অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৫৫

🟢

চারদিক থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।ইনায়া আরিশের বুকে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে।আরিশের পরনের কাপড় খামচে ধরে আছে যেন এইটা তার সবথেকে কমফোর্ট আর নিরপরাধ স্থান।আরিশের চোখে বিন্দু মাত্রও ঘুম নেই। সারাটা রাত এইভাবে আধ শোয়া অবস্থায় ইনায়া কে বুকে নিয়ে শুয়ে ছিল।তার বুকে এক যন্ত্রণা হচ্ছে যা বলে প্রকাশ করার মতন না। নিজের ভালোবাসার মানুষটির মুখে অন্য কাউকে এত গভীর ভাবে ভালবাসার কথা শুনতে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল আরিশের। এখন তো তার নিজেকে ইনায়া যোগ্য মনে হচ্ছে না।যে মেয়ে একজন কে এতটা গভীর ভাবে ভালবাসাতে পারে, এত কিছুর পরেও মুখ বুঝে সহ্য করে নেয় সকল দুঃখ কষ্ট, এমনকি কারোর বিরুদ্ধে কোনো খারাপ কথা পর্যন্ত বলে না তার মন কতটা সরল।ইনায়া কে না দেখলে আরিশ জানতেই পারতো না।আর ইনায়ার অতীত না শুনলে জানতেই পারতো না এভাবেও কাউকে ভালোবাসা যায়। স্বার্থহীন ভাবে।তার থেকে বেশি কষ্ট লাগছে এইটা ভেবে যে তার ইনু এত কষ্ট পেয়েছিল কোনো এক সময়ে।

আরিশ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ইনায়ার ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে দৃষ্টিপাত করলো। কতটা নিষ্পাপ লাগছে মুখখানি। অথচ এই মানুষটি কতটাই না যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। ভালোবাসাই তো চেয়েছিল এইটাতেও তাকে এত অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল। ভালোবাসা তো আর পাপ নেই। এভাবে তার ইনু কে ব্যবহার না করলেও পারতো মানুষ।

আরিশ ইনায়ার মুখে চুমুতে ভরিয়ে দিল‌।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল‌ কিন্তু তা ইনায়ার মুখের উপর পরার আগেই আরিশ তা মুছে ফেলল।ইনায়া দিকে তাকিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কমল কন্ঠ বলতে লাগলো___

সরি ইনু এত কষ্ট সহ্য করেছো অথচ আমি ছিলাম না তোমার সাথে। খুব ঘেন্না হচ্ছে নিজের উপর। বিশ্বাস কর যদি ঘুনাক্ষরেও টের পেতাম আমার ইনু এত কষ্ট সহ্য করছে তাহলে অনেক আগেই চলে আসতাম জান। বিশ্বাস করো পাখি, ভেতর থেকে যেন কষ্টে কলিজা বের হয়ে আসতে চাইছে।এত কষ্ট পেয়েছিল তুমি আর আমি স্বার্থপরের মতন নিজের জীবনে ব্যাস্ত ছিলাম। এতটা নির্দয় কি করে হলাম আমি ইনু? তোমার অতীত নিয়ে আমার বিন্দুমাত্রও কষ্ট বা ঘৃণা নেই বরং আফসোস এইটা নিয়ে যে আমি ছিলাম না তোমার পাশে। ক্ষমা কি করতে পারবে আমার? তোমার মন যে বড্ড বেশি ভালো হয়তো পারবে কিন্তু আমি? আমি কখনোই ক্ষমা করতে পারবনা নিজেকে।আর রইলো বাকি তোমাকে ভালোবাসা তা তো আগেও বেসে এসেছি আর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত বাসব। এতটা ভালোবাসা দিব যে নিজের অতীত ভুলে গিয়ে আমাকে পাগলের মতোন ভালোবাসবে।

কথাগুলো বলে আরিশ ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে আলগস্তে ইনায়া কে বিছানার শুইয়ে দিল।সে নামাজ আদায় করবে।আজ ইনায়া ডাক দিল না। নিশ্চিত কান্না করার জন্য মাথা ব্যথা করছে।তাই ইনায়া কে ঘুমাতে দিল।আরিশ ওজু করে এসে ঘরেই নামাজ পড়েনিল।ইনায়া কে একা রেখে আশা মসজিদে গেল না।

আজ তার মোনাজাতে কেবল ছিল ইনায়া।সে শুধু প্রার্থনা করেছে যাতে ইনায়ার আর কোনো কষ্ট না তাকে। সকল কষ্ট যেন দূরে চলে যায়।

অথচ ইনায়া ঘুমে মগ্ন ছিল। কেউ যে তাকেও এতটা ভালোবাসতে পারে তা সে দেখল না।সে কল্পনাও করেনি এমন মানুষকে পাওয়ার আশায় যেমন মানুষকে সে পেয়েছে।

