ঐ দিনের পর থেকে আমি সাদিক এর সাথে একটু একটু কথা বলি। তিক্ততা কিছুটা কমেছে আমার, তবে ও আগে যেমন ছিল এখনও তেমন ই আছে।আমি বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখার জন্য কিছু ফুলের ঝুড়ি বানিয়ে রঙ করছিলাম ছোট বেলা থেকেই রঙ করতে ভালবাসি।উঠে দাঁড়ালাম হাতে রং লেগেছে অনেকটা । নিচে যাব ধোয়ার জন্য কিন্তু তখনও চোখ ঝুড়িতে পেছনে ফিরে খেয়াল করিনি ঝাপাট করে বারি খেলাম
-----ইইইই সর্বনাশ সাদিক এর গেঞ্জিতে আঙুল এর ছাপ বসে গেছে
পেছন থেকে আওয়াজ পেলাম হাসির
ইফাদ হাসছে খটখট করে, কি বিচ্ছিরী হাসি।
সাদিক হা হয়ে বুক কে পেছনে ঠেলে রেখেছে বিষ্মিত হয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে পলক ফেলছে,,,,
রাগ দেখিয়ে বলল,,
রাঙাতে খুব ভাল লাগে না??
আমি দুটো ঢোক গিললাম,
তারপর ঠোটের কোণা স্বাভাবিক এর চেয়ে বাড়িয়ে বললাম
----হুউম শুধু তোমাকে।
আর কিছু না বলে পালালাম।
নিচে এসে বুকটা কেমন ধুরুধুরু কাঁপছে,হাত ধুয়ে বিছানায় উল্টো হয়ে শুয়ে পড়লাম ভীষণ হাসি পাচ্ছে।
বারেহ আমি কি জানতাম নাকি ও এই দিন দুপুরে এসে পড়বে?
ভাবলাম একবার গিয়ে দেখে আসি। উপরে গিয়ে আগে উঁকি দিলাম না কেউ নেই ইফাদ একা।
রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম ও বলল
----ভাইয়া চলে গেছে নোট দিতে এসেছিল।
আমি আর কিছু বললাম না সন্ধ্যায় পড়তে বসলাম।
কিছুক্ষণ পরপর খালি ঘড়ি দেখছিলাম।
একটুপর আমি রুম থেকে বের হলাম সাথে সাথেই গায়ে পানির ছিটা পড়ল
----হাহাহাহা,,হোহোহো কি শুধু রাঙালেই হবে? রঙিন ও তো হতে হবে।
আমি অবাক হয়ে সাদিক এর হাসি দেখছি,,,
ঠাশ করে আওয়াজ হলো হাতের কলম টা নিচে পড়ে গেছে।।।।আমি টেবিলেই বসা।
হাই আল্লাহ্ আমি এটা কি কল্পনা করছিলাম??
আবার ঘড়ির দিকে তাকালাম রাত ৮:১৫ হয়েছে সময়।
ইফাদ কে বললাম
---কিরে তোর মাস্টার মশাই তো এলো না আজ।
----হ্যা ভাইয়া আজকে আসবে না।
আমি বারান্দার শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালাম নিচে তাকালাম বাড়ির প্রবেশ পথ দেখছি আর এখান থেকে সামনের দুটো ঘর ও দেখা যায়।আমি বারবার গেইটে তাকাচ্ছি।
কেন আসলে? আমি মনেমনে চাচ্ছিলাম না মানে দেখছিলাম কে কে আসা যাওয়া করছে।
আসলে হয়ত কাউকে খুঁজচ্ছি।
:::::::::::::
পরেরদিন ভার্সিটি থেকে এসে সোজা উপরে গেলাম, টেবিলে বসলাম মাথাটা টেবিলের উপরে রাখলাম ,
ভাবছি আজ ভার্সিটিতেও অন্যমনষ্ক ছিলাম কি ক্লাস করেছি নিজেও জানিনা।
অনেকদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ল।
১৭ বছর বয়স ছিল আমার, বাড়িতে একটা বিয়ে চলছিল সেদিন রাতে,
আমার খুব পিপাসা পেয়েছিল সবাই বাড়ির উঠানে অনুষ্ঠান দেখছে।
আমি ঘরে গেলাম পানি খেতে বের হয়ে দরজা আটকাচ্ছি তখন পেছনে কারও আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম দরজার বাইরে লম্বা গলিতে দাঁড়িয়ে আছি আবছা আলো
আমি বললাম আপনি এখানে??
