অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৪৩

🟢

ইনায়া নিজের পড়ার টেবিলে বসে ছিল কিন্তু তার মন আরিশেল চিন্তায় ডুবে আছে।মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে।সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে আরিশ দেশে ফিরলে যদি সে আরিশের মাথা না ফাটিয়েছে তবে তার নাম ইনায়া ইফরাহ খান না। কিন্তু মাথা ফাটানোর জন্যে হলেও আরিশ কে দেশে ফিরতে হবে।

ইনায়া নিজের ফোন বের করে গ্যালারিতে ঢুকলো এবং আরশের পিক জুম করে দেখে গুনগুনিয়ে গাইতেলাগলো,,,,,,

--"Ek din aap yu hamako mil jaaege

Phul hi phul raaho me khil jaaege

Maine sochaa na thaa!!"

_______________

আরিশ বাংলাদেশে এসে পৌঁছাল দুপুর ২:৩০ এর পর।সে নিজের লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এলো। সাদমান আগে থেকেই গাড়ি পাঠিয়ে রেখেছিল। তাকে তো যে করেই হোক সন্ধ্যার আগে তার ইনুর কাছে পৌঁছাতে হবে। অবশ্য এয়ারপোর্ট থেকে শ্রীপুর যেতে সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ ঘন্টা লাগবে। এবং খুব বেশি ট্রাফিক জ্যাম থাকলে তিন ঘন্টা।তাই সে বিকাল ৬ টার মধ্যে নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবে। তারপরও তার মনে চিন্তা কারণ সে আর কোনো রিস্ক নিতে চায় না।আরিশ মনে মনে বলল,,,,

--"খুব শিঘ্রই আসছি তোমার কাছে আমি ইনু। অনেক অপেক্ষা করিয়েছি আর না জান।এখন তুমি শুধু আমার শুধু আরিশের।"

__________________

ইনায়া সবে মাত্র আসরের নামাজ পড়ে উঠলো। কিছুক্ষণ আগেও সে আরিশের সুস্থতার জন্য নামাজে কান্না করে ভাসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোনাজাতে কান্না করার পর থেকে এখন তার মন কিছুটা ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা ভালো হতে চলেছে। এবং ইনায়ার বিশ্বাস আছে আল্লাহর উপর যে এখন তার জীবনে যা হবে তা সবই ভালো হবে।

ইনায়া জায়নামাজ জায়গা মতো রেখে পিছনে ফিরতেই দেখলো তার মা দাঁড়িয়ে আছে।মনে হচ্ছে কিছু বলবে। ইনায়া তার মাকে জিজ্ঞেস করল,,,,

--" আম্মু কিছু বলবে? "

শারমিন শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করতে লাগলেন।তিনি জানেন তার মেয়ের পড়ালেখা করার অনেক ইচ্ছে। এই মুহূর্তে বিয়ের কথা শুনলে রেগে যাবে। কিন্তু মেয়েকে তো একদিন না একদিন বিয়ে দিতেই হবে। তাহলে এখন না হয় আগে থেকেই দেখা শোনা হয়ে যাক। দেখতে আসলেই কি আর বিয়ে হয়? তাই সাহস সঞ্চয় করে বলল,,,,

--"আজ সন্ধ্যায় তোকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে।দেখ মা রাগ করিস না। মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মেছিস একদিন না একদিন তো বিয়ে করতেই হবে। আজ শুধু দেখতে আসবে। সবকিছু তৈরি করা এখন না করে আমাদেরকে ছোট করিস না। দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হয়ে যায় না। আর তারপরও যদি তোর দ্বিমত থাকে তাহলে এই ব্যাপারে আমরা আগাবো না।"

ইনায়া বাক্য হারা হয়ে গেল।তার চোখে পানি চলে আসলো।একেই তো আরিশের চিন্তার পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম তারপর নাকি এখন তাকে দেখতে আসবে।সে মনে হচ্ছে এখন পাগল হয়ে যাবে আর নয়তো যেই দিকে দু'চোখ যায় সেই দিকে চলে যাবে। পেয়েছেটা কি সবাই।যখন চাইবে কাঠের পুতুলের মত নাচাবে।যখন ছোট্ট ছিল তখন তাকে বলা হয়েছিল একজনে সাথে তাকে বিয়ে দেওয়ার হবে।তখন সবে মাত্র ক্লাস ওয়ানে পড়তো।প্রেম,ভালবাসা, বিয়ে কি তা সে বুঝতোই না।মায়ের ওড়না দিয়ে বা গামছা পেঁচিয়ে শাড়ি পড়ে বউ সাজতে প্রত্যেক মেয়েরই ভালো লাগে ইনায়ারও লাগতো। বিয়ে মানেই বুঝতো ভালো কাপড় এবং খাওয়া।তাই তো তার পরিবারের সেই কথা মেনে নিয়ে একজন কে মনে প্রাণে রেখে দিয়েছিল।বড় হয়েছিল এই আশা বাঁধে যে তার সাথে একদিন বিয়ে হবে। এবং এই কারণেই ইনায়া একজন কে ১০ বছর একতরফা ভালোবেসে এসেছে।তখন সে না জানতো ভালোবাসা মানে আর না পারতো যাকে ভালোবাসে তার পুরো নাম। সানিউল নামকে সানি বলতো।এই একতরফা ভালোবাসা তাকে অনেক পুড়িয়েছে। অনেক জ্বালা, যন্ত্রণা দিয়েছে। অনেক বার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে কিন্তু ইনায়া সবকিছু একা একা সামলিয়ে ধৈর্য ধারণ করে নিজেকে স্বাভাবিক রেখেছে এবং সে একতরফা ভালোবাসা থেকে মুভ অন করেছে। তার পরেই এলো আরিশ।২ বছরও হয়নি ইনায়া মুভ অন করেছে তার ভেতর এলো আরিশ এবং নিজের মনে ইনায়ার জন্য জমিয়ে রাখা ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলো। ইনায়া অনেক কষ্টে সিদ্ধান্ত নিল আরিশ কে ভালোবেসে নিজেকে একবার সুযোগ দেবে কিন্তু এর ভেতর আরিশ তাকে অনিশ্চিত অপেক্ষায় আবদ্ধ করে চলে গেল। তারপরও ইনায়া এতক্ষণ পর্যন্ত শক্ত ছিল কিন্তু এখন আর শক্ত থাকতে পারছে না। একটি মানুষ কত শক্ত থাকতে পারে।আর যদিও কেউ পেরে থাকে কিন্তু ইনায়ার দ্বারা আর সম্ভব হচ্ছে না।সে নিজের চোখের পানি মুছে চিৎকার করে বলল,,,,

--"সমস্যা কি তোমাদের? যার যা ইচ্ছা আমার সাথে করে যাচ্ছ। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছো এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে? বোঝা হয়ে গেছি তাই না? আব্বু আজ জীবিত থাকলে কারোর সাহস হতো না আমাকে নিয়ে খেলার, আমাকে কষ্ট দেওয়ার।আসলেই যার বাবা নেই বিশেষ করে যেই মেয়ের বাবা থাকে না তার মাথার উপর কোনো ছায়া থাকে না।সবাই তাকে শুধু কষ্ট দেয়।বাবা ছাড়া মেয়েরা নিঃস্ব, ছাউনিহীন বাড়ি, শুকনো মরুভূমি।"

ইনায়া থামলো।এই প্রথমবার সে তার মায়ের সাথে এমন চিৎকার করে কথা বলেছে।সে শুধু মা কেন কখনো কারোর সাথেই বাজে ব্যবহার তো দূরের কথা চোখ তুলে কথা বলেনি।এমন না যে সে ভয় পায় কিন্তু সে ভাবে যদি রাগে কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেলে তাই নিজেই কষ্ট পেয়ে চুপচাপ সহ্য করে। এমনকি তার দোষ না থাকলেও সে চুপ থাকে কিন্তু আজ আর চুপ থাকতে পারল না।

শারমিন মেয়ের কথা শুনে কিছুটা কষ্ট পেলেন।তিনি কান্না করতে করতে বললেন,,,,

--" এভাবে বলিস না মা।আমি তোর ভাই তো আছি তাই না।আমরা কি তোর খারাপ চাই? তোর ভালোর জন্যই তো করছি সব।তোর ভাই আর কতদিন একা একা সব সামাল দিবে? তার তো একটা জীবন আছে? আর বিষয়টি এমন না যে তোকে আমরা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। শুধু দেখতে আসছে। আমার জন্য হলেও একটু তৈরি হয়ে তাদের সামনে যা। আমরা খোঁজ খবর নিয়েছি। ছেলে খুব ভালো এবং সরকারি কর্মকর্তা।তোর কোনো কষ্ট হবে না। তুবও যদি তোর মত না থাকে তাহলে পরে তোকে জোর করব না। কিন্তু তোকে আমার ভালোবাসার দিব্যি একটু তৈরি হয়ে উনাদের সামনে আসবি।"

শারমিন মেয়ের হাত নিজের হাতের মধ্যে এনে অনুরোধে স্বরে কথা গুলো বললেন। ইনায়া মায়ের এমন কাতর কন্ঠে গলে গেল।সে বলল,,,,

--" আমি রাজি উনাদের সামনে যেতে। কিন্তু এর বেশি কোনো কিছু আশা রাখবে না আম্মু।জোর করলে আমি বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব।"

শারমিন নিজের চোখের পানি মুছে মুচকি হেসে বললেন,,,,,,

--" ধ্যাত পাগলি জোর করব না তোকে। এখন কান্নাকাটি না করে ফ্রেশ হয়ে আয় আর তৈরি হয়ে নে উনারা সন্ধ্যায় আসবেন।"

ঠিক সেই মুহূর্তে ইরিন ঘরে প্রবেশ করে বলল,,,

--" ছোট চাচি তুমি চিন্তা কর না ইনায়া কে তৈরি করার দায়িত্ব আমার। তুমি বরং নিচে গিয়ে রান্নাবান্নার দিক দেখ।"

শারমিন মুচকি হেসে বলল,,,,

--" তুমি এলে মা আমি নিশ্চিত হলাম।ওকে তৈরি করো।আমি বরং নিচে যাই।"

এই বলে শারমিন ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

ইরিন আস্তে আস্তে ইনায়ার কাছে গিয়ে বলল,,,,

--" আমার ভাই জীবিত থাকতে তোমাকে অন্য কারোর হতে দিবে না।তাই আর কান্নাকাটি না করে এখানে চুপচাপ বসো।আমি হাতে একটু মেহেদী দিয়ে দেই।হাত নয়তো একদম খালি খালি লাগবে।এই বলে ইরিন ইনায়া কে বিছানায় বসালো এবং ইনায়ার হাত নিজের রানের উপর রেখে মেহেদি দিতে লাগল।

ইনায়া এখনো ঘাপটি মেরে বসে আছে।সে মনে মনে বলল,,,,

--"আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে আপনার উপর আরিশ যে আপনি আমাকে অন্য কারোর হতে দিবেন না। আমাকে অনেক যত্নে রাখবেন, সুখি রাখবেন।আমি এখনো বলতে পারছি না যে আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা কিন্তু হ্যাঁ আমি একবার যেহেতু নিজেকে আপনার অনিশ্চিত অপেক্ষায় আবদ্ধ করেছি আর যাই হোক এখান থেকে নিজেকে মুক্ত করবো না। যতদিন না‌ আপনি এসে আমাকে মুক্ত করেছেন।"

_________________

ইনায়া সাদা রঙের গ্ৰাউন পরলো।এটি সেই গ্ৰাউন যেইটা আরিশ লন্ডন থেকে আসার সময় তার জন্য নিয়ে এসেছিল।আরিশ এই গ্ৰাউনটি তাকে উপহার দেওয়ার পর ইনায়া একবারও এটা পরেনি কিন্তু আজ‌ পরলো। যাতে তার হৃদয়ের পাশাপাশি তার দেহ সাক্ষী দেয় যে সে শুধু আরিশের।

ইনায়ার একদম সাজতে ইচ্ছে করছেনা। কিন্তু তবুও ইরিন তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য অনেক জোর করেছিল হ্যাবি মেকআপ দেওয়ার জন্য কিন্তু ইনায়া না করাতে পারলো না।

ইরিন সুন্দর করে ইনায়ার মুখে ক্রিম লাগিয়ে অল্প একটু ফেস পাউডার দিল, চোখে আইলাইনার, চোখের পাতার উপর ব্রাউন এবং হালকা গোলাপি রং সংমিশ্রন করে আইশ্যাডো দিয়ে দিল। ঠোঁট আর্ট করে ঠোঁটে হালকা লাল রঙের লিপস্টিক দিয়ে দিল। ব্যাস ইনায়ার সাজ শেষ।ইরিন চেয়েছিল ইনায়ার মাথায় সুন্দর একটি হেয়ার স্টাইল করবে কিন্তু ইনায়ার একটি কথা সে পরপুরুষের সামনে মাথায় ঘোমটা দেওয়া ছাড়া যাবে না। এমনকি সে নিজের ঠোঁটের লাল লিপস্টিক টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে ফেলল। তারপর ঠোঁটে ভ্যাসলিন লাগালে। অবশ্য আগে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগার কারণে সেটার কিছুটা লেগেছিল এবং তার ওপর ভ্যাসলিন দেওয়ার কারণে এখন লিপগ্লসের মতো লাগছে। তারপর সুন্দর করে একটি সাদা হিজাব পরে নিল।

ইরিন তো অবাক মনে মনে বলছে,,,,,,

--"এই মেয়ের মনে হয় নিজের বিয়েতে বিধবা সাজার খুব শখ। অবশ্য মেডাম তো আর জানে না আজ ওনার বিয়ে। এমন বলদের বলদ সে তার হাতের মেহেদিতে যে আরিশ লেখা আছে তা এখনো খেয়ালই করেনি। জানি না আমার ভাই একে কি করে সামাল দিবে।"

বাইরে থেকে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।তার মানে পাত্র পক্ষরা চলে এসেছে। ইনায়ার বুক ছেত করে উঠলো। বুকের মধ্যে জমে থাকা পাথর যেন আরো ভারী হয়ে উঠলো। নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। মনে এক অজানা ভয়। কিন্তু নিজেকে শান্তনা দেওয়ার জন্য মনে মনে বলল,,,,

--" শান্ত হ ইনায়া শান্ত হ। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। নিশ্চয়ই তিনি ভালো কিছু ভেবে রেখেছেন।তার ওভার থিংকিং না করে নিজের আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। উনি সব ঠিক করে দিবেন।"

__________________

আরিশের গাড়ি সবে মাত্র থামলো ইনায়া দের বাড়ির সামনে। ভেবেছিল সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারবে কিন্তু মাঝখানে গাড়ি নষ্ট হবার কারণে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। এখন ৭:৩০ বাজে। নিশ্চয়ই ইনায়াকে দেখার জন্য পাত্রপক্ষরা চলে এসেছে।আরিশ আর দেরি না‌ করে সাদমান কে কল করে বলল,,,

--"ইনু দের বাড়ির সামনে আমার গাড়ি দার করিয়ে রেখেছি তাড়াতাড়ি আমার সাদা শেরওয়ানি নিয়ে আয়।"

বিজ্ঞাপন

সাদমান আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সাদা শেরওয়ানি এবং পায়জামা নিয়ে গাড়ির দিকে গেল।সে আগে থেকেই বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিল যাতে পরবর্তীতে আর দেরি না হয়।

আরিশ সাদমান আসতেই দরজা খুলে দিল। সাদমান গাড়ির ভেতর ঢুকে আরিশের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আরিশের মাথায় ব্যান্ডেজ করা হাতে ক্যানুলা লাগানো।

আরিশ সাদমান কে তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,,

--"আমার দিকে বাজে নজর না দিয়ে তাড়াতাড়ি আমার পরনের শার্ট খুলে আমাকে শেরওয়ানি পড়তে সাহায্য কর। এই ভাঙ্গা হাত নিয়ে আমি একা পারব না।"

সাদমান আর দেরি না করে আরিশের পরনের শার্ট খুলে তাকে শেরওয়ানি পরিয়ে দিল। শেরওয়ানি পড়ানোর সময় অবশ্য আরিশ হাতে কিছুটা ব্যথা পেয়েছিল কিন্তু তা প্রকাশ করল না। শেরওয়ানি পড়া শেষ হওয়ার পর আরিশ তারপর বলল,,,

--"এখন যে প্যান্ট পড়ে আছি সেটা পরলেই চলবে। আবার ম্যাচিং করে পায়জামা পরতে হবে না। এখন আমার সামনে থেকে সর তুই।আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।"

সাদমান গাড়ি থেকে নেমে পরে।আরিশ আর দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে দৌড় লাগায় ইনায়াদের ঘরের দিকে। বাড়িতে প্রবেশ করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগে।

পাত্র পক্ষ মূলত ছয়টা ৩০ এরপর চলে এসেছিল। ইনায়া তাদের সামনে পুতুলের ন্যায় বসেছিল। সে শুধু মনে মনে প্রার্থনা করছিল যাতে আরিশ এই মুহূর্তে চলে আসে তার কাছে। সেখানে তার মা,ফুফু,চাচা, চাচাতো ভাই,আরিশের মা, বাবা,ইরিন সবাই ছিল। আরিশর মা বাবা চুপ আছেন কারণ ইরিন তাদের সব বলে দিয়েছে।

পাত্র পক্ষ তো ইনায়া কে দেখেই পছন্দ করেছেন। শ্যামলা হলেও ফেইস কাটিং মায়াবী। আবার শালীনতা বজায় রেখে মেয়ে চলা ফেরা করে পছন্দ না হবার কোন কথাই না। তারা তো নিজেদের সাথে করে ঘটক নিয়ে এসেছেন। কখন থেকে ইনায়ার মা এবং ফুফুকে আজকেই আকদ করিয়ে দেওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করছেন।ইমন খান ও সাথে তাল মিলাচ্ছেন।

ইরিন তো বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।তার ভাই এখনো আসছে না কেন এই নিয়ে সে চিন্তায় পড়ে গেছে। বেশি দেরি করলে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

ইমন খান শারমিন এবং নিজের বোনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,,

--"আরে বিয়ে টা দিয়ে দিলেই তো ভালো।"

ঠিক সেই মুহূর্তেই এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসলো।

--"হ্যাঁ অবশ্যই। বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো। আর বিয়ে আজকে এবং এই মুহূর্তেই হবে।"

সবার দৃষ্টি গেলে ভেসে আসা কন্ঠের মানুষটার দিকে। কন্ঠ শুনে ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল।তার বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা আরিশের কন্ঠ। ইনায়া আরিশের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। ভয় করছে তার? না বরং বিশ্বাস হচ্ছে না এটা বাস্তব নাকি সত্যি। মনে হচ্ছে তার স্বপ্নের মত এখন যদি সে তাকায় তাহলে আরিশ তার থেকে দূরে চলে যাবে।

আরিশ আস্তে আস্তে রুমের ভেতর প্রবেশ করল। আরিশ কে দেখে সবাই আতকে ওঠলো। তার মাথায় ব্যান্ডেজ করা। হাতে ক্যানুলা লাগানো। আরিশের মা-বাবা বোন এবং শারমিন আরিশের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে সে তার উত্তর না দিয়ে শারমিন খানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,,,,,

--"দিয়ে দিন না আপনার মেয়েকে আমার করে! কথা দিচ্ছি খুব সুখী রাখবো। কখনো কষ্ট দিব না। নিজের ভালোবাসা দিয়ে অতীতের পাওয়া যন্ত্রনাকে ভুলিয়ে দিব। যতদিন জীবিত থাকবো এতটা ভালবাসবো যে আমি মরে গেলেও আমার ভালোবাসা তাকে আগলে রাখবে। শুধুমাত্র একটি সুযোগ দিন।ওকেতো বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্যই পাত্রপক্ষ এনেছেন। তাহলে আজ আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিন।"

উপস্থিত সবাই অবাক। ইনায়া তো এখনো মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। সে যেন পাথর হয়ে গেছে। ইচ্ছে করছে খুব কাঁদতে।আজ ৬ দিন পর সে আরিশের কন্ঠ শুনতে পেল। তার ভেতরটা যেন এখন শান্ত হল।

শারমিন এখনো চুপ হয়ে আছে। তার কানের সামনে ভেসে এলো স্বামীর মৃত্যুর আগ মুহূর্তে বলে যাওয়ার কথা,,,

--"ইনায়া কে নিয়ে চিন্তা করো না। ইনায়ার জন্য অনেক দূর থেকে সুপাত্র আসবে। এবং ইনায়াকে নিঃসন্দেহে তার হাতে তুলে দিও।

শারমিনের আর বুঝতে বাকি রইলো না তার স্বামীর কথার মানে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,,,,

--"আমি আমার মেয়েকে তোমার সাথেই বিয়ে দিব।"

ইমন খান এই কথা শুনে তেতে উঠল এবং জোড়ে চিৎকার দিয়ে বলল,,,,

--" এই বিয়ে কখোনোই হবে না।আমি মানব না এই বিয়ে।"

পাত্রের বাবা সঙ্গে সায় জানিয়ে বলল,,,

--"ঠিকই তো!আমাদেরকে এখানে ডেকে এরকম অপমান করার কোন মানে দেখছি না।"

আরিশ শান্ত কন্ঠে বলল,,,,

--" পরবর্তীতে আপনার ছেলের জীবন চলে যাওয়ার থেকে এখন অপমান হওয়া অনেকটা ভালো। কারণ ধরেন আজ ইনুর সাথে আপনার ছেলের বিয়ে হলো এবং বিয়ের প্রথম রাতেই ইনু তার দুধের সাথে বিষ মিশিয়ে দিল এবং আপনার ছেলে মরে গেল তারপর আমার সাথে পালিয়ে গেল। তার থেকে ভালো এখন না হয় এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়ুন।"

