অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৩০

🟢

ইনায়া তৈরি হচ্ছে কলেজ যাওয়ার জন্য। পরীক্ষা শেষ হয়েও তার শান্তি নেই। এখন আবার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে। নিজেকে তার বোর্ড পরীক্ষার্থী মনে হচ্ছে।ইনায়া তৈরি হতে হতে কলেজ কে বকতে লাগলো।

--"কি ঢঙ্গের কলেজে ভর্তি হয়েছি। পরীক্ষা দিয়েও শান্তি নেই। ‌ এখন আবার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দাও। আইসিটিতে তো এমনিতেই ফেল দিবে স্যার। তাহলে এত নাটক করার কি আছে। এত কষ্ট করে পরিক্ষা দিয়েও যখন জানি স্যারের কাছে পড়ি না বলে স্যার পরীক্ষায় ফেল দিবে তখন আর পরীক্ষা দেওয়া অথবা ক্লাস করার কোন ইচ্ছেই থাকে না। যতই ফেইল দেইক না কেন আমি তো এই স্যারের কাছে কখনোই প্রাইভেট পড়তে যাব না। ইস আমার কি টাকার গাছ আছে নাকি। এক সাবজেক্ট এর জন্য তিনি নিবেন ২৫০০ টাকা তাও আবার একঘন্টা পড়াবেন। আর উনার যে পড়ানোর স্টাইল। এই ২৫০০ টাকা দিয়ে যদি আমি গল্পের বই কিনি তাহলে আমার অনেক লাভ হবে। এই শয়তান ব্যাটার কাছে পড়ে লাভ নাই। ঘুরেফিরে বোর্ড পরীক্ষায় নিজের পড়া নিজেরই পড়ে পরীক্ষা দিতে হবে। তখন আর কোন স্যারের সুপারিশ চলবে না। তার থেকে ভালো আগে থেকেই নিজের প্রিপারেশন নিয়ে নেই।"

এইসব কথা নিজের সাথে নিজে বলেই সেই হিজাব পড়ে নিল।

আসলে ইনায়ার কলেজে আইসিটির একজন শিক্ষক আছে। যার কাছে প্রাইভেট না করলে তিনি ফেল দেন। গতবার ফার্স্ট সেমিস্টার পরীক্ষায় ১২০ জনের ভেতর মাত্র ১১ জন পাস করেছিল। তখন ইনায়া পাশ করেছিল। কিন্তু এইবার সে শিউর যে তাকে ফেইল দিবে। বাংলাদেশের Education System খুব খারাপ তার জন্যই বাংলাদেশের কোন উন্নতি হয় না। শিক্ষকরা হলো দেশের রক্ষক, কিন্তু তারা হয়ে যায় ভক্ষক। আর এইরকম দুই তিন জন শিক্ষকের জন্য এখন আর কেউ শিক্ষক জাতিকে সম্মান করেন। আগে কত সুন্দর সবাই শিক্ষককে স্যার ম্যাডাম বলে ডাকতো। আর এখনকার জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা বলে,,, "আজকে বেডার ক্লাস ,কালকে বেডির ক্লাস। এই বেড়ার ক্লাস ভালো লাগেনা,এই বেডি বেশি পড়া দেয়।"আর বাংলাদেশের প্রত্যেক স্কুল কলেজেই এমন একজন না একজন শিক্ষক থাকবে যার কাছে প্রাইভেট না পড়লে নয় মার্ক কম দিবে আর না হয় সোজা ফেল করিয়ে দিবে।আর ইনায়ার কলেজেও এমন এক শিক্ষক আছে যে কিনা তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে ফেল করিয়ে দেবে তাও আইসিটির মত সহজ সাবজেক্টে।

ইনায়া চলে গেল কলেজের উদ্দেশ্যে।আজ আর তার আরিশের দেখা হয়নি এখনো।

________________

আরিশ বেলা ১১ টায় ঘুম থেকে উঠল।সে মাঝখানে শুধু ফজরের নামাজ শেষ সময় উঠে নামাজ পড়ে আবার ঘুমিয়ে ছিল। এমনিতেই কাল রাতে অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছে। তাই আজ এত বেলা খবর পর্যন্ত ঘুমানো ‌ ঘুম থেকে উঠে আগে ফোন হাতে নিল। দেখল এগারোটার উপরে বেজে গেছে। বেশি দেরি না করে আগে মেসেজ চেক করল। দেখল তার সেই বন্ধু সেই লোকটির বাড়ির ঠিকানা ডিটেইলস সব দিয়ে দিয়েছে।আরিশ আর দেরি করল না। ভাবলো এখনি গিয়ে সেই লোকটিকে সে নিজ হাতে শাস্তি দিবে। এই ভেবে বিছানা থেকে উঠে নিল তারপরে আবার কিছু একটা ভেবে বিছানায় বসে পড়ল। তারপর নিজেকে বলল,,,,