ছেলেটা আমার এক তালতো ভাই হয় ঐ যে ছোট বেলায় একবার নম্বর দিয়েছিল সে।
হেসে বলল,,,
----এক গ্লাস পানি দিবে?
আমার খুব অস্বস্তি লেগে উঠলো ষষ্ঠ ঈন্দ্রিয় কেমন একটা খারাপ আভাস দিচ্ছে,,,,বাসায় বাবা ঘুমিয়ে আছে কিন্তু বাইরে খুব শব্দ হচ্ছে গানের।
আমি ভেতর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এলাম।
সে লাজুক ভাবে হেসে বলল
----ধন্যবাদ।
আমি গ্লাস রেখে এসেও দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে,আমাকে বলল
----তোমার সাথে কথা আছে।
আমি বললাম প্লিজ বাইরে চলুন ওখানে গিয়ে শুনি?
----না মানে আমি বলছিলাম কি,, আসলে সুবাহ আমি না তোমাকে,,,,,ইয়ে,, "আই লাভ ইউ"
আমি কথাটা শুনেই এভয়েড করে চলে যেতে চাইলাম কিন্তু ছেলেটা আমার হাত ধরে ফেললো
----একি আপনি করছেন টা কি?
----সুবাহ আই লাভ ইউ,,,,সেই অনেক বছর আগে থেকেই।
আমি হাতটা ছাড়াতে চাইলাম,ও আমার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রাখল এরপর হাতে চুমু খেল এবার আমি প্রচন্ড রেগে গেলাম
----ছাড়ুন বলছি।
ছেলেটা আমার দুই হাত ধরেই জোড়াজোড়ি করছে আর বলছে,,,
---ভয় কেন পাচ্ছো, আমি কিছু করব না শুধু হাত দুটো ধরে রাখতে চাই।
আমি ওর কথা না শুনে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু হঠাৎ ছেলেটা আমার গালে চুমু দিতে চেষ্টা করছে এমন সময় সামান্য দূরে থাকা বাসার গ্রীলের দুয়ার থেকে টর্চের আলো ঝলক মেরে উঠল আমাদের দিকে,,,,,
টর্চ হাতে কেউ এগিয়ে আসছিল সামনে, ছেলেটা সাথে সাথে হাত ছেড়ে দিলো আমার তখনও দেখছিলাম না সামনে কে
একটুপর আলো বন্ধ করাতে সাদিক কে দেখতে পেলাম।
আমার সামনে এসে ভয়ংকর দৃষ্টিতে বলল
----এখানে কি করছ???
আমি বললাম
----পা,পানি খেতে এসেছিলাম।
----একা কেন এসেছিলে???
আমি উত্তর দিব তার আগেই ও আমাকে ধমক দিয়ে বলল
----সাহস বেড়ছে খুব না??? এত সাহস কোত্থেকে হলো হুউম?
দাঁড়া তোর বাবা কে বলবো এখন,,,,,
আমি ভয় পেয়ে গেলাম খুব।
সাদিক একবার ও ঐ ছেলের দিকে তাকাল না সব আমাকেই বলছে।
প্রচন্ড জেদ নিয়ে বলল
----ফের যদি দেখি ট্যাং ভেঙে হাতে দিয়ে দিব আর কান কেটে সোজা গলায় বেধে দিব বুঝলি???
ওর ধমকে এবার ছেলেটা আর দাঁড়াল না।
সাদিক আমার থেকে চোখ সড়িয়ে ঐ ছেলের চলে যাওয়া দেখছিল ঘাড় ঘুরিয়ে।
আমার চোখ টলমল করছিল পানিতে,ও আমার দিকে তাকাতেই আমি জেদ দেখিয়ে চলে গেলাম বাইরে, চোখের পানি গুলো ও পড়ে গেল।
ভীষণ রাগ হলো নাচে গানে মগ্ন জবা আর লিলি কে ঐ ছেলেটার কথা সব বললাম,,,,
আর বললাম ঐ বাঁদর টা কে ও আমি ঘৃণা করি, আমার কি দোষ ছিল??
আসলে মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া মানেই হ্যারেসমেন্ট এর স্বীকার হওয়া। মেয়েরা ছোট,বড়,বুড়া সব বয়সেই ছেলেদের পৈশাচিকতার স্বীকার হয়।
আপন পর কেউ না কেউ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কিন্তু সব দোষ মেয়েদেরই।
ছেলেদের বলছি "আপনি এমনটা করবেন ঠিক আপনার মা,বোন,বৌ,মেয়ের সাথেও একই কাজটা অন্য কেউ করবে।"
যাই হোক অতীতের ভাবনায় ছেদ পড়ল,,,,
টেবিল থেকে মাথা তুলে অস্ফুট স্বরে বললাম,,,
----বাঁচিয়েছিলে সেদিন।
হুউম এটা বুঝতে প্রায় ছয় বছর লেগে গেল আমার?
এমন হাজারও প্রশ্ন আমার মনে ঘুরছে, তুমি এসব কেন করতে সাদিক?এর জবাব আমার চাই।
এ কি আমি ইফাদের টেবিলে বসে আছি,,,,
উফ মাথা মনে হয় পুরাই গেছে।
:::::::
সন্ধ্যায় বসে আছি অপেক্ষা করছে আমার দু চোখ, কিন্তু ওর দেখা নেই।
বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম অনেক্ষণ তাও দেখা পেলাম না। কি আশ্চর্য! আগে বারান্দায় গেলেই যেন খালি ও ই চোখে পড়ত আর এখন খুঁজেও পাচ্ছিনা।
ইফাদ থেকেও আর জিজ্ঞেস করিনি।
পরেরদিন সকালে,,,,
ভার্সিটি বন্ধ তাই আর যাই নি।কতক্ষণ টিভি দেখলাম ভাবছি নিজেকে কিভাবে খুশি করা যায়।
কাগজ নিয়ে অনেকগুলো ফুল বানাতে লাগলাম।নিজেকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখলাম।
এভাবে সন্ধ্যা ও পার হয়ে গেল আমি ওযীফা পড়ছিলাম
"শীঘ্রই তোমার রব তোমাকে এত দিবেন যে,তুমি খুশি হয়ে যাবে। (আদ-দুহাঃ-৫)"।
আয়াত টা পড়ে মুখের হাসিটা অন্তরে প্রশান্তির ছোঁয়া দিয়ে গেল।
কিন্তু আজও সাদিক এলো না,,
ইফাদ অনেক পড়ছে দেখি, ওর সামনে গিয়ে বসলাম আচ্ছা একটা কথা বল তো তুই এত ভাল ছাত্র হলি কখন থেকে?
নিজে নিজে পড়ছিস দেখি,,,
ও বই হতে মাথা উঠিয়ে বলল
----আর বলো না সাদিক ভাইয়া একগাদা পড়া দিয়ে গেছে, নিজে মজা করছে আর আমাকে দিয়েছে সাজা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম
----মজা?? কোথায় মজা করতে গিয়েছে?
---চার দিন এর সফরে গিয়েছে অফিস থেকে।
----ওহহ!! তাহলে এই ব্যাপার?
---হুউম আমাকে নোট করে দিয়ে গেছে গাদাগাদা পড়া।
----ব্রিলিয়েন্ট।।তা তুই কিসের আশায় এত পড়ছিস??
---ভাইয়া একটা গিফ্ট রেখেছে তাই।
----উফ ! আই এম জিনিয়াস। এটাই ভেবেছিলাম।
---আপু তোমার জন্যও কিছু দিয়ে গেছে ও।
----আমার জন্য??
একটু অবাক হলেও পরক্ষণে আমার চোখ চিকচিক করে উঠলো।
---কি দিয়েছে? আর এতদিন বলিস নি কেন??
----ভুলে গিয়েছিলাম।
---খালি নিজের টা মনে থাকে না??
ইফাদ ড্রয়ার থেকে ছোট একটা প্যাকেট দিলো। হাতে নিয়ে খুলতেই দেখি চাবির রিং নিচে ঝুলছে ওলের তৈরি একটা বানর, খয়েরী রঙ এর বানর টা বেশ কিউট কিন্তু এটা কেন দিলো??
----
----আপু তোমার নাকি খুব প্রিয়?
---কিহ!!
আমি রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখছিলাম,,,,ওটা
----এক বাঁদর আরেক বাঁদর দিয়ে গেছে হাহ্।