অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৪০

🟢

ইনায়া বাড়ি ফিরেছে কতক্ষন পরেই।ইরিনের বলা কথা গুলো এখনো তার কানে ভেসে আসছে।তার হাত পা কেমন জানি তার অবশ অবশ লাগছে। একটি লোক তাকে এত ভালোবাসে গেল অথচ সে ঘুনাক্ষরেও টের পেল না।আর সে চোখ বন্ধ করে ভুল মানুষের জন্য নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিল যে কিনা তার ভালোবাসার যোগ্যই না। ইনায়া সিদ্ধান্ত নিল এবং বলল,,,,

--"অনেক হয়েছে যন্ত্রণা সহ্য করা, অনেক হয়েছে ভুল মানুষকে ভালবাসা। এখন আমি শুধু আরিশের আর আরিশ শুধু আমার। আপনাকে ফিরে আসতে হবে আরিশ। আপনার ইনু আপনার অপেক্ষায় আছে। আপনি তো অনেক ভালোবাসলেন আমায়, এইবার আমায় আপনাকে ভালোবাসার সুযোগ দিন।"

ইনায়া থামলো কিন্তু মনে আছে এক‌ অজানা ভয়।

__________________

সকাল গড়িয়ে দুপুর

ইমন খান এবং তার ছেলে মেয়ে মিলে উঠে পরে লেগেছে ইনায়া কে বিয়ে দেবার জন্য।এক ঘটক ঠিক করেছিল।সে কিছুক্ষণ আগেই এসে বলে গিয়েছে তার হাতে কিছু ভালো ছেলে আছে।যদি অনুমতি পায় তাহলে তাদের মধ্যে একজন ছেলে এবং পরিবার কে নিয়ে আসবে।

ইমন খানের ঠোঁট হাসি ফুটে উঠল। তিনি নিজের সন্তানদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল,,,,

--"আর তিন চার দিন পর তাদের নিয়ে আসুন।আমরা এই তিন চার দিনে আমাদের তরফ থেকে তৈরি হই।"

ঘটক সম্মতি জানিয়ে বিদায় নেয়।তারা মূলত সময় নিয়েছে যাতে শারমিন কে রাজি করাতে পারে। কারণ শারমিন এত সহজে মেয়ের বিয়ে দিবে না।তাই আপাতত শারমিন কে রাজি করিয়ে সমন্ধ আনতে হবে পরের টা মেনেজ করা সমস্যার কিছু হবে না।আর ইমন খান গত সন্ধ্যায় আরিশ কে লাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠতে দেখেছিল তারপর নিজের বড় ভাইকে অনেক খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলো আরিশ লন্ডনে কিছু ব্যবসার কাজে গেছে। ইমন খান ধারণা করল তারমানে আরিশের আসবে কম হলেও ১ সপ্তাহ পর।এর ভিতর উনি নিজের কাজ করে ফেলবে। এবং এখন নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছে।

____________

সন্ধ্যা বেলায়,,,,

ইমন খান তার বোনের বাড়িতে চলে গেল এবং বোন কে বলল,,,

--"ইনায়ার জন্য ভালো ছেলে আছে।তুই শারমিন কে রাজি করা তাহলে তারা চার দিন পর আসবে দেখতে।"

রেশমা খান ভাইয়ের কথায় সায় দিল এবং শারমিন কে ডেকে আনল। শারমিন আসতেই রেশমা খান বলতে শুরু করল,,,,

