অতীতের খোলাসা শেষাংশ
ওহ্ একটি কথা তো বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম।ইনায়া আবার বলতে শুরু করল__
২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি, তখন তার মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা হয়নি। রাত ১২ টার পর হঠাৎ কল এসেছিল রূকসানা আপুর ফোন থেকে। এত রাত্রে আপুর ফোন দেখে আম্মু লাফ মেরে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল এবং সাথে সাথে ফোন ধরেছিল। আপু বলল রুবিনা আপুর শাশুড়ি মারা গিয়েছে।আমি যেন হতভম্ব হয়ে গেলাম।ওর বাবা মারা গিয়েছিল যখন সে ছোট ছিল।আর তার সব থেকে আপন ছিল তার মা। সে খুব মা ভক্ত ছিল এখন তার মাও মারা গিয়েছে। অথচ এক দেড় মাস পর তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা যা তার মায়ের স্বপ্ন ছিল।এহেন মূহুর্তে সে এত বড় ধাক্কা পেল এইটা ভেবেই আমি আহত হয়েছিলাম। সারারাত ঘুমাতে পারি কারণ এমন সময় আমিও পার করেছিলাম। আব্বু মারা গিয়েছিল তিন মাস সম্পূর্ণ হয়েছিলো সেই শোক কাটাতে পারিনি সে যায়গায় তার তো শুধু মা বেঁচে ছিল এইটা সে কি করে মানবে।তার কষ্ট হবে এইটা ভেবে আমি সারারাত কেঁদে কেঁদে ভাসিয়ে ছিলাম।সারা রাত নিজের চোখের পাতা এক মূহুর্তের জন্য বন্ধ করেছিলাম না।সকাল ছয়টা বেজে গেছে এইটা দেখেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম এবং আম্মুকে উঠিয়ে দিলাম কারণ রাতেই চাচিরা এবং আম্মুরি বলেছিল তারা যাবে। এবং সানিউল ভাইয়ার এমন বিপদের সময় আমি না গিয়ে কি করে পারতাম। আমার এমন সময় তাকে সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিল কিন্তু সে ছিল না। একেই তো বাবা হারানোর কষ্ট ছিল তার উপরে তার কাছ থেকে পাওয়া এমন ব্যবহার দুটোই আমি অনেক কষ্টে সামলিয় ছিলাম। কিন্তু আমি চাই না সে আরো কষ্ট পাক। হয়তো ভালোবাসা মানে এটাই।
শীতের সকালে আমি কোনরকম হাতমুখ ধুয়ে জামা বদল করে শুধুমাত্র একটি শাল নিয়ে বের হয়েছিলাম। সোয়েটার পর্যন্ত পরেছিলাম না।এমনি বের হয়েছিলাম। পুরোটা রাস্তা কাঁপতে কাঁপতে গিয়েছিলাম কিন্তু সেইদিকে আমার কোনো হোশ ছিল না। শুধু তার কথা ভেবে কেঁদেছিলাম।এখন তার কি হবে?সে কি করে নিজেকে স্বাভাবিক করবে?
টানা আড়াই ঘণ্টা পর টোকে পৌঁছেছিলাম। রিকশা থেকে নেমে আমি কারো জন্য অপেক্ষা না করে হাঁটা লাগিয়েছিলাম তাদের বাড়ির দিকে। ২০ মিনিটের মত হেঁটে যেতে হতো মাটির রাস্তা এবং রাস্তা খারাপ থাকাই রিক্সা দিয়ে যাওয়া যায় না ভিতরে। গিয়ে দেখলাম বাড়ি ভরতি মানুষ ছিল। কিন্তু আমার চোখ তো ছিল শুধু একজন কাঙ্খিত মানুষকে খুঁজাতে।পুরো বাড়ির চারপাশে ঘুরলাম কিন্তু তাকে দেখতে পেলাম না। তার মায়ের লাশের কাছে যেতেই কান্নায় ভেঙে পরেছিলাম।কত আশা ছিল বিয়ের পর উনাকে মা বলে ডাকব।উনার সাথে গল্প করবো,মাথায় তেল দিয়ে দিব।সানিউল দের ছিল মাটির বাড়ি। আমাদের যতটুকু আছে সেই তুলনায় তাদের কিছুই নেই। তারা যে টোকে থাকে এটি তার নানুর বাড়ি ছিল।আসল বাড়ি দুবাশিয়া(যা গফরগাঁওয়ে পরেছে) ছিল সেখানেও মাটির বাড়ি ছিল। বাথরুম ছিল কাঁচা।আমি যখন বুঝতে শুরু করেছিলাম তখন আমি এইটা ভেবে ভয় পেতাম যে ভবিষ্যতে না আমাদের পরিবার থেকে তাদের দ্বিমত পোষণ করে। কারণ আমাদের তুলনায় তাদের কিছুই ছিল না। কিন্তু আমি এইসবের পরোয়া করতাম না। আমার কাছে ছিল ভালোবাসা। ভালোবাসার সামনে আর কোন কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। টাকা পয়সা আসবে যাবে রূপ নষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু ভালোবাসা কখনো ফুরোবে না। তার মাটির বাড়ি না ইটের বাড়ি সেটা আমি কখনোই ভাবতাম না আমি শুধু এতটুকু ভাবতাম তাকে বিয়ে করে সুখে সংসার করবো। তার পুরো পরিবার নিয়ে একসাথে থাকব।কোন এক সময় বাথরুমে যেখানে আমার দিনের বেলা যেতে ভয় করতো সেই জায়গায় তাদের বাথরুম ঘরের বাইরে থাকায় যাতে বিয়ের পর রাতের বেলা সেখানে যেতে পারি তাই রাত্রে আমাদের বাড়িতেই একা একা বাথরুমে গিয়ে সাহস করেছিলাম। চিকন হবার জন্য ডায়েট করা পর্যন্ত শুরু করে দিয়েছিলাম যাতে একদম পারফেক্ট থাকি।
তার মায়ের মৃত দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম সানিউল ভাইয়া আমার হলে তাকে কখনো কাঁদতে দিব না।সকল কষ্ট ঘুচিয়ে দিব অথচ কখনো ভাবতেই পারিনি আমার কষ্টের কারণ হবে সে স্বয়ং নিজেই।
আপুর কাছ থেকে শুনলাম সে নাকি রাতেই খবর শুনে এসে পড়েছিল। কান্না করতে করতে ফজরের সময় ঘুমিয়েছিল এখনো পর্যন্ত উঠেনি। আমি আম্মুর সাথে তার রুমে গিয়েছিলাম সেখানে গিয়ে দেখেলাম সে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।তার চেহারা পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। এমন সময় আম্মু বলেছিল___
এখন তো আমাদের চলে যেতে হবে।
আমি যেন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।এমন অবস্থায় কি করে এত তাড়াতাড়ি চলে যাব আমি? এমনকি তার মুখ পর্যন্ত আমি দেখিনি এখনো পর্যন্ত। তাকে লাস্ট দেখেছিলাম ২০২২ সালের ১৪ ই এপ্রিল ১:২৫ এ আর এখন এত কাছে এসে এমন অবস্থায় তাকে শুধু নিজের চোখ জোড়া দিয়ে দেখতে পারবো না এইটা যেন আমার ধারা সহ্য হচ্ছিল না। হয়তো আম্মু আমার অবস্থা কিছুটা বুঝেছিল তাই আমাকে বলল__
তুই তোর চাচাতো ভাইয়াদের সাথে পরে আসিস আমি এখন চলে যাই।
আমি যেন নিশ্চিন্ত হলাম আম্মু চলে গেল আমি সেই রুমের ধারের কাছেই ঠাই দাঁড়িয়ে রইলাম শুধুমাত্র তার ঘুম ভাঙ্গার আশায়।
তার রুমে আস্তে আস্তে ভির জমতে শুরু করল কারণ তার ঘুম ভেঙ্গেছে।আমি হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ৮:৩৫ বাজে। বিছানার দিকে তাকিয়ে তার অশ্রুসিক্ত নয়ন দেখেছিলাম। তাকে দেখেছিলাম বাচ্চাদের মতোন ফুঁপিয়ে কাঁদতে অথচ আমি তাকে শান্তনা পর্যন্ত দিতে পারিনি।কি করে দিতাম আমার তো সেই অধিকার ছিল না। তার কান্না একদম কলিজায় এসে লাগছিল। তাকে এইভাবে কাঁদতে দেখে নিজের অজান্তেই মনে মনে শুধু একটা কথাই বলেছিলাম___
তুমি তো মন ভরে কাঁদতে পারছো এবং মন হালকা করতে পারছ কিন্তু আমি তো সেটিও করতে পারিনি। তুমি এখন যতটা কাঁদছো আমার বাবার মৃত্যুতে তার এক পার্সেন্টও হয়তো কাঁদিনি। এতটা কঠোর হয়ে গিয়েছিলাম আঘাতে। তোমার আমাকে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এখন যেমন তোমার কাছে আমি আছি তখন আমার কাছে সবচেয়ে বেশি তোমার প্রয়োজন ছিল। তোমাকে হয়তো একবার চোখের দেখা দেখলে কিছুটা আশ্বাস পেতাম,মন হয়তো অনেকটা শান্ত হত। সবথেকে খারাপ সময়ে মন প্রিয় মানুষগুলোকেই তো খুঁজে। কিন্তু তখন তুমি ছিলে না। অথচ আজ আমি শুধু মাত্র তোমার জন্য এসেছি কিন্তু তোমার চোখে আমি পড়ছি না।"
তাকে এইভাবে কাঁদতে দেখতে থাকলাম।সে কাঁদতে কাঁদতে যখন মাথা নিচু করে ফেলেছিল তখন ভিরের মাঝে শুধু তার মাথা হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম।জানা নেই এই স্পর্শ আদৌও তার প্রয়োজন ছিল কিনা, জানা নেই এই নিষ্পাপ স্পর্শ আদৌ আল্লাহ পবিত্র ভালবাসা হিসেবে নেবেন কিনা কিন্তু এতটুকু জানতাম আমার মন এমন স্পর্শের জন্য অনেক ছটফট করেছিল তাই আর তখন নিজেকে ধরে রাখি নি।
জানাজা শেষে হওয়ার পর সে নিশ্চুপ হয়ে গেল। সকাল থেকে কেউ কিছু খায় নি। আমাকে চাচি জোর করে নিয়ে গিয়েছিল খাবার খাওয়ার জন্য। এমন অবস্থায় আমি কি করে খেতাম তার ওপর এইটা জানতাম না সে আদৌও খেয়েছে কি খায়নি। যখন জানতে পারলাম সে হালকা-পাতলা খেয়েছি তারপর অল্প কিছু খেয়ে নিয়েছিলাম। খেয়েই আবার চলে এসেছিলাম তাদের বাড়িতে। এসে দেখলাম মোটামুটি সবাই চেয়ারে বসে আছে আমিও চুপচাপ একটি চেয়ার টেনে বসলাম। তাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পাচ্ছিলাম না হয়তো রুমের ভেতর ছিল। রুমের ভেতর থেকে বাহিরে এসে দাঁড়িয়ে রইলো। আমার পাশে একটি চেয়ার ছিল কিন্তু সে সেটিতে বসল না আমি বুঝতে পারলাম তাই আমার চেয়ার টেনে আমিও উঠে অন্য পাশে এসে বসলাম তারপর আমার সরাসরি সে বসলো। আড় চোখে তাকে দেখছিলাম। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছিল। শুধু মনে মনে দোয়া করছিলাম যাতে আল্লাহ তাকে ধৈর্য ক্ষমতায় দেয়।
আমাদের চলে আসার সময় হয়ে গিয়েছিল। চলে আসার আগে সবার সাথে কথা বললেও তাকে শুধু এক নজর দেখে চলে আসছিলাম।তখন দুপুর ১ টার বেশি বাজছিল। আমার চাচাতো ভাই তার বোন অর্থাৎ রুবিনা আপুর সাথে কথা বলছিল।আর আমি মনে মনে দোয়া করছিলাম যাতে চলে যাওয়ার আগে তাকে আরেকটি বার দেখতে পাই। হয়তো সেদিনটা আমার ছিল তাই তো দোয়া করতে করতে হঠাৎ দেখলাম সে আসছে। আমরা তার বাম পাশের রাস্তার দাঁড়িয়েছিলাম।সে মোড়ের মাথায় এসে আগে বাম পাশেই তাকিয়ে ছিল যেখান দিয়ে আমাদের যাওয়া কথা। অথচ তার পথ ডান পাশে ছিল কারণ মসজিদে যাবে সে।তার দৃষ্টি একদম আমার দিকে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হয়েছিল তখন।আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম তাকে দেখতে পেয়ে।সময় ছিল তখন ১:৩৪।সে মসজিদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল এবং বার বার পিছু ফিরে দেখতে লাগলো। তার চোখ ছিল আমার দিকে মন বলছিল আমাকে দেখছে আর মস্তিষ্ক বলছিল এমনি তাকাচ্ছে তাই আমি কারোর কথা না শুনে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে।সে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল চোখের আড়ালে। মসজিদ ছিলো হাতের ডান পাশে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেইখানে থেকে দেখা যাচ্ছিলো না। তারপরও তাকিয়ে ছিলাম। ভাইয়া তাড়া দিতে শুরু করল চলে যাওয়ার জন্য। সবাই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল অথচ আমি পিছনে ছিলাম যাওয়ার আগে তার আরেক নজর চাহনির জন্য। হঠাৎ দেখলাম সেই সামনের মোড় থেকে সে আবার উকি দিচ্ছিলো। প্রথমে তার মাথা তারপর তার পা পর্যন্ত দেখেছিলাম।সে কিছুক্ষণ এইভাবে উকি দিয়ে চলে গিয়েছিল কিন্তু আমার যেন দুনিয়া থমকে গিয়েছিল। এইটার মানে কি ছিল। পেছনে তাকানোর তো তার কোন প্রয়োজন ছিল না তারপরও সে কেন তাকিয়ে ছিল। তার জায়গায় আমি থাকলে যদি এই কাজটি করতাম তাহলে মানতাম কারণ আমি তাকে ভালবাসতাম কিন্তু তার মনে তো এমন কিছু ছিল না তাহলে সে কিসের ইঙ্গিত দিল? এইটাকে কি আমার পজেটিভ সাইড ভাবা খুবই দোষের কিছু ছিল? আমার তো মনে হয় না এটা দোষের কিছু। ভালোবেসেছিলাম সেও চোখে চোখে অনেক পাত্তা দিয়েছিল,চোখে চোখে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল যার ফলে আমি আরো বেশি দুর্বল হয়ে পরেছিলাম। পুরোটা রাস্তা এসব ঘটনা ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবেই হোক ভালো করে পড়াশোনা করব সে যেখানে চান্স পাবে সেখানে কলেজে এডমিশন নিব। কিন্তু একতরফা ভালোবাসা যে বড়ই পোড়ায়। তাই ঠিক মতন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারতাম না।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্লাস টেনের টেস্ট পরীক্ষার আগে নেয় মডেল টেস্ট পরীক্ষা সেটিতেও ফেল ছিল দুই বিষয়ে। ভালো মতোন পড়তে না পারলে ফেল আসাটাই স্বাভাবিক ছিল।তখন যেন বাড়ি থেকে ঝামেলা আরো বেড়ে যায়। খেতে বসেও আম্মুর কথা শুনতে হয়েছে।না পেরেছিলাম খাওয়া থেকে উঠে যেতে আর না পেরেছিলাম বসে বসে খেতে। খাওয়া থেকে উঠে গেলেও কথা শুনতে হতো। আমার এক বান্ধবী ছিল সেদিন তার সামনেই অনেক কথা শুনতে হয়েছিল।তখন কোনোরকম খাওয়া শেষ করে চলে এসেছিলাম আমার পড়ার টেবিলে। একসময় ডাইরি লেখার অভ্যাস ছিল। অবশ্য সেই ডাইরি জুড়ে কেবল ছিল সানিউল।ডাইরি তে যে না কিছু লিখতে নিয়েছিলাম উমনি আম্মু এসে বলা শুরু করল এখন সব ডাইরিতে লেখব ছেছড়ার মতোন। অথচ পরীক্ষার খাতায় কিছুই লেখিনা।
আবার ২৩ তারিখ আমার জন্মদিন ছিল অবশ্য আব্বু মারা যাওয়ার পর জন্মদিন নিয়ে যা উৎসাহ হতাম আগে তা যেন আব্বুর লাশের সাথে মাটি চাপা দিয়ে ফেলেছিলাম।এক সময় নিজের জন্মদিন নিয়ে এক সপ্তাহ আগে থেকেই ঘ্যানঘ্যান করতাম কিন্তু এক বিষাক্ত অনুভুতি আমার জীবনে এসে যেন সব ধ্বংস করে দিয়ে গেল। আব্বু মারা যাবার চার দিন পর যখন আমার জন্মদিন ছিল তখন আশা করেছিলাম সানিউল ভাইয়া হয়ত কল দিবে কিন্তু দেয়নি। আব্বুর মৃত্যুতেও এতটা কাঁদি নি যতটা শুধু মাত্র সানিউল ভাইয়ার কন্ঠ শুনার জন্য কেঁদেছিলাম।আর ২০২৩ সালে আমার জন্মদিনের দিন জীবনের প্রথম বার আমি হাত কেটেছিলাম। আপন মানুষদের দেওয়া যন্ত্রণা সহ্য করা বরই কঠিন এবং যখন সব দিক থেকেই ধাক্কা আসে তখন বেঁচে থাকাটাও মনে হয় বোঝ। নিজেকে পৃথিবীর জন্য বোঝা মনে হচ্ছিল। সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল মরে যেতে। বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম এই উদ্দেশ্য। স্টেশনে গিয়ে বসে রইলাম মস্তিষ্ক বলছিল ট্রেন এলেই যেন ট্রেনের সামনে চলে যাই।আর মন?সেটিও যেন আমার মতোন পাথর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন আমার সেই বান্ধবী লামিয়া ছিল আমার পাশে। আমাকে শান্তনা দেয়। অনেক কষ্টে আমাকে বোঝায়।আমি আরো শক্ত হই। বাড়ি ফিরি কথা শুনি ব্যাস এই ছিল আমার জীবন।অবশ্য আমি এসবের জন্য কাউকেই দোষারোপ করিনি কখনো। নিজের দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলাম।আমি ছোট থেকেই ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত রোল এক ছিল। রোল মেটার করে না কিন্তু কখনোই ৯০ এর নিচে মার্ক আসতো না। তারপরও ক্লাস ফাইভে অতিরিক্ত মাত্রায় আবেগে আপ্লুত হয়ে পরিনি বলে জিপিএ ফাইভ পেয়েছিলাম।আর সেই যায়গা এখন দু এক সাবজেক্টে ফেল করি। এটা আসলে সবার জন্য হতাশাজনক বিষয় ছিল।যেই আমার সব থেকে বড় স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হব কেন জানিনা সেই ইচ্ছা আশা আপনি আপনি মন থেকে সরে যেতে লাগলো। এতকিছুর পরেও তাকে আমি ভুলতে পারলাম না। ক্লাস সেভেনে একবার যখন গিয়েছিলাম তখন অনেক সাহস করে তার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার জন্মদিন কবে, সে বলেছিল পহেলা এপ্রিল।এর পর থেকে তার প্রত্যেক জন্মদিনে মানত রোজা রাখতাম তার জন্য। এসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও মানত রোজা রাখা বন্ধ দেই নি। রুবিনা আপু একবার এসেছিল আমাদের বাড়ি তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তার ফোন থেকে তার ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করে নতুন পাসওয়ার্ড দিয়ে তারপর তার অ্যাকাউন্ট আমার ফোনে লগইন করে রেখেছি যাতে আমি সানিউল ভাইয়ার আইডি ভালোভাবে স্টক করতে পারি। সে কি স্টোরি দেয় তা দেখতে পারি।। কিন্তু এর কারণে যে আরো বড় ধাক্কা খাব তা আমার জানা ছিল না। ঘর থেকে বের হওয়ার একদম বন্ধ করে দিলাম। শুধু স্কুল আর প্রাইভেট যাওয়া সময় বাহিরের আলো দেখতাম।আর নয়তো সারাক্ষণ ঘরেরই থাকতাম। বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশ্য আমারই দোষ ছিল। তখন কিছুই ভালো লাগতো না, কাউকেই সহ্য হতো না।সব কিছু অসহ্য লাগতো তাই একা থাকা শুরু করলাম।
নভেম্বর মাসে মোটামুটি সব ঠিকঠাক চলছিল আম্মু সাপোর্ট করা শুরু করল।কথা শোনান বন্ধ করেদিল।তখন এই সাপোর্ট টা খুব হাস্যকর এবং ফেলনা মনে হলো। যখন কেঁদে কেঁদে রাত জেগেছিলাম তখন আমার এই সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল। যখন হাত কাটার মতন জঘন্য কাজ করেছিলাম তখন প্রয়োজন ছিল এই সাপোর্টের। যখন খাবার ছেড়ে উঠে পড়তাম তখন প্রয়োজন ছিল সেই সাপোর্টের। যখন আত্মহত্যা করার মতো মহাপাপ করার চিন্তা মাথায় এসেছিল তখন প্রয়োজন ছিল সেই সাপোর্টের। যখন ছোট বেলায় সবাই এইসব কথা বলে আমার নিষ্পাপ মনে এমন বিষাক্ত অনুভুতির উৎপাদন করেছিল তখন প্রয়োজন ছিল সাপোর্টের তাহলে হয়তো এতবার সাপোর্টের প্রয়োজন হতো না এইবারি যথেষ্ট ছিল। এত যন্ত্রণা, এত অপমান, এত লাঞ্ছনা সহ্যই করতে হতো না।
আপু আইডি দিয়ে যখন তার একাউন্ট ঘুরতাম দেখতাম তার পোস্টে কোনো মেয়ে লাইক কমেন্ট করেছে কিনা, কোন মেয়ের কমেন্টের রিপ্লাই দিয়েছে সে।রাতে উঠতাম পড়ার জন্য কিন্তু এই সব করে আর পড়া হতো না। ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট খুলেছিলাম তার জন্য।তাকে ফলো দিয়েছিলায়।তার ফলোয়িং লিস্ট চেক করে দেখলাম একটা মাত্র মেয়েকে সে ফলো দিয়ে রেখেছে।কেমন খটকা লাগলো। মেয়েটির নাম ছিল নিপা।সেও মেডিকেল স্টুডেন্ট। খারাপ লাগা বেড়ে গিয়েছিল। মেয়েটির প্রত্যেকটি পোস্ট তার লাইক এবং কমেন্ট ছিল।তার পোস্টেও মেয়েটির লাইক কমেন্ট ছিল। এবং এইসব ভালো না লাগাই স্বাভাবিক ছিল।আমি প্রচন্ড পসেসিভ। নিজের যেইটা মনে করতাম সেইটায় অন্য কেউ অধিকার দেখাক তা আমার পছন্দ না। তারপরও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম। অহেতুক অভারথিংকিং এর কারণে নিজের পড়া লেখা নষ্ট করতে চাইতাম না। অনেক কষ্টে আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দিলাম কারন সামনেই ছিল টেস্ট পরীক্ষা। কিন্তু যে যায়গায় ২০২২ সাল থেকে ২০২৩ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পড়াশোনা হয়নি বলতে গেলে ক্লাস নাইন এবং টেন ফাও চলে গেছে সেই যায়গা আর এক মাসও হাতে ছিল না টেস্ট পরীক্ষার তারপরও হার মানি নি তখন আমি এবং টেস্ট পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই করেছিলাম।কোনো সাবজেক্টে ফেল আসেনি বরং আগের থেকে সব সাবজেক্টে ৫/৭ করে নাম্বার বেড়েছিল। কনফিডেন্ট পেলাম। আবার আগের মতোন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম যে হয়তো চেষ্টা করলে এসএসসি তে ভালো রেজাল্ট করব এবং হয়তো ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার জন্য প্রিপারেশন নিব। কিন্তু ছোটবেলায় ডাক্তার হওয়ার জন্য মনে যেই আকুলতা ছিল সেটা কেমন জানি হারিয়ে যেতে দেখছিলাম। কারণ যেটা আমাদের পছন্দ যেটাকে আমরা ভালোবাসি সেটাকে কখনো অপশনাল রাখতে পারি না কিন্তু ডাক্তার হাওয়া আমার কাছে কেন জানি অপশনাল লাগা শুরু করলো। মনে মনে ভাবতাম যদি এসএসসিতে প্লাস না পাই তাহলে ইন্টারে মানবিক গ্ৰুপ নিয়ে ভবিষ্যতে সাইকোলজিস্ট হবে। এবং সাইকোলজিস্ট হবার প্রতি যেই আকুলতা মনে তৈরি হতে লাগলো ডাক্তার হবার প্রতি সেই আকুলতা ছিল না। নভেম্বরে ১৫ দিনের মতোন খুব পড়লাম পড়ে টেস্ট পরীক্ষা দিলাম অক্টোবরে। পরীক্ষার পর অক্টোবরের শেষের ১০ দিন ডিসেম্বর ১০ দিন খুব ভালো পড়লাম আবার। তারপর বের হয়েছিল বোর্ড পরীক্ষার রুটিন।তখন শুধু কোচিং খোলা ছিল।কোচিং থেকে এসে আম্মু বলল সে একটা নাম্বার থেকে কল এসেছিলাম আমি তেমন পাত্তা দিয়েছিলাম না।যার প্রয়োজন সে ঠিকই আবার কল দিবে এইবার হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসেছিলাম।ফোন টেবিলেই ছিল আবার আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। আম্মু রান্না ঘরে ছিল।আমি কল ধরে সালাম দিলাম অপর পাশ থেকে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ ভেসে আসলো।আমি এই নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে বুঝতে পেরেছিলাম এইটা সানিউল ভাইয়ার। কিন্তু আমি স্বাভাবিক ছিলাম। নিজের অনুভূতি, দূর্বলতা প্রকাশ করিনি।সে সালামের জবাব দিয়ে হ্যালো বলল। আমি জিজ্ঞেস করলাম__
হ্যালো কে?
সে জোরে জোরে বলে __
হলো আমি সানি, সানিউল।
দুইতিন বার বলেছিল এইভাবে। তারপর বলল___
এই নাম্বার থেকে কল এসেছিল।
আমি অবাক তারপর বললাম___
আমার ফোনে আমি কখনো টাকা ভরি না।তো কল যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আর ফোন গেলে হয়তো ভুলে গিয়েছি তার জন্য দুঃখিত।
সে ছোট করে শুধু ওহ বলল।
কিন্তু ফোন কাটলো না। ভেবেছিল হয়তো তার নাম শুনে আমি তাকে নিজ থেকে পরিচয় দিব। কিন্তু আমি আর কোন কথা না বলে ফোন কেটে দিলাম। কিন্তু মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আম্মু কে সব বললাম আম্মু খুশি হয়ে বলল___
হয়তো তোর পরীক্ষার রুটিন পাবলিস্ট হয়েছে তাই কল দিয়ে আস্বস্ত করল।তাই মনোযোগ দিয়ে পড়।
আমিও আরো মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। ডিসেম্বর মাস খুব ভালোই পড়েছিলাম। দিন রাত এক করে পড়াশোনা করেছি। শীতের রাতে উঠে কাঁপতে কাঁপতে শেষ হয়ে গেলেও তাহাজ্জুদ নামাজ বাদ দেই নি। কারণ দোয়াই ছিল এক মাত্র উপায় তাকে পাওয়ার জন্য। ডিসেম্বর মাস শেষে শুরু হলো জানুয়ারি মাস এক মাস পড়েই ছিল পরীক্ষা। অনেক মোটিভেশনাল ভিডিওতে দেখেছিলাম তিন মাস ভালো করে পড়েও নাকি অনেকে ভালো রেজাল্ট করে।আমি দুই মাসের মত পড়েছিলাম জানুয়ারি মাসটা খুব ভালো করে পড়লে হয়তো একটা ভালো রেজাল্ট আসবে। এই আশা নিয়ে আরো ভালো করে পড়া শুরু করি। কিন্তু ভাগ্য হয়তো আমার সাথে ছলনা করার পণ নিয়ে রেখেছিল। আমার নিজেরই এক ফেক আইডি ছিল যেটা ছেলের নামে সেইটা দিয়ে তাকে মেসেজ দিয়েছিলাম জানুয়ারি মাসের ৮ তারিখে। সে রিপ্লাইও দিয়েছিল। ওই যে তার ইনস্টাগ্রামে একটি মাত্র মেয়েকে ফলো দিয়ে রেখেছিল সেটা আমাকে খুব ভাবতো এই বিষয়ে ক্লিয়ার হওয়ার জন্য মেসেজ দিয়েছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম__
আপনি নিপা কে চেনেন?
সে জিজ্ঞেস করল ___
কোন নিপা?
আমি বললাম ___
সুরাভী সরকার নিপা।
সে উত্তর দিল ___
হ্যাঁ। ওয়ান্স আপন এ টাইম আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল।
আমার ভাঙা হৃদয় যা অনেক কষ্টের জোড়া লাগিয়ে রেখেছিলাম তার আবার ভেঙে গেল। অবিশ্বাস্য লাগলো তারও নাকি মেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল।
আমি অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে কথাবার্তা এগোতে লাগলাম। বললাম সে আমার ভাইয়ের ফ্রেন্ড ছোটবেলা তারা একসাথে পড়তো। তারপর সে আবার বলল তার জানামতে নিপার কোন ছেলে ফ্রেন্ড নেই শুধু মাত্র সে ছাড়া।
কষ্ট পেলাম এইটা দেখে যে সে ভালোই জানে।
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে জিজ্ঞেস করলাম__
খুব ভালো করেই চেনেন দেখছি অনেক ভালো ফ্রেন্ড আপনারা?
সে জবাব দিল__
One of the best! Friend o.
Only one of mine.
ইশ্ কথাগুলো তীরের মতো এলো আমার উপর।
মেয়েটি হিন্দু ছিল।তার জীবনে উন্নতিতে মেয়েটির নাকি অনেক সাপোর্ট ছিল। অথচ সেই মেয়েটিকে চিনেছে দুই বছর ধরে। আর এই দিকে আমি ১০ বছর যাবৎ ভালোবেসেছিলাম আমার কোনো মূল্যেই ছিল না।
আমিও জিজ্ঞেস করলাম__
যদি আপনারা একই ধর্মে থাকতেন তাহলে হয়তো অনেক ভালো হতো।
সে উত্তরে বলল__
হ্যাঁ I loved her! And Marry her.
Anyhow!
লাইনটি পড়লাম আর চোখ থেকে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১২:৫০ বাজছিল।চোখ থেকে পানি পড়ে ফোনের স্ক্রিন ভিজে গিয়েছিল।পিছন থেকে আম্মু বলল___
যা খেয়ে নে। খেয়ে নামাজ পড়ে তারপর আবার পড়তে বসিস।
পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের পানি মুছে ফোন হাত থেকে রেখে খেতে বসেছিলাম। আম্মু ভাগ্য বশত ছিলোনা ঘরে। খাবারের লোকমা মুখে দিয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। কান্না করতে করতে ৪ লোকমা অনেক কষ্টে খেয়েছিলাম আর সম্ভব ছিল না খাওয়া তাই উঠে পড়লাম। খেতে বসে কখনো কাঁদি নি এই প্রথম ছিল।আমি সবসময় যত টেনশনেই থাকি না কেন খাওয়া বাদ যেত না বরং বেড়ে যেতে অথচ সে সময় খেতে বসেও কাঁদতে হচ্ছিলো। আমার আবার পরিবর্তন হতে শুরু করে। আবার চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। সত্যিকার অর্থে একের পর এক ধাক্কা সামলাতে পারলেও এইটা ঠিক সামলিয়ে উঠতে পারিনি তখন। বাড়ির মানুষ অর্থাৎ রুবিনা আপু,রূকসানা আপু, আম্মু সানিউল ভাইয়ার ব্যপারে এইটা সেইটা বলতো। রুখসানা আপু বলেছিল যদি সানিউল একজন ভালো ছেলে হয়ে থাকতো তাহলে যখন তুমি থাকে নিজের মনের কথা বলেছিলে তখনই সে নয় হ্যাঁ বলতো অথবা নয় না বলতো কিন্তু সে তোমাকে কিছুই বলেনি বরং তোমাকে অপশনাল হিসেবে রেখে দিয়েছে। তারমানে সে কোন ভাল ছেলের কাতারে পড়ে না।
তখন যে যতই বোঝাতো তার বোঝানো আমার কাছে ততই বিষাক্ত লাগতো। এইসব বোঝানো আমাকে তখন উচিত ছিল যখন আমি ছোট ছিলাম। তার ব্যাপারে এখন খারাপ না বলেই বরং যখন ছোটবেলা তার ব্যাপারে ভালো কথা আমার সামনে বলা হত তার সাথে বিয়ের কথা আমাকে শোনানো হতো তখন তাদের সে সব কথা শোনানো উচিত ছিল না। ভালোবেসেছি আমি, কষ্ট পাচ্ছি আমি,নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছি আমি, কিন্তু কথা শুনতে হচ্ছে মানুষের। আমাকে অনেকে অনেক কথাই বলেছিল মুখ বুঝে সহ্য করে নিয়েছিলাম কিন্তু তার ব্যাপারে কোন বাজে কথা সহ্য হতো না।তাই তখন হাত কাটতাম। হাত কবে কেটে ছিলাম সেই তারিখ মনে নেই। হাতে তার নাম লেখার চেষ্টা করছিলাম যেদিন জানতে পেরেছিলাম সে অন্য কাউকে ভালবেসেছে। তার নামের প্রথম অক্ষরটি শুধুমাত্র লিখেছিলেন তারপর মনে পড়ল এসব শুধু মাত্র পাগলামি। আর সে তো বলেছে সে ভালোবাসতো মেয়েটি তো অন্য ধর্মের তার মানে তাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই তাহলে অবশ্যই আমার সুযোগ আছে এখনো। এই আশা নিয়ে নিজেকে শান্তনা দিতে লাগলাম। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল তখন একমাস পর ছিল এসএসসি পরীক্ষা। এই ঘটনার পর আর আমার দ্বারা পড়াশোনা হয়নি। এই আগে যে এক দুই মাস পরেছিলাম সেই পরীক্ষার উপর কোনরকম এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। এসএসসি পরীক্ষা দেবার আগেই আমার সামনে এসেছিল পীরে কামিলে একটি ভিডিও। মূলত আমি পীরে কামিল উপন্যাসটি পড়ার নিয়ত করেছিলাম এটা দেখে যে সালার সিকান্দার নয় বছর অপেক্ষা করে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পায়। আমি ভেবেছিলাম আমি তো নয় বছর যাবত অপেক্ষা করে দশ বছরে পা দিলাম প্রয়োজন হলে না হয় আরো ৯-১০ বছর অপেক্ষা করবো। পরীক্ষার পর শুরু করলাম এই উপন্যাস পড়া। এসএসসি পরীক্ষার পর তিন মাসের মতন বন্ধ ছিল তখনকার দিনগুলো আমার ঘরে একা একা কাটছিল। বাহিরে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তাকে ভুলে যাব কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়নি তাই তাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টাই ভুলে গিয়েছিলাম।
সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ থেকে তাকে অনবরত স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। কি স্বপ্ন দেখতাম এটা মনে থাকতো না কিন্তু তাকে যে স্বপ্ন দেখতাম এটা মাথায় ছিল। রুবিনা আপু এসেছিল আমাদের বাসায় তারপর বলল তাদের বাসায় যেতে।আমি প্রথম যেতে চাইনি কারণ এসএসসি পরীক্ষার শেষে আমি আম্মুকে বলেছিলাম আপুর বাড়ি যাব। আম্মু চাইলেই ভালো ভাবে না করে দিত। কিন্তু আম্মু খোঁটা দিয়ে বলেছিল_____
কেন আবার কি সানিউল কে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে? মন মিটেনি এত অপমানিত হয়ে? নিজের নাহয় লজ্জায় সরম নেই আমাদের আছে।তাই আর আর ছোট করিস না।
এরপর থেকে আর কোথাও যাওয়ার নাম নেই নি আমি।
অথচ এইবার আম্মু বলল ঘুরে আসতে। তাই আমিও আর না করলাম না ভাবলাম চলে যাই।
আপুদের বাড়ি গিয়েছিলাম ২৩ এপ্রিল। থাকলাম একদিন। মূলত সপ্তাহ খানেকের জন্য গিয়েছিলাম।আপুর ফোনের ফেসবুক দিয়ে সানিউল ভাইয়ার আইডি ঘুরলাম। ভুলবশত ফেসবুকে না গিয়ে একবার ফেসবুক লাইটে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু কোথায় আছে না জীবনকে ঠিক করার জন্য কিছু কিছু ভুল করা খুবই জরুরী। এবং আমিও তাই করেছিলাম।
ফেসবুক লাইটে গিয়ে দেখলাম সানিউল ভাইয়ার আইডি লগ ইন করা। হয়তো বেড়াতে এসেছিল তখন করেছিল লগ আউট করতে মনে নেই। আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম যে এখন তার আইডি চেক করতে পারবো। আমার জানা মতে তার কোনো রিলেশন থাকার কথা না তখন। কারণ তার ফেসবুক জুড়ে ছিল ইসলামিক পোস্ট। টুপি, পাঞ্জাবি ছাড়া তার ছবি পাওয়া ছিল বিরল। পোস্ট গুলো থাকতো ছেলে মেয়েদের ফ্রি মিক্সিং মেলামেশা নিয়ে।সে এইসব থেকে দূরে থাকে সে আর যাই হোক কোনো হারাম রিলেশনে থাকবে না।
তাই চ্যাট লিস্টে আগে নিপা কে খুঁজলাম। মেসেজ পড়ে দেখলাম অনেক আগের মেসেজ।সেই কথা বন্ধ করে দিয়েছিলেন কারণ ছেলে মেয়ে বন্ধুত্ব ভালো না।আরো খুশি হয়েছিলাম। ওইটা তার অতীত ছিল যা নিয়ে আমি মাথা ঘামায় না। আমার কাছে তাকে পাওয়াই ছিল বড় জয়। কিন্তু যত চ্যাট দেখতে লাগলাম তত যেন অবাক হলাম। অনেক মেয়ে ছিল।এক মেয়ে মেসেজ করে জিজ্ঞেস করেছিল সে কি এখনো তাকে বিয়ে করতে চায় আগে যেমন তাকে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল।
আমি অবাক হয়েছিলাম। আমার জানামতে সে নিপা কে ভালোবাসতো।এক মানুষ এক মন দিয়ে এক সাথে কতজন কে ভালোবেসে?
সে আবার উত্তরে বলেছিল__
তখন মাথায় ভুত চেপেছিল কিন্তু তুমি পাত্তা দেও নি তাই বাদ।
আমি যেন অবাক।যে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল সে পাত্তা না পেয়েই ওখান থেকে সরে গেল। ভালোবাসা কি এতটাই স্বস্তা।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল ___
এমন আর কত জনের জন্য করেছো
সে নির্বিঘ্ন ভঙ্গিতে জবাব দিয়েছিল__
স্কুলে উঠার পর থেকে হিসাব করলে মোটামুটি আছে অনেকই।
আমি হতভম্ব কিন্তু অবাক করা বিষয় চোখ থেকে পানি পড়ল না বরং নিজের উপর হাসি আসছিল।
তারপর ভুলবশত তার Archive লিস্টে চলে গিয়েছিলাম এবং এই ভুল করার কারণে পেয়ে গিয়েছিলাম লটারি।
মানে এক মেয়ের সাথে চেট যার নিক নেইম ছিল Coronary Artery (করোনারি আর্টারি হলো হৃৎপিণ্ডের পেশীগুলিতে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী)
আর এই আপু ছিল তার গার্লফ্রেন্ড।এই মেয়ের সাথে তার মেডিকেলে ভর্তি হবার পর থেকে রিলেশন অর্থাৎ ২০২৩ সাল থেকে। অথচ ২৪ সালের জানুয়ারি মাসের সেৎবলেছিল সে নিপা কে ভালোবাসে।অথচ ফেসবুক ভরা হাদিস। তাদের চেট ছিল খুব বাজে যা পড়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ।
যেমন সে বলেছিল___
বিয়ের পর আমাদের এসি লাগবে কারণ আমরা দুজনের হ*ট।
এমনকি সে তাকে ছুঁয়েছে এবং সেটির প্রসংসা ভয়েসে বলেছে।এত বিশ্রী ভয়েস বা শব্দ আমি শুনিনি কখনো।মূল কথাই তাদের চেট ছিল একদম Sex*ting। ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও পাইনি আমি। বিশ্রী মেসেজ। অবশ্য আমি অনেকগুলো মেসেজের স্ক্রিনশট এবং ভয়েজের স্ক্রিন রেকর্ড করে রেখেছিলাম।
খুব হাসি পেয়েছিল আমার তখন। এমন মানুষকে কিনা ভালোবেসে নিজের জীবন নষ্ট করছিলাম আমি। তাকে খারাপ বলে নিজের ভালোবাসা ছোট করব না। কিন্তু এইসব দেখার পর জানি না কেন বিন্দুমাত্রও কষ্ট পাইনি আমি।২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল ৪:৪৫ বিকেলে আমার ভালোবাসা সমাপ্তি ঘটে। তাকে ভুলতে আমার যেন এক সেকেন্ডও লাগেনি। একটা মানুষকে ঘৃণা করার জন্য হলেও তার জায়গাটা মনে থাকা প্রয়োজন কিন্তু সানিউল ভাইয়াকে আমার ঘৃণা পর্যন্ত করতে ইচ্ছে করে না।কিন্তু আফসোস হলো যে একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসে এত অপমানিত হলাম। নিজের সুন্দর জীবন নষ্ট করছিলাম। নিজের এত বড় অতীত বানিয়ে ফেললাম।
এইসব বলে ইনায়া আরিশের বুকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।আরিশ এখনো চুপ।তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এই হাসি খুশি মেয়েটা এত কষ্ট একা একাই সামলিয়েছে।আরিশের যেন ইনায়ার কান্না আর সহ্য হলো না।ইনায়া মাথা বুক থেকে সরাতে চাইলে যখন দেখলো ইনায়া এখনো কাঁদছে, তখন ইনায়ার মাথা নিজের দুহাত দিয়ে একটু শক্ত করে ধরে উপরে উঠালো। দুজনের চোখাচোখি হলো। ইনায়ার ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পরছে।আরিশ সবসময়ের মতোন ঠোঁট দিয়ে ইনায়ার চোখের পানি শুষে নিল। তারপর ইনায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ডিপ ভয়েসে বলল___
তুমি কান্না থামাবে নাকি আমি নিজ থেকে তোমায় চুপ করাবো?
ইনায়া যখন কান্না থামালো না আরিশ বিনা দ্বিধায় তার ওষ্ঠ দ্বয়ের সাথে ইনায়ার ওষ্ঠ দ্বয়ের মিলন ঘটিয়ে ফেলল। তার স্পর্শ ছিল যত্ন এবং ভালোবাসা।