অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৪৭

🟢

--"আহ্ আচ্ছা তাই ব,, বলুন।"

ইনায়া আস্তে আস্তে কথা গুলো বলল।আরিশ বাঁকা হেসে ইনায়ার দিকে দুষ্টু চাহনি দিয়ে বলল,,,,,

--"আমি তো এইটাই বলছিলাম। কিন্তু তুমি কি ভাবছিলে? হুম?"

ইনায়া কম্পিত কন্ঠে বলতে লাগলো,,,,,,

--" আ,, আমি আবার কি,, কি ভাববো।আমি তো,, তাই ভে,, ভেবেছিলাম আপনি যা বলেছেন।"

আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,,

--" আমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি তুমি কি ভেবেছিলে। কিন্তু ইনু,,,,, আমি তো তোমাকে ইনোসেন্ট ভেবেছিলাম। কিন্তু আই লাইক ইওর মাইন্ড। actually আই লাভ ইউ মাইন্ড।"

ইনায়া বেশ লজ্জাম পড়ে গেল।মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু আরিশ কে তা বুঝতে না দিয়ে সে তাড়াহুড়ো করে বলল,,,,

--"কি যাতা বলছেন,,,, মাথায় চোট পাওয়ার কারণে এরকম উল্টাপাল্টা কথা বলছেন মনে হয় আপনি। আপনার রেস্ট এর প্রয়োজন। চুপচাপ ঘুমান।"

আরিশ বাঁকা হেঁসে ইনায়ার একদম কাছে চলে আসলো তারপর ইনায়ার দিকে কিছুটা ঝুঁকে ডিপ ভয়েসে বলল,,,,,

--"তোমাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে ঘুমানোর জন্য তো আমি সে কবে থেকেই অপেক্ষা করছি। যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি আমার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারি আজ জান।"

এই বলে ইনায়ার গালে এসে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিল।ইনায়ার লজ্জা পাওয়ার রেশ যেন কাটতে দিচ্ছে নি আজ আরিশ। ইনায়ার লজ্জা মিশ্রিত চেহারা দেখে আরিশ আবার ফিসফিসিয়ে বলল,,,,

--"একই তো আমার পোশাক পড়ে আছো আমার সামনে তার ওপর যদি আমার এরকম সামান্য কথাই এভাবে লজ্জা পাও তাহলে কি করে ধরে রাখবো আমি নিজেকে? বুঝতেই তো পারছো বয়স তো আর কম হয়নি আমার।"

ইনায়ার চোখ রসগোল্লার মতন বড় বড় হয়ে গেল।এই না বের হয়ে আসে তার চোখ জোড়া।আরিশ কখনো এমন ধরনের কথা বলতে পারবে তা তার কল্পনায় ছিল না। অবশ্য সে কখনো আরিশকে নিয়ে এই ধরনের কোন কল্পনাই করেনি।ইনায়া শুকনো ঢোক গিলে বলল,,,,,

--"আমি ঘুমোবো,আমার প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে।"

ইনায়ার এই কথা বলতে দেরি কিন্তু আরিশের চেহারা থেকে হাসি দূর হতে দেরি হয়নি। সে তৎক্ষণাৎ ইনায়া পাশে বসে ইনায়া মুখ নিজের হাতের মাঝে আলতো করে নিয়ে বলে,,,

--"মাথা কি অনেক বেশি ব্যথা করছে ইনু? অবশ্য মাথা ব্যথা করাটা স্বাভাবিক সারাদিন যা ধকেল গিয়েছে তোমার উপর। থাক আর কথা বলতে হবে না চুপচাপ শুয়ে পড়ো তো লক্ষ্যি মেয়ের মতোন।আমি মাথা ম্যাসাজ করে দিচ্ছি।"

ইনায়া বাঁধা দেওয়ার জন্য যেই না কিছু বলতে নিবে তার আগেই আরিশ ইনায়ার ঠোঁটের নিজের বৃদ্ধা আঙুল বসিয়ে বলল,,,,

--"হুঁশশশশশ,,, আর এক কোন বাড়তি কথা না চুপচাপ বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ো। তোমার যেই পাশে শুতে ইচ্ছে করে সেই পাশে শুয়ে পড়ো। এবং ভুলেও বিছানা ছাড়া অন্য কোন জায়গায় শোয়ার কথা মাথায় আনবে না। তুমি আমার স্ত্রী আমি সহ আমার সকল জিনিসের উপর তোমার পুরোপুরি অধিকার আছে। যেখানে আমার পুরো মনটা জুড়ে তোমার বসবাস সেখানে এই সামান্য খাটে তো তুমি শুতেই পারো। তাই আর কথা না বাড়ি শুয়ে পড়ো। আমিও যে ভীষণ ক্লান্ত।"

