ইরিন লাগেজ গোছাচ্ছে।আজ রাতে ফ্লাইট। কিন্তু এইটা ভেবেই অসস্থি বোধ হচ্ছে যে তাকে সাদমানের সাথে যেতে হবে।সে যত দূরে সরে যেতে চাচ্ছে তত যেন কাছে চলে আসছে। হঠাৎ তার দড়জায় কেউ নক করল।সে লাগেজ গোছাতে গোছাতে আসতে বলল।ইনায়া দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।দেখল ইরিনের লাগেজ গোছানো প্রায় শেষ।ইনায়া ইরিনের কাছে গিয়ে মিষ্টি সুরে বলল____
তো ননদিনী, মন খারাপ নাকি?
ইরিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।হাতের কাজ রেখে ইনায়া কে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরলো। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য ইনায়া একটু পিছিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল।ইরিন ইনায়া কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল।ইনায়া কিছুটা আন্দাজ করতে পারল ইরিনের মনের অবস্থা।সে ইরিন কে জড়িয়ে ধরে একহাত দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।ইরিন ইনায়া কে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল। তারপর সেদিন সাদমান তাকে যা যা বলেছে সব বলে দিল।ইনায়া পরিস্থিতি বুঝতে পারল।সে ইরিন কে ধরে বিছানায় বসালো। ইরিন এখনো কাঁদছে।ইনায়া ইরিনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলতে শুরু করল___
দেখ ইরিন তখন সাদমান ভাইয়া তোমার বড় ভাইকে নিয়ে চিন্তিত ছিল।আর উনার কথায় তোমাকে খারাপ বা ছোট করার কোনো ইরাদা ছিল না। তুমি যদি সাদমান ভাইয়ার দিকটা চিন্তা করে দেখো তাহলে তুমি বুঝতে পারবে সে তার দিকে ঠিক ছিল। আচ্ছা আমি মানলাম তোমাকে এভাবে কথাগুলো বলা উচিত হয়নি। কিন্তু সে তখন অনেক চিন্তার ভেতর ছিল। একেই আরিশের চিন্তা তার উপর তুমি হুট করে তার রুমে চলে গিয়েছিলে। এবং তার থেকে বড় কথা তুমি একা মেয়ে হয়ে তার রুমে গিয়েছো। এটা যে কোন মানুষ দেখলেই তোমাকে খারাপ বলতো। আর অবশ্যই সাদমান ভাইয়া চাইবে না কেউ তোমাকে খারাপ বলুক তার জন্য সেই রাগের মাথায় এসব কথা বলে ফেলেছে তোমাকে। কিন্তু তুমিও তোমার জায়গায় ঠিক আছো। এত সহজে ভুলে যাবে না। হইতে পারে তোমার করা এই অভিমান এবং উপেক্ষাতেই এসে বুঝতে পারবে তোমার ভালোবাসা। এমনও হতে পারে সেও তোমাকে ভালবাসতে পারে। তাই তুমি এমন জেদ ধরেই থাকবে। আর নিজেকে আরও শক্ত বানাও। নিজের ভালোবাসা যেহেতু প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছো এখন ঠিক এভাবেই থাকো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর সামনে যেহেতু তোমার পরীক্ষা আপাতত এই সব থেকে মন সড়িয়ে নাও। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।
ইরিন ইনায়ার কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনছিল।সে বুঝতে পারলো আসলেই ইনায়া ঠিক বলছে।আর সাদমানের দিক থেকে ভাবলে কোনো না কোনো দিক দিয়ে সাদমান ও সঠিক। শুধুমাত্র তার বলার ধরনটা ভুল ছিল।ইরিন চোখের পানি মুছে মুচকি হেসে বলল___
ঠিক বলেছ তুমি।উনার বলার মানে আমাকে খারাপ করা ছিল না বরং আমি যাতে মানুষের চোখে খারাপ না হই সে জন্য বলেছিল।কিন্তু ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে বারবার কষ্ট পাবার পর সব সময় তা সহ্য করা যায় না তাই তখন আমিও সহ্য করতে পারিনি। কিন্তু আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি যখন থেকে আমি উনার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি তখন থেকে যেন উনি বেশি কথা বলতে চাচ্ছেন। হয়তো আমার করা এই উপেক্ষায় উনার মনে ভালোবাসা তৈরি করতে পারবে। তাই আমি যেমন আছি তেমনি থাকবো। কিন্তু মনে মনে উনাকে ঠিকই ভালবাসবে।
ইনায়া হাসলো। অবশেষে সে এই মেয়েটিকে স্বাভাবিক করতে পারল।সে আর আরিশ কিছুদিন যাবত লক্ষ্য করছিল যে ইরিন আগের মত নেই এবং এই জিনিসটি তাদেরকে খুব ভাবাচ্ছিল।সে ইরিনের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে রুম থেকে বের হয়ে গেল। ড্রয়িং রুমের সোফায় আরিশ বসেছিল। মূলত ইনায়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।ইনায়া কে নিজের বোনের রুম থেকে আসতে দেখে ইনায়ার দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকালো।ইনায়া মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল সব ঠিক আছে।আরিশ নিশ্চিত হলো।ইনায়া ইশারা করল রুমে ফিরতে। তারপর সে হনহনিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল।ইনায়া নিজের শশুর শাশুড়ির সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে তারপর চলে এলো ফ্ল্যাটে। সাদমানের রুমের দিকে তাকিয়ে দেখল সাদমান তার লাগেজ গোছাচ্ছে।ইনায়া নিজের রুমে চলে গেল। গিয়ে দেখল আরিশ একটি বাটিতে লেবুর রস চিপড়ে রসের সাথে তেল মেশাচ্ছে।ইনায়ার আর বুঝতে দেরি হলো না এইসব তার জন্য।সে মনে মনে বলল__
আসলে লোকটা পারেও।
আরিশ নিজের পিছনে না তাকিয়েও ইনায়ার উপস্থিতি টের পেয়েছে আগেই।সে ইনায়ার দিকে না তাকিয়েই বলল___
মেডাম আমার দিকে এইভাবে ডেবডেব করে না তাকিয়ে থেকে চুপচাপ এখানে এসে বসেন।
ইনায়া লজ্জা পেয়ে গেল এইভাবে আরিশের কাছে ধরা পড়ে গিয়ে।তাই সেও আর কিছু না বলে চুপচাপ বিছানায় এসে বসল।মাথা থেকে ঘোমটা খুলে রাখলেও গলায় ওড়না জড়িয়ে রাখল।আরিশ তেলের বাটি বিছানায় সাথে থাকা টি টেবিলের উপর রেখে ইনায়ার দিকে তাকালো। তারপর ইনায়ার মুখোমুখি বসে বলল___
ইনু,আমার দিকে তাকাও।
ইনায়াও বিনা দ্বিধায় আরিশের দিকে তাকালো।
আরিশ ইনায়ার চোখে চোখ রেখে শান্ত কন্ঠে বলল___
আমি কি হই তোমার?
ইনায়া অবাক হলো আরিশের কথায়। তারপর কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিচু স্বরে বলল__
আমার স্বামী।
আরিশ আগের মতোই শান্ত কন্ঠে বলল__
তাহলে তোমার উপর কার সবথেকে বড় হক আছে?
ইনায়া মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বলল__
আপনার।
আরিশ মুচকি হেসে ইনায়ার থুতনি নিজের হাত দিয়ে ধরে উঁচু করে ইনায়া কে তার দিকে তাকাতে বাধ্য করল।
ইনায়াও বাধ্য মেয়ের মতন তার দিকে তাকালো।আরিশ ইনায়ার চোখে চোখ রেখে আবার বলতে শুরু করল____
তাহলে কেন এখনো আমার সাথে সাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারছো না ইনু? সামান্য ওড়না সেটাও আমার সামনে খুলে একটু স্বাভাবিক ভাবে বসতে পারো না? আমিই তো এখানে তাই না?
ইনায়া লজ্জা পেল আরিশের কথায়। কিন্তু আরিশ তো ঠিকই বলেছে।তবুও তো বলার সাথে সাথেই আর এমন করা যায়না।আরিশ যেন ইনায়ার দ্বিধাদ্বন্দ্ব বুঝতে পারলো। তারপর হুট করে একদম ইনায়ার মুখের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল____
যদি তুমি অনুমতি দাও তাহলে আমি নিজ হাতে তোমার ওড়না তোমার গা থেকে সরাতে পারে।
কথা বলার সময় তার প্রত্যেকটি নিঃশ্বাস ইনায়ার মুখের উপর পড়ছিল। ইনায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে নিজের চোখ বন্ধ করে নিল।আরিশ মুচকি হাসলো। একহাত বাড়িয়ে দিয়ে ইনায়ার গলা থেকে তার ওড়না সরাতে লাগলো। ওড়না সরানোর সময় ইনায়ার গলায় তার আঙ্গুলের ছোঁয়া লাগলো, এতে যেন ইনায়া কেঁপে উঠল।আরিশ ওড়না খুলে বিছানার একপাশে রাখল কিন্তু পুরোটা সময় তার দৃষ্টি কেবল ছিল ইনায়ার চোখ বুজে থাকা মুখের দিকে। এই মুখশ্রী দেখলে তার কাছে যেন অন্য সকল দৃশ্য কিছুই না। তারপর হঠাৎ বিনা আমন্ত্রণে ইনায়ার ঠোঁটে হালকা করে চুমু খেল।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল।চোখ তার আপনা আপনি বড় বড় হয়ে গিয়েছে।আরিশ এতক্ষণে সরে এসেছে।ইনায়ার এমন রিয়েকশন দেখে সে মিটিমিটি হাসছে।ইনায়া যখন বুঝতে পেল কি ঘঠেছে সঙ্গে সঙ্গে আরিশের বুকে মুখ লুকালো।আরিশ শব্দ করে হেসে দিল তার প্রিয়শীর কান্ডে। তারপর নিজেও ইনায়া কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
ইমন খান ঘরে বসে বসে ফন্দি আঁটছে কি করে এক ঢিলে দুই পাখি মারবে। প্রথমত নিজের বোনকে ব্যবহার করবে এবং তাকেও সম্পত্তি থেকে দূর করবে।তার তিন সন্তান।সেই হিসেবে তার সম্পত্তি প্রয়োজনও বেশি।তাই তার ভাগের যতটুকু আছে ততটুকুতে তার চলবে না এবং তার অন্যদের ভাগের সম্পত্তি ও চাই।অন্যদিকে রুকসানা বসে বসে এক ভয়ানক ঝড় আনার পরিকল্পনা করছে আরিশ আর ইনায়ার জীবনে।