জ্ঞান ফিরতেই হস্পিটালের বেডে ভর্তিরত অবস্থায় অঝোর ধারে চোখের পানি বেয়ে পড়ছে,,,,
হাত ভর্তি মেহেদী হলুদ চুড়ি, শাড়ি পরিহিতা আমি গায়ে এখনও কাঁচা হলুদের গন্ধ খোপায় রজনীগন্ধা। না কান্নাটা পেট ব্যাথায় না ঘন্টা খানিক আগেও আমার গায়েহলুদ চলছিল কিন্তু হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেলো,,,,
বিয়ে বাড়ির শোরগোল এর মাঝে স্টেইজ এই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম আমি,,,,সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো একি বউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো কেন,,,
একটু আগে আমার জ্ঞান ফিরেছে, বাবা গোমরা মুখে এসে জিজ্ঞেস করলো
-----সুবহা,,, মা কেমন লাগছে এখন?
'আমি অশ্রু চোখে চেয়ে বললাম
----বাবা বিয়েটা কি হচ্ছে না আর?
বাবা অন্যদিকে ফিরে গেলো,,,,বুঝতে পাড়লাম বাবার চোখে পানি আর আমার বিয়েটাও সম্ভব নই,ডাক্তার জবাব দিয়েছে আগামীকাল কেই আমার অপারেশন করতে হবে।
আর অপারেশন এর দরুন আমি আর কখনোই মা হতে পারবো না।
ঘটনাটা প্রথম জানতে পেরেছিলাম আমার বাগদান এর পর। আমার বিয়ের কথা বার্তা প্রায় পাকাপাকি তারিখ ও পড়ে গেছে,
আমি সবে মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি এরই মধ্যে মামা একটা ভাল প্রস্তাব পেয়ে বাবা কে বলেছিল, আর সব ঠিকঠাক দেখেই বাবা ও রাজি হয়ে যায় আমার সম্মতিতে।
কিন্তু সপ্তাহ খানেক পর একদিন প্রচন্ড পেট ব্যাথা শুরু হয়ে যাই আমার, ব্যাথার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে,দাঁতমুখ খিঁচে অজ্ঞান হয়ে পড়ি আমি।
পরে হস্পিটালে কিছু টেস্ট করিয়ে জানতে পারি তলপেটে বড় টিউমার আমার, যা অপারেশন ছাড়া সাড়বে না,আর টিউমার এর অবস্থান এমন জায়গায় যে,অপারেশন করলে আমার পক্ষে কখনোই মা হওয়া সম্ভব না।
কিন্তু বাবা যখন ডাক্তার কে আমার বিয়ের কথা জানাই তখন তিনি আশার কিরণ দেখিয়ে বলেছিল, উনি আমাকে কিছু ওষুধ দিবেন যা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে আর আমি যদি এরই মধ্যে একবার মা হতে পারি তাহলেও হবে, তবে অপারেশন এর আগেই এটা সম্ভব কিন্তু এই চান্স এর পার্সেন্টেইজ খুবই কম।
আমি বাবা কে বলেছিলাম বর পক্ষকে বলে দিতে কারণ আমি কাউকে ধোকা দিতে চাইনা।এত বড় সত্য লুকালে আল্লাহ হয়তো আমাকে ক্ষমা করবেন না।
বাবার মনে মেয়ের প্রতি ভালবাসা হয়ত দূর্বল করে দিচ্ছিল।নিজের মেয়েকে মা হতে দেখার ইচ্ছেটা হয়তো সে ফেলতে পারেনি।
বাবা আমাকে এসে বলেছিল
----সুবহা,,
---বাবা তুমি বলেছ ওদের সব?
---মা দেখ ডাক্তার বলেছে তুই একেবারে ঠিক হয়ে যাবি এখন ও ৫০% চান্স আছে,,,,
বাবা হয়ে আমি তো হাড় মানতে পারিনা রে,,,নিজের মেয়েকে বিনা চেষ্টায় কিভাবে সব শেষ করতে দিই বল?
আর আমি বলেছিলাম,,
এরপর এর কথাগুলো আর মনে করতে পারছিনা এখন খুব দ্রুত ঘুম চলে এলো ইঞ্জেকশেন এর কারণে,,,
যা লিখা ছিল কপালে তাই হলো আমার বিয়ের দিন অপারেশন ছিল, বিয়েটা আর হয়নি হয়তো বা আর হবেও না।
পুরো এক সপ্তাহ পর বাসায় ফিরেছি আমি,,,
জীবিত লাশের মত,কিছুই ভাল লাগছেনা এক একটা ঘন্টাও অনেক মাস এর মত লাগছে আমার।
হাসিখুশি যেন কেবল একটা পুরানো কথা আমার জন্য।
মনের অবস্থা খুবই করুন বিয়ে ভেঙেছে বলে নই, কখনো নিজের মত চেহারার একটা বাচ্চা দেখব না বলে।
আরও কিছুদিন কেটে গেলো আত্মীয় স্বজনরা ও ঘরে ভীর করছিল।
কিছুই ভাল লাগছিল না আমার বিছানায় পরে আছি,
এরই মধ্যে আমাকে দেখতে এলো সাদিক।
সাদিক পাশে বসে বললো রাগী দৃষ্টিতে,,,
---খুব তো ঢেং ঢেং করেছিলে বিয়ের জন্য,,, নিশ্চয় আশা মিটেছে??
এবার একটু পড়ালেখাতে মন দিয়েন, যা রেসাল্ট আপনার,ভাগ্যিস বিয়ের সময় রেসাল্ট দেখা হয়না।
ওর কথা শুনে আমার গায়ে আগুন লেগে গেলো এরকম একটা পরিস্থিতেও কেউ এমনভাবে কথা বলতে পারে?
ও কেন রাগ দেখাচ্ছে বুঝলাম না তবে আশ্চর্য লাগার মত কিছুই নেই,ওর থেকে এটাই আশা করা যাই আজ অব্দি ভাল কথা ওর মুখে শুনিনি আমার জন্য।
চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি তৎক্ষণাৎ মুছে নিলাম আমি।
সাদিক আমার ঘর থেকে বের হয়ে গেলো দেখতে আসার নামে কথা শুনিয়ে ।
ওর পর পর এলো জবা আমার বান্ধুবি আবার আত্মীয় হই আমরা একই বাড়ির বাল্যবন্ধু।
এসে হালচাল জিজ্ঞেস করে বললো
জানিস তোর জন্য একটা চিরকুট এসেছে
আমি কোন উৎসাহ না দেখিয়ে বললাম
----কিসের চিরকুট? কে দিলো?
আমাকে মনমরা দেখে হাতে চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললো
---এটা খুলে দেখা না একটু, দেখি কে এই যুগে পত্র দিলো?
খামে প্রেরকের কোন ঠিকানা দেখিনি যা ছিল সব আমারই।
কোন আগ্রহ না পেয়েও খুলে দেখলাম ওটাতে লিখা ছিল
"আমার প্রিয়তা,
যা কিছু হয় সবই কোন না কোন কারণেই হয়।
"নিশ্চয় আল্লাহতালা সবচেয়ে উত্তম পরিকল্পনাকারী "[আনফাল-৩০]।
এত সুন্দর আয়াত টা পড়ে আমার অসম্ভব ভাল লাগলো তারপর এই জানতে ইচ্ছে করলো এটা কে পাঠালো।
জবা বলে উঠলো
---ব্যাস এইটুকুই লিখলো?
তবে আমি এর গভীরতা বুঝতে পেরেছিলাম।
কে সে? এইটুকু কথা দিয়ে এত কিছু বুঝিয়ে দিলো।
তারপর জবা আবার বললো
---আচ্ছা সাদিক ভাই কি বলছিল রে,,,?
---কি আর বলবে বাঁদর টা,,,
জবা কে সব বললাম
আসলে বজ্জাত টা আমাদের জাত শত্রু ঘটনার সূত্রকাল বহু বছর আগে যখন আমার মাত্র ১৩ কি ১৪ বছর বয়স ছিল।