আরিশের এমন থ্রেট শুনে পাত্রের বাবা বলল,,,

--" এত সহজ নাকি?আমার ছেলে একজন পুলিশ তাকে মার এত সহজ না।"

তখন পাত্র নিজে উঠে দাঁড়ালো এবং বলল,,,

--" উফ্ বাবা থামোতো। জোর করে কিছুই হয় না। যে জায়গায় মেয়ের মা রাজি মেয়েকে এই ভদ্রলোকের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য সেখানে আমরা ঝামেলা না করলেই ভালো। শুধু শুধু ঝামেলা না করে এখন চলো আমরা চলে যাই এখান থেকে। উনাদেরকে নিজেদের মধ্যে বিষয়টাকে সামলে নিতে দাও। আর আমাদের সাথে যে কাজিকে নিয়ে এসেছিলে তাকে এখানে রেখে যাও উনি বিয়ে করিয়ে তারপর চলে যাক।"

এই বলে পাত্র নিজের বাবা মাকে বোঝাতে বোঝাতে নিয়ে গেল এখান থেকে।আর ইমন খান লাগিয়ে দিল চেঁচামেচি। রেশমা খান এখনও চুপ। তিনি হয়তো কিছু নিয়ে কবি চিন্তা করছে। আরিশের মা, বাবা এবং শারমিন ইমন খানের সাথে তর্ক বিতর্ক করছে।

আরিশ নিঃশব্দে বিছানার ওপর বসে মাটির দিকে তাকিয়ে ইনায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। ইনায়া এখনো আরিশের দিকে তাকিয়ে দেখেনি।আরিশ শান্ত কন্ঠে বলল,,,,

--"ওহে আমার প্রিয়শী। আমার ওপর কি বড্ড অভিমান জমেছে তোমার? বিয়ে করে নাও প্লিজ। সমস্ত অভিমান ভাঙিয়ে দেব। তোমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমার ওপর অভিমান করার। এবং তোমার অভিমান ভাঙ্গা আমার দায়িত্ব। প্লিজ বিয়ে করে নাও আমায়। তুমি আমায় বিয়ে না করলে আমি যে চিরকুমার হয়ে থাকবো। তুমি কি চাও আমি সারা জীবন একজন সিঙ্গেল ব্যক্তি থাকি? বয়স তো আর কম হলো না। আর কত একা একা জীবন কাটাবো। এই যে দেখো এখন আমার কি অবস্থা,, মাথায় ব্যান্ডেজ লাগানো হাতে ক্যানুলা লাগানো এই বয়সে কি একা একা নিজেকে সামলানো যায়। একটা তো বউয়ের প্রয়োজন। হয়ে যাও না গো আমার বউ। আমাকে সামলিয়ে নাও। পুরো পৃথিবী তোমার বিরুদ্ধে থাকলেও আমি থাকবো তোমার পক্ষে।"

ইনায়া কুঁকড়ে কেঁদে উঠলো তারপর কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে বলল,,,,

--" আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি কখনোই আমার কাছে ফিরবেন না।"

এই বলে আবার কেঁদে উঠলো। ব্যাস এতেই যেন আশেপাশের সবাই চুপ হয়ে ইনায়া এবং আরিশে দিকে দৃষ্টি দিল।আরিশ উপলব্ধি করতে পারলো তার ইনু তাকে একটু একটু করে ভালবাসতে শুরু করে দিয়েছে। ইনায়া কে কান্না করার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হল।

________________

কিছুক্ষণ আগেই আরিশ এবং ইনায়া পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। বিয়ে হয়ে গেল তাদের পারিবারিক ভাবে। ইসলামীক দৃষ্টিতে এখন তার স্বামী-স্ত্রী। এই সম্পর্কটা সব থেকে বেশি পবিত্র একটি সম্পর্ক।

এইতো কিছুক্ষণ আগে ইনায়ার ফুপি বলল,,,,,

--"আমার ছোট ভাইয়েরও ইচ্ছে ছিল তার মেয়ের সাথে যেন আরিশে বিয়ে হয়। তিনি অনেক আগেই আমাকে বলেছিলেন কিন্তু আমি এ বিষয়টি কাউকে বলিনি। তাই আমি চাই এ বিয়ে ঠিক হয়ে যাক।"

আর কি এরপরই তাদের দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। এখন ইনায়া আরিশের অর্ধাঙ্গিনী।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস