আমার বয়স যখন ১৩ কি ১৪ বছর চলছিল জবা, আমি, লিলি তিন প্রাণপ্রিয় বন্ধু মিলে বাড়ির একটা বড় মেহেদী গাছের ডালে বসে লবন মরিচ দিয়ে তেঁতুল খাচ্ছিলাম আর গানের সুর মিলাচ্ছি,,,,
বিকেলে তখন একটা তরুণ মাস্টার আসতো জবা দের ঘরে,,,
জবা তো গাছ থেকে নেমে দিলো দৌড় মাস্টার কে দেখে, মাস্টার তখন ডালে ডালে জ্বল খাচ্ছিল আমার দিকে চেয়ে চেয়ে,,,,
আমি বুঝলেও পাত্তা দিতাম না নতুন নতুন বড় হচ্ছি যে কারো নজরে পড়তেই পারি।
কিন্তু হঠাৎ সামনে তেড়ে এসে উপস্থিত হলো সাদিক,,,,
লম্বা দেহ,গোলগাল মুখ, উজ্জ্বল শ্যামলা রঙ, ঘন ভ্রুজোরা আর চোখ দুটো বেশ বড়।
ওর বয়স তখন ১৮ হবে সবে কিশোর থেকে তরুণে পদার্পণ করেছে।
তার রাগান্বিত চোখ দেখে তো আমরা শেষ আমাদের কে গাছ থেকে নামিয়ে আমার কান টা ধরে নিয়ে গেলো ঘরে,,,
মা কে মামী মামী বলে ডেকে এলাহি কারবার করলো,,,
মা কে ডেকে আঞ্চলিক ভাষায় বললো' "আমি নাকি ঐ মাস্টার এর সাথে ফিল্ডিং মারছিলাম গাছের আবডাল থেকে।
সেইদিন মায়ের সামনে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গিয়েছিল।
আমরা একই বাড়িতে থাকতাম সম্পর্কে ও আমার ফুফাতো ভাই লাগে,,,,,
ওকে দেখলেই আমার গা জ্বালা করতো, না এখনো করে।
ঐ চামচিকা বাঁদর টা আমার ঘোর শত্রু ছিল, একবার বাড়িতে এক চাচাতো বোন এর বিয়ে ছিল,,,
বিয়েতে কত ছেলে পেলে আসবে একটু হাসাহাসি একটু চোখাচোখি তো হতেই পারে,
এক ছেলে অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করে, যাওয়ার বেলায় কাগজে লিখে একটা নাম্বার ছুড়ে দিলো।
আমরা তিন বান্ধুবি হাসাহাসি করছিলাম হাতে কাগজ টা খুলে দেখছিলাম হঠাৎ মনে হলো আড়াআড়ি ভাবে পাশে কারো বড় চোখের দৃষ্টি পড়েছে,,,,
আর দেরি না করেই সাদিক আমার হাত থেকে কাগজ টা নিয়ে চলে গেছে সোজা আমার বড় ভাইয়ের কাছে।
উফফ কত কত লজ্জা যে এই সাদিক দিয়েছে আমাকে।
ও আমার সাথে কখনোই ভাল ভাবে নরম সুরে কথা বলেনি।
আমি যেন ওর চোখের বালি।
কতবার জবা,লিলি আর আমাকে মায়ের হাতে মার খাইয়েছে বাঁদর টা।
এরপর একদিন আমরা একটা সিদ্ধান্তে এলাম ছোট মাথায় ছোট বুদ্ধি আমাদের।
জবা আর লিলি বললো
----সাদিক ভাই মনে হয় তোকে পছন্দ করে।
আমি বিষ্ময় নিয়ে তাকালাম,,
---কিহ!!!
ওরা বললো,,
----হ্যা হতে পারে এটাই।
আমি বললাম,,
----পছন্দ করলেও তাতে আমার কি??
লিলি বললো
---মনে কর ওর সাথে একটু নরম সুরে কথা বলবি তাহলে হয়তো ও আর আমাদের পথের কাটা হবে না।
---ছিঃ ঐ চামচিকার সাথে আমি কথা বলতে যাব? প্রশ্নই উঠেনা।
একদিন সন্ধ্যা বেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলো এটা অবশ্য নতুন কিছু না গরমের দিনে প্রায় এমন হয় আর আমরা তো তখন মহাখুশি, ঘর থেকে সবাই বের হয়ে পরতাম সবার ঘরে এখন এর মত আই,পি,এস ও সচরাচর ছিল না।
আমরা উঠোনে বসে চাঁদের আলোয় আড্ডা দিতাম আর পিচ্চিরা অনেক খেলা করতো।
তো সেদিন জবা আর লিলি আমাকে বললো ঐ দেখ দোতলায় সাদিক ভাই বসে পড়ছে
---তো???
---সুবাহ তুই গিয়ে ওর সাথে একটু কথা বলে দেখনা আসলেই কি ওর মনে তোর জন্য কিছু আছে?
----উফফ থাকুক আর না থাকুক তাতে আমার কি??
জবা বললো
---সাদিক ভাই দেখতে কত সুন্দর কিন্তু ব্যবহার এত খারাপ কেন বুঝিনা।
আমি মুখ বাঁকিয়ে বললাম
----হাহ্ সুন্দর না ছাই,, ওর মুখে মধু নাই।
তারপর শেষমেশ আমি ওদের ঘরে দোতলায় গেলাম
পড়ার টেবিলে পড়ছিল ও।
আমি ওর সামনে গিয়ে কতক্ষণ ওকে দেখলাম, মোমের আলোতে মুখটা লাল লাগছে গুনগুন করে পা নেড়ে নেড়ে বই পড়ছে টেবিলে, চোখের পাপড়ি গুলো এই লম্বা,,,
মাথা তুলে ডাগর ডাগর চোখে আমাকে দেখে কড়া ভাবে বললো
---এইখানে কি... হুম?
আমি একটু নরম সুরে বললাম
---ভাইয়া তোমার কি পরীক্ষা আছে?
---হুউম।
আমি বিড়বিড় করে বললাম তাই তো বলি বাঁদর এত সোজা হলো কি করে?
----কি বললে??(ক্ষেপে গিয়ে)
---কই কি বললাম?
আমি একটু মিষ্টি হেসে বললাম
---তুমি না অনেক ভাল, শুধু শুধুই তোমাকে ভুল বুঝি।তুমি আমার সাথে এমন করো কেন?
ও আবার তাকিয়ে মুখ খেঁচে বললো তোর মত বাঁদরীর সাথে এমন ই করা উচিত।
আর এখন জা তো এখান থেকে,,,,
আমি মিনমিনিয়ে বললাম
----অরণ্যরোদন করতে এসেছিলাম হাহ্।
।
----কি বললে তুমি??
ঐ সময় ওর মা ওকে ডেকেছিল আর ও রুম থেকে বের হতেই আমি কলম নিয়ে বই এ লিখলাম "মানে বানর এর গলায় মুক্তো পড়ানো। "
খিক খিক করে হেসে পালাচ্ছিলাম কিন্তু পাজি টা দরজায় এসে হাজির ।
আমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম,আসলে একে তো বিদ্যুৎ নেই তার উপর একটা অপরাধ করে পালাচ্ছিলাম তাই হয়তো ঘটনার আকষ্মিকতায় ভয় পেয়েছিলাম বুকে থু থু ছিটে দিয়ে দৌড় দিলাম।
:::::::::::::::::::::::::::
যাই হোক ওসব ছেলেবেলার কথা।এরকম শতশত ব্যাপার জড়িয়ে আছে স্মৃতিতে।
আমার বর্তমান টা বেশ খারাপ যাচ্ছে, নিজেকে আর নারী মনে হয় না এখন, হবেই বা কি করে মা না হওয়া নারী আর পুরুষের মধ্যে পার্থক্য কি?
আবার এমন ও হতে পারে এটা কেবল আমার ধারণা।
এসব ভেবে প্রতিরাতে চোখের জল ফেলি দিনের বেলায় তো আর পারিনা তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখি বই পড়ে।
ভার্সিটি যাওয়া হয়নি তবে বন্ধুদের থেকে খবর নিয়েছি সামনের মাসেই পরীক্ষা তাই প্রস্তুতি নিচ্ছি।
রাতে বাবা ফিরেছে ঢাকা থেকে আমার অপারেশন এর পর পরই বাইরে যেতে হয়েছিল কাজে।
আমার সাথে বাবার আর তেমন কথা হয়নি, বাবা এখন চোখ লুকিয়ে রাখে আমার থেকে হয়তো বিয়ের আগে সেদিনের কথা গুলো মনে পড়ে বলে।
:
আমি বাবা কে বলেছিলাম ওদের বলে দিতে কিন্তু সেদিন বাবা আমাকে যুক্তি দেখিয়ে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতে বলেছিল,তাই আমিও আর বাবার অবাধ্য হইনি, তবে ভাগ্যের কাজ ভাগ্যই করে দিয়েছে।
পাত্রের বাবা-মা নিজের দ্বায় সাড়াতে পিছু হাটেনি,এমন মেয়েকে কেউ চাইনা হয়তো আমিও চাইনা।
এখন মেনে নেওয়াটা খুব সহজ না হলেও বলতে হয় সহজ কিন্তু বিয়ের পর অবহেলা টা মেনে নেওয়া অসম্ভব।
এখন আমার জীবনের লক্ষ্য আর বাকি মেয়েদের মত নয়,,নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে, জানি আমি কখনোই পরিপূর্ণতা পাব না কিন্তু পরিশেষে এভাবেই ভাল থাকাটা শিখে নিতে হবে আমাকে।
হঠাৎ মোবাইল এ টুং করে শব্দ হলো
আমার একটু ও দেখতে ইচ্ছে করছিল না, জানি সিম কোম্পানি হবে।
আরও একটুপর মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি স্ক্রিন এ অপরিচিত নাম্বার এর মেসেজ ভেসে উঠেছে।
আমি ঝাপসা চোখ দুটো মুছে মেসেজ ওপেন করলাম
""আমার প্রিয়তা,
দুঃখ কোরনা আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।[তাওবাহ-৪০]
আল্লাহ কি তার বান্দাহর জন্য যথেষ্ট নন?[আয-যুমার-৩৬]
আমি আবার মুগ্ধ হলাম কে এই মানুষ? এত সুন্দর করে স্বান্তনা দেয় আমাকে। সে কি আমার পরিচিত কোন নারী?
নাকি কোন,,,,,,,,,,
না, না আমি আমার জীবনে আর কোন পুরুষের ছায়ার মায়াতে পড়তে চাইনা,হোক সে আমার কোন শুভাকাঙ্ক্ষী।
একরাশ দুঃখ দেখা দিলেও মেসেজ টার আয়াত গুলোতে চোখ পড়তেই আবার ভাল লাগলো।