সময় কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। নিজের মতোন চলতে থাকে।ইরিন আর সাদমান কিছু দিন হলো লন্ডনে এসেছে।এই কিছু দিনে এমন কোনো সময় নেই যে সাদমান ইরিনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি। কিন্তু বরাবরের মতোই ইরিন তাকে এড়িয়ে গেছে। সাদমান আপাতত আরিশ দের বাড়িতেই আছে। অবশ্য এখানে তার জন আলাদা রুম আগে থেকেই ছিল।সে তো আর নতুন থাকছে না এই বাড়িতে। বলতে গেলে আরিশের পরিবারই তার পরিবার।ছোট থেকেই মা বাবার ভালোবাসা পায়নি সে তাই আরিশের পরিবারের সাথে তার এত অ্যাটাচম্যান্ট। আরিশ এবং তার পরিবারও তাকে খুব ভালোভাবে ট্রিট করেছে। এবং এই পরিবারকে যাতে হারাতে না হয় সেই কারণেই সাদমান সবসময় ইরিন কে উপেক্ষা করে চলতো। কিন্তু এখন যেন ইরিনের উপেক্ষা তার সহ্য হচ্ছে না।যেন মনে হচ্ছে খুব কাছের কিছু হারিয়ে ফেলতে চলেছে সে। অবশ্য সাদমানের কাছের কেউ কখনোই ছিল না।আরিশের পরিবার থেকে যা ভালোবাসা পেয়েছে তাকে সে নিজের সৌভাগ্য মনে করে এসেছে।আর ইরিনের ভালোবাসাকে পাগলামি এবং বাচ্চামি মনে করে এসেছে। কিন্তু এখন সে হারে হারে টের পাচ্ছে সে কি এতদিন উপেক্ষা করেছে।যেই মেয়েটি এক সময় তার দিকে ডেবডেব করে তাকিয়ে থাকতো আজ সেই মেয়েটি তাকে দেখেও না দেখার ভান করছে। সাদমান যেন আর এই সব সহ্য করতে পারছে না।সে নিজে নিজে বলল____
--"বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার বধিব পরান।"পরীক্ষাটা শেষ হোক আগে তোমার তারপর বোঝাচ্ছি মজা। আমিও নিজের জিনিস কে নিজের করে রাখতে জানি মাই ডিয়ার সুগারপ্লাম। অনেক ছাড় দিয়েছি। অনেক দেখিয়েছি আমার ভালো এবং লজ্জাময় রূপ। এখন তুমি আমার নির্লজ্জ রূপ দেখার জন্য প্রস্তুতি নাও।যা তুমি নিজে আমাকে দেখাতে বাধ্য করেছ। তোমাকে কি করে নিজের করতে হয় তা আমার খুব ভালো করে জানা আছে।"
এইসব বলে সাদমান বাঁকা হাসলো।
__________________
ইনায়ার সময় এবং পরিস্থিতি দুটোর সাথেই খুব সহজে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। অবশ্য আরিশ তার পাশে আছে বলেই তার দ্বারা এইসব সম্ভব হয়েছে।কোনো রকমের ঝড় যে আসে নি বিষয়টি মোটেও এমন না। এইতো গতকাল তাকে তার চাচাতো বোন রূকসানা কল দিয়ে কত কিছু বোঝাল। তাকে বলল এখনই আরিশ কে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে,আরিশ যেন তার কথায় উঠে আর বসে।ইনায়া যেন তার শশুর শাশুড়ি কাছ থেকে প্রথম থেকেই দূরত্ব বজায় রাখে। লন্ডনে যাতে ভবিষ্যতে না যায়।ইনায়ার ভীষণ হাসি পেয়েছিল কথা গুলো শুনে।সেও কম যায় না সেও সব কথা আরিশ কে বলেছিল। বিয়ের পর তো মেয়েদের সব থেকে কাছের মানুষ হয় স্বামী।যেই মেয়ে বিয়ের পর নিজের মনের কথা বা সমস্যার কথা নিজের স্বামী কে না বলে বাপের বাড়ির কাউকে বলে সেই মেয়ের সংসারে সব সময় ঝামেলা লেগে থাকে।আরিশ অবশ্য রূকসানার কথা শুনে খুব রেগে গিয়েছিল।সে এই মেয়েকে সেই দিন থেকে সহ্য করতে পারে না যেইদিন সে ইনায়া অতীতের কথা সবার সামনে তুলে ধরছিল। একটি মেয়ে হয়ে কি করে পারলো এমন করতে তা আরিশের বোধগম্য হয় নি।
___________________
দিনের পর দিন পার হচ্ছিল আর ইনায়ার প্রতি যেন আরিশের ভালোবাসা বেড়ে যাচ্ছিল।ইনায়া তো ভয় পেয়েছিল। ভেবেছিল যত দিন যাবে তত হয়তো আরিশ তার প্রতি বিরক্ত হবে।অথচ বিরক্ত হবার বদলে আরিশ তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছিল। এইতো গতকালের ঘটনা____৳
ইনায়া পড়া শেষ করে উঠে যেই না ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাবে উমনি দেখলো আরিশ বিছানার বসে কি যেন ভাবছে।ইনায়া নিঃশব্দে আরিশের পাশে বসল।ইনায়া বসতেই আরিশ ইনায়ার দিকে অনুশোচন দৃষ্টিতে তাকালো।আরিশের এমন দৃষ্টি দেখে ইনায়া ভয় পেয়ে গিয়েছিল।সে হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল___
কি হয়েছে আপনাকে এমন লাগছে কেন?আমায় বলুন।শরীর খারাপ লাগছে কি?
আরিশে আগের মতন করেই ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে নরম কন্ঠে বলল___
তোমার জন্মদিন চলে গেল অথচ আমি কিছুই করতে পারিনি। খুব অনুশোচনা হচ্ছে ইনু।
ইনায়া আরিশের কথা শুনে যেমন চিন্তা মুক্ত হলো ঠিক তেমনি খুশিও হলো।যাক কেউ তো আছে যে তার জন্মদিন নিয়ে ভাবে। অতীতের কারণে তো ইনায়া নিজের জন্মদিন কেউ ঘৃণা করত। জন্মদিনের দিন মনমরা হয়ে থাকতো। কখনো নিজের জন্মদিন কে স্পেশাল মনে করতো না আর না নিজেকে স্পেশাল মনে করতো। অথচ আরিশ তার জীবনে এসে যেন সব কিছু রঙ্গিন করে দিয়েছে।যেন তার আর কোনো কষ্ট নেই, কোনো আক্ষেপ নেই।আর হ্যাঁ ইনায়া জন্মদিন চলে গিয়েছিল যখন আরিশ তার লন্ডনের মিশনে ছিল।আর দেশে এসেই তো তাদের বিয়ে হলো। তারপর নতুন জীবন এবং ইনায়ার অতীত সব মিলিয়ে আরিশ কিছুই করেনি ইনায়ার জন্মদিনের জন্য। কিন্তু আদৌও কি আরিশ ইনায়ার জন্যে কিছুই করেনি? ইনায়ার তো তা মনে হয় না। বরং ইনায়ার মতে আরিশ তার জন্য যা করেছে তা কখনোই কেউ তার জন্য করেনি আর না করতে পারবে। মানুষ তো যতটা করে তার থেকে বেশি বলে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু আরিশ নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসেও তা মুখে বলে বলে না ঘুরে কাজে প্রকাশ করে।ইনায়ার তো মাঝে মাঝে নিজের ভাগ্যের উপর বিশ্বাস হয়না। অনেক কিছু সহ্য করেছিল সে তার অতীতে। অল্প বয়সেই অনেক ঝড় তার উপর দিয়ে গিয়েছিল। সামলানোর জন্য কেউই ছিল না। কিন্তু এইটা কখনো কল্পনাই করেনি সে যে ঝড়ের পর এত সুন্দর রংধনু আসবে তার জীবনে। অতীতের কালো মেঘ কেটে গিয়ে সুন্দর রৌদ্রজ্জ্বল সকাল আসবে। আসলে আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনা কারী।
ইনায়া এতটাই বিভোর ছিল তার ভাবনায় যে আরিশ এতক্ষণ যাবত তাকে ডেকে যাচ্ছে তা যেন তার শ্রবণে পৌঁছায়নি। হঠাৎ হোশ ফিরতেই আরিশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল সেই আক্ষেপ করা চেহারা যা দেখে ইনায়া হেসে উঠলো।আরিশ বুঝতে পারলো না কি হয়েছে।সে জিজ্ঞাসা সলুভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে।ইনায়া যেন এইবার শব্দ করে হেসে উঠলো। তারপর বলল__৳
আমার কাছে আপনি আমার সব থেকে বড় উপহার। জন্মদিনের জন্য যে কিছু লাগবে এমন কোনো আইন নেই বুঝলেন?
আরিশ মুচকি হাসলো ইনায়ার কথায়। তারপর ইনায়াকে এক টানে নিজের বুকের উপর ফেলে দিল। ইনায়াও আরিশের বুকে ঘাপটি মেরে মাথা রেখে বসে রইল।আরিশ ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল___
--"আমি জানি ইনু তোমার কেন নিজের জন্মদিন নিয়ে কোনো ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা নেই। কিন্তু বিশ্বাস করো তোমার না থাকলেও আমার আছে। আমি তোমার জীবনের প্রত্যেকটি দিন কোনো না কোনোভাবে স্পেশাল করে তুলতে চাই। যাতে কখোনো তোমার আমকে গ্ৰহণ করার জন্য আফসোস না হয়। কখনো এমন কোনো চিন্তা মাথায় আনবে না যে তুমি স্পেশাল কেউ না।আর ভুলেও ভাবে না যে তোমার প্রতি আমার এই ভালোবাসা ক্ষণিকের জন্য। বিশ্বাস করো জান তুমি ব্যতীত আমার জীবনে দ্বিতীয় কোনো নারীর কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ আসা নারী একমাত্র তুমিই।"
এই কথাগুলো যেন ইনায়ার মন ছুঁয়ে গিয়েছিল।
ইনায়া গতকালের ভাবনা থেকে বের হয়ে এলো উমনি আরিশ রুমে প্রবেশ করলো।আজ কাল সে খুব ব্যস্ত।তার ঢাকায় জার্নি করে যেতে হচ্ছে আবার চলে আসতে হচ্ছে। তাদের নতুন ব্যান্ড মূলত ঢাকায় খোলা হবে। রুমে এসেই ইনায়া দিকে এক মিষ্টি হাসি নিক্ষেপ করল।ইনায়াও আরিশের হাসির বদলে এক মিষ্টি হাসি উপহার দিলো।যা দেখে আরিশের সকল ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেল। দরজা ঠেলে পুরোপুরি রুমে প্রবেশ করলো।ইনায়াও আরিশের কাছে গিয়ে পা জোড়া কিছুটা উঁচু করে নিজের পরনের ওড়না দিয়ে আরিশের কপালের, মুখের, গলার ঘাম মুছে দিল।আরিশ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার ঘোমটা ওয়ালির দিকে।ইনায়া যতই মুখে স্বীকার করুক না কেন সেও যে আরিশ কে ভালোবেসে ফেলেছে তা আরিশ খুব ভালো করেই বুঝতে এবং দেখতে পাচ্ছে।আরিশ ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে চলে গেল ওয়াশ রুমে শাওয়ার নেওয়ার জন্য।ইনায়া ওয়ার্ড ড্রপ থেকে আরিশে পরার জন্য কাপড় বের করে বিছানার উপর রেখে দিয়ে চলে গেল আরিশে জন্য কফি আনতে। এইটা যেন আরিশের নিত্যদিনের স্বভাব। এবং ইনায়াও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আরিশ ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে বিছানার উপর নিজের পরার জন্য ইনায়া বের করে রাখা কাপড় দেখে মুচকি হাসলো। তার মনে হচ্ছে এখন যে তার একাকীত্ব দূরে চলে গেছে। রাতটা তাদের প্রতিদিনের মতোনই কেটে গেল। দুজন মিলে একসাথে খেয়ে উঠলো। রান্না ইনায়া ভালোই পারে কিন্তু অনেক সময় আরিশ নিজেই করে আবার অনেক সময় আরিশের মা করে ইনায়া কে করতে দেওয়া হয়না। খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুজন মিলে চলে এলো রুমে।ইনায়া বিছানা গোছাতে শুরু করল ঘুমানোর জন্য। এমনিতেই তার আবার তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস। বিয়ের পরেও এই অভ্যাস আরিশ পরিবর্তন করাই নি। বরং সে নিজকে ইনায়ার অভ্যাস অভ্যস্ত করতে শুরু করেছে।আরিশ আসার আগেই ইনায়া নামাজ আদায় করে ফেলেছিল।আর আরিশ মসজিদ থেকে নামাজ পড়েই বাড়ি ফিরছে।ইনায়া বিছানা গুছিয়ে শুয়ে পড়ল।আরিশ লাইট অফ করে চলে এলো বিছানায়।তার ইনু আবার বিন্দুমাত্র আলোতে ঘুমাতে পারে না।দু জন ফ্যানের বরাবর মুখ করে শুয়ে আছে।
ইনায়া মনে মনে ভাবছে___
আরিশ আর তার মাঝে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক থাকলেও তা এখনো পরিপূর্ণ লাভ পায়নি। বিয়ের তো প্রায় সপ্তাহখানেক হয়ে গেল অথচ আরিশ তার অধিকার চাইনি।আর না তাকে জোর করে ছুঁয়েছে। যতটুকুই তাদের মাঝে হয়েছে সকল কিছু তার সম্মতিতে হয়েছে। কিন্তু আরিশ তার অনুমতি ব্যতীত এক জায়গায় খুব গভীরে ভাবে ছুঁয়েছে। স্পর্শটা এতটাই গাঢ় ছিল যে ইনায়ার সকল ক্ষত মুছে গেছে। হ্যাঁ আরিশ ইনায়ার মন ছুঁয়ে দিয়েছে যা কেবল সবাই ভেঙ্গে এসেছে।
নিরবতা ভেঙ্গে হঠাৎ আরিশ বলে উঠলো ___
--"ইনু একটু বুকে আসো।"
ইনায়াও বিন্দুমাত্র সময় অপচয় না করে এসো পরল আরিশের বুকে।আরিশও খুব যত্ন সহকারে নিজের ইনু কে জড়িয়ে ধরলো।এখন মনে হচ্ছে তার বুক শান্তি পেয়েছে।