প্রিয়তা,
জানো মেহেদী রাঙা হাত, মেয়েদের কে আলাদা অলংকারময়ী করে তুলে।"
হাতগুলো নিজেদের মধ্যেই যেন ফিসফিসিয়ে গল্প করে যায়।"
সকালে মেসেজটা দেখেই ভাল লাগার চাইতে বেশি খারাপ লাগলো।
এত বছর ধরে কেউ একজন আড়ালে থেকে আমার সাথে কথা বলে তবে কখনো আমার উত্তর চাইনি।
কখনো প্রশ্নই করেনি,,, কি আজব তার কি কখনওই আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করেনা???
ভালই হলো সে চাইলেও আমি বলতাম না।
বিকেলে ফুল গাছের যত্ন নিচ্ছিলাম, হাত থেকে মাটি ঝাড়তেই শুন্য হাত গুলো দেখতে পেলাম।
সিড়িতে বসে আপন মনে বলতে লাগলাম,
মেহেদী সে তো অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি।
আজও মনে পড়ে সেইদিন হস্পিটালে আমার মেহেদী ভরা দুহাত দেখে কত কেউ আমার জন্য আফসোস করেছে,তাদের চোখের ভাষা আমি স্পষ্ট পড়ে নিয়েছিলাম।
আমার হাতের গাড় রঙ দেখে কত কেউ বলেছিল হবু স্বামী বেশ ভালবাসবে, এখন নিঃসন্দেহে বলতে পারি সবই মিথ্যে রীতিনীতি।
না কেউ ভালবেসেছিল আমাকে আর না কেউ বাসবে।
নিচে গিয়ে সোজা পাকঘরে ঢুকলাম
:
একটুপর ঝালপোয়া আর চা নিয়ে বের হলাম সবার জন্য,ঘরের সবাই কে ডাকলাম খেতে।
আজ নাস্তা করতে করতে পুরো পরিবার মেতে উঠেছিলাম।
মাগরিব এর নামাজ টা সেড়ে বাবার রুমের দিকে যাচ্ছিলাম দরজায় দাঁড়িয়ে গেলাম,,,
মা বলছিলেন বাবাকে,
-----আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাবা খুশি মনে অশ্রু ঝড়িয়ে বললো
----দেখলে আমার মেয়ে কত সুন্দর চা করে খাইয়েছে আমাদের, আমি ওর জন্য দোয়া করি অনেক অনেক দোয়া, তুমি দেখো ও অনেক সুখী হবে,কারো ঘরের বউ হবে একদিন।
সব দুঃখ ভুলে যাবে।
মা বললেন
----আল্লাহ্ তো বলেই দিয়েছেন
----(এবং অবশ্যই আমি তোমাদের কে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা,মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল,ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে তবে,সুসংবাদ দাও সবর কারীদের।(সূরা বাকারা-১৫৫)।
এবার বলো এর চেয়ে বেশি আর কিছু কি বলার আছে??
বাবা বলে উঠলো
----নাহ কিছুই বলার নেই। তবে একটা কথা কি জানো?
---কিহ??
----সুবাহ তোমার চাইতে ভাল চা বানায়।
মা আহ্লাদী করে বললো
---হয়েছে হয়েছে , খালি আমার বদনাম।
ওদের কথা শুনে আমি আড়াল থেকেই আবার ফিরে এলাম।ভাবলাম একটু চা করেছি বলে এত খুশী,আসলেই মেয়েরা শ্বশুর বাড়িতে যে পরিমাণ কষ্ট করে তার সামান্যতম সুনাম ও অনেকেই পাইনা আর মা-বাবার জন্য একটু করলেই তারা অনেক বেশিই বলে ফেলে।সবাই যদি ছেলের বউ কে নিজের মেয়ের মত করে ভাবতো তাহলে মেয়েদের জীবন টা কতই সহজ হত।
উপরে উঠে পড়তে বসলাম,,,
ইফাদ আমার মোবাইল নিয়ে গেইম্স খেলছিল, আমি কিছু বললাম না
হঠাৎ মেসেজের টোন এলো।
আমি সজাগ হয়ে উঠলাম ওর থেকে মোবাইল টা চাইলাম কিন্তু ও কোনভাবেই দিবে না।
আমি কেন যেন খুব দ্রুত রেগে গিয়ে একটা ঠাশ্ করে চড় বসিয়ে দিলাম।
ইফাদ রেগে গিয়ে বললো
----একটু খেলছিলাম, তাও দিলে না
পঁচা বোন।
ভাইয়া ঠিকই বলে তুমি একটা নাঠা,,,
যার কপালে যাবে তার কপাল পুড়বে।
আমি তৎক্ষণাৎ সজোরে আবার চর বসিয়ে দিলাম।
ইফাদের চোখে পানি চলে এলো।
আমি রেগে গিয়ে বললাম
----এইসব শিখাই তোকে না???অভদ্র বেয়াদব একটা।
আমি নিচে চলে যাচ্ছিলাম রুমের বাইরেই সাদিক কে দেখলাম ও কিছু বলতে চেয়েছিল হয়ত কিন্তু আমি দৌড়ে চলে এলাম।
নিজের রুমে এসে আগে মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে বসলাম।
১০০ থেকে উল্টো গুনতে লাগলাম।
২ মিনিট পর শান্ত হয়ে মোবাইল টা হাতে নিয়ে দেখি সিম কোম্পানির মেসেজ।
তারপর অনেক্ষণ ভাবলাম আমি কেন ইফাদ কে মাড়লাম,,,,
আমি কি কিছু লুকাতে চাইছিলাম? আমার মনে কিসের ভয় ছিল??