--"দেখ আরিশ তাড়াহুড়ার কাজ হয় শয়তানের। তাই যা করতে হবে বুঝে শুনে করতে হবে। এইটা লন্ডন না যে আমি যা খুশি তাই করতে পারব আমার অনেক লোক আছে সবকিছু ঠিক করে দেবে। এটা বাংলাদেশ। এইটা তোর বাবার চাচার এবং ইনায়ার শহর। এই স্থানের সাথে তাদের সম্মান ভালোবাসা এবং নিরাপত্তা সবকিছু মিশে আছে। তাই এখানে যা করতে হবে তা প্ল্যান মাফিক করতে হয়। তাই আগে সাদমান আসুক। তারপর তাকে নিয়ে কিছু একটা করব।"

এইসব বলে আরিশ বিছানা ছেড়ে উঠলো। তারপর ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। ওয়াশরুম থেকে একেবারে গোসল করে বের হয়ে এসে ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখল টেবিলের ওপর প্লেটে খাবার ডাকা। সে বুঝতে পারলেও তার মা অথবা বোন এসে খাবার রেখে গেছে। তাদের কাছে তো এই রুমের এক্সট্রা চাবি আছে।আরিশ খাবার খেয়ে নিল।আজ আবার তার সকাল থেকে ইনায়ার সাথে দেখাও হয় নি।আরিশ খাবার খেয়ে রুম থেকে বের হল। সব সময়ের মতন আগে মা বাবা বোনের সাথে দেখা করতে গেল।আরিশ তার মাকে বলল,,,

--"মা আজ সাদমান আসবে।ওর জন্য রান্না কর।আমি বাইরে যাচ্ছি"

আরিশের মা সায় দিল। কিন্তু সাদমান আসবে শুনে ইরিনের মনে লাড্ডু ফুটলো। কতদিন পর সে তার প্রিয় মানুষটিকে দেখবে।তার তো ইচ্ছে করছে লুঙ্গি ডান্স দিতে।তাই সে টেডি না করে নিজের বাবার ঘরে চলে গেল এবং আলমারি থেকে একটি লুঙ্গি নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। আর আরিশ চলে গেল তার উদ্দেশ্যে।

ইরিন ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করলো। তারপর তার ফোন ব্লুটুথ বক্সের সাথে কানেক্ট করে লুঙ্গি ডান্স গান ছাড়লো। এবং আমি সাথে সাথে নাচতে লাগলো। পাগলের মতোন নাচতে লাগলো।ইরিন আবার নিজের ইচ্ছে মনে রাখে না। নিজের ইচ্ছে পূরণ করে। তাই তার ইচ্ছে হয়েছিল লুঙ্গি ডান্স করতে সে তাই পূরণ করছে।

ইরিন নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে গেল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়লো।সে ভাবতো কিভাবে সে সাদমান কে ভালোবেসে ফেলছে।

অতীত ________________

সাল ২০২৪। ইরিনের সবে মাত্র জেনারেল সার্টিফিকেট অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (GCSE) পরিক্ষা শেষ।(যা বোঝায় SSC exam) ইরিন বাসায় ফ্রি ছিল তখন। ড্রয়িং রুমে বসে ছিল। তখন তার ভাই বাইরে থেকে এল। সাথে একজন পুরুষ ছিল। ইরিন প্রথমে তেমন খেয়াল না করলেও যখন সেই পুরুষের কন্ঠ শুনল ইরিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করল।দেখল তার সামনে এক শ্যামবর্ণ পুরুষ বসে আছে। উচ্চতায় ৫'৯ হবে। চেহারায় স্পষ্ট ভেসে উঠছে লাজুক লাজুক ভাব। বোঝাই যাচ্ছে ছেলেটি খুব লাজুক। হাসির মাঝে রয়েছে এক নম্রতা।যা সোজা এসে ইরিনের বুকে লাগে।ইরিন তখনই এই লাজুক পুরুষের প্রেমে পড়ে যায়। তারপর সে দেখল তার ভাই সেই পুরুষদের সাথে তার মায়ের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। তখন সে জানতে পারল সেই পুরুষের নাম সাদমান।যে কিনা আরিশের বেস্ট ফ্রেন্ড এবং তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। এর পর থেকে শুরু হলো ইরিনের গোয়েন্দা গিরি। সেদিন রাতে এসে সে তার ভাইয়ের সাথে যারা এড আছে তাদের মাঝে সাদমানের Account stalk করে বের করল।আর সাদমানের একাউন্টে যতগুলো ছবি ছিল সবগুলা নিজের ফোনে সেভ করে রাখল।

এবং ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,,,

বিজ্ঞাপন

--"ওই আমার লাজপুরুষ, তোমার এই লাজুকতা ভাব যে আমার সকল লজ্জা কেড়ে নিয়েছে। এখন যে আমি তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। তোমাকে কিডন্যাপ করে হলেও আমি নিজের করব।"

এই বলে ইরিন হাসলো।

বর্তমান______________

ইরিন ফিরে এলো অতীত থেকে । তারপর নিজের ফোন বের করে গ্যালারিতে ঢুকে সাদমানের ছবি বের করে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,,,

--"আমাকে অনেক পুড়িয়েছ আমার লাজুক পুরুষ। খুব শীঘ্রই এমন ব্যবস্থা করব যে তুমি নিজে লাজ লজ্জা ভেঙে আমাকে আপন করতে চাইবে।নয়তো আমিও আরিশ ইহতেশাম খানের ছোট বোন না।"

এই বলে ইরিন দুষ্টু হাসি হাসলো।

অন্যদিকে আরিশ চলে গেল সোজা ইনায়ার কলেজের দিকে। ভাবল যদি এক পলক দেখতে পারে সে তার ঘোমটা ওয়ালি কে।আরিশ কলেজের পিছনে রেষ্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।ইনায়ার কলেজে জানালা দিয়ে সেখান দেখা যায়।আরিশ এক দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে রইল।

বেলা ১২:১৫ ইনায়ার পরিক্ষা শেষ। কিন্তু তার বান্ধবীরা এখনো বাকি তাই ইনায়া ৪ তালায় গেল কারণ সেই দিক টা ফাঁকা। পরিক্ষা ৩ তালায় হচ্ছিল।

ইনায়া চার তলায় গিয়ে একটি রুমে ঢুকে জানালার পাশে বসল। কারণ সেইখান থেকে বাতাস আসে। কিন্তু হঠাৎ সে বাইরের দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি থমকে যায়।চার তলা থেকে বাইরের দিক খুব স্পষ্ট দেখা যায়।সে দেখল কোনো এক সুপুরুষ কালো রঙের পোশাক পরে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়র বুঝতে সময় লাগলো না যে এই পুরুষটি আর কেউই নয় বর আরিশ।ইনায়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো।

কিছুক্ষণ আগেও তার ভাইবা রুম থেকে বের হবার পর মন খারাপ ছিল। কারণ সেই স্যার পড়ার প্রশ্নর থেকে বেশি ফালতু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। এবং যার উত্তর দেওয়া অসম্ভব।আর সঠিক দিলে তাই জিজ্ঞেস করবে যে কোথায় প্রাইভেট পড়ো। তাই ইনায়া কোন উত্তর না দিয়ে বলল সে কিছুই পারে না। প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও এই কথা বলার কারণে তার নিজের মন খুব খারাপ হলো। তাই সে মূলত জানলার কাছে এসে বসে ছিল একা একা। কিন্তু আরিশ কে দেখে পরম হতে তার মন ফুরফুরে হয়ে উঠল। মনে হল মন থেকে কোন বোঝা নেমেছে।

আরিশ ও এই দিকে তাকিয়ে ছিল।সে দেখল জানালার পাশে এক মেয়ে এসে বসেছে। আরিশের চিনতে অসুবিধা হলো না যে এটা তার সপ্তদর্শী। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল এবং সে মনে মনে বলল,,,,,

--"আমি তো তোমাকে শত দূর থেকে হলেও চিনতে পারব। কিন্তু তোমার নজরে কি আমি পড়েছি?"

ইনায়া আরিশ কে জানলা থেকে দেখে বলল,,,

--"জানিনা কি করে আপনাকে এত দূর থেকে চিনে ফেললাম। আপনাকে দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। এই যে যেমন একটু আগেও মন খারাপ ছিল এখন মন ভালো হয়ে গেছে।"

এই বলে ইনায়া আর দেরি করল না। বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ল।

আরিশের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে ভেবেছিল সবার পরীক্ষা শেষ হলে বান্ধবীর সাথে যাবে। কিন্তু আরিশ কে দেখে পরবর্তী তার সিদ্ধান্ত বদলে গেল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস