দেখতে দেখতে ইরিনের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। পরীক্ষা চলাকালীন সাদমান তার অনেক খেয়াল রেখেছিল। যেমন তাকে কলেজে দিয়ে আসা আবার নিয়ে আসা। অফিসের কাজের ব্যস্ততার মাঝেও তার খোঁজ নেওয়া, তার কাছে প্রতিদিন ক্ষমা চাওয়া। এই সব যে ইরিন কে প্রতিনিয়ত সাদমানের প্রতি দূর্বল করে তুলছে।সে চাইতেও কঠোর হতে পারছে না। ইরিন ইনায়া কে কল দিয়ে সমস্ত কথা খুলে বলল।ইনায়া তো হেসে কাত।
তারপর ইরিন কে বলল____
"নারীরা তো এমনিতেই হয় নরম মনের।
কিন্তু যখন আঘাত পায়,
তখন বরফের মতোন শক্ত হয়ে যায়।
আবার যখন ভালোবাসা এবং যত্ন পায়,
সেই বরফ গলে পানি হয়ে যায়।"
ইরিন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর দুজন মিলে এটা সেটা নিয়ে কথা বলে ফোন রেখে দিল। এদিকে ইনায়াও নিজের বিবাহিত জীবন নিয়ে খুব ব্যস্ত। তার উপর আবার মাস খানেক পর তার প্রি টেস্ট পরীক্ষা। ইন্টার লাইফ টাই এমন।কখন যে নাকের ডগা দিয়ে সময় চলে যায় তা চোখেই পড়ে না।আরিশ তো প্রতিদিনই ঢাকা যাতায়াত করছে। অবশ্য করতে না চাইলেও তাকে করতে হচ্ছে।বাবা কে এত কাজের চাপ দিতে চায় না সে। লন্ডনের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা এক বিষয় আর বাংলাদেশের আরেক বিষয়। এখানে তো এক ঘন্টার রাস্তা ২ ঘন্টা লাগে কেবল ট্রাফিক জ্যামের জন্য।নতুন ব্যান্ড খুলেছে ঢাকা। নতুন কম্পানি। একদম বিদেশের অফিসের মতন উন্নত ব্যবস্থা।ইনায়া যতবার আরিশের কাছে নতুন কম্পানির নাম জিজ্ঞেস করেছে ততবার আরিশ বলেছে এইটা নাকি সারপ্রাইজ।তাই ইনায়াও ধৈর্য ধরে আছে। অবশ্য মেয়েটা ধৈর্য্য ভালোই ধরতে পারে।এই কম্পানির উদ্বোধনের পর আরিশের বাবা মা লন্ডন বেক করবে। ইমরান খান লন্ডনের দিকটা দেখবেন এবং আরিশ বাংলাদেশের কম্পানি। তারপর ইনায়ার পরীক্ষা শেষে তারা ফিরে যাবে লন্ডন।আরিশ তো ইনায়ার জন্য পার্স পোর্টের আবেদন করে ফেলেছে। কারণ ইনায়া কে নিয়ে তো হানিমুনে যাওয়াও এখনো বাকি আছে।
_________________
ইনায়া রাতের খাবার রান্না করছিল।সে সব কিছু রান্না করতে না পারলেও স্বাভাবিক রান্না যা প্রতিদিনের খাবার সেগুলো পারে।আর বাড়তি কিছু পারে বলতে যেসব ফোনে দেখে সেইসব আরকি। শুধুমাত্র গরুর মাংস, পোলাও, বিরিয়ানি এগুলো পারে না। একবার তার মা শুধু তাকে বলেছিল গরুর মাংস টা একটু নাড়া দিতে।সেও ভদ্র মেয়ের মতোন নাড়া দিচ্ছিল। কিন্তু তরকারি মাটির চুলায় বসিয়ে ছিল। এবং আসে পাশে আরো মাটির চুলা ছিল যেখানে তার চাচিরা রান্না করছিল সেখানে থেকে আগুনের তাপ আবার সে যেই চুলায় রান্না করছিল সেখান থেকে আগুনের তাপ আসছিল। ফলস্বরূপ সে ভালোভাবে তারকারি নাড়া দিতে পারেনি এবং নিচ থেকে তারকারি পুড়ে গিয়ে লেগে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্রী গন্ধ টাই না ছিল।গুনে গুনে তিন কেজি গরুর মাংস সে পুড়িয়ে ফেলেছিল তাও দুপুরের খাওয়ার জন্য ছিল। অবশ্য তার মা তাকে বকেনি। কিন্তু বাড়ির সবাই অনেক মজা নিয়েছিল। অবশ্য ইনায়া নিজেও এই বিষয় নিয়ে খুব লজ্জিত।
ইনায়ার রান্না করতে করতে এইসব ভাবছিল ঠিক তখনই এক বলিষ্ঠ হাত তার কোমর স্পর্শ করল।ইনায়া এমন আকস্মিক ঘটনায় কেঁপে উঠলেও তার চিনতে অসুবিধা হলো না যে এইটা আরিশের হাত।তার ঠোঁট স্মিত হাসি ফুটে উঠল।আরিশ আস্তে আস্তে ইনায়ার কোমরে নিজের দুহাত রাখল। তারপর নিজের থুতনি রাখল ইনায়ার কাঁধে। নিজের দু হাত দিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল ইনায়া কে। ডুবিয়ে দিল মুখ ইনায়ার চুলে।ইনায়া কেঁপে উঠল। হাতে থাকা চামচ কড়াইয়ের উপর পরে গেল।সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধাল__
"উমহ করছেন টা কি আপনি?দেখছেন না রান্না করছি?ছাড়ুন তো।"
কথাটি অবশ্য সে মিছে রাগ দেখিয়ে বলল।আরিশের ঠোঁট হাসি ফুটে উঠল।
সে ইনায়া ঘাড়ে চুমু খেয়ে ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল____
"ধরতেই তো পারলাম না আজ পর্যন্ত মন মতন আর এখনি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছো? ছাড়ার জন্য তো আমি ধরিনি তোমাকে ইনু। একবার যেহেতু নিজ থেকে আমার কাছে ধরা দিয়েছ তখন আমি মরে গেলেও তোমাকে নিস্তার দিব না বেবি গার্ল। ছায়ার মতন তোমার পাশে থাকব।এক অচেনা ছায়া যে অন্ধকারেও চলে যাবে না বরং পাশে থাকবে।"
কথাগুলো ইনায়ার ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। তার তো মনে হয় সে সুখের স্বর্গে ভাসছে।এত সুখ কি তার সইবে?আর আরিশ যে কথায় কথায় মরার কথা বলে সে কি জানে না এতে তার ইনুর উপর দিয়ে কি যায়?ইনু কি সহ্য করতে পারবে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়ে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা? হ্যাঁ ইনায়া আরিশ কে ভালোবেসে ফেলেছে। খুব গভীরে ভাবে ভালবাসে ফেলেছে।আর ভালো না বাসবার তো কোনো কারণই নেই।আরিশের মতোন মানুষ কে কি ভালো না বেসে পারা যায়? উহু মোটেও না। কিন্তু ইনায়া নিজের ভালোবাসাটা শুধু মুখ দিয়ে প্রকাশ করতে চায় না।ঔই যে কথায় আছে না___
"চুন খেয়ে গাল পোড়েছে দই দেখলে ভয় করে।"
ইনায়ার দশা হয়েছে এমন।এখন আর নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করার মতন সাহস নেই তার। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেও দূর্বল হয়ে পড়েছে আরিশের প্রতি। ভালোবেসে ফেলেছে তারা উগান্ডা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা চাচাতো ভাই কে।
ইনায়া নিজের চিন্তায় এতটাই মশগুল ছিল যে তরকারি পুড়ে যাচ্ছিল সেই দিকে তার কোন হেলদোল নেই। ভাগ্যিস আরিশ ছিল।সে তাড়াতাড়ি করে তরকারি নাড়া দিয়ে চুলা নিভিয়ে দিল। তারপর ইনায়া কে নিজের দিকে ফেরালো।ইনায়ার হোশ ফিরল।এখন তারা দুজন দুজনের মুখোমুখি।আরিশ লম্বা তাই সে মাথা নিচু করে আছে তাকিয়ে আছে তার ইনুর দিকে আর ইনায়া খাটো তাই সে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে আছে আরিশের দিকে।ইনায়া আস্তে আস্তে বলল____
"আপনি খুব লম্বা।"
তার কথা আরিশের কর্ণপাত হলো কিনা কে জানে?আরিশ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে।ইনায়া যেন আরিশের এই দৃষ্টি সহ্য করতে পারল না।সে নিজের দৃষ্টি আরিশের থেকে সরিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল____
"স,, স,, সরুন।আ,, আপ,, আপনি আপনার হাত মুখ ধুয়ে আসুন আমি খেতে দিচ্ছি।"
আরিশ কিছু বলল না বরং ইনায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘনঘন নিশ্বাস নিতে লাগল।আরিশের এমন কান্ডে ইনায়া ভরকে গেল।তার পুরো শরীর ভয়ে যেন কম্পন বয়ে গেল।সেও নিজের নয়ন জোড়া বন্ধ করে নিল।এই ভাবেই পার হয়ে গেল কিছুটা সময়। তারপর আরিশ আস্তে আস্তে নিজের চোখ খুলে ইনায়ার মায়াবী মুখশ্রী দেখল।সে ইনায়ার উদ্দেশ্যে নরম কন্ঠে বলল___
"আমি চাই সবসময় তুমি আমার দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে কথা বলা। তোমাকে নিচু করা মানে নিজের ভালোবাসা কে নিচু করা ইনু। এবং হ্যাঁ এই অধম সবসময় নিজের মাথা তোমার জন্য নত করে কথা বলবে কারণ এতে আমার ভালোবাসা উঁচু হবে।"
ইনায়া চোখ বন্ধ করে আরিশের বলা প্রত্যেকটি বাক্য শুনল।চোখ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও অশ্রুতে ভরে উঠলো তার নয়ন।চোখ খুললেই যেন টপটপ করে পানি পড়বে তার চোখ থেকে। ঠোঁট তার কাঁপছে। হয়তো কান্না আটকিয়ে রাখা প্রচেষ্টার ফল।আরিশ বুঝতে পারল তার ইনুর অবস্থা। যতদিন যাবত সে ইনায়া কে চিনে ততদিনে এতটুকু বুঝতে পেরেছে যে তার ইনু খুব বেশি সেনসেটিভ। অল্পতেই কান্না করে ফেলে। খুব বেশি খুশি হলেও আবার খুব বেশি কষ্ট পেলেও কান্না করে। অনেকে অবশ্য সেনসেটিভ মানুষ কে ন্যাকা বলে কিন্তু এরা কেবল কমল হৃদয়ের অধিকারী হয়।আরিশের কাছে তার ইনু কে কখনো ন্যাকা মনে হয়নি। বিশেষ করে যখন থেকে সে ইনায়ার অতীত জেনেছে তারপর থেকে তার চোখে দেখা সবথেকে স্ট্রং ব্যক্তি হলো তার ইনু।যে সেনসেটিভ হওয়া সত্ত্বেও কত কিছু একা একা সামলিয়েছে। আরিশ আর কিছু না ভেবে ইনায়ার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের সাথে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনার কারণে ইনায়ার চোখ আপনা আপনি খুলে গেল।তার হাত পা রিতিমত কাঁপছে।আরিশ চুমু না ভেঙে ইনায়ার কাঁপতে থাকা হাত নিজের হাত দিয়ে ধরে নিজের বুকে রাখলো। এবং নিজের হাত রাখল ইনায়ার কোমরে। কোমর ধরে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।ইনায়া আবেশে আরিশের শার্টের কলার চেপে ধরলো। এভাবেই কিছুক্ষণ সময় পার হয়ে গেল।আরিশ আস্তে আস্তে ছেড়ে দিল ইনায়ার অধর জোড়া।ইনায়া এখনো নিজের চোখ বন্ধ করে রেখেছে যা দেখে আরিশ হেসে ফেলল। মনে মনে বলল__
এখনো মেয়েটি তার সাথে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে নি। কিছু করতে না করতেই লজ্জায় শেষ হয়ে যায়। আদৌও কি সে তার ক্রিকেট এবং ফুটবল টিম গঠন করার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে?
নিজের এমন চিন্তা দেখে আরিশ আবার হেসে উঠলো তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু কন্ঠে বলল___
"ইনু আর লজ্জা পেয় না নয়তো অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে।"
এই বলে আরিশ রান্না ঘর ত্যাগ করল।আরিশ চলে যেতেই ইনায়া আস্তে আস্তে নিজের চোখ খুলল। কিছুক্ষণ আগের কথা ভেবে লজ্জায় লাল নীল বেগুনী হয়ে উঠল। নিজের হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিল।আরিশের সামনে যেতে হবে এই ভেবেই তার শরীর শিউরে উঠছে।
__________
রাতটা তাদের সবসময় মতন গেল না। সবসময় যেমন খাওয়া দাওয়া করে ইনায়া ঘুমিয়ে পড়ে আজ আর তা করল না। সোজা চলে এলো বারান্দায়। আবহাওয়া একদম ঠান্ডা। আকাশে মেঘ করেছে। অবশ্য মাস খানেক পর শীত শুরু হবে। হয়তো এখন কার বৃষ্টিতেই গরমের উষ্ণতা কমে শীতের দিকে অগ্রসর হবে। বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
"তুমি নাকি গান গাইতে পারো?"
হঠাৎ পেছন থেকে আরিশের কন্ঠ ভেসে এলো।ইনায়া অবাক হলো যে আরিশ কি করে জানতে পারল? সে তো কখনো বলেনি।বলার মতোন তো কিছুই না। অবশ্য ইনায়া নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা সকল প্রতিভাই প্রায় ভুলতে বসেছিল। যেমন আগে কত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত এবং সবসময় ফাস্ট হতো।আর নয়তো সেকেন্ড। যেমন চিত্র অঙ্কন, হাতের লেখা, কবিতা আবৃত্তি এবং বিশেষ করে গান।এক কালে তো হারমোনিয়ামও বাজাতে পারতো। অবশ্য সেসব ছোট বেলার কথা।বড় হবার পর অহেতুক জিনিসের জন্য নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করে নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভাতে মরীচিকা ধরিয়ে ফেলেছিল।
"বার বার কোন উগান্ডার ভাবনার হারিয়ে যাও ইনু? "
আরিশ আবার বলে উঠলো।ইনায়ার চিন্তায় ছেদ পড়ল।সে নিজের সামলিয়ে মুচকি হেসে বলল___
"ভাবছিলাম যে আপনি কি করে জানলেন? আমি তো বলিনি আপনাকে। আর সেসব অনেক আগের কথা। এখন আর গানটান গাইনা আমি।"
আরিশ মুচকি হেসে বলল____
" এই সব বললে তো চলবে না ইনু। আমার জন্য হলেও একটা গান গাইতে হবে তোমার।"
এই বলে আরিশ একদম ইনায়ার কাছে এসে দাঁড়াল।তার সুঠাম দেহের সাথে ইনায়ার পিঠ স্পর্শ করছে।ইনায়া বুঝল আরিশ আজ তার কাছ থেকে গান শুনেই ছাড়বে।তাই সে আস্তে আস্তে আরিশের দিকে ফিরল। দুজনের চোখাচোখি হলো।আরিশের চোখ জানান দিচ্ছে যে সে অপেক্ষা করছে।ইনায়া এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে আরিশের চোখ চোখ রেখে গাইতে শুরু করল___
"কপাল গুণে
পেয়েছি তোকে সেই সব দিনে
যখন খালি বৃষ্টি ছাড়া
ছিল না উপায়।
ও... এক সাথে চল
পেরিয়ে যাব জমানো জল
পথের ধারে পা ডুবিয়ে
কোথায় কোথায়।"