ইনায়া লাফ মেরে উঠে বসলো।তার শরীর ঘেমে গেছে। তার বুক কেমন ধুকপুক করছে।সে খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছে।
কিছুক্ষণ আগে সে স্বপ্নে দেখেছিল সেই অচেনা ছায়া। কিন্তু এইবার সেই অচেনা ছায়া আস্তে আস্তে চেনা রূপ নিতে লাগলো। চেহারা স্পষ্ট হতে লাগলো। ইনায়া দেখল অচেনা ছায়া তার কাছে এসেছে। খুব নিকটে। আস্তে আস্তে ছায়া দৃশ্যমান হতে লাগলো। ফুটে উঠলো আরিশের চেহারা। ইনায়া খুশি হয়ে ছায়ার কাছে গিয়ে বলল,,,,
--"আমি জানতাম আমার স্বপ্নে আসা অচেনা ছায়া আপনি। আপনাকে যেদিন প্রথমবার দেখেছিলাম, যখন আপনার কন্ঠ শুনেছিলাম তখনই মনে হয়েছিল আপনি আমার স্বপ্নে আসা অচেনা ছায়া।"
কিন্তু আরিশ বলল,,,,
--"হয়তো ফিরতে পারবো না কখনো তোমার কাছে ইনু, স্বার্থপরের মতোন তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি।পারলে ক্ষমা করে দিও আর ওইযে বলেছিলাম আমার মৃত দেহের কানের কাছে ফিসফিস করে বলো ভালোবাসি আপনাকে আরিশ। "
এই কথা বলে ছায়া অদৃশ্য হতে লাগল। ইনায়া বলছে,,,,
--" প্লিজ যাবেন না আমাকে ছেড়ে। আমি বাঁচব না আপাকে ছাড়া।প্লিজ ফিরে আসুন।আমার আপনাকে প্রয়োজন।I need you... I really need you. I need you so badly."
ইনায়া দেখল আরিশের ছায়া আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। ইনায়া দৌড়াচ্ছে ছায়াটিকে ছুঁতে কিন্তু তার আগেই ছায়া মিলিয়ে গেল। আর ইনায়া ঘুম থেকে উঠে পড়ল।
ইনায়া নিজের কপালের ঘাম মুছে সময় দেখলো ৪ টা বাজে।তার মানে তো ভোর। আরে সে শুনেছে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। তার মানে কি আরিশের কোনো বিপদ হয়েছে?না ইনায়া আর ভাবতে পারলো না সে। বিছানা ছেড়ে উঠে পরলো। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে বের হল। সে এখন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আরিশের জন্য দোয়া করবে। বসে বসে কান্না করা থেকে নামাজে পরে কান্না করলে আল্লাহ নিশ্চয়ই কোন না কোন পথ বের করে দিবেন। তিনি নিশ্চয়ই আরিশ কে সুস্থ হবে ফিরিয়ে আনবেন।
ইনায়া নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু নামাজের সিজদায় ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। অনেকক্ষণ যাবৎ সিজদায় লুটিয়ে কাঁদল। তারপর অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করে আস্তে আস্তে নামাজ পড়ে নিল। নামাজ শেষে মোনাজাতে আল্লাহর নিকট দরখাস্ত করল,,,
--"হে,, আল্লাহ,,, আমার বুকে,,, কেমন জানি লাগ,,, লাগছে।আমি আপনার কাছে যা চাওয়ার জন্য নামাজে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটি বলার মত শক্তি এখন পাচ্ছি না। কিন্তু আপনি জানেন আমি কি চাই। দয়া করে আমার আরিশ কে সুস্থ ভাবে আমার কাছে ফিরিয়ে আনেন।আর কিছু চাই না। উনার সকল কষ্ট, যন্ত্রণা সব যেন আমার হয়। উনাকে শান্তি দিন, যন্ত্রণা মুক্ত রাখুন। হেফাজত নাযিল করুন। এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরিয়ে আনুন। আমি আপনার এক পাপী বান্দী। জীবনে যদি সামান্য পরিমাণের হলেও আপনার ইবাদত সঠিকভাবে করতে পারি তাহলে আপনাকে আমার সেই ইবাদতের দোহাই আরিশ কে সুস্থ রাখবেন এবং ফিরিয়ে আনবেন। আল্লাহ রহমত নাযিল করুন। উনাকে ভালো রাখুন।"
ইনায়া থামলো।কথা গুলো সে অনেক কষ্টে বলেছিল। সে তো ভেবেছিল কান্নার কারণে সে কিছুই বলতে পারবে না। আজ আবার ১ বছর ৫ মাস পর ইনায়ার জীবনে এমন দিন।এক বছর ৫ মাস আগে সে একজন কে এমনভাবে নামাজের মোনাজাতে চাইতো। কিন্তু যত চাইতো তত যেন উপরওয়ালার থেকে ইশারা পেত যে এইটা তার জন্য সঠিক নয়।কিন্তু সে চেষ্টা করে যেত। বারবার নিজের মনকে বোঝাত ভাবতে হয়ত আল্লাহ তার ধৈর্য পরীক্ষা নিচ্ছে । তাইতো সে হার মানেনি পাগলের মত চেয়ে গেছে। কিন্তু আজ এমন একজনের সুস্থতা চাচ্ছে যে কিনা তাকে পাগলের মতোন ভালোবাসে।
ইনায়া মোনাজাত শেষ করে আর জায়নামাজ থেকে উঠে না
বরং জায়নামাজে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর আবার ফজরের আজান দিবে। সে ভাবলো একেবারে নামাজ পড়ে তারপর উঠবে। আর জায়নামাজে শুয়ে থাকলো আলাদা শান্তি লাগে। ইনায়ার তো জায়নামাজে শুয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে। যখনই তার মন ভারী হয়ে উঠতো তখন নামাজ পরে কিছুক্ষণ এভাবেই জায়নামাজে শুয়ে থাকতো এবং আল্লাহর জিকির করত। এখনো সে সেটি করছে। কিন্তু এখন তার চোখ দিয়ে ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পরছে। ইনায়া নিজের চোখের পানি মুছার প্রয়োজন বোধ করলো না। সে এভাবেই শুয়ে থাকলো।
________________________
লন্ডনের অ্যাডেনব্রুক'স হাসপাতালের ইমারজেন্সি কেবিনে শুয়ে আছে আরিশ।হাতে ক্যানুলা লাগানো। মাথায় ব্যান্ডেজ করা। মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
আগের ঘটনা ________
তখন বন্দুকের গুলি এসে আরিশের ডান হাতের ভেতর দিয়ে যায়নি বরং হাতের পাশ দিয়ে একদম ঘেঁষে গিয়েছে। কিন্তু এই হাতে আঘাত এবং মাথায় আঘাতের কারণে তার শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং সে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। কিছুক্ষণের ভেতর তার লোকেরা যখন কিডন্যাপারদের ধরতে আসে তার বলা মতন,তখন তাকে এই অবস্থায় দেখেই তাড়াতাড়ি তাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়। তার এখনো জ্ঞান ফিরেনি। কিন্তু ডাক্তার বলেছে দুই তিন ঘন্টার ভেতর জ্ঞান ফিরে যাবে। খুব একটা ক্ষতি হয়নি তার। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে।
আজ দুদিন হলো আরিশ লন্ডনে এসেছে। আর একদিন তো বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে আসতে গিয়েই চলে গেল। এবং লন্ডনে এসেই সে তার মিশনে নেমে পরেছিল।
মোট তিনদিন পার হলো।
আরিশের জ্ঞান ফিরেছে ঘন্টাখানেক আগে। সে আস্তে আস্তে চোখ খুলল। নিজেকে হসপিটালের বেডে দেখতে পেল। সে যেন নিশ্চিন্ত হল। নিজে বাঁচতে পেরেছে তার জন্য নয় বরং তার ইনুকে দিয়ে আসা কথা সে রাখতে পারবে, সে তার ইনুর কাছে ফিরে যেতে পারবে এরজন্য।
আরিশের জ্ঞান ফিরতে তার একজন এসিস্ট্যান্ট তার কাছে আসলো তারপর বলল,,,
--"Sir, we did not tell anyone about your hospitalization. Not even Sadman Sir. The matter was very risky. Now if you give permission, we will tell you." (স্যার আপনার হাসপাতালে ভর্তি হবার বিষয়ে আমরা কাউকে কিছু জানায়নি। এমনকি সাদমান স্যার কেউ না। বিষয়টা খুব রিস্কি ছিল। এখন আপনি পারমিশন দিলে আমরা জানাবো।)
আরিশ অনেক কষ্টে মাথা নাড়িয়ে শুধু সম্মতি জানালো। তার মাথা একদম ভাড় হয়ে আছে। মাথায় আঘাত খুব বাজে ভাবে লেগেছিল।সে অনেক কষ্টে উঠে বসলো। তার যত কষ্টই হোক তাকে শক্ত থাকতে হবে। কারণ দুর্বল হয়ে পড়লে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে যাওয়া অনেক বড় বিষয় হয়ে যাবে তার জন্য। এখন আর এখানকার কোন সমস্যা নেই। সব বাচ্চার এখন নিরাপদে আছে। এবং কিডনাপাররা আপাতত হসপিটালে আছে। তারপর তাদেরকে জেলে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। আরিশের দায়িত্ব আপাতত শেষ। কিন্তু এখন তার কর্তব্য বাকি। অবশ্য তার কর্তব্য কে সে নিজের জন্য ফরজ মনে করে।আর সেই ফরজ কাজ হলো তার ইনু কে দিয়ে আসা কথা রক্ষা করা, তার ইনুর মুখে হাসি ফুটিয়ে দেওয়া। তাছাড়াও তো তার ইনুর জন্মদিন নিকটে তাকে তো ফিরতেই হবে।
সাদমান খবর পেতেই লন্ডনে কল করল।আরিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট তাকে এসে ফোন দিল। আরিশ কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন ধরে ভাঙ্গা কন্ঠে প্রথম একটি কথাই বলল,,,
--"আমার ইনু কেমন আছে রে?"
সাদমানের না চাইতেও চোখে পানি চলে আসলো। একটা মানুষ কতটা ভালবাসলে নিজের জীবন মরনের পথে থাকা অবস্থাতেও নিজের ভালোবাসার মানুষের খবর আগে নেয়? এমন মানুষ পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের বিষয়। কিন্তু সাদমান আপাতত আরিশ কে ইনায়াকে দেখতে আসবে এই সম্পর্কে কিছু বলল না। যেহেতু সে এখানে আছে তাই সে সামলিয়ে নেবে। তাই আপাতত এই বিষয়ে চাপা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল, ,,,,
--"তোর ইনু অনেক ভালো আছে।তোর অপেক্ষায় আছে।"
আরিশের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।সে ভাঙ্গা কন্ঠে আবার বলতে লাগলো,,,,
--"বাংলাদেশে ফেরার ব্যবস্থা কর আমার তাড়াতাড়ি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।"
সাদমান অবাক হয়ে বলল,,,,
--"কিন্তু তুই তো এখনো সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হোসনি। এখন তো বাংলাদেশে আসা ঠিক হবে না। দু চার দিন যাক তারপর না হয় চলে আয়। পাগলামি করিস না।"
আরিশ নিজের কন্ঠস্বর একটু ভারী করে আদেশের সুরে বলল,,,,,
--"যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার বাংলাদেশের যাওয়ার ব্যবস্থা কর। আমি তোর বন্ধু হিসেবে নয় বরং আপনার বস হিসেবে অর্ডার দিচ্ছি।"
সাদমান আর কিছু বলল না। সব সময়ের মতো এবারও আরিশের জেদের কাছে হেরে গেল।