_________________

বেলা ১১টা ইনায়া ঘুম ভাঙ্গে।সে আস্তে আস্তে চোখ খুলে মাথার পাশে আরিশ কে দেখে।গত রাতের কথা মনে পড়তেই ইনায়া লজ্জায় শরীর উপর থাকা চাদর টেনে মুখ ঢেকে ফেলল।আরিশ প্রথম হতভম্ব হয়ে গেল ইনায়ার এমন কান্ডে।সে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে অপেক্ষা করছে ইনায়ার ঘুম ভাঙ্গার।আর ইনায়া ঘুম থেকে উঠেই তাকে দেখে এমন করলো। পরক্ষনেই আরিশের কিছু একটা মনে পড়তেই তার টনক নড়ে উঠলো। তার ইনু কি রাগ করেছে তার উপর? তার এই কাজটি করা ঠিক হয়নি। কিন্তু তখন নিজেকে ধরে রাখতেও পারেনি।একেই তো ইনায়া কান্না থামাচ্ছিল না।তার উপর যখন সে ইনায়া ঠোঁটের দিকে অগ্রসর হয়েছিল ইনায়াও তো পিছিয়ে যায়নি। যদি যেত তাহলে সে নিজেকে সামলাতে পারত‌।

ইনায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। গতরাতের কথা মনে পড়তেই এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যাচ্ছে শরীর দিয়ে।আরিশের চোখে চোখ রাখার সাহস পাচ্ছে না। এমন অনুভূতি তার জীবনের প্রথম ছিল। আরিশের স্পর্শ খুবই নরম ছিল।গত রাতে যখন আরিশ ইনায়ার ওষ্ঠাধরের চুম্বন করেছিল দীর্ঘ কয়েক মিনিট পর সে নিজের ঠোঁট আলাদা করে।ইনায়া যেন জান ফিরে পেয়েছিল। জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। লজ্জায় আর আরিশের দিকে তাকায়নি সে‌।আরিশ কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে তা সে টেরও পাইনি।

আরিশ ইনায়ার কানের কাছে এসে বলল__

ইনু জান। এত লজ্জা পাবার কিছুই নেই সুইটহার্ট। অনেক বেলা হয়ে গেছে যদি এখন বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্র েশ হয়ে খাবার-দাবার খেয়ে পড়তে না বাসো তাহলে যখন পরীক্ষায় আন্ডা পাবে তখন বসে বসে লজ্জা পেও।

ইনায়া শুয়া থেকে উঠে বসলো। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর পরে আছে।আরিশের দিকে তাকিয়ে থাকে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল___

বিজ্ঞাপন

জি না আমি আন্ডা পাবো না‌‌।আর লজ্জা করলে আপনার করবে কারণ আপনার বউ আন্ডা পেয়েছে আমার না।আর আমার তো চিন্তাও নেই যে এখন কেউ এসে ভয় দেখিয়ে বলবে যে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট না করলে বিয়ে দিয়ে দিবে। কারণ কি আমার হয়ে গেছে। আপনি বসে বসে আঙ্গুল চুষুন।

এই বলে ইনায়া বিছানা ছেড়ে উঠে হনহনিয়ে বাথরুমে চলে গেল।

আরিশ বোকার মতোন এভাবেই বসে রইল।সে তো এই কথা এই জন্য বলেছিল যাতে তার ইনু গত রাতের কথা মনে করে লজ্জা না পায়। অথচ এখন তাকেই কথা শুনিয়ে চলে গেল। এসব ভাবতে ভাবতে সে দেখলেও তার বৃদ্ধ আঙ্গুল তার মুখের ভেতর। তারাতাড়ি মুখ থেকে আঙ্গুল বের করে বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলে যে তার ইনু লুকিয়ে দেখছে কিনা। যখন দেখলে কেউ নেই তখন নিশ্চিত হলো। বিছানা থেকে উঠে বিছানা গোছাতে শুরু করল।

ইনায়া তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে বের হলো কারণ অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখল রুমে একদম পরিপাটি করে গুছিয়ে ফেলেছে আরিশ।ইনায়া খানিকটা লজ্জা পেলে। আরিশের কাছে গিয়ে মিনমিন করে বলল__

সরি আজকে দেরি হয়ে গিয়েছে ঘুম থেকে উঠতে।

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল__

ইটস্ ওকে বেবি গার্ল। খাবার টেবিলে বসো। বেলা তো কম হলো না নিশ্চয়ই ক্ষুধা লেগেছে তোমার। আমারও ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে একসাথে খেয়ে নেই। আমার পরে আবার কাজে বের হতে হবে।

ইনায়া চলে গেল ড্রয়িং রুমে। দেখল টেবিলের উপর খাবার সুন্দর করে সাজানো বুঝল যে নয় আরিশ রান্না করেছে আর না হয় মা পাঠিয়ে।আরিশ ও এসে আগে ইনায়ার জন্য চেয়ার টেনে দিল।ইনায়া বসতেই সেও নিজের চেয়ারে বসে পড়লো।দুজন মিলে খাওয়া শুরু করলো।

খেতে খেতে আরিশ ইনায়া কে বলল___

আজ রাতে সাদমান আর ইরিন লন্ডনে ব্যাক করবে।

তু,,

আরিশের কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই ইনায়া বলে উঠলো,,

চিন্তা করবেন না আমি ইরিনের সাথে কথা বলব।

আরিশ মুচকি হেসে খাওয়ায় মনোযোগ দিল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস