অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৩৮

🟢

ইনায়া এখনো থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে।তার বিশ্বাস হচ্ছে তার শ্রবণে আসা আরিশের বলা কথা গুলো।সে ভাবতেই পারেনি কখোনো এমন কিছু সে শুনবে।যে যায়গায় সে মেনে নিয়েছিল যে সে ভালোবাসা deserve করে না।সেই জায়গায় আরিশের মতো একজন পারফেক্ট লোক বলছে তাকে ভালোবেসে।তাও ১৫ বছর ধরে। আবার বলছে তার জন্মের পর। এইটাই কি করে সম্ভব তার বয়স তো ১৭ তাহলে তাকে তার জন্মের পর থেকে ভালোবাসলে ১৫ বছর কি করে হয়?

ইনায়া আর কিছু ভাবতে পারছে না।তার মাথা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে।সে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা আরিশের দিকে তাকালো।আরিশ তার দিকে এক আকাশ সমান আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আরিশের শীতল দৃষ্টি তার মনে ঢেউ তুলে দিল।ইনায়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,,,,

--"আমার জন্মের পর থেকে,,,তা,,,তা তা,,হলে ১৫ বববছর?কি কি করে? আপনি কি বলেছেন?"

ইনায়া নিজেকে ধাতস্থ করে নিল। সে অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে সে সহজে ভালোবাসায় জড়াবে না। এবং তার লাইফে ভালোবাসা নামক কোনো জিনিস আসলে সে খুব কঠিন ভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।

আরিশ সে অবস্থা তেই ইনায়ার দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,,,,

--"কারণ ভালোবাসা আর আবদার করা দুটোর ভেতর আকাশ পাতাল ফারাক ইনু।তুমি যখন জন্ম গ্ৰহণ করেছিলে তখন আমি শুধু তোমাকে বিয়ে করব এইটা আবদার করেছিলাম। এবং আমার এই আবদার কে আমি ভালোবাসা বলে দাবি করে ভালোবাসার মতোন পবিত্র শব্দ কে ছোট করব না। কারণ আবদার পরিবর্তনশীল।আজ এটা না পেলে অন্যটা।

কিন্তু ভালোবাসা তা না। ভালোবাসা অ-পরিবর্তনশীল। ভালোবাসার মানুষ বদলায় না। কিন্তু যদি আল্লাহ তোমার জীবন থেকে কাউকে নিয়ে গিয়ে তার থেকে উত্তম কাউকে পাঠায় তাহলে প্রথম যে এসেছিল সেটি তোমার ভালোবাসা ছিল না সেটি ছিল ভালোলাগা। আর তুমি হলে আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা। যাকে আমি কোনো কিছুর পরিবর্তে হারাতে চাই না ইনু। তোমাকে পাওয়ার জন্যে নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাব।আর রইলো তোমাকে ১৫ বছর যাবৎ ভালোবেসে আসার কথা যেই যায়গায় তোমার বয়স ১৭। তাহলে শোন প্রিয়শি, তুমি তখন ছিলে দু'বছরের শিশু। তোমার বাবার সাথে যখন আমি ফোনে কথা বলছিলাম,যখন তোমার কথা জিজ্ঞেস করলাম তখন উনি বললেন তুমি ঘুমাচ্ছিলে।হঠাৎ তুমি ঘুম থেকে উঠে পড়লে এবং অনেক জোরে জোরে কান্না করতে লাগলে। বিশ্বাস কর ইনু তখন বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ব্যথা করছিল। মনে হচ্ছিল কলিজা ফেটে যাচ্ছে শুধু মাত্র তোমার কান্নার আওয়াজ শুনে। মনে চাইছিল সব কিছু ফেলে তোমার কাছে চলে আসতে। তোমাকে নিজের করে নিতে। তোমার চোখে পানি আসতে না দিতে।আর তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর মাই হোক তোমাকে কখনো কাঁদতে দিব না।এবং ঠিক তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি শুধু আমার আবদার না তুমি আমার ভালোবাসা।এক পবিত্র ভালোবাসা।তাই তো তোমার সামনে নিজের ভালোবাসার ভিক্ষা চাচ্ছি। একবার যদি সুযোগ দিতে? ইনু!দাও না একটু ভালোবাসতে। বিশ্বাস কর কখনো কষ্ট দিব না। অনেক আগলে রাখবো। কখনো আমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য তোমাকে পস্তাতে দিব না।দাও না গো সুযোগ।"

আরিশ থামল।আর ইনায়া?সে তো সেই এখনো অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। শুধু অবাক?না তার সাথে এক নতুন আশা কিন্তু আশার থেকে বেশি ভয়।এক অজানা ভয়, অতীতের ভুল।সব এসে তাকে ঘিরে ধরেছে।সে কি করবে এখন?আরিশের প্রতি যে তারও এক অদ্ভুত টান।যেন জন্মজন্মান্তের টান।যা কেউ চাইলেও ছিঁড়তে পারবেন না। এবং সেই অদৃশ্য সুতা দিয়ে বাঁধা টানের কারণে বারবার মন আরিশের দিকে ছুটে আসে। ইনায়া চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিল।আর আরিশ তার দিকেই তাকিয়ে আছে এখনো,যেন তার পলক নড়ছে না।

এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর ইনায়া নিজের চোখ খললো। কিন্তু আরিশের দিকে তাকানোর সাহস দেখালো না।সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,,,

--"আমার যে অতীত আছে! আপনার মতো ভালো মানুষের প্রয়োজন কি আমার মতোন কাউকে ভালোবাসার?আরো ভালো অপশন পাবেন আপনি।"

আরিশ চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কঠোর স্বরে বলল,,,,

--"থাকুক অতীত ইনু থাকুক।আরিশ ইহতেশাম খান তার প্রিয়সি, তার ঘোমটা ওয়ালি,তার ভালোবাসার মানুষটির অতীত নিয়ে পরোয়া করে না। তুমি শুধু বলো তুমি আমার হবে বিশ্বাস করো ইনু তোমার অতীত সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না করে বাকিটা জীবন তোমাকে ভালোবেসে যাব‌‌।আর তুমি আমার কাছে অপশন না ইনু তুমি আমার প্রাধান্য। Your Are My First And Last CHOICE, Priority,Love, EVERYTHING."

ইনায়া শীতল হয়ে গেল আরিশের কথায়।সবাই তো তাকে সবসময় অপশন হিসেবে রেখেছে।সে চাওয়া তো দূরের কথা কখনো কল্পনাও করতে পারে নি কেউ তাকে অপশন না বলে ভালোবাসা বলবে। ইনায়া কিছু বলবে তার আগেই আরিশ বলতে শুরু করল,,,

--"ইনায়া চলে যাচ্ছি আজ রাতে। যাওয়ার আগে তোমাকে নিজের অনুভূতি সম্পর্কে বলতে চেয়েছিলাম এবং তোমার কাছ থেকে শুধু একটা সুযোগ চাচ্ছি আর কিছু না ।দিবে না তোমার এই পাগল প্রেমিক কে নিজের পাগলামি প্রকাশ করার সুযোগ?"

ইনায়ার মনে যেন এখন ভয় ঢুকে গেল।আরিশ চলে যাবে কোথায় যাবে। তারমানে কি আরিশও তাকে ছেড়ে চলে যাবে।আর চলে গেলেই তার কি?সে কেন এত উতলা হয়ে যাচ্ছে আরিশ চলে যাবে শুনে।আর আরিশ যাবেই বা কোথায়?তার শ্রবণে যেন আরিশের মুখ থেকে বের হওয়া অন্য কথা গেল না। শুধু একটা কথাই গেল যা হলো আরিশ চলে যাবে। ইনায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না জিজ্ঞেস করল,,,,

--"কোথায় চলে যাবেন আপনি?আর কেনই বা যাবেন?আর আমার সামনে এভাবে বসে না থেকে প্লিজ দাঁড়ান।"

বিজ্ঞাপন

আরিশের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।সে উঠে দাঁড়ালো।তার চলে যাবার খবর যে ইনায়ার উপর ইফেক্ট ফেলছে সে তা স্পষ্ট নিজের দু‌- নয়নে দেখতে পাচ্ছে।সে তার ইনু কে অপেক্ষা না করিয়ে বলল,,,

--"তুমি আমার সব। তোমার সবকিছু জানার অধিকার আছে ইনু।আমি শুধু লন্ডনের একজন বিজনেস ম্যান না।আমি একজন সিক্রেট এজেন্ট। এবং আমি আমার এক স্পেশাল মিশনে যাচ্ছি। যেখান থেকে ফিরে আসবার কোন নিরাপত্তা নেই। তাই ভাবলাম যদি ফিরে না আসি তাহলে মরার পর আক্ষেপ থাকবে যে কখনো নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের মনের কথা বলতে পারলাম না। তাই ভাবলাম ইচ্ছাটা পূরণ করে যাই।"

ইনায়া থমকে গেল।তার বুক যেন ভারি হয়ে উঠলো। এখন তার কাছে সবটা ক্লিয়ার। তারমানে আরিশ সেইদিন যখন তার বন্ধু একজন লেখক এবং তার বন্ধু গল্পে একজন সিক্রেট এজেন্ট তার মিশন নিয়ে কনফিউজ সেসব কথা ছিল তা সব মিথ্যা ছিল। বরং সমস্যা টা আরিশের। ইনায়া ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। আরিশ এত বড় একটা রিস্কের কাজে যাচ্ছে।

ইনায়া মিনমিনে গলায় বলল,,,

--"আপনি খুব তাড়াতাড়ি ফিরবেন তো?"

আরিশের ঠোঁটে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। আসলেই কি সে ফিরতে পারবে? তাড়াতাড়ি তো অনেক দূরের কথা। কিন্তু তার যে কিছুই করার নেই। নিজের প্রাণের থেকে বেশি ওই শিশুদের প্রাণ জরুরি।সে চাই নি নিজের অনির্ভরশীল জীবনের সাথে ইনায়ার মতো নিষ্পাপ মেয়েকে জড়াতে। কিন্তু সে যে বড় স্বার্থপর মানুষ। মরতে রাজি কিন্তু নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে হারাতে নয়। নিজের ভালোবাসার জন্য না হয় একটু স্বার্থপর হল।

আরিশ ইনায়ার কথার উত্তর না দিয়ে উল্টো আবদারের সুরে বলল,,,

--"অপেক্ষা করবে না আমার জন্য ইনু? যতদিন আমি না ফিরি?আর আমার মরণ হলে প্লিজ অন্য করোর হোইও না ইনু।প্লিজ। এবং এটিকে না হয় আমার শেষ ইচ্ছা হিসেবে স্বীকৃতি দিও। ফাঁসি দেবার আগে তো আসামি কেউ তার শেষ ইচ্ছা জিজ্ঞেস করা হয়। আমি যে তোমার ভালোবাসা জেলে বন্দি। আমার এই শেষ ইচ্ছা কি পূরণ করবে না?বেশি কিছু তো চাই না। শুধু এতটুকু চাই যে যা আমার তা শুধু আমার থাকুক। মৃত্যুর পর যখন আমার আত্মা তোমাকে না পাওয়ার আক্ষেপে তোমার কাছে আসবে শুধুমাত্র তোমাকে দেখতে, কিন্তু যখন তোমাকে অন্য কারো সাথে দেখতে তখন আমার সেই আত্মা শান্তি পাবে না ইনু। প্লিজ বলো তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে। নিজের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত শুধুমাত্র আমার হয়ে থাকবে। আমাদের ভাগ্যে যদি অসম্পূর্ণতা থাকে তাহলে না হয় এই অসম্পূর্ণতা নিয়েই বেঁচে থেকো। কিন্তু শুধু আমার হয়ে থেকো। বলো না ইনু তুমি অপেক্ষা করবে। তোমার আরিশের জন্য অপেক্ষা করবে। তোমার আরিশের ফিরে আসার অনিশ্চয়তার জালে নিজেকে আবদ্ধ করবে। প্লিজ একবার বলো যে তুমি আমার হবে। শুধুমাত্র আমার জন্য অপেক্ষা করবো।"

ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।আরিশের বলা কথা গুলো তার বুকে এসে বাঁধল।সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না।ছাদ থেকে দৌড়ে নিচে নামার জন্য পা বাড়ালো।

অন্যদিকে আরিশ আহত দৃষ্টিতে তার ইনুর দিকে তাকিয়ে রইল যে কিনা তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। কিন্তু আরিশের চোখের আড়াল হওয়ার আগে ইনায়া নিজের পা থামিয়ে দিল। অশ্রুসিক্ত নয়নে আরিশের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে বলল,,,,,

--"আমি অপেক্ষা করব আপনার জন্য। আপনার অনিশ্চিত অপেক্ষায় নিজেকে আবদ্ধ করব।আমি জানি না আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা। কিন্তু ইনায়া_ইফরাহ_খান অপেক্ষা করবে আরিশ ইহতেশাম খানের জন্য। আপনার ইনায়া অপেক্ষা করবে তার আরিশের জন্য।"

এই বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না ইনায়া। দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো। আরিশের চোখের আড়াল হয়ে গেল।

আর আরিশ?তার পুরো পৃথিবী থমকে গেল।সে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।তার মনে হচ্ছে সে যদি এই মুহূর্তেও মারা যায় তার আর কোনো আফসোস থাকবে না। কিন্তু এই ভাবনা তার মাথায় আসতেই সে নিজেকে জোরে থাপ্পড় দিয়ে বলল,,,

--"কি উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা করছিস তুই আরিশ?তোর ইনায়া তোর জন্য অপেক্ষা করবে আর তুই মরে যাবার চিন্তাভাবনা করছিস? তোকে যে তোর ইনায়ার জন্য ফিরে আসতে হবে।"

আরিশ থামল তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,,,,

--"আমাকে তো পাঠানো হয়েছিল আপনার ইবাদতের জন্য। কিন্তু দুনিয়াতে আসার পর আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাই দুনিয়ার মোহে পড়ে। কিন্তু হয়তো আমি সম্পূর্ণ রূপে পথভ্রষ্ট হয়নি। হয়তো আমাকে এ পৃথিবীতে যতটা আপনার ইবাদত করার কথা ছিল তার কিছুটা হলেও আমি পরিপূর্ণভাবে করতে পেরেছি। হয়তো এর ফলে আপনি আমাকে আমার ভালবাসার মানুষটি উপহার করলেন।আমি নিজের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যদি আপনার শুকরিয়া আদায় করি তাহলেও তা কখনো সম্পূর্ণ করতে পারবো না আল্লাহ তায়ালা।আমি এখন শুধু হায়াত চাই। যাতে আরো অনেকটা সময় আপনার ইবাদত করার সময় পাই এবং নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে সময় কাটাতে পারি। সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে চাই। এবং আপনি চাইলে সব সম্ভব। শুধুমাত্র আপনার রহমত আমার উপর নাযিল রাখবেন।"

আরিশ থামল তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এই পানি নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়ে যাবার খুশি এবং ভালোবাসার মানুষটি থেকে দূরে যাবার দুঃখ মিশ্রিত পানি।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস