ছাদে গিয়ে ভিজছি বৃষ্টি কিছুটা মধ্যম গতিতে পড়ছে , আমি একেবারেই ভেজা পছন্দ করিনা শুধু দেখতে ভালবাসি ছাতার নিচে কিংবা জানালার বাইরে হতে।
আজ কয়েকটা আবেগের মিশ্রণে ভিজতে চলে এলাম, ভালই লাগছে সব চিন্তা যেন এই ঠান্ডা পানির সাথে বয়ে যাচ্ছে।
প্রায় পনেরো মিনিট পর পেছনে কারও আওয়াজ পেলাম।
----এখানে কি করছ??
আমি মুখে একটু হাসি ফুঁটিয়ে পেছনে ফিরলাম।
----তোমার অপেক্ষা করছিলাম, বিশ্বাস ছিল আমি ডাকলে তুমি অবশ্যই আসবে।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাদিক, একটা খোলা বোতামের মেরুন চেক শার্ট ভেতরে সাদা গেঞ্জি সাথে হালকা আকাশী জিন্স সামনের চুল গুলো লেপ্টে পানি পড়ছে সেই পানি তার হালকা গোলাপি রঙা ঠোট বেয়ে নামছে, চোখের পাঁপড়ি ছুঁয়ে টপটপ পানি পড়ছে,অনেকটা হাঁপাচ্ছে ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক দৌড়ের মধ্যে এসে পড়েছে।
আমার প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু ও ওটা এড়িয়ে চলে বলল,,,
---এই বৃষ্টিতে এখানে কি করছ?? মনে রং লেগেছে???
---তুমি এখানে কি করছ? সেটা বললে না যে?
ও রেগে বলল,,
----ওটা না জানলেও চলবে ঘরে যাও বলছি।
----আমি জানতাম তুমি আমাকে খুঁজে বের করবেই।চিন্তা করো না আমি শুধু বৃষ্টিতে ভিজতে এসেছি আর কিছুই না।
----চলো এখন।।
----তুমি চলে যাও আমি আমার জবাব পেয়ে গেছি।
----সুবাহ,,,, অসুখে পড়ার শখ হয়েছে না?
----হ্যা,,!! তাতে তোমার কি??
----কিছুই না আমার।
চলে যাচ্ছি আমি।
আমি ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম ভাবছি ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়ত একা পেয়ে আমাকে নামানোর বাহানায় ছোঁয়ার চেষ্টা করতো কিন্তু ও এমন না।
পরেরদিন সকালে প্রচন্ড তাপ অনুভব করছি গায়ে।মা আর বড় ভাইয়া পাশে এসে বসলো।
ভাইয়্যা বলল,,,
জ্বর বাধালি কেমনে?
আমি জড়ানো কন্ঠে বললাম
---খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তোমাদের সেবা পেতে।
আমার মা একটু কষ্ট পেলো মনেমনে কারণ ছেলেপক্ষ কে বারণ করতে হয়েছে।
দুপুরে খাবার আর ওষুধ খেয়ে শুয়ে আছি গায়ের তাপে চোখ বেয়ে পানি পড়ছে হয়ত একটু পর ওষুধ এর কাজ শুরু হবে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম
সাদিক আমাকে বলেনি কিন্তু আমি ঠিকই বুঝে নিয়েছি মেসেজ টা ও ই দেই।
গতকাল যখন অনেক মন খারাপ হল ওর মেসেজ টা দেখে আমার কেমন যেন একটা অনুভূতি হল,আর ঐ অনুভূতি তে কেবল সাদিক এর নামটা ই আসছিল।
আমি কাউকে বলিনি ছাদে যাচ্ছি সাধারণত আমাদের ছাদে কেউ যাইনা কারণ একটা আলগা লোহার সিঁড়ি দেওয়া খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ উঠে না।আমরা সবাই বারান্দা তে সময় কাটাই।
কাল ওকে ছাদে দেখে আমি বুঝতে পেরেছি ও ঠিকই বুঝে নিয়েছে আমি কি বলতে চেয়েছি।
ও আমার থেকে কখনো মেসেজ এর রিপ্লাই আশা করেনি, তাই ও আমার রিপ্লাই পেয়ে ভয় পেয়েছিল নিশ্চয় দ্রুত এসে ঘরে আমাকে খুঁজেছে তারপর না পেয়ে হন্তদন্ত করে উপরে উঠে পড়লো, আমার চিন্তাই ও ভুলেই গিয়েছিল ও যে ধরা খেতে চলেছে।
ওর চেহেরায় তখন স্পষ্টভাবে একটা স্বস্তি দেখেছিলাম যেটা ও আমাকে খুঁজে পেয়ে অনুভব করেছে।
আমি খুব বেশি ওকে না জানলেও এতটুকু বুঝতে পেরেছি কাল, ও যে আমার প্রতি কিছু অনুভব করে যা আজ অব্দি আমাকে বুঝতে দেইনি কিংবা এখনও দিচ্ছেনা।
দুদিন জ্বর থাকার পর একটু সুস্থ হয়েছিলাম আর মা এসে বলল,,
আগামীকাল তোকে দেখতে আসবে তোর কোন সমস্যা নেই তো??
---থাকলে কি মানা করে দিতে??
আচ্ছা বিয়ের কথা বললে এমন করিস কেন তুই?তোর কি কাউকে পছন্দ আছে নাকি?
আমি তোষামোদ করে বললাম
----হঠাৎ এত ভাল কথা?? আগে তো বলতে খবরদার কোন ছেলের সাথে প্রেমে জড়াবি না, তোর বাপ -ভাই আছে জানলে কিন্তু কষ্ট পাবে।
এখন যদি আছে বলি তাহলে কষ্ট পাবেনা??
প্রথমত প্রেমের বয়সে শাসন করবে,তারপর প্রেম করলে হুদাই রাজি হবেনা কেউ, কারণ বাংলা সিনেমাই অভিনয় করার বড় শখ ছিল একসময় তোমাদের তাও আবার মা-বাবার রোলে।
আবার নিজের হাতে দু একটা পাত্র/পাত্রী রেখে মেয়ে/ছেলে কে জিজ্ঞেস করবে তোর কোন পছন্দ আছে?
তোমাদের এসব ব্রিলিয়ান্ট কাজ কারবার দেখলে মন চাই সকল মা বাবার জন্য একটা এওয়ার্ড ফাংশন অর্গানাইজ করি।
মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে,,,
আমি আবার বললাম আমার সমস্যা প্রেমে বাধা দেওয়াতে নই। প্রেম করতে মানা করা অবশ্যই ভাল কথা কারণ ছেলে মেয়েরা আবেগে এসে বেশিরভাগ সময় ভুল মানুষ কিংবা ভুল কাজ করে ফেলে আর এটা কোন মা বাবার সহ্য হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু দয়া করে শেষে এসে এ ধরণের গায়ে কাটা লাগানো ভাল কথা বলতে এসো না।
মা অনেক্ষণ পর বলল,,,
---তোর কি মন খারাপ খুব?
হঠাৎ মা এর দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম আমি এতক্ষণ কি করছিলাম।
মা এর মন তো সব বুঝে আমার গালে হাত রাখতেই নরম হয়ে বললাম
---মা আমি দুঃখিত।
এবার মা বলল,,,
---আসলে আমি তোকে বোঝা ভেবে ঘর ছাড়তে বাধ্য করছিনা, জানিস প্রতিটা মা-বাবা চাই তার বাচ্চা গুলো যেন তাদের চোখের সামনেই নিজের সুখী জীবনে পদার্পণ করে।
আজ আমরা সবাই আছি তাই তোর মনে হচ্ছে বিয়ে করার দরকার কি?
আমি মায়ের দিকে তাকালাম,,,
কিন্তু জানিস কিছু বছর পর তুই একাকীত্ব অনুভব করতে শুরু করবি তখন তুই দিনে যতই ভীরের মাঝে থাকিস না কেন রাতে ঐ একাকী তোকে গ্রাস করবে। সুখ দুঃখ মিলেই তো জীবন, কেউ যদি দুঃখে না থাকে সে কখনো সুখের মজা পাবেনা, সে কখনো তার রব কে পাবেনা।আল্লাহ কোন মানুষ কেই সেজন্য শতভাগ সুখ দেননি।
মায়ের কথা শুনে আমি জরিয়ে ধরে বললাম,,
মা তোমাকে অনেক ভালবাসি। নিমিষেই বুঝিয়ে দাও আমি একা নই আমার থেকেও কেউ আমাকে বেশি ভালবাসে।
সাদিক কে এই কয়েকদিন দেখিনি আমি। আজ সকাল থেকেই সবাই নাস্তা আর ঘর পরিপাটি করছে বিকালে আমায় দেখতে আসবে।আমিও খুশি কারণ বাবা-মা আছে আর টেনশন কিসের।
মা আমাকে একটা নীল এর সাথে আকাশী কম্বিনেশন এর শাড়ী দিয়ে গেছে।
বিকেলবেলায় ছেলে পক্ষ এসে পড়েছে।
মা আমার ঘরে এসে দেখল আমি শাড়ী পরিনি একটা সাদা কামিজ কালো ওড়না-প্যান্ট পড়েছি কানে সিলভার ঝুমকা চোখে শুধু মাস্কারা, হালকা পিচ রঙা লিপস্টিক একেবারে ন্যাচারাল লুক এর ম্যাকআপ নিয়েছি।
মাথায় কাপড় দিয়ে সামনে গেলাম আসলে আমার কিছু যায়ে আসেনা ওরা আমাকে পছন্দ করুক কিংবা না করুক তাই নার্ভাস ও লাগছেনা।
ওদের সাথে সব ফর্মাল পর্ব শেষ আমাকে উপরে পাঠিয়েছে পাত্রের সাথে তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
পাত্র উপরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল,,,,
---বাহ চমৎকার ভিউ।এখানে এসে বসলে নিশ্চয় মন ভাল হয়ে যায়?
আমি কিছু বললাম না।
উনি আমার থেকে নাম,পড়ার কথা জিজ্ঞেস করল কিন্তু আমি একটা জবাব ও দেই নি, কেন যেন ভাল লাগছিল না আকাশের দিকে চেয়ে ছিলাম।
উনি হঠাৎ বলল,,,
---আপনি কি কারও উপর রেগে আছেন??
কথাটা জিজ্ঞেস করতে না করতেই সাদিক সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো ফরমাল গেটআপ এ।
আমি এবার একটু হেসে বললাম,,
----ঠিক বলেছেন আপনি,এখানে দাঁড়ালে মন ভাল হয়ে যায়।
ভদ্রলোক মনে মনে কি যেন মেলালেন একটু হাসি মুখে ফিরে তাকালেন আমার দৃষ্টি লক্ষ্য করে,,
সাদিক উপরে উঠতেই দুজনে সৌজন্যমূলক ভাবে হাত মিলিয়ে বলল,,,
---আমি সাদিক।ওর কাজিন।
ভদ্রলোক হেসে বলল
---আমি ডঃ এহেতেশাম হুসাইন।
আপাতত উনাদের মেহমান।
সাদিক বলল প্লিজ কেরি অন।এটা বলেই ইফাদ এর রুমে চলে গেল।
ও কিছুটা অবাক হয়েছে কারণ কথা বলার সময় ভদ্রলোক এর পেছনে দাঁড়ান আমার দিকে তাকিয়েছিল একবার।
এরপর ইফাদ ও উপরে আসল।আমি আর ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে এখনো।
আমি বলতে গেলাম আসলে,,,,,,
একই মুহূর্তে উনিও একিভাবে বললেন।
দুজনেই বিব্রত বোধ করে বললাম, আপনি আগে বলুন। কিন্তু উনার অনুরোধে আমিই আগে বললাম
----বলছিলাম কি মাগরিব এর নামাজ টা পড়ে আসি??
উনি অবাক হয়ে বললেন,,
---বিশ্বাস করুন এটাই বলতে চেয়েছিলাম।
উনি মাথা নিচু করে একটু হেসে বললেন আবার মিলে গেল।
চলুন তাহলে কথা আজ এতটুকুই থাক।
-----শুনুন।
আমার কথায় উনি দাঁড়িয়ে গেলেন পিছনে ফিরে তাকাতেই আমি বললাম।
----আপনার বাচ্চাদের একটু দেখতে পারি?
উনি একটু পর খুব সুন্দর করে বললেন,,
---দেখতে চান?ঠিকাছে অন্য কোন দিন।
আমি মাথা নারলাম।
এরপর আর কথা না বলে নেমে যাচ্ছিলাম সোজা বরাবর উপরে দরজায় চোখ পড়ল দেখি সাদিক দাঁড়িয়ে আছে দুহাত ভাজ করে।
নিশ্চয় এখন ও কিছুটা ধারণা করেছে কেন আমি আবার হারিয়ে যাব লিখেছিলাম।