ইনায়া আরিশের দৃষ্টি লক্ষ্য করে লজ্জায় লাল হয়ে গেল।এতটাও অবুঝ না সে যে আরিশের কামনাময় দৃষ্টি বুঝতে পারবে না।সে আরিশের বুকে আবার মুখ লুকোলো।আরিশ ইনায়া কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো হয়তো নিজেকে স্বাভাবিক করছে।
_______________
সাদমান আরিশের ফ্ল্যাটে এসেছে আজ। পাশের রুমে বসে আছে। কিন্তু তার মস্তিষ্ক জুড়ে কেবল ইরিন। আগে ইরিন সবসময় তার পিছন পিছন ঘুরতো, তাকে জ্বালাতন করতো, তাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতো কিন্তু এখন যেন ইরিন সম্পূর্ণ রুপে বদলে গেছে। তার পিছনে পিছনে ঘুর ঘুর করা তো দূরের কথা তার সামনে পর্যন্ত আসছে না। একদম তাকে উপেক্ষা করছে।আর এই উপেক্ষা যেন সাদমান সহ্য করতে পারছে না। তাকে যেন খুব পোড়াচ্ছে ইরিনের উপেক্ষা। কিন্তু সে তো এইটাই চাইতো। সে চাইতো যাতে ইরিন তাকে ভালো না বাসে, তার থেকে দূরে থাকে,তার দিকে যেন এমন প্রেমময় দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে। অথচ এখন ইরিন এই সব বন্ধ করে দিয়েছে কিন্তু সাদমানের তা সহ্য হচ্ছে না। সাদমান নিজের চাওয়া কে পাওয়ার পর মেনে নিতে পারছে না।তার মানে কি এইটা তার চাওয়া ছিল না? সে কি সত্যিকার অর্থে চাইতো না ইরিন তাকে ভালো না বাসুক।কেন এত টানা পরনে আছে সে। সে তো চায় না নিজের অনির্ভরশীল জীবনে ইরিনের মতোন কাউকে জড়াতে। একা একাই তো বেশ আছে সে। তার মা বাবার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল যখন সে ক্লাস ৯ এ পড়তো।এই বয়সে এত বড় ধাক্কা অনেক কষ্টে সামলিয়ে ছিল।বাবার কাছে থাকতে হয়েছে তার।মা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।বাবা যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে তখন সৎ মায়ের অত্যাচারের কারণে ক্লাস টেনে হোস্টেলে চলে যায়। হোস্টেলে একা একা থেকেই পড়াশোনা করে। বাবা টাকা পাঠাতো তাকে। তার যত টাকার প্রয়োজন ছিল তার থেকে সব সময় বেশি টাকা দিত তাকে। কিন্তু সে তা পায় নি যা সে খুঁজেছিল এবং তা হলো ভালোবাসা।না বাবার ভালোবাসা পেয়েছে আর না কখনো মায়ের ভালোবাসা পেয়েছে। ডিভোর্সের পর তার মা কখনোই তার সাথে দেখা করেনি।সে অনেক চেষ্টা করেছিল তার মার সাথে একটিবার দেখা করার জন্য কিন্তু তার মা তার সাথে দেখা করেনি। বরং অন্য এক পুরুষকে বিয়ে করে ইতালি চলে গিয়েছিল। সে শুধু মাত্র তার মায়ের কন্ঠ শোনার জন্য অনেক রাত জেগে কান্না করেছিল কিন্তু সে তার মায়ের সাথে কথা বলেতে পারেনি। যখন সে হাই স্কুল পাশ করে কলেজে এডমিশন নেয় তখন সে নিজের বাবার সাথেও যোগাযোগ ছিন্ন করে দেয় এবং পার্ট টাইম জব করে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালায়।সে তো হাসতেই ভুলে গিয়েছিল। তার কোনো বন্ধু ছিল না। সে সবসময় একা থাকবে এবং চুপচাপ থাকতো। কিছুটা লাজুক প্রকৃতিরও সে।কিন্তু হঠাৎ তার পরিচয় হয় আরিশের সাথে। দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব হয়ে যায়।সে আরিশের অফিসে তার এসিস্ট্যান্ট হয়ে জয়েন করে এবং যখন আরিশের বিশ্বস্ত হয়ে উঠে তখন আরিশ তাকে নিজের সিক্রেট এজেন্ট এর ব্যপারে জানায় এবং তাকে তার পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট বানিয়ে দেয়।
সাদমান জীবনে অনেক কিছু দেখেছে তাই তার মৃত্যু কে ভয় হয় না।সে তো বেঁচেই ছিল মৃত্যুর জন্য। কিন্তু হঠাৎ তার সামনে আসে এক হাস্যোজ্জ্বল নিষ্পাপ চেহারা।সে হাস্যজ্জল নিষ্পাপ চেহারার অধিকারী আর কেউই নয় বরং ইরিন স্বয়ং নিজেই ছিল। সাদমান যখন প্রথমবার ইরিন কে দেখে তার মনে এক অদ্ভুত অনুভুতির জন্ম নেয়। কিন্তু না সে কখনো কারোর ভালোবাসা পেয়েছে আর না সে জানে অনুভূতি কি তাই সে নিজের মনে জন্মে উঠতে থাকা অজানা অনুভূতি কে জন্মাতে দেওয়ার আগেই মাটি চাপা দিয়ে দেয়। কিন্তু ইরিনের হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী, ইরিনের দুষ্টুমি, খুনসুটি, পাগলামি এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এই সকল কিছু সাদমান কে ক্রমশ দূর্বল করে তুলে। কিন্তু সে যে দূর্বল হতে চায় না। ছোট থেকে বড় হয়েছে মা-বাবার ঝগড়া দেখে দেখে। তাই সে বিয়ে, ভালোবাসা, অনুভূতি এই সকল কিছু কে ঘৃণা করে ভীষণ ভীষণ ঘৃণা করে।তার ধারণা বিয়ে মানেই জীবন বরবাদ।কিন্তু ইরিন তার জীবনে আসার পর থেকে তার এই ধারণা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।ইরিনের পাগলামো যেন তাকে নতুন জীবন দিয়েছিল। কিন্তু এখন ইরিনের নিরবতা তাকে কষ্ট দিচ্ছে।সে এখন বাঁধ্য হচ্ছে স্বীকার করেতে যে সেও ইরিন কে ভালোবেসে ফেলেছে।
সাদমান নিজের চিন্তা ভাবনা দেখে দমে গেল ।কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তারপর নিজে নিজে বলল,,,,
--"আমিও তোমাকে ভালোবাসে ফেলেছি ইরিন।জানি বুঝতে দেরি করে ফেলেছি। কিন্তু এই দেরিকে আমিই খুব দেরিতে রূপান্তর করব না।তোমার রাগ অভিমান সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিব। তুমি আমাকে যতটা ভালবাসতে তার থেকে হাজারগুন বেশি ভালোবাসা তোমাকে দিব। আমি জানিনা ভালোবাসা মানে কি কিন্তু যতটুকু জানি ততটুকুই তোমাকে উজাড় করে দিব।"
____________
ইরিন জানলার ধারে বসে ছিল। হাত তার জানালার গ্রিলে ছিল, এবং দৃষ্টি ছিল আকাশে।মেয়েটা বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। সাদমান থাকে দূরে সরে থেকে নিজেও কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু এইবার সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যত কষ্টই হোক না কেন সে আর সাদমান কে জ্বালাতন করবে না। ইরিন আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলতে লাগলো,,,
--"আমার ভালোবাসা আপনাকে খুব বিরক্ত করে তাই না সাদমান।আর কখনোই আপনার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াব না। গুটিয়ে নিব নিজেকে আপনার থেকে। কখনোই নিজের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি নিয়ে আসবো না আপনার সামনে।যত সম্ভব আপনার থেকে দূরে থাকব।আমি না হয় আপনাকে দূর থেকেই ভালোবাসব।"
ইরিনের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।সে যার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কাঁদছে, যার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার জন্য তৈরি হচ্ছে সে নিজেই যে তাকে পাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তা জানে না ইরিন। হয়তো জানলে সি নিজ থেকেই ধরা দিত।
______________
ইনায়া পড়ার টেবিলে বসে পড়ছিল।আরিশ কিছু কাজের জন্য সাদমান কে নিয়ে বাইরে গিয়েছে।ইনায়া ঘন্টাখানেক পড়ে তারপর পড়ার টেবিল থেকে উঠলো। পুরো ফ্ল্যাটে চোখ বুলায় সে।তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে তারও সংসার হয়েছে।সেও এখন কারোর স্ত্রী। তাকেও কেউ ভালোবাসে। ইনায়া নিজের জামার হাতা উঠিয়ে কাঁটা দাগে নজর বুলায়। কতটাই না বোকা ছিল সে, কারোর ভালোবাসায় অন্ধ ছিল সে।ইনায়ার অতীতের কথা মনে পড়লেই এখনো খুব কান্না পায়। যাকে ভালোবাসতো তাকে পায়নি বলে কান্না পায় বিষয়টি এমন না বরং তখন কষ্টের দিনগুলো যেভাবে কাটিয়েছিল সেগুলো মনে পড়লেই তার কান্না আসে। তার এখনো মনে পড়ে সে কান্না করতে করতে রিফাত ভাই কে মেসেজ দিয়েছিল শুধু মাত্র নিজের কষ্টের কথা বলতে কিন্তু পরবর্তীতে সে হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি ঝড়িয়েছে। এবং এই অসম্ভব কিছু শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছে তার পার্সোনাল ডাইরি, তার রিফাত ভাইয়ের জন্য। তাকে এমন এমন কথা বলে হাসিয়েছে যার ফলে ইনায়া নিজের দুঃখ ভুলে গিয়েছিল।সে একবার রিফাত কে মেসেজ দিয়েছিল কিন্তু রিফাত তখন রাস্তায় ছিল নিজের প্রাইভেটে যাচ্ছিল। এমনকি তার লেইট হয়ে গিয়েছিল।তার এখনো মনে আছে রিফাত রাস্তা দিয়ে হেটে হেটে যাওয়ার সময় তাকে এক, দুই মিনিটের করে কমপক্ষে ১০/১২ ভয়েস মেসেজ দিয়েছিল শুধু মাত্র তাকে মোটিভেট করার জন্য এবং হাসানের জন্য।এই রিফাত ভাই কে ইনায়া কি করে ভুলতে পারে।যেই যায়গায় তার দোষ না থাকলেও বাড়ির সবাই তাকে দোষারোপ করেছে সেই জায়গায় তার রিফাত ভাই তাকে দোষারোপ না করে শুধুমাত্র তার পাশে থেকেছে এবং তাকে আস্থা দিয়েছে সাপোর্ট করেছে তাকে হাসিয়েছে।রাত ২/৩ টায় যখন তার ডিপ্রেশনের কারণে প্যানিক অ্যাটাক হাওয়ার উপক্রম ছিল তখন এই রিফাত ভাই তার সাথে কথা বলেছে,নিজের জীবনের ব্যক্তিগত হাস্যকর বিষয় শেয়ার করে তাকে হাসিয়েছে। নয়তো ইনায়া যে হাসতেই ভুলে গিয়েছিল।
ইনায়া এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর বললো,,,
--"আরিশ আজ আমি আপনাকে নিজের অতীত সম্পর্কে বলবো। আমি চাই না আপনার আর আমার মাঝে কোনো ঝামেলার সৃষ্টি হোক।আমি চাই আমাদের ভবিষ্যৎ সুখের হোক এবং কোনো বিপদ আপদ যেন না আসুক।"