আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম বইয়ের মাঝখানে রাখা কাগজ টা তে আমারই হাতে লিখা ""বানরের গলায় মুক্তো পড়ানো ""
মনে পড়ে গেল সেই ছেলেবেলায় লিখেছিলাম সাদিক এর বইয়ে আর এটা ঐ বইয়ের ই অংশ। সাদিক এর মত একটা ছেলে বই এর পাতা কেটে একটা মোটা ঢালে গাম দিয়ে কাগজ টা সযত্নে লাগিয়ে রেখেছি বুঝতে পারলাম এটা হাড়িয়ে না যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে,এখন কথা হলো কেন??
আমি মুহূর্তেই কেন যেন ওটা কে নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছি মুখে কান্না ঠোটের ভেতর হাসি অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগেছে।
:
বিকেলে জবা এসেছে সেই আগের মত সিঁড়িপথ এ বসে আছি ওর বাচ্ছা কে কোলে নিয়ে।
জবা আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর আমি খেলছি।
ও বলল
----জানিস তুই একটা শ্যামা সুন্দরী, তোর চেহারার দিকে তাকিয়ে যে কোন কেউ ঘন্টা খানিক ডুবে থাকতে পারবে।
ঘন ভ্রুকুটির নিচে টানা চোখ, ইউ শেইপ মুখ,,খাড়া নাখ,ছোট ঠোট হাসলে গালের দুপাশে ভাজ পড়ে আর তোর কোমর অব্দি চুল গোসল করে যখন খোলা রাখতি কি যে সুন্দর লাগতো তোকে,আমি ভাবতাম আমি আর লিলি ফর্সা হয়েও তোর সাথে দাঁড়িয়ে কেন যেন কারও মনে ঘর করতে পারতাম না ছেলেদের আকর্ষণ তুই ই ছিনিয়ে নিতি।
----হাহাহা,,,, হঠাৎ আমার রুপের গুনগান করছিস???
---না ভাবছি তুই এখন ও একইধরনের রয়ে গেছিস আর দেখ আমি বিয়ে করে কি মোটি হয়েছি।
----হাহাহা,,,, ওহ আর ইউ জেলাস,,???
----না রে মোটেও না।
আমাদের সামনেই তখন সিঁড়িতে সাদিক উপস্থিত হলো আমি ওকে দেখে সড়ে গিয়ে উঠার জায়গা দিলাম
সাদিক জবার সাথে ফরমাল কথা বলে রুমে চলে গেল।
জবা আর আমি আবার বসলাম
---কিরে সাদিক ভাই ইফাদ এর কাছে যাচ্ছে?
---হ্যা ইফাদ কে পড়াই।
----ওহ।
---আজ শুক্রবার তাই তাড়াতাড়ি এসেছে।
জবা বললো
----তোর সাথে কথা হয়??
---আরেহ না এখনও আগের মতই, ও ভালভাবে কথা বলে না আমাকে খোঁচাই।
জবা হেসে বললো,,,
----বোকা তুই।
---মানে??
---আমার সবসময় মনে হত ও তোকে পছন্দ করে আর সে জন্যই এত রাগ তোর উপর।
আমি বিরক্তি ফুঁটিয়ে বললাম
----ধ্যাত কি বলিস,,, পছন্দ তো অনেকেই করতো কেউ কি এরকম রুক্ষভাষী ছিল???
পছন্দ করলে তো উল্টো নরম ভাষায় কথা বলতে দেখেছি কত বড় বড় জালেম কে।
----তা ঠিক তবে, প্রতিটা মানুষ আলাদা, হয়ত এটাই ওর ভালবাসার স্টাইল।
----বাব্বাহ্ জবা সাহেবা আপনি তো বিয়ে নয় পুরুষের উপর পি,এইচ,ডি করেছেন।
-----আমার এটাই মনে হয়, জানিনা ও কখনো তোকে বলবে কিনা কিন্তু আমি তো সিউর।
:
পরেরদিন ভার্সিটি তে,,,,,,
আজ নম্বর দিয়েছে ক্লাস টেস্ট এর মজার বিষয় ১৫/১৫ পেয়েছি এস্যাইনমেন্টের ও ভাল নম্বর পেয়েছি।
সাদিক কে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছিল কারণ ফুল নম্বর না পেলে মন টা খারাপ হত এখন আমি পড়ালেখায় ছাড় দেই না আগের মত হলে কিছু যায়ে আসতো না।
বাসায় ফিরে সব কাজ সেড়ে ঘুম দিলাম।
সন্ধ্যায় উঠে নামাজ পড়ে কফি বানালাম দুই মগ, আমি চা খাইনা মাঝে মধ্যে কফি খাই তাও বেশি করে গুড়ো দুধ দিয়ে।
অন্য মগ টা সাদিক এর জন্য মা নাস্তা পাঠাচ্ছিল তখন আমিই করে দিয়েছিলাম।
আজ ভীষণ মেঘলা বৃষ্টি ও হচ্ছে উপরে গিয়ে লম্বা বারান্দাটাই দাঁড়িয়ে ছাতা টা একপাশে রেখে কফি পান করছি।
একটুপর অন্যপাশে ফিরে দেখি সাদিক দাঁড়িয়ে আছে দূরে মগ নিয়ে উল্টো পাশে ফিরে বৃষ্টি দেখছে ।
ও কিন্তু শনিবার আসে না হয়ত এই সপ্তাহে কোন কাজ পড়েছে তাই পুষিয়ে দিচ্ছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম একটা কালো রঙ এর চেক শার্ট এর সাথে আকাশী জিন্স আর কালো সেন্ডেল পড়েছে।
এক হাত পকেটে অন্যহাত মগে।
আমি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে পাশের রেলিং ধরে দাড়ালাম পাশে লাগানো একটা পিলার আর তার কিছুদূর পর সাদিক।
পেছনে ফিরতেই আমাকে দেখল আমি তখন কিছুটা হেলান দিয়ে ওকেই দেখছিলাম
""ভাবছিলাম কত বড় হয়ে গেছি আমরা, সেই তো কিছুদিন আগেই কত ঝগড়া করতাম।
আমার দিকে ফিরতেই আমি সাথে সাথে নড়েচড়ে দাঁড়ালাম।
ও রুমের দিকে চলে যাচ্ছিল আমাকে ক্রস করে ঠিক তখন আবার পিছু ফিরে বললো
----কফি ভাল হয়েছে।
আমি একটু অবাক হলাম, তারপর কয়েক সেকেন্ড পর ওর দিকে তাকালাম।
ও চলে গেল রুমে।
আমি দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম "ও কিভাবে জানলো কফি আমি বানিয়েছি?
এরপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি অন্ধকার নেমে এসেছে ল্যাম্পপোস্ট এর আলোয় বারান্দা আলোকিত আর পাশে রুম থেকেও আলো আসছে আমার পাশে থাকা রেলিং এর সাথে লাগানো পিলারের পাশেই এসে দাঁড়াল সাদিক।
কিচ্ছুক্ষণ মৌনতার পর আমি ওর দিকে না তাকিয়ে বললাম
-----তারপর তোমার ঐ সাদা শার্ট টার কি হলো??
ও একটু পর বললো
----আর কখনো পড়তে পারিনি,
তবে ফেলেও দিইনি।
আমি হাসলাম নিঃশব্দে। ভেবেছি ও বলবে "কোন সাদা শার্ট?
কিন্তু ওর উত্তরে অবাক হয়েছি।
বৃষ্টি কমে গিয়ে ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে আর আমার মাথায় পেঁচানো ওড়নাটা উড়ু উড়ু অবস্থায়।
আমি ওড়নার পাশটুকু শক্ত করে ধরে রেখে জিজ্ঞেস করলাম
----তুমি আমার ঈদ কার্ড টা কেন ছিঁড়েছিলে???
----কার,,,,!! ওহ ঐ জুয়েলের দেওয়া কার্ড টা??
--হুম।
----ঈদ কার্ড পেয়ে খুশি হয়েছিলে তাইনা?
তুমি কি জানতে ও বড়ুয়া ছিল?
আমি হা হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।
----কিহ? ও বড়ুয়া ছিল? বদমাইশ টা কে আমি জিজ্ঞেস ও করছিলাম আর ও আমায় মিথ্যে বলে কার্ড দিল?
---হ্যা।নানী, দাদী তো আর ফর্সা লোক বিয়ে করতে পারেনি তাই লাল দেখে ফাল দিয়েছিলে, যদি তুমি হলেও পারো।
আমি হা হয়ে গেলাম তারপর পিলার টপকে মাথা বের করে ওর দিকে তাকালাম কারণ পাশে থাকলেও ওকে দেখছিলাম না
দাঁতে দাঁত চেপে বললাম
---কিহ?????
ও তখন আমার দিকে তাকাতেই আমার মুখ ফসকে হাসির ফোয়ারা বেড়িয়ে গেল দুজনেই খিলখিল করে হেসে দিলাম।
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবছিলাম জবার কথা,
আচ্ছা সাদিক কি আমাকে পছন্দ করে?
কিন্তু ওর কথায় তো মনে হয় না।সবার ঘরেই একটু পজেসিভ কাজিন টাইপ কেউ থাকেই সাদিক ও এমন ছিল,এর চাইতে বেশি কি হবে??
ওকে আজ বারান্দায় জিজ্ঞেস করেছিলাম
----তুমি আমার সাথে এমন করতে কেন?
ও সামনে তাকাল তারপর আমার দিকে মৃদু হেসে বললো,,,
---আমি ভাল'র সাথে ভাল, আর খারাপের সাথে খারাপ।
আমি চুপ হয়ে ভাবছিলাম এটার মানে কি???
কিন্তু ওর চেহারার দিকে মনোযোগ গেল, ঘন ভ্রু, বড় চোখ ঠোটে হালকা গোলাপি আভা, মায়াবী লাগছে নাকি সুন্দর বুঝিনি। গাধামো করে সব ভুলে গিয়েছি এখন মনে পড়লো ও আমাকে খারাপ বুঝিয়েছে।
তারমানে কি??সে আমাকে খারাপ বললো আর আমি চুপ ছিলাম।