আমার প্রিয়তা

পর্ব - ১০

🟢

না খুব বেশিদিন আমার খুশি টিকে না,আমার পরীক্ষাও প্রায় শেষের দিকে আর একটা আছে।প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি হওয়ার কারণে এক মাস ব্যাপী কোন পরীক্ষা হয় না ৬/৭ টা কোর্স এর পরীক্ষা প্রতি সেমিস্টার এ বন্ধ ও কম।মা এর কাছ থেকে শুনলাম আমার বড় ভাইয়া আসছে বিদেশ থেকে ৩ দিন পর যেদিন আমার শেষ পরীক্ষা।

সমস্যা হল বড় ভাই আসা মানে মা আরো তাড়াতাড়ি পাত্র দেখা শুরু করবে যাতে ভাইয়া বিয়েটা দেখে যেতে পারে।আমার হতাশ লাগলেও ভাইয়া আসবে ভেবে খুশি লাগছে।ভাইয়া আমার প্রায় ছয় বছরের বড় ছোট বেলায় বেশ শাসন করতো তবে বড় হওয়ার পর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।

ভাইয়া আসবে তাই মা প্রস্তুতি নিচ্ছে আসলে আমি বুঝি বাবা মা চায় আমাকে একটা ভাল ঘরে বিয়ে দিয়ে ভাইয়ার জন্য বউ আনতে কারণ আমি থাকা অবস্থায় যদি কখনো ভাইয়ের বউ মনে কষ্ট দেই আমাকে ওটা বাবা-মা সহ্য করতে পারবে না।

আর ভাইয়ার ও এক কথা আমার গৃহস্তি না দেখে সে বিয়ে করবেনা।এখন আমি কি চাই তা কেউ জানেনা, এমন কি আমিও না।

আমি টিভি দেখছিলাম মা এসে বলল,,,

---তোর আর যেন কয়টা পরীক্ষা আছে??

মুখ গোমরা করে বললাম একটা।

----তাই ভালই হলো ইরাম আসলে বেড়াতে পারবি।

---হ্যা মা।

সত্যি বলতে ভাইয়া অনেকটা বন্ধুর মত ওর মনের কথা সব আমাকে বলে কিন্তু আমি তো আর কোন ছেলের কথা বড় ভাইকে বলতে পারিনা।

দেখতে দেখতে আমার পরীক্ষা একেবারে শেষের দিকে বৈশাখের ঝড়ো হাওয়া বইছে,,জানালার দিকে বাইরে একটু দেখছি আর পড়ছি।

******

পরেরদিন পরীক্ষা শেষে হল থেকে বের হলাম বান্ধুবীদের সাথে কথা শেষ করে চলে যাচ্ছিলাম হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় তাই আর বের হতে পারিনি।

সামনে থেকে রিমন কে আসতে দেখলাম,,, আমি দেখেও চোখ সরিয়ে নিলাম।

ও আমার কাছে এসে বলল,,,

তোমার জন্য একটা জিনিস রেখেছি প্লিজ না করো না।

ব্যাগ থেকে বের করে একটা প্যাকেট দিল।

আমি বললাম

----কি এটা??

---আজ আমার বার্থ ডে তাই না বলতে পারবে না।,,,,এখানে আমার মনের কথা আছে প্লিজ তুমি তাকে দিয়ে দিও।

---তুমি এটা আমাকে কেন দিচ্ছো??

আজ শেষ পরীক্ষা আমি কাউকে কেমনি দিব??

----তা তে কি কিছুদিন পর ই তো আবার ক্লাস শুরু হবে ফোর্থ ইয়ার এর।

---কিন্তু আমাকে কেন??বলে দাও কাকে দিতে হবে?

---বাসায় গিয়ে খুলে দেখলে তার নাম পাবে।

রিমন আমাকে আর কোন সুযোগ না দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই চলে গেল।

::::::::

বাসায় চলে এলাম আজ বিকেলবেলা ভাইয়া আসবে তাই ইফাদ,বাবা আরও কয়েকজন আনতে গেল চট্টগ্রাম শাহ-আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এ।

আমি ও অপেক্ষা করছি।সাদিক এসে বসার ঘরে ঢুকল মা ওর সাথে কথা বলছে যেহেতু ইফাদ নেই। আমি টিভি দেখছিলাম স্বাধীনভাবে, পরীক্ষা শেষে নিজেকে ফ্রিডম ফাইটার মনে হয়।

আর যতদিন পরীক্ষা চলে ততদিন মনে হয় যেন এই স্বাধীন দেশে কেবল আমিই পরাধীন।

কথাটা হাস্যকর হলেও কিন্তু সত্যি।

মাগরিব এর নামাজ টা পড়তে বসে বুঝতে পারলাম ভাইয়া এসেছে, সবাই গমগম করছে বসার ঘরে।

আমি নামাজ শেষ করে পিছন ফিরতেই দেখি ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম,খুশিতে কান্না চলে এলো দু বছর দু মাস পর দেখা।ভাইয়াকে অনেক সমাদর করা হচ্ছে, সবাই ওকে দেখতেও আসছে।

এখন দোতলায় প্রায় উঠি ভাইয়ার রুম টা খোলা থাকে ওখানে গিয়ে বসে থাকি,গল্প করি, লুডু খেলি যদিও আমি পারিনা।

আমার অপারেশন টার পর থেকে ভাইয়া আমাকে দেখলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুঝিনা ও কি ভাবে, আবার হয়ত বা বুঝি।

ভাইয়া বলল,,,

---কতদিন বেড়াতে যাস না তুই??

----মনে নেই।

---চল কাল আমরা খুব বেড়াব।

----প্লিজ কারও বাসায় নয়।

----তোর প্রিয় জায়গায় যাব।

কথা টা শুনে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।আমি মুখ লুকিয়ে নিচে চলে এলাম,আজ অনেকদিন পর যেন বুক ফেটে কান্না আসছে।রুমে ঢুকেই কেঁদে দিলাম সেই প্রাণবন্ত আমি কোথায় হাড়িয়ে গেলাম। বেড়াতে যাওয়ার শখ ছিল, খুব দুরন্ত ছিলাম আমি, আমাকে ছাড়া কাজিন দের জমতোই না কোথাও, কিন্তু ঐ এক্সিডেন্ট এর পর অসামাজিক হয়ে গেলাম একেবারে।মানুষকে ভয় লাগে কারণ মানুষ সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী কখন কিভাবে মন ভাঙতে হয় এই পদ্ধতি আর কোন প্রাণীর জানা আছে কিনা জানিনা।

তারপরের দিন বিকেলে ,,,

ভাইয়া এসে বলল কিরে তৈরি হয়ে নে,,,

বিজ্ঞাপন

ভাইয়া তুমি এসেছ পর্যন্ত সবাই তোমাকে দাওয়াত করছে আগে ওগুলো শেষ কর পরে না হয় গেলাম একদিন।

----হুম তাই তো বলছি আজ ঐ একদিন। চল এখন।

আমি হাসি মুখে বললাম ওকে আসছি আমি।

আমি তৈরি হয়ে উপরে গেলাম ইফাদ এর ঘরে আমার ড্রয়ার থেকে কিছু নিতে,হঠাৎ রিমনের প্যাকেট টা চোখে পড়ল, আরেহ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। পাঁচদিন কেটে গেল আমার খেয়াল ই নেই।প্যাকেট টা খুলতে গিয়ে ভাইয়ার ডাকে চমকে গেলাম ইফাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সাদিক এর কাঁধে হাত রেখে।সাদিক সাদা শার্ট ব্লু জিন্স পড়েছে, জিন্স এর পকেটে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি প্যাকেট টা আবার রেখে দিলাম,মনেমনে ভাবলাম কি এক উড়কো ঝামেলায় পড়লাম কার জিনিস দিল কে জানে,দেখতেও পারছিনা।

ভাইয়া আর সাদিক কথা শেষ করল ইফাদ পড়তে বসেছে আর আমরা বের হয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় ইফাদ এর মুখ দেখার মত ছিল তাই ভাইয়া সাদিক কে বলল

----আজ না হয় পড়া থাক চল আমার সাথে।

ইফাদ তো খুশিতে আত্মহারা আমিও খুশি হলাম, ভাইয়া সাদিক বলল

----তুই কোথায় হনহন করে বের হয়ে যাচ্ছিস??

----এইত রাস্তায় যাচ্ছি একটু।

----আরেহ তুই ও আমাদের সাথে চল।

---না ভাইয়া আমি ঠিকাছি এখানেই।

-----আরেহ চল না, আমার সাথে কি বাইরে যাস প্রিতিদিন?

---আচ্ছা।

উফফ ভাইয়া টা ও না কেন ওকে বলতে হল??আমার কেমন যেন লাগছে।

সবাই বের হয়ে পড়লাম পতেঙ্গা সি বিচ এ,,,,

আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা,।সমুদ্র টা মন কেড়ে নেই, কক্সবাজার এর আনন্দ টা এখানেই পেতে পারি চাইলে। এটা ভেবেই আমার গর্ববোধ হয় এই শহরে আমার জন্ম যেখানে সমুদ্র আছে।

আর নেভাল রোডের হাফ রেলিং এ পা ঝুলিয়ে বসে সমুদ্র দেখার মজায় আলাদা,বাতাস বইছে খুব নিচের বড় বড় পাথর গুলোতে সমুদ্রের পানি আছড়ে পড়ছে কিন্তু আমাকে ছোঁয়ার সাধ্য নেই।ছোট বড় জাহাজ দেখা যাচ্ছে, দু একটা কাছেই থামানো ওগুলো দেখলেই টাইটানিক এর কথা মনে পড়ে।কেন জানিনা জাহাজের বো বো শব্দ শুনলেই অন্তর কাঁপে।

এই রাস্তায় বিকেলে একরকম,, সন্ধ্যায় আরেক রকম অদ্ভুত সুন্দর লাগে এই জায়গাটা,,,যে কোন সময়েই সুন্দর।শুনেছি ভোর হওয়ার সময় নাকি জায়গা টা সবচেয়ে সুন্দর লাগে পরিষ্কার রোড নির্জন প্রকৃতি,পাশে সমুদ্র।তবে মেয়ে হওয়ার কারণে আমার সৌভাগ্য হয়নি ঐ সময়ে আসার কিন্তু একদিন জীবন সঙি কে নিয়ে আসার ইচ্ছে আছে।

আমরা পৌছে গেলাম সেই চোখ ভুলানো জায়গায় যেখানে আমি সব দুঃখ ভুলে যাই।

আমরা চারজনই পা ঝুলিয়ে বসে আছি হাতে ছোট ছোট পেঁয়াজুর বাটি সাথে পেয়াজ কুচি, এখানের বিশেষ খাবার ছোট ছোট পেঁয়াজু, ঝাল কাঁকড়া, সেদ্ধ ডিম।

আমার প্রচন্ড ভাল লাগা কাজ করছে কারণ অনেক বছর পর এসেছি। ভাইয়া আর আমি ছেলেবেলার গল্প করছি আর হাসছি,সাদিক তো আছেই এক একটা ফাজলামো কথাবার্তা নিয়ে যেমন ও বলছে একদিন নাকি আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম এক ভাইয়ের বিয়ের স্টেজে হঠাৎ নাকি চেয়ার থেকে স্টেজের বাইরে পড়ে যায় আর সবার কি হাসাহাসি শুরু হয়েছিল।

কথাটা সত্য কিন্তু শুনেই রাগ হলো আসলে আমি তখন সাত বছরের ছিলাম সন্ধ্যায় যখন নতুন বউ এনে স্টেজে বসিয়েছিল আমি বেশ ক্লান্ত থাকায় স্টেজে রাখা চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ি।

আস্তে আস্তে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত ধরেছে আমরা এখন এয়ারপোর্ট এ এসেছি বিচ এর পাশে হওয়ার কারণে এখানে না আসলেই নই,,,এত সুন্দর রাস্তা মাঝখানে গাছের শারি আমরা রাস্তায় বসে আছি ছোট ছোট গাছের পাশে। সোডিয়াম লাইট এর আলোয় মাঝেমাঝে বিমান আসা যাওয়ার শব্দ পাচ্ছি,আবার খুব কাছে বিমানের লাল, নীল বাতি গুলো ও দেখছি।

আমি আড়চোখে সাদিকের দিকে তাকালাম এখন ও আর আমি বসে আছি শুধু দূরত্ব বজায় রেখে, ভাইয়া ইফাদ কে ওয়াশরুমে নিয়ে গেছে।

আমি আঙুল দিয়ে পরিষ্কার রাস্তাটা তে লিখছি যা আমি ছাড়া কেউ দেখছে না।

সাদিক কে বললাম,,,

----তুমি খুব মজা পাও না??

সাদিক কোন এক চিন্তা ভেঙে চমকে উঠে বলল,,,

----কিসে??

---আমাকে জালাতে।

----কখন? মুচকি হেসে বলল।

---সবসময়,একটু আগেও তো করছিলে।

----কই নাতো।

আমি বললাম তোমাকে আমি দেখে নিব।

----আর কত দেখবে?

আমি বললাম,,,

---তোমার ভেতর টা কেউ দেখে না তো তাই বুঝতে পারেনা, তুমি কত বড় ফাজিল।

ও অবাক হওয়ার নাটক করে বলল,,

---এত পাওয়ার তোমার চোখে??আগে জানলে আরও কয়েকটা কাপড় পড়ে আসতাম।

---মানে??

আমি একমিনিট পর ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম।রেগে ওর দিকে তাকাতেই ভাইয়ারা চলে এলো।

সাদিক মুচকি মুচকি হাসছে লুকিয়ে,হাসিটা সুন্দর হলেও আমার রাগ হচ্ছে।

এবার আমরা উঠে গিয়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, সাদিক ইফাদের পিঠ চাপড়ে বলল,,,সব ঠিকঠাক ভাবে পড়েছিস তো না? এখানে আবার অনেকের চোখের পাওয়ার বেশি।

সত্যিই মন চাইছে ওকে আমি,,,,

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প