আরিশ উঠে দাঁড়ালো এবং ইনায়ার মায়ের সামনে গিয়ে বলল,,,,
--"আমাদের এখন বিদায় দিন মা।আমি ইনু কে আমার সাথে নিয়ে যাব।আজ থেকে ওর সকল দায়িত্ব আমার উপর। চিন্তা করবেন না এক্ষুনি লন্ডন নিয়ে যাব এমন না।সে তার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করুক যদি পাবলিক পরীক্ষা দিতে চায় আমি ওর পাশে আছি আর যদি বলে লন্ডনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তখন তার এডমিশন লন্ডনে করিয়ে দিব।আর এখন তো এখানেই আছি। পাশাপাশি বাড়ি যখন ইচ্ছে আপনি চলে যাবেন আর ইনুর যখন ইচ্ছে সে চলে আসবে।আর রইলো বাকি ইনু নিয়ে আপনার চিন্তা সেটা একেবারেই স্বাভাবিক। প্রত্যেক মায়েরই নিজের সন্তানকে নিয়ে চিন্তা থাকে আপনারও আছে তা আমি জানি। কিন্তু আপনি আমার ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে পারেন ইনুর ছোট্ট ছোট্ট প্রয়োজনীয়তা, চাহিদা, ইচ্ছে থেকে শুরু করে সব কিছুর দায়িত্ব আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আকাশের চাঁদ হয়তো এনে দিতে পারবো না কিন্তু আমার মনের,ঘরের চাঁদ বানিয়ে রাখতে পারব, আমার ব্যক্তিগত চাঁদ যে একান্তই আমার। বিন্দুমাত্র কষ্ট পেতে দেব না। অনেক অনেক অনেক অনেক সুখে রাখব।"
শারমিনের চোখে পানি চলে আসলো। সে নিজের চোখের পানি মুছে ইনায়ার কাছে গেল তারপর ইনায়া কে আরিশের পাশে এনে দাঁড়া করিয়ে ইনায়ার হাত আরিশের হাতে তুলে দিয়ে বলল,,,
--" আমার তোমার ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে তুমি আমার মেয়েকে অনেক সুখী রাখবে। কিন্তু আমার এই পাগলি মেয়েটার উপর বিন্দুমাত্র ভরসা নেই উঠতে বসতে কিছু না কিছু ফালিয়ে দেয়,কথায় কথায় উষ্টা খেয়ে পড়ে যায়, ফ্রিজের ভেতর টাকা রেখে দেয়, ফোন গরম হয়ে গেলে ফোনের কভার ফ্রিজের ভেতরে রেখে দেয়, আর কথা বলা শুরু করলে কথা শেষ হয় না তার, তার উপরে পাগলের মতো হাসে এই মেয়েকে কি তুমি সামলাতে পারবে বাবা? "
উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।আরিশ ও হেসে উঠলো।ইনায়া কান্না করে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু তার একহাত এখনো আরিশের হাতে।আরিশ খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে। শারমিন নিজের মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চুমু খেলেন।
ইশান এসে আরিশের সামনে দাঁড়ায় তারপর শ্রদ্ধাজনক কন্ঠে বলে,,,,,
--" তুমি আমার থেকে বয়সে বড় আরিশ ভাই কিন্তু আজ আমি তোমার কোন ছোট ভাই হিসেবে কথা বলছি না বরং ইনায়ার বড় ভাই হিসেবে কথা বলছি। খুব আদরের বোন আমার। শুধু আদরের বোন না ও আব্বু এবং আম্মুর চোখের মনি।ওর খুব বেশি চাহিদা নেই মেয়েটি অল্পতেই খুশি হয়ে যায়।ওর কান বিধানো হয়েছিল যখন ও ক্লাস নাইনে পড়েতো কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো স্বর্নের কানের দুল নেই। অনেক আগে আব্বু টাকা জমিয়ে রেখে দিয়েছিল ওর জন্য কানের দুল এবং স্বর্ণের চেইন বানানোর জন্য কিন্তু হঠাৎ আব্বুর ব্যবসায় টাকা লাগবে বলে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলে টাকা খরচ করে ফেলবে নাকি তখনও নির্দ্বিধায় বলে দিয়েছিল এই টাকা যেন খরচ করে ফেলে।আজও পর্যন্ত স্বর্ণের জিনিসের জন্য কখনো বায়না করেনি। নিজের পড়ার গাইড নিজের জমানো টাকা দিয়ে কিনে, যদি কোন একমাস প্রাইভেট বন্ধ থাকে তাহলে সেই প্রাইভেটের বেতনের টাকা দিয়ে নিজের জন্য বোরকা বানায়। নিজে কষ্ট পেয়ে মরে যাবে কিন্তু মুখ ফুটে কখনো কিছু বলবে না। খুব বেশি নরম স্বভাবের, রাগ উঠলে কান্না করবে, মন ভালো না থাকলে কান্না করবে। এমনকি খুব বেশি খুশি হলেও কান্না করবে। কান্না করা যেন তার স্বভাব। এবং আমার তোমার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে তুমি আমার বোনকে বিন্দুমাত্র কষ্ট দিবে না। তাইতো যখন আম্মু কল দিয়ে বলল বোনের তোমার সাথে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তখন তাড়াতাড়ি করে অফিস থেকে চলে আসলাম শুধুমাত্র নিজের বোনের বিয়ে দেখব বলে। এবং আশা করছি তুমি আমার বিশ্বাস ভাঙবে না।"
আরিশ ইশানের কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তার জানা ছিল না তার ইনুর এই দিক সম্পর্কে।তার ইনু অনেক সেক্রিফাইস করেছে সে তার ইনু কে আর কোন সেক্রিফাইস করতে দিবে না।আরিশ ইশানের চোখে চোখ রেখে বলল,,,,
--"আমি কথা দিচ্ছি আমি তোমার বিশ্বাস ভাঙ্গব না।আমি ইনু কে অনেক সুখী রাখবো। যদি ভেবে থাকো তোমাকে এবং মাকে কথা দিয়েছি বলে তাকে সুখে রাখবো তাহলে সেটা ভুল বরং আমি আমার ইনুকে ভালবাসি বলেই তাকে আমি সুখী রাখব।"
সবাই অবাক হয়ে আরিশের দিকে তাকালো। ইমন খান এবং রূকসানার আর এইসব সহ্য হচ্ছে না তাই তারা তৎক্ষণাৎ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কেউ আর কথা অন্য কোনো কথা তুলল না। এমনিতেই হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেল তার উপর আরিশ অসুস্থ। সবাই জিজ্ঞেস করলে আরিশ বলে ছোট্ট একটি এক্সিডেন্ট হয়েছে।
_________________
বিয়েটা খুব স্বাভাবিক ভাবে হলেও বউকে তো আর খুব সাধারণভাবে ঘরে তোলা যায় না।তাই আয়েশা খানম আগে থেকেই সাদমান কে দিয়ে আরিশের ফ্ল্যাট সাজিয়ে রেখেছিল।আরিশের ঘর সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। আয়েশা খানম এবং ইমরান খান আরিশের ফ্ল্যাটে বরণ ডালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ইরিন এবং সাদমান নিচে আরিশ ও ইনায়ার সাথে।সবে মাত্র তারা ইনায়াদের বাড়ি থেকে এই বাড়িতে এলো। এখন শুধু সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠা বাকি।
কিন্তু এর মাঝেই আরিশ এক কান্ড করে বসলো। কোনো কথাবার্তা না বলেই ইনায়াকে পাজা কোলে তুলে নিল। ইনায়ার চোখ এতটাই বড় বড় হয়ে গেল যে এখনই বের হয়ে আসার উপক্রম। সাদমান এবং ইরিন তো মিট মিট করে হাসছে। ইনায়া আরিশকে আস্তে আস্তে বলছে,,,,,
--"উফ কি করছেন টা কি নামান আমাকে। একই তো আপনি অসুস্থ তার উপর আমি আবার মোটা। আপনার কষ্ট হবে প্লিজ নামান আমাকে।"
আরিশ ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,,,,
--"আজ ৬ দিন পর অবশেষে আমার এই মধুর কন্ঠ শুনতে পেলাম। তখন যা বলেছিলে কাঁদতে কাঁদতে অর্ধেক কথা বুঝেছি অর্ধেক কথা বুঝিনি। এখন কথাগুলো এসে আমার কলিজায় লেগেছে। মনে হচ্ছে শান্তি ফিরে এসেছে আমার জীবনে।"
এই বলে ইনায়া কে কোলে করে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠাতে লাগলো। ইনায়া এক দৃষ্টিতে আরিশের দিকে তাকিয়ে আছে।তার দুই হাত আরিশের কাঁধে।আরিশের গলা জড়িয়ে ধরার মতো সাহস এখনো পাচ্ছে না সে। আরিশের ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই ইনায়ার যেন লজ্জা আরো বের হয়ে গেল কারণ আরিশের রুমের ভেতর ছিল তার মা এবং বাবা।
আয়েশা খানম এবং ইমরান খান দুজনকে সুন্দর করে বরণ করে নিলেন। তারপর তাদেরকে ভেতরে আসতে দিলেন।আরিশ ইনায়া কে সোজা তার রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসালো। ইনায়া আরিশের দিকে তাকাতে পারছে না। সে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশ মুচকি হাসল। কিন্তু আরিশের হাসি কাশিতে ধারণ করতে বেশি সময় লাগলো না। কারণ আরিশ যখন দেখলেও তার পুরা রুম ফুল দিয়ে সাজানো এই দেখেই তার কাশি উঠে গেল। এরকম কিছু হবে সে আশা করেনি। সে তার ইনু কে লজ্জা ফিল করাতে চায়না।আরিশ তারাতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে গেল তার মাকে এই বিষয় জিজ্ঞেস করার জন্য কিন্তু ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখল তার মা-বাবা এবং বোন আগেই তাদের ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছে। শুধুমাত্র সাদমান এখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার হাতে একটি নারিকেল। সাদমান নারিকেলটি আরিশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,,,,
--"এই সবকিছু ভাই তোর মায়ের প্ল্যান ছিল আমি এইসব সম্পর্কে কিছু জানি না। আর এই নারিকেল তুই না বলেছিলে আনতেই তাই আনলাম।"
নিজের কথা তাড়াতাড়ি বলে শেষ করে সাদমান দৌড় লাগায় পাশের ফ্ল্যাটের দিকে এবং ফ্ল্যাটের ভিতর গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। আরিশ আর কিছু বলার সুযোগ পায় না। হ্যাঁ সে ঠিকই নারিকেল আনতে বলেছিল কিন্তু তার নিয়ত ছিল এই নারিকেল সাদমানের মাথায় ফাটাবে কারণ তার ইনু কে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে অথচ সাদমান এইকথা তাকে আগে জানায়নি। কিন্তু এখন সবকিছু উল্টো হলে গেল।আরিশ ফ্ল্যাটের দরজা লাগিয়ে শুকনো ঢোক গিলে নারিকেল নিয়ে নিজের রুমে দিকে যেতে লাগল।
ইনায়া ঘাপটি মেরে বিছানায় বসে ছিল।তার কেমন যেন অস্থির লাগছে।এক অজানা ভয়। অবশ্য জানে আরিশ এখন তার সাথেই আছে তারপরও অন্যরকম এক অনুভূতি।
আরিশ আস্তে আস্তে রুমের ভেতর প্রবেশ করল। তারপর দরজা লাগিয়ে দিয়ে ইনায়ার দিকে এগোতে লাগলো । ইনায়া আরিশ কে তার দিকে এগোতো দেখে নিজের পরনের কাপড় শক্ত করে চেপে ধরে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।আরিশ ইনায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার পিছন থেকে নারিকেল বের করে দিয়ে বলতে লাগলো,,,,,
--"সবাই তো বাসর ঘরে বউকে দামি আংটি, গলার হার, গাড়ি, বাড়ি, শাড়ি উপহার দেয়।আমি না হয় আমার বউকে বাসর ঘরে তার প্রিয় নারিকেল উপহার দিলাম।"
এই বলে আরিশ একটি নারকিল ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
ইনায়া বেচারি বুঝতেই পারছে না এখন সে হাসবে নাকি কাঁদবে।সে ভেবে পায় না এই লোকটি এমন সিরিয়াস কন্ডিশনে কি করে এরকম উল্টাপাল্টা কথা বলে। নিশ্চিত নিজের ১৫ বছরের ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছে এই খুশিতে মাথার তাড় ছিঁড়ে গেছে।
ইনায়া আরিশের দিকে রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,,,,
--"খুব মজা লাগছে নাহ? আপনার কাছে সবকিছু খুব এন্টারটেইনমেন্ট, ফিল্মি লাগছে তাই না? শুনুন আপনার কাছে লাগলেও আমার কাছে লাগছে না। তাই এখনই এই নারিকেল নিয়ে আমার সামনে থেকে যান নয়তো কসম এই নারিকেল আজ আমি আপনার মাথায় ফাটাবো।"
আরিশ ইনায়ার দিকে চোখ ছোট ছোট করে অসহায় কন্ঠে বলল,,,
--" তুমি যদি বলতে তুমি আমাকে কামড় দিবে তারপরও আমি মেনে নিতাম। মেনে নিতাম বলে ভুল করছি,,, বিশ্বাস করো নাচতে নাচতে গ্রহন করতাম। কিন্তু তুমি বলছো বাসর রাতে নিজের স্বামীর মাথা ফাটাবে। এই যে দেখো আমার মাথায় এমনিতেই ফাটানো। এখনো ব্যান্ডেজ করা আছে।"
এই বলে আরিশ নিজের মাথা নিচু করল।আরিশের ব্যান্ডেজ করা মাথার দিকে চোখ যেতে ইনায়ার দৃষ্টি শীতল হয়ে এলো।চোখ ছলছল করে উঠলো।সে নিজের নরম হাত দিয়ে আরিশের মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,,,
--"অনেক ব্যাথা পেয়েছিলেন তাই না? কষ্ট হচ্ছে কি?"
আরিশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,,,,,,
--" তোমার কথা মনে পড়লেই তোমার সকল কষ্ট দূর হয়ে যায়। সেই জায়গায় তো এখন তুমি আমার সামনে তাও আবার আমার অর্ধাঙ্গিনী রূপে। আমার কি কোন ভাবে কষ্ট হতে পারে? পৃথিবীর সব থেকে ধনী এবং ভাগ্যবান ব্যক্তি তো এখন থেকে কারণ আমি যে আমি তোমাকে পেয়েছি।"