ইনায়া কিছু বলল না। চুপচাপ বিছানার বাম পাশের দিকে গিয়ে শুয়ে পড়ল।তার যেন কেমন অদ্ভুত লাগছে।এই প্রথম কোনো পুরুষের সাথে একই খাটে রাত্রে যাপন করবে। তারপর সে শার্ট এবং টাউজার পড়া।ওড়না সুন্দর করে শরীরে পেঁচানো।নিজের ঘরে থাকলে তো ওড়না খুলে ঘুমিয়ে পড়তো কিন্তু এখন আর সেটা সে পারবে না। তাই চুপচাপ শুয়ে পড়লো।

বিজ্ঞাপন

ইনায়া কে শুয়ে পরতে দেখে আরিশ উঠে দাঁড়ালো এবং লাইট অফ করার জন্য সুইচ পর্যন্ত গেল তারপর কিছু একটা ভেবে ইনায়া কে জিজ্ঞেস করল,,,,,

--"ইনু,,, লাইট অফ করলে কি তুমি আনকম্ফোর্টেবল ফিল করবে? যদি বলো তোমার কোন সমস্যা হবে তাহলে লাইট অফ করবো না।"

আরিশ মূলত এই প্রশ্ন করেছে কারণ সে চায় না ইনায়া আনকম্ফোর্টেবল অথবা আনসেইফ ফিল করে। অন্তত তার কাছে তো নাই।

ইনায়া নরম স্বরে বলল,,,,

--"আলো থাকলে আমি ঘুমাতে পারিনা।"

আরিশ নিজের উত্তর পেয়ে গেল।লাইট অফ করে আস্তে আস্তে বিছানার দিকে অগ্রসর হতে লাগলো।আরিশ বিছানায় কাছে আসছে ইনায়া তা বুঝতে পেরে একদম খাটের শেষ সীমানায় চলে গেল। আরিশ বিছানায় উঠে নিজের স্থানে শুয়ে পড়লো। তারপর আদেশের স্বরে বলল,,,,,,,

--"ইনু এইদিকে চেপে শোও। বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে কি বাসর রাতেই কমরের ব্যাথা বানাবে? মানুষ তো পরে আমাকে খারাপ বলবে।"

ইনায়া কিছুটা অবাক হল। সে বুঝতে পারল না তার কোমরের ব্যথার সঙ্গে আরিশ কে খারাপ বলবে মানুষ এইটার কি সম্পর্ক। তাই প্রশ্ন করল,,,,

--"আমি বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা বানালে মানুষ আপনাকে খারাপ কেন,,,

কথা সম্পন্ন করার আগেই ইনায়া থেমে গেল। সে বুঝতে পারলো আরিশের কথার মানে।তার কান দিয়ে যেন ধোয়া বের হচ্ছে। ইচ্ছে করছে মাটি ফাঁক করে তার ভেতর লুকিয়ে পড়তে। সে কখনো ভাবতেই পারেনি এমন নির্লজ্জ, ঠোঁটকাটা কোন মানুষের সাথে তার বিয়ে হবে। এখন তার আফসোস হচ্ছে কেন সে আরিশের দেওয়া নারিকেল সযত্নে টেবিলের উপর না রেখে সেই নারিকেল দিয়ে আরিশের মাথা ফাটিয়ে দেয় নি। এখন যদি সেই নারিকেল দিয়ে আরিশের মাথা ফাটাতো তাহলে‌ আর আরিশ এই ধরনের কথাবার্তা বলতে পারতো না।

ইনায়া কে অর্ধেক কথার মাঝখানে থেমে যেতে দেখে আরিশের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল তারপর বলল,,,,

--"বাহ্ বাহ্,,, আমার বউ তো দেখছি খুব স্মার্ট এবং ইন্টেলিজেন্ট। আমার বলা কথা খুব তাড়াতাড়ি বুঝে ফেলে। যাইহোক এখন আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ আমার দিকে চেপে আসুন। নাকি আমি নিজে তোমাকে আমার দিকে আনবো?

ইনায়া বুঝলো সে এই মানুষটির সাথে পারবে না।তাই আরিশের দিকে কিছুটা চেপে এলো।ইনায়া আরিশের কিছুটা কাছে আসতেই আরিশ নিজের বাম হাত দিয়ে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে মাথা ম্যাসাজ করে দিতে লাগল।ইনায়া আরিশের এমন কান্ডে বেশ অবাক হলো। লোকটি নিজে অসুস্থ, মাথায় ব্যান্ডেজ শোয়ার আগে সবেমাত্র হাতের ক্যানুলা খুলল। নিশ্চয়ই হাতে ব্যথা আছে। তার উপর আবার এত লং জার্নি করে এসেছে অবশ্যই সে ক্লান্ত। অথচ নিজের ক্লান্তি নিজের ব্যথার কথা চিন্তা না করে সে তার স্ত্রীর মাথা ম্যাসাজ করে দিচ্ছে এমন স্বামী আদৌ পাওয়া যায় এই যুগে? হয়তো পাওয়া যায় তাই তো ইনায়াও পেয়েছে।ইনায়া আস্তে আস্তে বলল,,,,

--"আমি ঠিক আছি। কিন্তু আপনি ঠিক নেই। তাই আমার চিন্তা না করে প্লিজ একটু ঘুমান। আপনার রেস্টের প্রয়োজন। আমাকে বিয়ে করেছেন আমার সেবা আপনাকে বাকিটা জীবন করতেই হবে। আজ না হয় নিজের কথা ভেবে একটু ঘুমান।"

আরিশ মুচকি হাসলো। তারপর ইনায়ার দিকে ফিরে নিজের মাথা উঁচু করে ইনায়ার কপালে চুমু খেল।ইনায়া আবেশে নিজের চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনের ভেতরে এক অদ্ভুত ভালোলাগা জন্ম নিল।আরিশ ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে তারপর বলল,,,,,

--"ভীষন ভালোবাসের আল্লাহর এই বান্দা আপনাকে মেডাম।"

এই বলে আরিশ নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লো।ইনায়ার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।তার বিশ্বাস হচ্ছে এত সুখ তার কপালে জুটল।তার খুব ইচ্ছে করছে আরিশ কে জড়িয়ে ধরে শুতে কিন্তু লজ্জায় পারছেনা। অন্যদিকে আরিশের ও খুব ইচ্ছে করছে নিজের ইনু কে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে কিন্তু সে ইনায়া কে আরো সময় দিতে চায় তাই অনেক কষ্টে নিজের ইচ্ছাকে দমন করে ফেলল। চোখ তার বন্ধ হয়ে আসছে।সে ভীষণ ক্লান্ত। কম ধকল যায়নি তার উপর। চোখ বন্ধ করতেই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল আরিশ।ইনায়া অনেকক্ষণ নিজের সাথে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ভাবতে ভাবতে তারপর সেও ঘুমিয়ে গেল।

______________

জানালা দিয়ে সূর্যেল আলো আসতেই ইনায়া নড়েচড়ে উঠলো। আস্তে আস্তে তার ঘুম হালকা হয়ে গেল। ঘুম ভেঙে যেতে ধীরে ধীরে নিজের চোখ খুলল।চোখ খুলে নিজেকে নতুন জায়গায় দেখে কিছুক্ষণ সময় নিল কোথায় আছে এটা বোঝার জন্য। তারপর তার মস্তিষ্কে নাড়া দিল যে গতকাল রাতে তার আরিশের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে এবং এখন সে আরিশের রুমে আছে।ইনায়া আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো।দেখলো সে নিজের যায়গায় আছে এবং আরিশ তার যায়গায়। মাঝখানে কোলবালিশ হয়তো আরিশ রেখেছে।ইনায়ার আরিশের এইসব যত্ন খুব ভালো লাগে ‌।আরিশ আগেও সব সময় তাই ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিত এবং বিয়ে হবার পরেও নিজের অধিকারের কথা না ভেবে ইনায়ার ইচ্ছাকে সম্মান দিয়েছে। একটা মেয়ে তো ভালোবাসে এবং সম্মান আটকে পড়ে।

ইনায়া দৃষ্টি গেল আরিশের দিকে।আরিশ সোজা হয়ে ঘুমোচ্ছে। চেহারা একদম যেন নিষ্পাপ শিশুদের মতোন।ইনায়া মুচকি হাসলো। তারপর আস্তে আস্তে আরিশের কিছুটা কাছে গেল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরিশেল ঘুমন্ত চেহারার পানে।এই মানুষটিই তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবেসে এসেছে। আর সে কিনা এই মানুষটাকে বিয়ে করার পরেও স্বামীর অধিকার দিতে পারছি না।আর মানুষটি এতটাই নিঃস্বার্থভাবে তাকে ভালবাসি যে নিজের অধিকার পর্যন্ত চায়নি। পুরুষ মানুষ চাইলেই তো জোর খাটাতে পারতো কিন্তু সুপুরুষের মতো মাঝখানের কোলবালিশ রেখে নিজের জায়গায় ঘুমিয়েছে।

ইনায়া আরিশের আরো কাছে চলে গেল। এতটাই কাছে চলে গেল যে তার চুল আরিশের মুখে পড়বে এমন।ইনায়া আরিশের ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে নিজের হাত আরিশেল মুখের কাছে নিয়ে গেল তা সে বুঝতেই পারবে না। যখষ বুঝতে পারলো তখন নিজের হাত সরিয়ে নেয় নি বরং আরিশের নাক ছুঁইয়ে দিল নিজের হাতের আঙ্গুল দিয়ে।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস