অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৫২

🟢

আরিশ গিয়ে দরজা খুলল।দরজা খুলে দেখল সাদাফ এসেছে সাফি কে নিতে অর্থাৎ পুচুঁ কে নিতে।আরিশ সাদাফ কে দেখে মনে মনে বলল___

"আসার আর সময় পেলি নারে? একেই তো বউ দূরে দূরে থাকে।যাও একটু সুযোগ পেয়েছিলাম তাও এসে নষ্ট করে দিলি।"

কিন্তু মুখে বলল অন্য কথা।

" হ্যাঁ আসো এসে ওকে নিয়ে যাও।"

কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে মনে বলল___

" নিয়ে যাও এবং আমাদের কে প্রাইভেসি দাও।ইনু যা সরম পেয়েছে মনে হয় না আজ কিস জুটবে কপালে।"

__________________

সালমানের জন্য যেন আজ ঈদের দিন। অবশ্য সে ঈদের দিনেও এত খুশি হয় না আজ যত হয়েছে। এমনিতেই চিন্তায় ছিল তাকে তো যেতে হবে এখান থেকে। লন্ডনের অফিসে কাজ আছে। কিন্তু এখন শুনছে ইরিনের নাকি পরীক্ষা তাই ইরিন কেউ যেতে হবে। ইরিন কে তো আর একা পাঠাবে না লন্ডনে।আর ইমরান খান তার স্ত্রী কে নিয়ে সপ্তাহখানেক পর আসবে। কারণ দেশে তাদের বিজনেসের একটি ব্রাঞ্চ খুলবে যার জন্য তাদের আরো থাকতে হবে।তাই সিদ্ধান্ত নিল সাদমানের সাথে ইরিন কে পাঠানো হবে। লন্ডনে দুজন মহিলা আয়া আছে। একজন কে রাখা হয়েছিল যখন আরিশের জন্ম হয় এবং আরেকজন কে‌ রাখা হয়েছিল যখন ইরিনের জন্ম হয়েছিল। দুজনই বাঙালি। মূলত তাদের কে ঠিক করে দিয়েছিল ইনায়া বাবা।তিনি নিজে অর্থবান না হলেও গরিবদের কে সাহায্য করতে অনেক ভালোবাসতেন। তিনি তার বিশ্বাস্য গরিব কে ঠিক করে দিয়েছিল এবং ইমরান খান তাদের নিজ দায়িত্বে নিয়েছেন।আর সাদমান যতদিন না ইমরান খানরা লন্ডনে ফিরছেন ততদিন খান মঞ্জিলে থাকবে। তাদের বাড়ির নাম খান মঞ্জিল।

এতেই সাদমান অনেক খুশি কারণ সে ইরিনের সাথে সময় কাটাতে পারবে।এখন তো ইরিন তার সামনেই আসে না।তখন তো পালাতে পারবে না। কারণ ইরিন কে কলেজে দিয়ে আসা এবং আনার দায়িত্বও সাদমানের উপর। সাদমানের ইচ্ছে করছে খুশিতে নাচতে। কারণ এই সুযোগ কে হাতছাড়া করা যাবে না।এই সময়ে মধ্যেই তার ইরিনের মান অভিমান সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে হবে।

আর অন্যদিকে ইরিন বসে বসে ভাবছে___

"আমি যত সাদমান থাকে দূরে যেতে চাই ততই যেন তার সাথে এক অচেনা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরি। এমন কেন হচ্ছে আল্লাহ? আমি তো উনাকে আর বিরক্ত করতে চাচ্ছি না। আর উনার সামনে যেতে চাচ্ছি না। তাহলে বারবার কেন উনাকে আমার কাছে নিয়ে আসছো?যদি উনাকে আমার ভাগ্যে লিখে থাক তাহলে আমাকে উনার করে দাও আর যদি উনাকে আমার ভাগ্যে লিখে না থাকো তাহলে আমার ভাগ্যে তুমি লিখে দাও প্লিজ। দোয়া নাকি ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। গত ২ বছর ধরে তো দোয়া করেই আসছি।আরো করতে রাজি আছি। কিন্তু আমাকে তুমি খালি হাতে ফিরিও না আল্লাহ।"

ইরিন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো।

__________________

ইনায়া বিকাল টেবিলে বসে পড়ছিল।তখন সাদাফ এসে পুচুঁ কে নিয়ে যাওয়া পর আর আরিশের সাথে কথা বলেনি।কথা বলা তো দূরের কথা তাকানোর সাহস পর্যন্ত পায়নি। দুজন মিলে চুপচাপ দুপুরে খাবার খেয়েছে।আরিশও আর ইনায়া কে বিরক্ত করল না। খাওয়া দাওয়া করে সে ইনায়া কে নিজের আনা জিনিস দেখিয়েছে। সেখানে ছিল চুলের জন্য ভিটামিন সি, নারিকেল তেল, মেথি,চিয়াসিড। তারপর বলল

বিজ্ঞাপন

"মার কাছ থেকে শোনলাম তোমার নাকি লম্বা চুলের খুব শখ কিন্তু নিজের চুলের যত্ন নেওনা। তাই আজ থেকে তোমার চুলও যত নেওয়ার দায়িত্ব আমার।"

ইনায়া তো খুশিতে গটগট।তার আরিশ কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে চলে আসলো বাবার সাথে নতুন বিজনেসের ব্রাঞ্চ খোলা নিয়ে কথা বলতে।ইনায়া আসরের আজানের ধ্বনি শুনে পড়াব টেবিল থেকে উঠে বসলো। নামাজ পড়ে চলে গেল বারান্দায়। বারান্দার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছিল আরিশ কে নিজের অতিত সম্পর্কে বলার জন্য। কারণ সে আর দেরি করতে চায় না।সে চায় না তার অতীতের জন্য তার বর্তমান এবং ভবিষ্যতের উপর কোনো বাজে প্রভাব পড়ুক।ইনায়া বাম হাতের জামার হাতা উঠিয়ে হাতের কাটা দাগ দেখতে লাগল।মন তার বিষন্ন হয়ে উঠলো। কিন্তু কিছু একটা মনে পড়তেই মনে বিষন্নতা দূরে সরে গেল।তার মনে পড়লো বিয়ের রাতের কথা যখন আরিশ সবার সামনে তার হাতের এই কাঁটা দাগে চুমু খেয়েছিল। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শ দিয়ে তার অতীত মুছে দিয়েছিল। এখন আর নিজের অতীত নিয়ে নিয়ে কোনো আফসোস নেই।তার জীবনের সকল অন্ধকার এক অচেনা ছায়া এসে আলোকিত করে দিয়েছে।আর তার সেই অচেনা ছায়া হলো আরিশ।ইনায়া চোখ বন্ধ করল। সেদিন তার হাতে চুমু খাওয়া সময় আরিশ যা যা বলেছিল তার মনে মনে আওড়ালো। চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। কিন্তু সে চোখ থেকে পানি পরতে দিল না। তার আগেই উপরের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে চোখের পানি চোখের মাঝে আটকে রাখো। কিছুক্ষণ পর চোখের পানি শুকিয়ে গেল। সে মুচকি হাসলো কারণ এখন আর তার জীবনে কোন দুঃখ নেই কোন আফসোস নেই।

আরিশ নিজের ফ্ল্যাটে এসে ইনায়া কে রুমে না দেখতে পেয়ে বারান্দায় চলে গেল। বারান্দায় গিয়ে দেখল গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বিনা শব্দে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। চুলে নিজের মুখগুলো। ইনায়া কেঁপে উঠলেও পরক্ষণে নিজেকে শান্ত করে রাখল। আরিশ ইনায়ার মাথায় শব্দ করে চুমু খেলো। তারপর ইনায়ার বাহু জোড়া ধরে নিজের দিকে ফেরালো এবং চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল__

"কি হয়েছে ইনু? কিছু কি বলতে চাও যা বলতে পারছ না? আমাকে বল আমি তো আছি তোমার কাছে। একটা কথা মাথায় রাখবে এই আরিশ ইহতেশাম খান তোমার পাশে ছিল আছে এবং আজীবন থাকবে। তাই এত দ্বিধা দ্বন্দ্ব না করে মন খুলে আমাকে বলো। তুমি আমার সাথে কথা বলতে চাইলে তো আমি সারা জীবন শুধু বসে বসে তোমার কথা শুনতে রাজি আছি। "

ইনায়া কিছুটা অবাক হল কারণ সে তো কিছুই বলেনি তাহলে আরিশ কি করে বুঝতে পারল ইনায়ার যে তাকে কিছু বলার আছে। সে নিজেকে স্বাভাবিক করে আরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালো __

"আমি আপনাকে নিজের অতীত সম্পর্কে জানাতে চাই আজ। আমি চাইনা ভবিষ্যতে আমাদের মাঝে কোন সমস্যা হোক শুধুমাত্র আমার অতীত নিয়ে। আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমার উচিত সম্পর্কে জানার। আজ না হয় কাল তো বলতেই হত। তাহলে আর দেরি না করে আমি আজকেই আপনাকে আমার অতীত সম্পর্কে বলতে চাই। এবং আমার আপনার ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে আপনি আমাকে আমার অতীত জানার পরেও ভালবাসবেন।"

আরিশ মুচকি হেসে ইনায়া কে নিজের বাহুতে আবদ্ধ করল। তারপর কপালে চুমু খেলো এবং বলল __

"চলো রুমে গিয়ে বসি আমি আছি তোমার সব কথা শোনার জন্য। কিন্তু হ্যাঁ যদি তোমার মনে হয় যে তুমি এখন তা বলতে প্রস্তুত নও তাহলে কোন জোর নেই। তুমি যদি না চাও আমাকে তোমার অতীত জানাতে তাহলে আমার চলবে। পুরো পৃথিবী তোমার বিপক্ষে থাকলেও আমি তোমার বক্ষে থাকবো। কেউ যদি তোমার বিরুদ্ধে একটা কথা বলে এমনকি প্রমাণ আমাকে দেখায় তারপর আমি তাকে বিশ্বাস করব না আমার কাছে তোমার মুখে একটি কথায় যথেষ্ট। তাই যদি তুমি চাও তুমি আমাকে নিজের অতীত সম্পর্কে জানাবে তাহলে আমি শুনতে রাজি এবং তুমি যদি চাও যে আমাকে তোমার অতীত সম্পর্কে তুমি জানাবে না তুমি এটির জন্য প্রস্তুত নও তাহলে তোমার অতীত সম্পর্কে না জেনেই তোমাকে আমি ভালোবেসে যাবো। তোমার প্রতি কখনো আমার ভালবাসার কোন কমতি হবে না এতোটুকু ভরসা রাখতে পারো।"

ইনায়ার চোখে পানি চলে আসলো। সে আরিশ কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরিশ হঠাৎ তাকে পাজা কোলে তুলে নিল এবং তারপর রুমের ভেতর চলে গেল। বিছানায় আগে ইনায়া কে বসালো তারপর সে নিজেও বিছানায় উঠে বসলো। ইনায়া নিজের বুকে টেনে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল__

"বলতে চাইলে বলতে পারো না বলতে চাইলে কোন সমস্যা নেই। ভয় পেওনা যে আমি তোমাকে তোমার অতীত নিয়ে বিবেচনা করব। আসলে দোষটা আমার। অনেক আগের তোমার কাছে চলে আসো উচিত ছিল। তাহলে হয়তো আর তোমার এই অতিত তৈরি হতো না। আমাকে ক্ষমা করে দিও ইনু।"

ইনায়া ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না থামানোর চেষ্টা করল। আরিশের বুকে এভাবে কিছুক্ষণ নিরব থেকে তারপর বলতে শুরু করলো_

"আমি প্রস্তুত আপনাকে নিজের অতীত সম্পর্কে বলতে। আপনার ইনু এতটাও দুর্বল না। আফটার অল আমি একজন সিক্রেট এজেন্ট এর বউ এতটা দুর্বল হলে কি চলবে? যেখানে আমার স্বামী জীবন মরনের খেলায় নিজেকে মাতিয়ে রাখে সেখানে কি সামান্য কোন কিছু আমাকে ভেঙে দিতে পারবে? এত দুর্বল হলে তো আর চলবে না।"

ইনায়া থামলো।আরিশ মুচকি হাসলো তারপর বলল __

"দ্যাট ইজ মাই স্ট্রং বেবি গার্ল। আই নো ইউ আর ভেরি স্ট্র। সো উইদাউট এনি হেসিটেশন গো আ্যহেড।"

ইনায়া এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো নিজেকে ধাতস্থ করে তোলল বলার জন্য। আরিশ ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো এবং নীরব থাকলো সে তার ইনু কে সময় দিল। ইনায়া কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর বলা শুরু করল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস