির ছাদে আসো।আমি অপেক্ষা করছি।"

এই একটা লাইন পড়ে ইনায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।সে দেরি না করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বের হয়ে গেল ছাদের উদ্দেশ্যে।

বিকেলের আকাশে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। সূর্য এখনো অস্ত যায় নি।আরিশ এক মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তার মনের ভেতর অন্য কিছু চলছে।

সে ইনায়ার উপস্থিতি টের পেল যখন ইনায়া তার পিছনে এসে দাঁড়ায়।আরিশ ইনায়ার দিকে তাকালো আর ইনায়া আরিশের দিকে। ইনায়ার জানি কেমন এক শান্তি শান্তি লাগলো। দুদিন পর সে আরিশ কে দেখলো।আরিশের অনুপস্থিত তার নিজের অজান্তেই তাকে অনেক পুড়িয়েছে। ইনায়া যতই নিজেকে এইটা সেইটা দিয়ে বোঝাক না কেন। সে তো জানে তার মনের কথা।

ইনায়া কিছু বলতে যাবে তার আগের আরিশের মুখ থেকে বের হয়ে আসা কথা ইনায়ার বুকে লাগলো। কথাগুলো তার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি বের হতে লাগলো।সে কখনোই ভাবেনি এমন দিন সে‌ দেখবে। যেই জিনিসটাকে সে সব থেকে বেশি ভয় পেতে এখন সেই জিনিসটি তাই মনের দরজায় সামনে এসে কড়া নাড়ছে।

মূলত কিছু মুহূর্ত আগে আরিশ বলেছিল,,,,,

--"ভালোবাসি তোমায় ইনু।আজ থেকে নয় বরং আরো ১৫ বছর ধরে।না দেখে, শুধু মাত্র শুনেছিলাম তুমি জন্মগ্ৰহণ করেছো। ঠিক তখনই ভালোবেসে ফেলেছিলাম।তখন অবশ্য ভালোবাসা মানে কি তা জানতাম না, কিন্তু তোমার বাবার কাছে আবদার করেছিলাম বিয়ে আমি তোমাকেই করব। আর তোমার বাবা ও তাতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। এবং সেই থেকে আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। ভেবেছিলাম তোমার জন্মদিনের দিন যেহেতু তোমাকে ভালবাসা শুরু করেছিলাম তাই সামনে আসা তোমার জন্মদিনের দিনই তোমাকে নিজের মনের কথা বলবো। কিন্তু যখন জানতে পারলাম তুমি অন্য কাউকে ভালবাসতে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছিল। বিশ্বাস কর ইনু। তোমাকে নিয়ে আমি আর কোনো রিস্ক নিতে চাই না। বড্ড ভালোবাসি যে তোমায়। নিজের মনের কথা কিভাবে প্রকাশ করব তার জন্য এতগুলো বছরে হাজারো প্ল্যান করেছিলাম, ভেবেছিলাম খুব স্পেশাল ভাবে তোমাকে নিজের মনের কথা বলবো। ভাবতে পারিনি এত সাধারন ভাবে নিজের মনের কথা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু বিশ্বাস কর মুখ দিয়ে যতবার বলতে পারব তোমাকে ভালোবাসি , তার থেকেও হাজার গুণ বেশি ভালোবাসি। ভালোবাসা যে কখনো বলে প্রকাশ করা যায় না। তোমাকে আমি হারাতে চাই না। আমাকে কি একবার সুযোগ দেওয়া যায় না ইনু? প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিও না। তোমাকে ভালবাসতে পারার একটি সুযোগ ভিক্ষা চাচ্ছি আমি।"

এই বলে আরিশ হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লে। আর ইনায়া থ হয়ে গেল রইলো।তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছে।সে কখনো ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি এত বড় ধাক্কা তাকে সামলাতে হবে। সে যেন পাথর হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস