বিয়ে সম্পূর্ণ হতেই ইমন খানের ছোট মেয়ে রূকসানা তাচ্ছিল্যের স্বরে আরিশ কে বলে উঠলো,,,,,,
--"নাচতে নাচতে যে বিয়ে করে বসলে তুমি কতোটুকু জানো এই মেয়ের সম্পর্কে? ওর অতীত সম্পর্কে? পরে পস্তাবে নাতো?"
উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেল। ইনায়া বুক কেঁপে উঠলো।সে আরিশ কে শুধু বলেছিল তার অতীত আছে। তার অতীত কি সেটা বলেনি। সেইটা বলার সুযোগই পায়নি তার আগেই তো আরিশ চলে গেল। এখন যদি আরিশ তাকে ভুল বুঝে?
রেশমা খান রূকসানার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,,
--"আহ্ রূকসানা হচ্ছেটা কি? এখন এইসব কথা তোলার কোন মানে নেই।"
রূকসানার মুখে হাসি ফুটে উঠল।সে বলল,,,
--" আর কত লুকাবে তুমি ফুফু? একদিন না একদিন তো জানতেই হবে।আর এখন যেহেতু আরিশ ইনায়ার স্বামী,তার সম্পূর্ণ অধিকার আছে সব সত্য জানার।"
সবাই চুপচাপ রূকসানার দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশ এখনো চুপচাপ আছে। সে দেখতে চায় রূকসানা কতটুকু বলতে পারে।
রূকসানা হুট করে ইনায়ার কাছে এলো এবং শক্ত করে ইনায়ার বাম হাত ধরে উঁচু করলো। ইনায়া আহ্ করে উঠলো।আরিশের চোখ রক্তবর্ণে ধারণ করল।তার ইনায়া কে যে কষ্ট দেয় আরিশ তাকে ছাড় দেয় না।আরিশ রেগে দাঁড়িয়ে পরলো। যেই না রূকসানাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রূকসানা ইনায়ার বাম হাতের গ্ৰাউনের হাতা কব্জি পর্যন্ত উঁচু করে ফেলল। হাত উল্টো করে সবার চোখের সামনে ধরলো। হাতের তালু পার করে অর্থাৎ কব্জি থেকে শুরু করে হাতের কুনির নিচের অংশের কাছ পর্যন্ত হাতে অনেকগুলো ব্লেড দিয়ে কাঁটা দাগ স্পষ্ট না হলেও ভালোভাবেই বোঝা যায়। তারপর ছোট্ট করে s অক্ষর লেখা। দেখি বোঝা যাচ্ছে এই অক্ষরটিও ব্লেড দিয়ে কেটে লেখা হয়েছে। সবাই অবাক দৃষ্টিতে ইনায়ার হাতের কাটা দাগ গুলোও দেখছে।সবাই বলতে আরিশ, তার মা, বাবা,বোন, সাদমান এবং ইমন খান।এই বিষয়ে ইমন খানের ধারনা ছিল না। ইনায়া নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে। মনে হচ্ছে এই না সব কিছু শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে যায়।
আরিশ হাঁটু গেড়ে ইনায়ার সামনে বসে পড়লো।রূকসানা ইনায়ার হাত উপর থেকে ছেড়ে দিল। ফলস্বরূপ ইনায়ার হাত খাটের কাঠে বারি লাগলো হলে কিন্তু তার আগেই আরিশ আগলে নিল। খুব যত্ন সহকারে ইনায়ার হাত ধরে হাতে ব্লেড দিয়ে কাটা s অক্ষরের দিকে তাকিয়ে রইল।তার চোখ পানি জমে গেল।
তখন ইনায়া কে পাত্র পক্ষ দেখতে এসেছে শুনে বাড়ির সবাই একবার করে এসে পাত্রকে দেখে গিয়ে তারপর যার যার ঘরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আবার যখন শুনলো ইনায়ার বিয়ে হবে তাও আবার আরিশের সাথে তখন আবার সবাই এসে ভিড় জমিয়ে দিল। এখন সবার দৃষ্টি ইনায়ার এবং আরিশের দিকে।
কেউ মনে মনে ইনায়ার কপালে দুঃখ আছে এইটা ভেবে আনন্দ পাচ্ছে আবার কেউ ভাবছে মেয়েটার কপালে মনে হয় না সুখ জুটবে। শারমিন তো মুখে কাপড় গুঁজে কাঁদছে।সে জানে না তার তার মেয়ের কপালে কি আছে।
আরিশ আস্তে আস্তে ইনায়ার হাত নিজের মুখের সামনে আনে। তারপর সবার সামনে বিনা দ্বিধায় ইনায়া হাতের কাঁটা দাগে শব্দ করে চুমু খায়। ইনায়ার নিঃশ্বাস যেন ভারি হয়ে ওঠে। এ প্রথম কোন পুরুষ তাকে স্পর্শ করেছে। বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে পবিত্র চুম্বন। প্রথম চুম্বন।
ইনায়া আরিশের দিকে তাকায়।তার চোখ পানিতে ছল ছল করছে।আরিশ নিজের ঠোঁট ইনায়ার হাতের কাছে রেখেই শান্ত কিন্তু ভালোবাসাময় কণ্ঠে বলে,,,
--"সবাই তো ভালোবেসে প্রথম স্পর্শ কপালে ছোঁয়ায়। কিন্তু আমি না হয় প্রথম স্পর্শ তোমার অতীতের কাঁটা ঘায়ে দিলাম।
যদি তুমি এই সামান্য কাঁটা দাগের কারণে কলঙ্কিত হও, আমি না হয় নিজের পবিত্র ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে তোমার কলঙ্ক মুছে ফেললাম।"
রূকসানার মুখে অন্ধকার নেমে এলো। সে ভেবেছিল এখন হয়তো আরিশ সিনক্রেট করবে অথবা ইনায়া কে অপমান করবে এই হাতের কাটা দাগের কারণে। কিন্তু আরিশ উল্টো ইনায়া কে সবার সামনে সম্মান করলো।উপস্থিত সবাই অবাক।হা করে তাকিয়ে আছে আরিশে দিকে।ইরিন এবং সাদমান মিট মিট করে হাসছে। ইমরান খান নিজের স্ত্রীর কানে ফিসফিস করে বললেন,,,,
--"দেখতে হবে না কার ছেলে। আই প্রাউড অফ মাই বয়।"
শারমিনের চোখে পানি চলে এলো। ইনায়ার বাবাও শারমিন কে ঠিক এইভাবেই সাপোর্ট করতো। অন্য কোন মানুষকে পরোয়া করতো না। এখন তার মেয়েও একজন সাপোর্টেড স্বামী পাচ্ছে এইটা তো ভাগ্যের বিষয়। আর ইনায়ার ইচ্ছে করছে খুব কাঁদতে কিন্তু সে কাঁদবে না।আরিশ তার কান্না সহ্য করতে পারে না।
আরিশ রূকসানার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,,,,,,
--"ইনায়া ইফরাহ খান হচ্ছে আরিশ ইহতেশাম খানের স্ত্রী, অর্ধাঙ্গিনী। অর্থাৎ আমার অর্ধেক অংশ। যদি কেউ আমার স্ত্রীকে আমার সামনে অথবা আমার অগোচরে অপমান তো দূরের কথা চোখ তুলে তাকে কিছু বলার সাহস দেখায় তাহলে তার চোখ তুলে নিতে আমার হাত কাঁপবে না।আর যদি ঘুনাক্ষরেও কেউ আমার ইনু কে কিছু বলার সাহস দেখায় তাহলে তার মুখ আমি পুড়িয়ে দিব। আর হ্যাঁ যদি কারোর খুব বেশি যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু পেতে ইচ্ছে থাকে এবং সেই ইচ্ছের তাগিদে আমার ইনুর অতীত নিয়ে কোন কথা বলে তাহলে তাকে আমি খুব যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দিব।"
আরিশ এমন কথায় উপস্থিত সবাই ভয় পেল। ইনায়া এখনো নিশ্চুপ। একেইতো মেয়েটি কিছুদিন অনেক অপেক্ষা করে নিশ্চিন্তায় কাটিয়েছে, তার উপরে আরিশকে নিয়ে বাজে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ আবার হঠাৎ তাকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে কিন্তু এর মধ্যেই আরিশ এসে তাকে বিয়ে করে ফেলল। তার কাছে সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগছে। এবং আরিশের ফিরে আসা স্বপ্নের মত লাগছে।
আরিশ নিজের হাত দিয়ে আলতো করে ইনায়ার চোখের পানি মুছে দিল। তারপর সবার সামনেই ইনায়ার কপালে চুমু খেল এবং বলল,,,,,
--"অনেক কেঁদেছো ইনু আর নয়। এখন তুমি শুধু হাসবে এবং সুখের রাজ্যে ভাসবে। কষ্ট যন্ত্রণাকে তোমার তৃ-সীমানায় আমি আসতে দেব না।"
ইনায়া আরিশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর মনে মনে ভাবলো,,,
--"কতটা সৌভাগ্য থাকলে আরিশের মতোন জীবনসঙ্গী পাওয়া যায়? সত্যি কোনো কিছু জীবন থেকে হারিয়ে গেলে তার জন্য নিজের জীবন শেষ না করে দিয়ে বরং জীবনে কি আসতে চলেছে তার জন্য ধৈর্য ধরতে হয়। নিশ্চয় আল্লাহ উত্তম কিছু জীবনে পাঠিয়ে দেয়। আর ইনায়ার সেই ধৈর্য্যের ফল আরিশের মতো একজন স্বামী। কিন্তু ইনায়া তো কখনো আরিশের মতোন কাউকে চাইনি। সে এত উত্তম কিছু কখনো নিজের চিন্তায় আনতে পারিনি। একজনকে খুব করে চেয়েছিল কিন্তু যখন তাকে পায়নি তখন আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট না হয়ে বরং ধৈর্য ধরে প্রার্থনা করে গিয়েছে " হে আল্লাহ আপনি যা ভাল মনে করেন তাই করবেন আমার জীবনের সাথে।"আর আজ ইনায়া নিজের প্রার্থনার ফসল পেয়েছে।'