একটুপর আমি উপরে গেলাম, সিঁড়িপথে ভাবছিলাম ইফাদ কে সরি বলবো।
দরজার কাছে যেতেই শুনতে পেলাম
ইফাদ বলছে
----প্লিজ প্লিজ ভাইয়া আর হবে না,,,,
আর কখনো বলবো না এমন।
দাওনা ভাইয়া,,,,
বুঝলাম ওরা কিছু নিয়ে তর্ক করছিল।
ইফাদ বললো আমি আপুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবো প্লিজ দাওনা ভাইয়া।
সাদিক এর একটাই কথা শুনলাম শুধু
-----বলেই যখন ফেলেছিস তার শাস্তি তো পেতেই হবে এই গেইম্স গুলো দু সপ্তাহ পরে পাবি।।
আর শোন ওকে আমি ছাড়া আর কেউ খারপ বলতে পারবে না বুঝলি।
আমি এক চোখে লুকিয়ে দেখছিলাম সব।
রুমে না ঢুকে বারান্দার রেলিং ধরে আকাশ পানে চেয়ে রইলাম।
সাদিক চলে যাওয়ার পরেই রুমে গিয়ে ইফাদ কে সরি বললাম আর ও আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো
----আপু আমি আর কখনো তোকে খারাপ বলবো না।
পড়ার টেবিলে বসে একটু ব্যস্ততা দেখিয়ে ইফাদ কে বললাম
----কিরে তোর মনে হয় মুড অফ কিছু দরকার ছিল?
ও একটু আহত স্বরে বললো
----ভাইয়া আমাকে গেইম্স গুলো দেই নি।
আজ দেওয়ার কথা ছিল গিফ্ট হিসেবে।বলেছে দুই সপ্তাহ পর দিবে কিন্তু এরপর ই তো আমার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে।
আমি বললাম
----ভাল হয়েছে দেইনি শোন আগে এস,এস,সি টা দিয়ে নে অনেক বন্ধ পাবি,,,,
এখন খেললে তখন আর মজা পাবিনা।অপেক্ষার কিন্তু আলাদা মজা।
ও একটু ভেবে বললো
----আসলেই তো আমি এখন আর খেলবো না।পরীক্ষা শেষে,,,,,,,, উফ্ ভাবতেই মজা লাগছে,তখন কেউ বাধা ও দিবেনা।
রাতে লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম, কানে বেজে উঠলো
----"ওকে আমি ছাড়া আর কেউ খারাপ বলতে পারবেনা।"
ঢং নিজেই সবাই কে বলে বেড়াবে আমি খারাপ আবার অন্যদের বেলায় শাস্তি ও দেই।
দুদিন ভার্সিটি যাই নি,আমার মনে হচ্ছিল কেউ আমার উপর নজর রাখছে।
আমি জানি অনেকেই বিয়ের জন্য হয়ত আমাকে যাচাই করছে।
টেবিলে বসে একাউন্টিং করছিলাম অনেকগুলো অংক তুলতে হচ্ছে এস্যাইনমেন্ট এর জন্য।তার মধ্যে বান্ধুবি কল দিয়ে বললো লাস্ট দুদিন যা করিয়েছে তার উপর একটা ক্লাস টেস্ট ও নিবে।
আজ সারাদিন অংক তুলেছি।।সন্ধ্যায় সব তুলা শেষ করে এবার ক্লাস টেস্ট এর প্রস্তুতি নিচ্ছি।
কল করলাম বান্ধুবি কে
----এই রিমা ৪০৩ নম্বর পৃষ্ঠার ৯,১০ নম্বর অংক গুলো ও কি আছে?
---হ্যা আছে কিন্তু স্যার প্রথম কয়েকটা করিয়ে এগুলো নিজেদের সল্ভ করতে বলেছে, এটাই নাকি ক্লাস টেস্ট নেওয়ার মূল কারণ।
-----আমি কিভবে পারবো? আগের গুলো তো তাও সহজ দেখলাম।
কারো থেকে যোগাড় করে ছবি পাঠা না।
---নেইরে দোস্ত নিজেও পারছিনা।
ফোন রেখে দেওয়ার পর অংক গুলো দেখলাম,,,
না পারছিনা। ভাবলাম গরম ও পড়ছে একটু শাওয়ার নিয়ে আসি,ইফাদ পড়ছে সাদিক এর কাছে।
একেবারে খেয়ে দেয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলাম এবার ঠান্ডা মাথায় অংক করতে বসে আমি অবাক,,,,
আমার সেই ৯,১০ নম্বরের অংক গুলো খাতায় সল্ভ করা।
চারপাশে তাকালাম রুমে এখন আমিই আছি শুধু।
বুঝলাম সাদিক করেছে কারণ ও পড়ালেখাই এমনিও ভাল তাছাড়া আর কেই বা আছে এখানে।
এবার প্রস্তুতি নিলাম কয়েকবার প্রেক্টিস করে উঠে গেলাম, ইফাদ ঘুমিয়ে পড়েছে,,,
বের হয়ে যাওয়ার সময় ইফাদের টেবিলে একটা বই দেখলাম উপন্যাস এর।
ভাবলাম এই বই কোত্থেকে এলো???
কতক্ষণ নাড়াচাড়া করে খুলে দেখলাম।
বাহ,,,!! হিটলার পড়ছে প্রেমের গল্প।
কিন্তু ওর বইয়ের ভাজে একটা কাগজ দেখে অবাক হলাম খুব।