--" ইনায়ার জন্য ভালো ঘর থেকে সমন্ধ আসছে।আমি বলি কি এখন আর না, না, নাহ করে রাজি হয়ে যা। দেখাশোনা হোক। দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হয়ে যায় না।আর ইশান আর কত সবদিক সামাল দিবে।ওর উপর তো আর সব চাপ দিলে হবে না।আমরা তো আর ইনায়ার খারাপ চাই না। এমন জায়গায় বিয়ে দিব যেখানে তাকে বিয়ের পর পড়াশোনা করাবে। ইনায়া যতদিন ইচ্ছে ততদিন পড়তে পারবে। এবং চাইলে চাকরি করতে পারবে। আমরা সব কিছু বুঝে শুনেই তো দিব। তাই বলছি কি আর দ্বিমত না পুষে রাজি হয়ে যা। ইমন খুব ভালো ছেলে পেয়েছে তুই রাজি হলে ৩-৪ দিন পর তারা এসে দেখে যাবে। আগে দেখে যাক তারপর যদি তোর পছন্দ হয় তোর মত থাকে তখন না হয় এ বিষয় নিয়ে আমরা সামনে আগাবো। আর আপাতত ইনায়া কে কিছু বলার প্রয়োজন নেই কারণ পড়ালেখা করছে এসব শুনলে মন খারাপ হবে। যেদিন দেখতে আসবে তার কিছুক্ষণ আগ দিয়ে বলবি তাহলে আর বেশি সমস্যা হবে না। কিন্তু দেখতে আসার পর যদি ইনায়া পছন্দ না করে এবং বলে যে সে এখন বিয়ে করতে চায় না তখন না হয় আমরা আর তাকে জোর করব না।"

রেশমা খান থামলো। তার দৃষ্টি শারমিন এর দিকে। শারমিন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,,,

--" মেয়েকে তো একদিন না একদিন বিয়ে দিতেই হবে আর মেয়েটা অতীতে একবার ভালোবেসে আঘাত পেয়েছে এখন হয়তো এসবের ভেতর নিজেকে জড়ায় নি কিন্তু ভবিষ্যতে জড়াবে না এমন তো কোন কথা নয়, আর আমি চাইনা আমার মেয়েটা আবার কষ্ট পাক। তাই আমি রাজি আপনাদের মতামতে। কিন্তু পরবর্তীতে যদি ইনায়া না করে তাহলে আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলব না।"

শারমিন থামল।ইমন খান এবং রেশমা খানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ইমন খান শারমিন কে বলল,,,,

--" বড় ভাই এবং বড় ভাবি যাতে এই বিষয় সম্পর্কে কিছু জানতে না পারে। তারা এত বছর বিদেশে থেকেছে, এত বছর পর দেশে এসেছে, অবশ্যই তাদের কোন মতলব আছে তাই যেদিন দেখতে আসবে সেদিন তাদেরকে বললেই হবে। এত আগে বলার কোন প্রয়োজন নেই।"

শারমিন আর কিছু বলল না।সায় জানিয়ে দিল।

কিন্তু রুমের বাইরে থেকে সব কথা শুনে ফেলল ইরিন।সে মূলত নিজের রুম থেকে বের হয়েছিল ইনায়ার কাছে যাবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দোতলা থেকে নিচে নামতেই রেশমা খানের ঘরের সামনে ইনায়ার মায়ের জুতো দেখে ভাবে হয়তো ইনায়াও এখানে আছে তাই সে ঘরের ভেতর ঢুকে। কিন্তু যেই রুমে সবাই বসে থাকে সেই রুমের দরজা মিশানো থাকায় সে ঢুকতে যাবে তখনই এসব কথাবার্তা শুনে সে থেমে যায় এবং মনোযোগ দিয়ে সবগুলো কথা শোনে।সব শুনে তার হাত পা অবশ হওয়ার উপক্রম। সে বুঝতে পারছে না এখন কি করবে।সে কি ইনায়া কে বলবে? না না ইনায়া এমনিতেই আরিশের জন্য চিন্তিত তাকে আরো চিন্তায় ফেলা যাবে না। তাহলে সে এখন কাকে বলবে? হ্যাঁ সাদমান। সাদমান কে বললেই সব ঠিক হবে।

ইরিন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আবার দৌড় দিয়ে দোতালে উঠে গেল কিন্তু এবার নিজের ফ্ল্যাটে না গিয়ে সোজা আরিশের ফ্ল্যাটে দিকে চলে গেল। সেখানেই মূলত সাদমান থাকে। অনবরত কলিং বেল বাজাতে লাগলো। সাদমান সবে মাত্র আরিশের সাথে কথা বলে ফোন রাখলো আর সাথে সাথেই কলিং বেল বেজে উঠলো।

সাদমান গিয়ে দরজা খুলতেই ইরিন তড়িঘড়ি করে রুমে ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সাদমান হতভম্ব হয়ে গেল।তার এইবার রাগ উঠে গেল।এই মেয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। যে জায়গায় এই ফ্ল্যাটে এখন তার ভাই অনুপস্থিত সেই জায়গায় একটি পর পুরুষের সাথে এই রুমে ঢুকে আবার দরজা লাগিয়ে দিচ্ছে। আশেপাশের মানুষ দেখলে সবার আগে ইরিনের চরিত্রে প্রশ্ন তুলবে।

সাদমান ইরিন কে কর্কশ কন্ঠে বলল,,,,

--"R you lost your mind Erin? তোমার কি কোনো Commonsense নেই? এইযে এতবার বলছি আমি তোমাকে শুধু নিজের বন্ধুর ছোট বোন হিসেবে দেখি তা ছাড়া আর অন্য ভাবে দেখি না। তাহলে কেন নির্লজ্জের মতোন আমার পিছনে পরে আছো? এতটুকু হলেও তো Self-respect রাখা উচিত তোমার। যেখানে এই ঘরে তোমার ভাই নেই সেখানে তুমি কোন সাহসে এই রুমে ঢুকেছো। তার ওপর আবার রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছো। এগুলো কোন ধরনের অসভ্যতামি? দয়া করে আমাকে মুক্ত দেও। আমি বিরক্ত হয়ে গেছি তোমার এসব পাগলামিতে। তুমি যথেষ্ট ম্যাচিউর। তোমার এইটা বোঝার ক্ষমতা আছে ,যে জায়গায় আমি বারবার তোমাকে ইগনোর করছি তার মানে আমার মনে তোমার জন্য বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। তাই দয়া করে নিজেকে আর ছোট করোনা।"

সাদমান একনাগাড়ে কথা গুলো বলে থামলো।সে কখনো কারোর সাথে এত উঁচু গলায় কথা বলেনি। সাদমান বরাবরই শান্ত স্বভাবের লোক। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে আরিশের সাথে কথা বলে তার মাথায় এমনিতেই গরম হয়ে গিয়েছিল। কারণ আরিশ অনেক বড় রিস্ক নিতে চলেছে তাও আবার একা একা। সে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু আরিশ কে থামাতে পারেনি। তার উপর আবার ইরিনের এই ভাবে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেওয়া। সব মিলিয়ে তার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল এবং নিজের মনের যত রাগ আছে সব ইরিনের উপর ঢেলে দিল।

আর ইরিন সাদমানের প্রত্যেকটি কথাই ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। তার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে আহত দৃষ্টিতে একবার তাকালো সাদমানের দিকে। আসলেই কি সে এত খারাপ? সাদমান কি তাকে এত ঘৃণা করে?ইরিন আর সহ্য করতে পারলো না। তার চোখ জলে ভরে গেল।

সাদমান ইরিনের দিকে তাকাতেই সাদমান থমকে গেল।তার ভেতরটা নাড়া দিয়ে উঠলো। মাত্র বুঝতে পারল সে এতক্ষণে রাগের মাথায় কি কি বলে ফেলেছে ইরিন কে। সাদমান চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে ইরিন কে যেইনা সরি বলতে যাবে তার আগেই ইরিন ভাঙ্গা কন্ঠে বলল,,,,

--"ইনায়ার চাচা, ফুফু মিলে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তিন-চারদিন পর তাকে ছেলের পক্ষ থেকে দেখতে আসবে। এই সম্পর্কে সে কিছু জানে না। এবং তার মা এতে রাজি হয়েছে। কাকে বলব কিছু বুঝতে পারছিলাম না তাই আপনাকে বলতে এসেছিলাম। বাহিরে বললে যদি কেউ শুনে ফেলতো তাই রুমের ভেতরে ঢুকেছি। I'm So Sorry. Sorry For Disturbing you And Sorry For Everything. আপনি আমাকে যে চরিত্রের ভাবছেন আমি সেই চরিত্রের মেয়ে না।"

এই বলে ইরিন আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। দরজা খুলে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল।

বিজ্ঞাপন

আর সাদমান সে অনুতপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের উপর তার এখন ভিশন রাগ হচ্ছে। এমনি তে রাগ বলতে কিছু নেই কিন্তু যখন রাগ উঠে তখন কি বলে সে নিজেও জানে না।এত বাজে ভাবে ইরিন কে আঘাত না করলেও পারতো। সাদমান এখন পড়েছে মহাবিপদে। এক দিকে আরিশের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, একদিকে ইরিনের মনে আঘাত করে কথা বলে তাকে কষ্ট দেওয়া, এবং অন্যদিকে আবার ইনায়াকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। সাদমানের মাথা ফেটে যাচ্ছে।সে ইরিন কে এইভাবে কথা গুলো মিন করে বলতে চাই নি।সে তো শুধু ইরিন কে নিয়ে যদি কেউ কোনো খারাপ কথা বলতো তাই এইসব ভেবে রেগে গিয়েছিল।আর আগের থেকেও মাথায় রাগ ছিল।সব মিলিয়ে সে বেচারি ইরিনের উপর রাগ ঢেলেছে এবং এখন তিলে তিলে পস্তাতে।

ইরিন নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দরজার সামনে পিঠে হেলান দিয়ে বসে পরলো। কান্না দলা পাকিয়ে আসছে তার।সে আর নিজেকে থামালো না। কাঁদতে লাগলো।আজ সাদমানে কথা গুলো তীরের মতো তার হৃদয়ে এসে লেগেছে।আর তার সাদমানের জন্য ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলা হৃদয় সেই তীরের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। ইরিনের কান্না গতি বেড়ে গেল।মুখ থেকে কান্নার গুঙ্গানির শব্দ বের হতে নিলে সে নিজের হাত দ্বারা নিজের মুখ চেপে ধরল যাতে কান্নার শব্দ না বের হয়। এইভাবেই সে কাঁদতে লাগলো।

আর তার মনে পরে গেল ইনায়ার বলা কথাগুলো,,,,,,,

--"কোনো পুরুষ যখন বুঝতে পারে যে কোন নারী তাকে সত্যিকারের ভালোবাসে তখন তার সেই নারী কে তুচ্ছ মনে হয়।নারীর ভালোবাসা তার কাছে মূল্যহীন।"

ইরিন কান্না করতে করতে বিরবিল করে বলল,,,,

--" আসলেই পুরুষেরা ভালোবাসার মর্ম দিতে যানে না। আমিই বেশি এক্সপেক্টেশন রেখে ফেলেছিলাম। আর কখনো আপনাকে বিরক্ত করবনা সাদমান কথা দিলাম।মরে যাব কিন্তু আপনার কাছে কখনোই নিজেদের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি করবো না। থাকুক না আমার ভালোবাসা অপূর্ণ। আপনার দেওয়া আঘাত নিয়েই না হয় আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে আর কখনোই আপনার দিকে তাকিয়ে দেখবো না।"

ইরিন কথা গুলো বলে আবার হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো।আজ তার ভিশন কান্না করতে ইচ্ছে করছে। সে আর নিজের ইচ্ছেকে দমন করলো না বরং কাঁদতে লাগলো।

__________________

রাত ২ টা। ইনায়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

অন্যদিকে লন্ডনে এখন সন্ধ্যা ৮টা বাজে।আরিশ নিজের ব্ল্যাক ডায়মন্ড লুক নিয়ে বাচ্চাদেরকে যে পুরনো গোডাউনে আটকে রাখা হয়েছে সেই গোডাউনের দিকে আগাচ্ছে। তার সাথে তার আরো তার কিছু এসিস্ট্যান্ট আছে।যারা নিজেদের মুখ কালো রঙের মাস্ক দিয়ে ঢেকে রেখেছে। সবার হাতে গুলি। সবাই আরিশের ইশারায় আস্তে আস্তে গোডাউনের দিকে এগোতে লাগলো। আরিশ নিজের লোক দ্বারা গোডাউনে চারদিক ঘেরো করে রাখল যাতে কেউ পালাতে না পারে।

আরিশ মাত্র ১০ জন লোক নিয়ে গোডাউনের ভেতরে ঢুকলো। বাকি লোকগুলো গোডাউনের চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে। আর অনেকেই গোডাউনের থেকে অনেক দূরে ট্রাক নিয়ে বসে আছে। যাতে যখন বাচ্চারা এখান থেকে বের হতে পারবে তখন তাদের তাড়াতাড়ি করে ট্রাকে উঠিয়ে এখান থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারবে।

আরিশ আস্তে আস্তে নিজের লোকদেরকে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে গোডাউনের ভেতরে ঢুকে গেল। আরিশ ইনায়ার কথা মতোন আগে কিডন্যাপারদের দুর্বলতা খুঁজে বের করেছিল। এবং এদের দুর্বলতা ছিল নেশা পানি এবং নারী।আরিশ সেই দুর্বলতা কাজে লাগিয়েছে‌।সে নিজের লোকদের মাধ্যমে কিডন্যাপার দের কাছে অনেকগুলো মদের বোতল পাঠিয়েছিল। মদের বোতলগুলো একটি কার্টুনে পাঠানো হয়েছিল এবং কার্টুন বক্সের উপর একটি চিরকুট ছিল যেখানে লেখা ছিল Well Done. কিডনাপাররা ভেবেছিল হয়তো তাদের কাজের জন্য কেউ তাদেরকে উপহার দিয়েছে। এবং মদের বোতল দেখে তারা নিজেদের লোভ সামলাতে পারল না। তাই সেগুলো নিয়ে সবাই ফুর্তি করতে ব্যস্ত।

আরিশ তার লোকদের বলল পুরো গোডাউন তন্ন তন্ন করে খুঁজে বাচ্চাদেরকে যেন এখান থেকে বের করে নিয়ে যায়। আর কিডনাপারদের সে একা সামলাব।কারণে যদি সবাই মিলে কিডন্যাপারদের সামলায় তাহলে বাচ্চাদের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বাচ্চাদের নিরাপত্তা আগে।

আরিশ চলে গেল গোডাউনের ছাদের দিকে। কারণ সেখান থেকে অনেক মানুষের কথা বলা শব্দ আসছে।আর তার লোকেরা বাচ্চাদেরকে খুঁজে ঘুরাউন থেকে বের হয়ে গেল। গোডাউন থেকে বের হয়ে তারা আরিশ কে স্যাটেলাইট ফোনে বলল,,,,

--"Sir Mission Successful."

ব্যাস আরিশ এই মেসেজটুকুর অপেক্ষায় করছিল। গোডাউনের ছাদে উঠে পরলো।সে দেখতে পেল সেখানে ৭-৮ জন কিডন্যাপার। তারা মদ খেয়ে মাতলামি করছে। কারোরই তেমন কোন হুস নেই।আরিশ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনা শব্দে তাদের দিকে এগোতে লাগলো।আরিশ নিজের গুলির ব্যবহার না করে বরং মাটিতে রড পরেছিল সেটি হাতে নিল। তারপর একে একে সবার মাথায় বাড়ি মারলো। কেউই নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না কারণ সেখানে উপস্থিত সবাই এমনিতেই মদ খাওয়ার কারণে টাল হয়ে গিয়েছিল।তাই এমন আকস্মিক ঘটনা থেকে কেউই নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না। একে একে সবাই মাটিতে পরে গেল।

আরিশেল ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।সে স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে নিজের লোকেদেরকে বলল গোডাউনের ছাদে চলে আসতে এবং সেখানে পড়ে থাকা লোকেদের অ্যারেস্ট করে নিতে।

আরিশ নিজের আদেশ দিয়ে রড মেঝেতে ফেলে দিল। যেই না পিছনে ঘুরতে নিবে উমনি তার মাথায় যেন কেউ রড দিয়ে বাড়ি মারলো। সাথে সাথে আরিশ হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল।তার মাথা থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পরছে। তার পরনের কালো মাস্কের পিছনের অংশ রক্তে ভিজে গেছে।আরিশ হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো। তার চোখ ঘোলাটে হয়ে আসছে। কিন্তু সে নিজের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে।তার যেভাবেই হোক চোখ খোলা রাখতে হবে। তাকে বেঁচে ফিরতে হবে।

আরিশ নিজের সাথে লড়াই করতে দেখে তাকে আঘাত করা ব্যক্তি পৈশাচিক আনন্দ পেল।সে নিজের হাতে থাকা রড দিয়ে আরিশের ডান হাত এলোমেলো আঘাত করতে লাগলো।আরিশের যেন জান বেরিয়ে যাচ্ছে। একেই তো মাথায় আঘাত করার জন্য মাথা থেকে রক্ত বের হয়েছিল তার উপরে আবার তার হাতে মারা হচ্ছে।আরিশ অনেক কষ্টে

যেই রড দিয়ে তার হাতে মারা হচ্ছিল সেই রড নিজের বাম হাত ধারা ধরে ফেলে। এমন আকস্মিক আত্মরক্ষায় আগন্তুক ব্যক্তি ঘাবড়ে যায়।আরিশ নিজের বাম হাত দিয়ে ধরে রাখা

রড দিয়ে উল্টো সেই লোকটির গাঁয়ে বার করে।রড একদম লোকটির পায়ে ঢুকিয়ে দেয়। লোকটি চিৎকার করে উঠে।আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। একদম মাটিতে বসে পরে। নিজের হাটু থেকে রড বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আরিশ অনেক কষ্টে এক হাত দ্বারা নিজের মাথা চেপে ধরে।অন্য হাতের সাহায্যে নিয়ে যে সে বসা থেকে উঠবে এটাও এখন আর সম্ভব না। তার চারপাশ ঘোলা হয়ে আসছে।তাও আরিশ অনেক কষ্টে নিজের আঘাত প্রাপ্ত শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। হাঁটতে গিয়ে বারবার পরে যেতে নেয় কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নেয়। নিজেকে বলে,,,,

--"আরিশ তোর ইনু তোর জন্য অপেক্ষা করছে। তোকে তোর ইনুর কাছে ফিরতে হবে। তাকে তার অতীতের পাওয়া যন্ত্রণা নিজের ভালোবাসা দিয়ে ভুলাতে হবে।সে যে অনেক কিছু Deserve করে তাকে তার প্রাপ্য সুখ, সম্মান, ভালোবাসা দিতে হবে। তোকে ফিরতেই হবে।"

এইসব বলে আরিশ নিজের মাথা চেপে ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগলো ঠিক তখনই,,,,বুম!!!!!

গুলির শব্দ একটি তীব্র এবং কান ফাটানো আওয়াজ যা বন্দুক থেকে বেরিয়ে আসলো। এবং সোজা এসে আরিশের সেই আঘাতরত ডান হাত লাগলো।

আরিশ চিৎকার করে উঠলো,,,--"আহ্হহহহহ।"

সে মাটিতে শুয়ে পড়লো। তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম।আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নেওয়ার সবোর্চ্চ চেষ্টা করলো। তার কানে ভেসে উঠলো ইনায়ার বলা কথা,,,,

--"ইনায়া ইফরাহ খান আরিশ ইহতেশাম খানের জন্য অপেক্ষা করবে। নিজেকে অনিশ্চিত অপেক্ষায় আবদ্ধ করবে। আপনার ইনু আপনার অপেক্ষায় থাকবে।"

আরিশের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল,,,সে অনেক কষ্টে মুখ থেকে শব্দ বের করে বললো,,,,,

--"তাহলে কি আমাদের ভাগ্যে অপূর্ণতা লেখা আছে ইনু?আমি কি ফিরতে পারবো না তোমার কাছে?আমি যে স্বার্থপরের মতো কাজ করলাম। নিজের শেষ যাত্রায় এসে তোমাকে নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলাম। তোমাকে নিজের অনিশ্চিত অপেক্ষায় রেখে আসলাম। তুমি কি আমায় ক্ষমা করবে? আমার শেষ ইচ্ছে ছিল তোমার মুখে ভালোবাসি শোনার। বেঁচে থেকে তো আর ইচ্ছা পূরণ করতে পারলাম না। আমি মরে গেলে কি আমায় মরদেহের কানের কাছে এসে বলবে ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি।"

আরিশের চোখ বন্ধ হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস