ভার্সিটি থেকে ফিরছিলাম আজ গুড়িগুড়ি বৃষ্টি আমার ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে নিলাম রাস্তার পাশ ধরে ফুটপাতে হাটতে লাগলাম যেটা আমি সবসময় করিনা তবে বৃষ্টির দিনে কিছুটা হেটে রিক্সা নেই।
এমন সময় মনে হলো কেউ রাস্তার কিনারায় ছাতার নিচে উঁকি দিচ্ছে পাশে বান্ধুবি কে বললাম
---কে এই পাগল? আমাকে দেখতে চাচ্ছে নিচু হয়ে।
ছেলেটা একটা হোচট খেলো খাওয়ার ই কথা সামনে না দেখে আড়াই হাত দুরুত্বে থাকা আমাকে দেখতে চাচ্ছে আর আমি ফুটপাতে তার চেয়ে উঁচুতে আছি।
আমার বান্ধুবি আর আমি একটু আস্তে করেই হেসে দিলাম।
তারপর আর না তাকিয়ে হাটা দিলাম।
----সুবাহহহ,,,,??
পেছন থেকে ডাক শুনতে পেয়ে অবাক হলাম পেছনে তাকিয়ে দেখি।সাদিক।
----সুবাহ,,?
আমি দাঁড়িয়ে বললাম
----তুমি এখানে?
ও কাছে এসে বলল,,
--তোমাকেই খুঁজছি
----এখানে কেন?
---দরকার আছে তাই।
---ফোন করলেই তো পারতে!
---একে তো কল করছি ধরছনা তার উপর নিকাব বেঁধে আছো, চিনব কি করে???
----তাই বলে উঁকি দিবে ছাতার নিচে? পাবলিকের মার খাওনি তাও বেশি।
----একটা বিপদ হয়েছে তাই তোমাকে নিতে এসেছি,,,
আমি আর কিছু বলতে না দিয়ে
চিন্তিত হয়ে বললাম
---বিপদ! না,না যাই হোক আমি তোমার সাথে যেতে পারবনা।
----তোমার নানুর অবস্থা খুব খারাপ সবাই ওখানে চলে গেছে তাই তোমাকেও নানুবাড়ি যেতে হবে কারণ ঘরে কেউ নেই।
----কি?? নানুর অসুখ??ঠিকাছে কিন্তু তোমার সাথে যেতে পারবনা।
----আরেহ আমি কি বলেছি আমার সাথে যেতে?
----ঠিকাছে আমি চলে যাচ্ছি
---একা??
----কারণ তোমার সাথে যাওয়া সম্ভব না।
----আরে দাঁড়াও।
তখনই দেখি আপু বলে ডাক দিল ইফাদ।
ও এসে বলল তোমাকে খুঁজে হয়রান ফোন কেন ধরছ না??
আমি মোবাইল বের করে দেখি,,
----মোবাইল তো ভুলে সাইলেন্ট হয়ে গেছে ভাইব্রেট এর বদলে।
আমি তোমাকে নিতে এসেছি,সাদিকভাই লাঞ্চ করে অফিস যাচ্ছিল আমাকে নামিয়ে দিতে বললাম এখানে এসে আরেক বিপত্তি তোমাকে খুঁজেই পাচ্ছিনা তাই ভাইয়া আর আমি তোমাকে খুঁজছিলাম।
আমি ভয়ে ভয়ে সাদিকের দিকে তাকালাম
ও কড়া চোখ দুটো অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল
---যত্তসব!! পাগল,,,,
ইশ্ কি লজ্জায় না পড়লাম,,,,
তারপর ইফাদ আর আমি সিএনজি নিলাম আর সাদিক তার বাইক নিয়ে চলে গেল।সারা রাস্তায় ভেবেছি ছিঃ এমনটা করা সত্যিই উচিৎ হয়নি, ও কি ভাববে আমাকে নিয়ে।
:
নানুর বয়স হয়েছিল আর সেইদিন রাতেই মারা গেল আজ সাতদিন হয়েছে ,এ কয়দিন বেশ আসা যাওয়া ছিল নানু বাড়িতে আজ মা ফিরেনি ওখানেই থেকে গেছে মেজবান শেষে, আমরা তিন ভাই বোন চলে এসেছি আমি অনেক বছর পর এতবার নানু বাড়ি গিয়েছি অনেকের সাথেই দেখা হয়েছিল। বাবা ঢাকায় গিয়েছে দুইদিন আগে।নিচে একা কিভাবে থাকব তাই ভাইয়া বলল ইফাদ ভাইয়ার রুমে থাকবে আর আমি যেন ইফাদের ঘরে থাকি, আমিও রাজি হয়ে গেলাম কারণ ইফাদের রুমে আমি কম্ফোর্টেবল অনেক।
ইফাদ আর আমি অনেক্ষণ একসাথে ছিলাম ও টেবিলে বসে গেইম্স খেলছিল আর আমি জানালার দিকে তাকিয়ে আমের ডালি দেখছিলাম হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয় খুব জোরে আমি রুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় গেলাম।দোকান পাট সব বন্ধ হওয়ার কারণে রাস্তার আলো কম কিন্তু হালকা পাতলা আলো এখনও আসছে।
ঝুম বৃষ্টি দেখে মনটা কেমন যেন করে ভাল ও লাগে আবার আপনদের জন্য মন আনচান করে।আমার আপন রা যেন সবাই নিরাপদ থাকে, বৃষ্টিতে দোয়া কবুল হয় তাই আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে মনের সৎ চাওয়া গুলো চেয়ে নিলাম।
"আল্লা-হুম্মা সায়্যিবান, নাফি'আন।"
(অর্থ-হে আল্লাহ মুশলধারায়,উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।)
দোয়া চাইতে চাইতে হাত টা বারিয়ে দিলাম পানি ধরার জন্য ইচ্ছে করছে খুব এভাবে বসে থাকতে হঠাৎ রাস্তায় চোখ পড়লো চার পাঁচজন কে দেখতে পাচ্ছি সবাই দৌড়ে সরে যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে কিন্তু তার মধ্যে একজন ছাতার বাইরে হাত বের করে বৃষ্টি ধরছে আর আস্তে আস্তে হাটছে গাড়ির হেডলাইটে দেখার চেষ্টা করলাম ভাল করে তবে মুখ দেখছিনা ছাতার কারণে।
আমার ইচ্ছা আরও বেড়ে গেল এই পাগল টা কে আবার??
আমি আরও ভাল করে দেখার জন্য কিনারায় এলাম,এবার দেখি মানুষ টা পা দিয়ে রাস্তার পানি গুলোতে বারি মেরে মেরে খেলছে অনেকটা লাফানোর মত কি আশ্চর্য এরপর দেখি পকেট থেকে বের করে কোন একটা প্যাকেটে কিছু ভরছে স্পষ্ট দেখছিনা যা দেখেছি তাও একটা গাড়ির আলোতে দেখেছি আবার ঝাপ্সা হয়ে গেছে।
হঠাৎ ভাবলাম কি করছি আমি?কেউ বৃষ্টি বিলাস করছে আর আমি গোপনে দেখছি ছিঃ ছিঃ এমন কেউ করে?
আমি ভাবলাম না ঢুকে যাব ঘরে এমন সময় ছাতাটা উড়ে গেল মানুষ টার না চাইতেও বিজলির চমক এ চোখ পড়লো একি এতো সাদিক ও দৌড়ে গিয়ে আবার ছাতা টা খুঁজে নিল।আমি আবার দাঁড়িয়ে গেলাম দেখি ছাতাটা বন্ধ করে দুহাত মেলে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখছে এক হাত দিয়ে আবার চুল গুলো পেছনের দিকে সরাচ্ছে এবার এক দৌড় মেরে বাড়িতে ঢুকে পড়লো।
আমি এখনও রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি ভাবলাম বৃষ্টিতে কারও ভিজতে কিভাবে ইচ্ছে করে?
গায়ের সাথে ভেজা কাপড় গুলো খুলতে আরেক মুসিবত তার উপর বরফ গলা পানি ইইউউ আমি নিজেই শিউরে উঠলাম আমার তো ভালই লাগেনা ভিজতে।
পরেরদিন সকাল বেলায়,,,,
আজও বৃষ্টি হচ্ছে মা সকাল বেলায় এসে পড়েছে আমি ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছি উঠানে কাদা আর পানির একটা স্রোত বেয়ে যাচ্ছে আমাদের দুয়ারের নিচে তার সাথে ছোট ছোট নৌকা ভাসছে আমাদের বাসার বা পাশে জবাদের ঘর আর ঐ একই লাইনে আরও চারটে ঘর আছে আবার আমাদের মুখোমুখি লিলিদের ঘর তার পাশাপাশি আরও দুটো ঘর মাঝখানে উঠোন আর পুরো বাড়ির একটা বড় গেইট আমাদের বাসার ডান পাশে।
এখন সামনে তাকালাম বৃষ্টিতে বসে বসে বাচ্চারা খাতার পাতা ছিঁড়ে নৌকা বানিয়ে ছাড়ছে আর ওগুলো স্রোতোবহা হয়ে আমার দুয়ারের নিচে দিয়ে ভেসে রাস্তার ড্রেনে চলে যাচ্ছে।
মনে হচ্ছে যেন নদীর সরু বাঁকে নৌকা চলাচল করছে।একটু দূর থেকে আমিও ওদের সাথে খেলছি আর কথা বলছি।
বাচ্চারা এ দুয়ার ও দুয়ার মিলে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে সবার ঘর থেকে নৌকা বানিয়ে পানিতে ছাড়ছে।
খুব আনন্দ লাগছে এসব দেখে,আর মনে পড়ে যাচ্ছে ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি।
সেই আমি যখন এভাবে নৌকা বানাতাম ভাইয়ার সাথে চাচাতো ভাই বোন রা মিলে কত খেলতাম। একদিন একটা হাফ দেওয়ালের উপর উঠে বসেছিলাম সদ্য গোসল করে লাল ফ্রক পড়েছি মা নতুন বানিয়ে দিয়েছে পাশে রাখা ছিল কয়েকটা বাঁশ আমি ওখান থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ উল্টে পড়ে আটকে গেলাম, দেখলাম ফ্রক বাঁশের সাথে আটকে গেছে আর আমি ঝুলছি কেমন ভয় পেয়ে কান্না শুরু করে দিলাম তার মধ্যেই উল্টো করা সাদিক কে দেখলাম।
ও বলল
----কিরে চামচিকা এখানে কি করিস?
আমি হাত বাড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করলাম ওকে।
ও আরও মজা নিয়ে বলল,,
----আমার সাথে আর ফাইজলামি করবি??সরি বল।
আমি আরও কান্না করে বললাম
----পড়ে যাচ্ছি আমি ধরো আমাকে।
ও এবার আমাকে উদ্ধার করল।দেখলাম ফ্রকের কুচি ছিড়ে ঝুলে আছে আমি আরও কান্না করে দিলাম কারণ মাত্র পড়েছিলাম জামা টা।
সাদিক হাসছিল,আমি ধমক দিয়ে বললাম একদম হাসবিনা বাঁদর, চামচিকা, ইতর।
ও হাসি থামিয়ে বলল
----চামচিকা তো তুই,,,ওভাবে উল্টো কেউ ঝুলে থাকে?
----আমি না তুই,তুই,তুই।
---এই আমাকে তুই করে বলছিস কেন? আমি কি তোর সমান?
----তুমি আমাকে তুই কেন বললে? আমি কি তোমার সমান।
----তাতে কি তুই তো আমার অনেক ছোট।
----ঠিকাছে তুই আমাকে তুই বললে আমি ও তুই করে বলব।
এরপর আমি আবার ফ্রকের কথা মনে করে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ঘরে চলে গেলাম।
এরপর থেকে সাদিক আমাকে তুই করে বলত না আমিও ওকে ভাইয়া টাইয়া ডাকতাম না শুধু চামচিকা বলতাম।
হঠাৎ মায়ের ডাকে ঘোর কাটল, ভাইয়ার বিয়ে একটু পিছিয়েছে মা হাই হুতাশ করছে নানু আমাদের বিয়ে দেখলনা।
মা কে আমি স্বান্তনা দিলাম,,,,,
ভাইয়ার বউ এর জন্য শাড়ি চুরি কেনা হয়ে গেছে কিন্তু আমি কি পড়ব ভাবিনি।
আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল কদম ফুল পেতে কিন্তু এপ্রিল এ এই ফুল কই পাব?
ভার্সিটি থেকে দুই রঙ এর কাঠ গোলাপ এনে একটা কাঁচের পাত্রে ছিঁড়ে ছিঁড়ে সাজালাম ফুল গুলো ভাসছে আর মাঝখানে ছোট ছোট মোমের কিছু ফুল ও ভাসিয়ে দিলাম।
রুমে এসে ওগুলো দেখে মা বলল
----বাহ খুব সুন্দর সাজিয়েছিস তো।তোর মন খুব ভাল মনে হচ্ছে?
---হ্যা মা দুদিন পর ভাইয়্যার বিয়ে বলে কথা।
---আচ্ছা তুই কি শাড়ি পড়বি?
----না মা আমি শাড়ি পড়ব না।
---কেন?
----আমি আমার বিয়েতেই প্রথম শাড়ি পড়তে চাই, আমার স্বামীই যেন প্রথমবার আমাকে শাড়িতে দেখে।
এর আগের বার ও হলুদের শাড়ি পড়েছি কিন্তু স্টেইজে বসতে না বসতেই জ্ঞান হাড়িয়েছিলাম আর শখ টা ও পূরণ হল না।
দিনের সব কাজ শেষে উপরে উঠলাম, কতক্ষণ পড়লাম তারপর মাগরিব এর নামাজ পড়তে নিচে গেলাম এসে দেখি চারটা কদম ফুল ইফাদ এর টেবিলে আর সাদিক কাক ভেজা হয়ে বসে আছে।
আমি ভেতরে আমার টেবিলে চলে গেলাম।
এই অদিনে এই ফুল কই পেল ও?তবে কয়েকদিন ধরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে।
মায়ের সাথে লুবনা ও এসেছিল ওকে দিয়ে সাদিকের জন্য নাস্তা পাঠিয়েছে, হঠাৎ লুবনা ফুল গুলো দেখে বলল,,,
----এগুলো কোত্থেকে?
সাদিক বলল,,
----একটা বিশেষ কাজে অন্য একটা কোম্পানিতে গিয়ে ছিলাম জায়গাটা দূরে আছে তবে আসার পথে অনেক গাছপালার মধ্যে কদম ফুল দেখতে পেলাম আমার খুব ভাল লাগে তাই নিয়ে এলাম।
----ভাইয়া আমাকে দিবেন?
----হ্যা নিতে পারো, তাছাড়া আমি ছেলে মানুষ ফুল দিয়ে কি করব?
----তাহলে এনেছেন কেন?
---উম,,!!সুন্দর লেগেছিল হয়ত।
লুবনা কে আমি বললাম
----এদিকে আন এগুলো টবে পানি দিয়ে সাজায়।
হঠাৎ আমার দিকে তাকাল সবাই।আমি যে এত এক্সাইটেড হয়ে এগুলো নিয়ে ভাবছিলাম হয়ত কেউ খেয়াল করেনি তাই।
লুবনা আমার হাতে দিয়ে গেল ফুল গুলো ও নিচে গেছে ফুলদানি আনতে,আমি যে কি খুশি হয়েছি এগুলো পেয়ে,বারবার শুঁকে দেখছিলাম ঝাপ্সা খুশবো উফ নরম ছোট পাঁপড়ি গুলো বলের মত লাগছে আমি মুখের সাথে স্পর্শ করছি।
সাদিক চুপচাপ বসে আছে ইফাদের সামনে কিন্তু আমি ওকে আড়চোখে দেখছি।
মনে মনে বললাম তুমি দেখি বেশ খবর রাখো আমার মনের,আমার সব কিছুতেই এত দৃষ্টি কেন তোমার?