সাদিকের কোন প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে আমি আবার গল্প পড়ায় মন দিলাম।
একটুপর দেখি মা নাস্তা পাঠিয়েছে রানীর দিয়ে।
রানী যাওয়ার আগে বললো "আফু খালাম্মা আপনারে নাস্তা করতে ডাকে।
আমি কিছু না বলে হ্যা সূচক মাথা নাড়ালাম, একটু পর বইটা রেখে দিয়ে
নিচে যাচ্ছিলাম পেছন দিয়ে পাশ কেটে যেতেই শুনতে পেলাম
"কোথায় এই বয়সে মা বাবা কে চা বানিয়ে খাওয়াবে তা না উল্টো দেখছি মহারানী কে ডেকে খাওয়াতে হয়।
আমি ওর কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেলাম,দেখি
ইফাদ অংক করছে আর মিটমিট করে হাসছে।
আমি সাদিক কে উদ্দেশ্য করে বললাম
"কি বলেছ তুমি?
সাদিক আমার দিকে না তাকিয়ে বললো
----রিপিট করার সময় নেই,
ইফাদ শোন পরের বার না বুঝলে মাথার পাশে আঙুল দিয়ে স্ক্রু ঘুরিয়ে রিভাইন করে নিবি আর যদি সাউন্ড কম মনে হয়ে ভলিউম টাও একটু বাড়িয়ে নিবি, বুঝলি???
---জ্বি ভাইয়া।
----সো এতক্ষণ আমরা কোথায় ছিলাম?
ইফাদ অনেকটা হাবলা হয়ে তাকাল
----অ অংকে??
----হুউম গুড কর কর।
আমার খুব রাগ লাগলো কিন্তু কিছু বলার সুযোগ পাইনি,,,
থমথম করে নেমে গেলাম নিচে।
নাস্তা করতে করতে ভাবলাম এই ইডিয়েট টা মনে হয় আমার বিরুদ্ধে লাগার জন্যই জন্ম নিয়েছে, আমি না থাকলে ওর জন্মই বৃথা যেতো।
:
পরেরদিন ভার্সিটি থেকে এসে বেশ লম্বা একটা ঘুম দিলাম নিচে বসেই টিভি দেখছিলাম উপরে যাইনি আজ।
একটু পর মা দেখি নাস্তা পাঠাচ্ছে, রানী ট্রে হাতে নিয়ে উপরে চলে গেলো।
আমি বুঝলাম সাদিক আছে। মা কে জিজ্ঞেস করলাম
----হঠাৎ পুরানো টিচার বাদ দিয়ে সাদিক কে কেন রাখলে?
মা বললো
----আরেহ আগের মাস্টার সপ্তাহে ৩ দিন আসতো তাও আবার গ্যাপ দেই, ইফাদ তো মহা খুশী কিভাবে না পড়ে বেঁচে যাবে।
তাই তোর বাবার রিকোয়েস্টে সাদিক পড়াতে রাজি হয়েছে তাও আবার ৫ দিন।
---ওহ!
আর কিছু বললাম না, আজ আর উপরেও যাইনি ও থাকাকালীন।
এভাবে প্রতিদিন সাদিক আসে পড়াতে, আমি মাঝে মাঝে উপরে চুপচাপ পড়ি কোন কথা বলিনা ও আর কোন কথা বলেনি তবে চুপিচুপি এক আধবার তাকানো হই দুজনেরই।
একদিন আমি উপরে পড়ছিলাম ইফাদ ও পড়ছে আর সাদিক মোবাইল এ কি যেন দেখছিল এমন সময় বিদ্যুৎ চলে যায় বাইরে দমকা বাতাস তুফানের মত বালু ছড়াচ্ছে বুঝলাম সে কারণেই বিদ্যুৎ নেই,,,আমি জানালার সামান্য ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম বাইরে তবে এল,ই,ডি বাতি জ্বলছে
নীরবতায় হঠাৎ ইফাদ বলে উঠলো"
----সুবাহ্সাদিক।।।আচ্ছা ভাইয়া এটা সকালের কোন সময়টা কে বলা হয়?
আমার কানে বারি লাগতেই কান খাড়া করলাম।
সাদিক বলে উঠলো কিহ,,,???
ইফাদ বললো,,
----নাহ মানে আমার খুব সুন্দর লাগে শব্দ টা সুবা্হসাদিক কেমন একটা পবিত্রতা আছে এটাতে তাই না।
মনে হয় যেন ভোরে আল্লাহতালার সাথে সবার আগে দেখা করার /কথা বলার একটা সুন্দর সময়।
সাদিক ওর কথা শুনে একটু থতমত খেয়ে বললো "
----ক'দিন পর এস,এস,সি দিবি আর এখন এসব প্রশ্ন করছিস, গাধা,,,!!!
তোকে এখন সুবেহ্সাদিক এর অর্থ বলবো???
আমিও খুশি হয়েছি ওকে ঝেড়ে দেওয়াতে "বোকা একটা।
ইফাদ বললো
----বারেহ আমি কি করলাম? বাংলা বই এ পেলাম এখন, জানই তো এখন সৃজনশীল এ সব ভাল করে পড়ে যেতে হয় কখন কি প্রশ্ন করে।
সাদিক তারপর আমার দিকে এক আধটু তাকিয়ে বললো।
----আর ওটা কে সুবেহ্সাদিক বলে।
----ঐ একই কথা আর কি। (ইফাদ)
সাদিক ওর গায়ে চাপড়ে বললো
---পড় এবার,,,,,
আমি এপাশ ওপাশ তাকিয়ে আবার পড়ায় মনোযোগ দিলাম।
:
আজ বাসায় আছি ছুটির দিন, গোসল করে একটা হলুদ জামা পড়েছি, আমার এক বোন বলে হলুদেই নাকি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে,হাতে লাল হলুদ চুরি পড়েছি কেন জানিনা আজ খুব সাজতে ইচ্ছে হলো।অনেকদিন কোথাও যাই না তাই সাজা ও হয়না।
উপরে উঠে রোদেলা দুপুরে টেবিলে বসে কলম ঘুরাচ্ছিলাম, আসলে মনে মনে কিছু ভাবছি।
ইফাদ কে বললাম
----আচ্ছা তোর ফাইনাল কবে রে?
ও ভেজা চুল মুছতে মুছতে বললো
-----ছয় মাস আছে আর।
----ওহ,,,ভাল করে পড়। এ প্লাস মিস দিবি না,,, আর আমার হেল্প লাগলে বলিস।
ও বলে উঠলো
----না, না দরকার নেই ভাইয়া যা পড়াই না,,,,আগে ভালই ছুটি ছিল এখন তাও নেই।
ইফাদ দুপুরে খেতে নিচে গেলো আর আমি রুমে একা একা বই খুলে বসে আছি পড়ায় মন নেই শুনেছি জবার একটা বাবু হয়েছে।
হঠাৎ আজ এতদিন পর ভাবলাম আমার বিয়েটা যদি হয়ে যেত সেদিন তাহলে এতদিনে নিশ্চয় আমি অন্যের ঘরে থাকতাম। এতদিনে নিশ্চয় মানুষ টাও বিয়ে করে নিয়েছে।
রুমের বাতিটা কেমন যেন মিটমিট করছে, দিনের বেলায় খুব একটা দরকার নেই বাতির তবে একটু পর তো লাগবেই।
আমি ইফাদ এর টেবিলের উপর আস্তে করে উঠে বাতিটা খুলছিলাম, আমার ইলেকট্রনিক যে কোন কিছু ঠিক করতে ভাল লাগে,,,
ওখানে দাড়িয়ে বাতিটা আবার ফিট করতেই,,,,,,
রুমের ভেতর ধুপ করেই ঢুকলো সাদিক,,,,
ও আমাকে হঠাৎ করে এভাবে টেবিলের উপর আশা করেনি হয়ত তাই ভয়ে কিংবা আকষ্মিকতাই মুহূর্তেই
আহহহহহহহ্ করে শব্দ করে উঠলো।
আমিও কিছু না বুঝে চেঁচিয়ে উঠলাম জোরে
----আহহহহহহহহহহহ।।।।
ফলাফল ঘরের সবাই দৌড়ে উপরে উঠে এলো।
কিছুক্ষণ পর যখন সব স্বাভাবিক হলো।
আমি আমার টেবিল থেকে কোণা চোখে ওকে দেখছিলাম মুখটা বানিয়ে
আর ও মুখ টিপেটিপে হাসছে,ইফাদ এর টেবিলে বসে।
ইফাদ পড়ছে আমিও লিখালিখি করছি।
ভাবছি আজ ও হঠাৎ করে এভাবে এসে পড়বে আমি ভাবতেও পারিনি তাছাড়া আজ বন্ধের দিন, ও তো না আসার কথা।
সাদিক যাওয়ার আগে দাঁড়িয়ে বললো
----জানিস ইফাদ, আজ তো আমি হার্ট ফেইল হতে হতেই বেঁচে গেলাম, রুমে ঢুকা মাত্র দেখলাম এক লম্বা ভূত দাঁড়িয়ে আছে মাথার উপর কিন্তু পরে নিশ্চিত হলাম ওটা তো কোন পেত্নি ছিল যে আরেক পেত্নির উপর ভর করেছে ,,,
ইফাদ আর সাদিক খিলখিল করে হেসে উঠলো,,,,,
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ও গুনগুন করে বললো,,,
অমন করে সাজলে তো ধরতে ইচ্ছে করবেই,,,,
আমি তো শুনেছি ইফাদ খেয়াল না করলেও,,,,
রেগে বললাম
----কিহহহ্????
ও বললো
--- না মানে জ্বীন, ভূতের আর কি।।।।।
সাথে সাথেই বললাম বাবা মাস্টার রাখেনি বদমাইশ রেখেছে,,,হাহ্।
বলেই থমথম করে নেমে গেলাম আর ওরা দুইজন তখনও হাসছে জোরে জোরে।
:অনেকদিন পর মেসেজ এলো
""প্রিয়তা জানো সৌন্দর্যের আরেক নাম কি?
আমিই বলে দিই "রঙ"
সব ধরনের রঙ কথা বলে।""
"""""নিরাশ হয়োনা, দুঃখিত হয়োনা,তুমিই জয় লাভ করবে, যদি তুমি বিশ্বাসী হও।[আল-ইমরান:১৩৯]।
সবকিছু ভুলে গিয়ে ঠোটে হাসি ফিরে আসে আমার।
:
ছুরি নিয়ে সবজি কাটতে বসেছিলাম,, আনমনা হয়ে ভাবছিলাম সেই আগের কথা তখন বয়স ছিল ১৬।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম একদিন, নিচে দেখলাম সাদিক কে সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পড়ে একেবারে সং সেজে কোথায় যেন যাচ্ছিল,আমার এক কাজিন এর সাথে দাঁড়িয়ে আলাপ করছে,,,,,
আগেই বলেছি আমাদের ঘর একেবারে ঢুকতেই সুতরাং রাস্তায় বের হতে কিংবা ঢুকতে আমাদের সামনেই যেতে হয়।
আমি আর দেরি না করে এক বোতল ময়লা পানি নিয়ে এলাম। প্রায় আর্ট করতাম সেই সুবাদে ময়লা পানির অভাব হতো না।
অপেক্ষা করছিলাম,নিচে ও আমার বরাবর আসতেই বোতল দিলাম কাত করে জবজব করে রঙিন হয়ে গেলো সাদা শার্ট,, একটা পৈশাচিক আনন্দ পেলাম কিন্তু দুঃখের বিষয় উপরে তাকিয়ে আছে দুটো মুখ আমার দিকে, অপরজন আমার বাবা।
আমার মুখ হা হয়ে গেলো বাবা কেও ভেজা দেখে,,,,
দিলাম একটা দৌড়, সারাদিন লুকিয়ে ছিলাম সেদিন আর ভাত,চা ও খাইনি।
এরপর বাবা শাস্তিসরুপ কান ধরে উঠবস করিয়ে ছিল পঞ্চাশ বার।
বাবা ভেবেছিল অজান্তেই পানি ফেলতে গিয়েছিলাম, সত্যিটা জানলে না জানি কি করতো।
তবে শান্তি লেগেছিল মনে,চরম একটা প্রতিশোধ নিয়ে,,,,
বেচারার সাদা শার্ট,,,,আহা;;;;;;
তবে ও কোন বেচারা ছিলনা আমার এই কাজ টার পেছনে ওর ও হাত আছে,,,,
এমনি এমনি তো আর শাস্তি দেইনি।