আমি এবার পড়ালেখায় মনোযোগ দিলাম, দিন যায় রাত আসে। প্রতিদিন সাধারণ ভাবেই দিন টা কাটে, এখন আর চঞ্চলতা কাজ করেনা আমার ভেতর। মা হতে না পারা টা আমাকে দ্রুত বড় করে দিলো,এখন আর বাচ্চামি করিনা করবো ও বা কিভাবে?
এত কম বয়সে জীবন আমাকে এত বড় শাস্তি দিয়ে দিলো।
আমি ক্লাসে যেতাম পরীক্ষা দিতাম রেগুলার।
ঘরে বেশির ভাগ সময় ই পড়াতে মন দিতাম কারণ আমি ছাত্রী ভাল ছিলাম তবে কখনো আহামরি রেসাল্ট করিনি হয়তো এতো মনোযোগ দেই নি এখন নিজেকে ব্যস্ততায় ডুবানোর জন্যই এটা করা।আমি পুরো একবছর কোন আত্মীয়র বাড়ি কিংবা বিয়েতে যাইনি।
প্রথমবার আমার ভার্সিটি রেজাল্ট এ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি,,,,
ক্লাসে টপ হয়েছি আমার অনেক খুশি লেগেছে সাথে পরিবার এর সবাই ও খুশি।
মা যখন আত্মীয় স্বজন কে বলতো সবাই প্রথমে খুব খুশি দেখাতো কিন্তু শেষ লাইনটা হতো এমন
----এত ভাল রেজাল্ট করল, আহারে এত সুন্দর মেয়েটার কি হবে ভবিষ্যৎ?
যদি ভাল উপার্জন ও করতে পারে কিন্তু খাওয়াবে কাকে?
এমন কথা গুলো প্রায় কানে আসতো, বুঝতাম না আসলে মানুষ কি চাই?
সবাই কি আমার দুঃখে দুঃখিত হতো নাকি বেচারি বানিয়ে মনে মনে আনন্দ পেতো।
অসহ্য একটা বেদনা যা আমার পিছু ছাড়ার নয়।
ভেবেছিলাম সময়ের স্রোতে আমার দুঃখ ও ঘুচে যাবে কিন্তু না আমার বেলায় তা হইনি কেউ কখনো আমাকে ভুলতেই দিতনা।
এভাবে প্রায় দিন যেতে যেতে আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছিলাম।
জবা আর লিলির ও বিয়ে হয়ে গেছে ওরা এখন এই বাড়ির মেহমান। আসা যাওয়া করে আমার সাথে সময় কাটাই যখনি বেড়াতে আসে।
প্রাইভেট ভার্সিটি হওয়াতে আমার ছুটি কম থাকে রেগুলার ক্লাস পরীক্ষা এসবেই দিন কেটে যায়।
এর মধ্যে মাঝে মাঝে ঐ নম্বর টা থেকে মেসেজ আসতো তবে আমি কখনওই জবাব দেইনি কিংবা খোঁজার আগ্রহ দেখাইনি যেমন টা ছিল ওভাবেই রেখেছি তাকে।
তবে একটা কথা না ভেবে পারতাম না ঐ মানুষ টা আমাকে প্রিয়তা কেন ডাকতো? সে কি আমার নাম জানে না?
যে আমার দুঃখ জানে তার কাছে আমার নাম জানা টা কি কোন ব্যাপার?
আমি ভাবতাম আমি কি তার প্রিয় কেউ?
প্রিয়তা নামটা তে একটা আপন আপন ভাব,খুব বেশি ভাল না লাগলে কিন্তু আমরা কোন কিছু কে প্রিয় বলিনা।
উপরের সিড়ি দিয়ে উঠে আমাদের লম্বা বারান্দা সাথে দুটো রুম একটা তে আমার ছোট ভাই থাকে এবং অন্যটা তে বড় ভাই। ছোট ভাই এর রুমে আমাদের দুজনেরই পড়ার টেবিল আছে আলাদা। রাস্তার পাশেই সবার আগে আমাদের ঘর।তাই বিকেল কিংবা সন্ধ্যার পর দোতলায় খোলামেলা বারান্দায় খুব ভাল লাগে।আগে জবা আর লিলি কে নিয়ে সিঁড়িতে বসে থাকতাম,,,,, লাগানো একটা আমগাছ যেটার গোড়া রাস্তার পাশে।
আমাদের বাড়িটা বড় অনেকগুলো ঘর আবার মাঝে খেলার বিরাট উঠান শহরে এখন এমন টা খুব কম দেখা যায়।
যাই হোক আমি বিকেলে উপরে উঠলাম , আজ বসন্তের একটা সুন্দর দিন খোলা আকাশ টা একেবারে নীলে ভরে গেছে ছোট ভাইয়ের রুমে ঢুকে হাতে একটা গল্প বই নিয়ে বসে পড়লাম কিছুক্ষণ পর মাগরিব এর নামাজ পড়তে চলে গেলাম।
আমি আঙুলে তসবিহ গুনে গুনে উপরের রুমে ঢুকতেই দেখি ছোট ভাইয়ের টেবিলে মাস্টার এর চেয়ারে বসা সাদিক, ও মাথার পিছনে দু হাত রেখে চোখ বুঝে হেলান দিয়ে আছে ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে,,,,ফরমাল পোশাকে বসে আছে, গায়ে হালকা আকাশী শার্ট আর খাকী প্যান্ট,হাতে ঘড়ি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক গরম লাগছে ওর। কেমন ঘেমে আছে।
আমি ওকে দেখে আর হিজাব খুললাম না,,,,পেছনে পাশ কাটিয়ে আমার টেবিল এ চলে গেলাম তারপর দেখি আমার ছোট ভাই ইফাদ এসে পড়তে বসলো সাদিক এর সামনে।
বুঝলাম বাবা হয়তো ইফাদ এর জন্য সাদিক কে ঠিক করেছে।
ইফাদ সামনে এস,এস,সি দিবে।আর আমাদের পাড়াই সাদিক পড়ালেখায় সবচেয়ে ভাল, এখন ভাল একটা কোম্পানি তে জব করে। ছাত্র থাকা কালীন টিউশনি করতো অনেক, অভিভাবক রা নিজেই ওর কাছে যেত।
ওর সাথে আমার পরেনা তাই আমরা সৌজন্যমূলক কথা ও বলিনা বিশেষ করে ঐ দিনের পর থেকে তো একেবারেই না,,,,,,ওকে আমি দেখি প্রায় একই বাড়িতে হওয়ার কারণে কিন্তু কথা বলিনা।
গল্পের বইটা পড়তে পড়তে, আমার পাশে থাকা জানালার বাইরে চোখ গেলো হালকা বাতাস হচ্ছে, আমের ডালি দুলছে অনেক মুকুলে ভরা, আমার জেঠাদের আম গাছ ইয়া বড় কিন্তু আমগুলো খুব টক তাই আমার খেতে আগ্রহ হয়না,,,তবে আকাশে একটা রুপালী চাঁদ দেখা যাচ্ছে আর বাতাসে কেমন ফল ফুলের খুশবো।
এবার ফিরে তাকালাম ঘরে,হঠাৎ মনে হলো সাদিক এতক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল কিন্তু এখন ফিরে গেছে।
আমি বইটা মুখের সামনে রেখে আড়িচোখে তাকাচ্ছি ওর দিকে সন্দিহান ভাবে।