আমার প্রিয়তা

পর্ব - ১৮

🟢

আমি সাদিকের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ও হঠাৎ কি বলছে এসব?

আমি তড়িঘড়ি করে দরজার দিকে চলে যাচ্ছিলাম,,,,,,

সে এবার উঠে এসে বলল

----দাঁড়াও।

আমি দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরলাম

ও বলল,,

----বললাম না যেতে পারবে না।

----কেন?

ও আমার কোন কথার জবাব না দিয়ে আস্তে আস্তে কাছে চলে এসছে।

আমি ঢোক গিলা শুরু করলাম মাথা নিচু করে।

ও আমার অনেকটা কাছে এসে বলল

----সরে দাঁড়াও

আমি বললাম

---কি??

------বলছি সরে দাঁড়াও। রিমোট নিব।

আমি চমকে উঠে সরে দাড়ালাম,দেখলাম ও পেছনে রাখা স্ট্যান্ড থেকে রিমোট নিলো আর বলল

----এখানে রিমোট টা যে কখন রেখেছি,,,?

ও মিটমিট করে হাসছে

আমি কিছুই বলার মত না পেয়ে চলে যেতে নিলে ও বলল

----মা তোমাকে অপেক্ষা করতে বলেছে ওয়াশরুম এ গেছে এবার বসতে পারো।

ও এটা বলে আবার সোফায় গিয়ে বসে পড়লো।

আমি দাঁড়িয়ে আছি ভাবছি আমি সত্যিই একটা স্টুপিড, ইডেয়েট কি না কি ভেবে ফেলেছি আর সাদিক ই বা কেন বলল ঘরে ফুফি নেই।

এক মিনিট ভেবে দেখলাম ছেলেটা আসলেই মস্ত বড় ফাজিল আমাকে সবসময় বোকা বানায়।কোনদিন যে ওর মাথাটা আমি ভেঙে দেই উফ অসহ্য।

দেখলাম পাশের রুম থেকে সাবিল বের হলো,,,,,,

আমাকে দেখে বলল

----আরেহ সুবাহ আপু দেখছি, তা কয় বছর পর এলে বাসায়?

আমি একটু হেসে বললাম

----ওসব ছার আগে বল পরশু যাসনি কেন আমাদের সাথে?

---আপু আমার টেস্ট পরীক্ষা চলছে কিভাবে যাব।

---আচ্ছা ঠিকাছে তা পরীক্ষা কেমন হলো?

----আলহামদুলিল্লাহ ভাল হচ্ছে।ইফাদের কেমন হচ্ছে?

----তোমার ভাই ভাল জানবে।

----তাহলে তো ভালই হবে।

সাবিল আমাকে বসতে বলে চলে গেল কিন্তু কে বসবে ঐ পাজির সামনে।

এবার আসি পরিচয় পর্বে_____

জোহরা ফুফি আমার বাবাদের চাচাতো বোন হয় শুনেছি বাবার চাচা মানে বারেক দাদুর এক মেয়ে দুই ছেলে ছিল তাদের মধ্যে প্রথম ছেলে পানিতে পড়ে মারা যায় আর ছোট ছেলে কিশোর বয়সে গাড়িতে চাপা পড়ে দাদু এই শোক সামলাতে না পেরে দীর্ঘকাল দিশাহীন ভাবে কাটিয়ে দেয় নিজের একমাত্র কন্যাকে কখনো দূরে থাকতে দিবে না সে, তারপর ফুফির বিয়ে দেয় প্রবাসীর সাথে । স্বামী প্রবাসী হওয়ার কারণে ফুফিকে তারা নিজের ঘরেই রেখে দেই।শুনেছি অনেককাল পরে ফুফির সন্তান হয় ডিটেইলস জানিনা। এরপর ফুফির তিন পুত্র সাদিক,সাহের,সাবিল হয়।

দাদু রা মারা যাওয়ার পর ওরা এই ঘরেই বড় হয় আর ততদিনে ফুফা বিদেশে উপার্জিত টাকা দিয়ে শহরেই জায়গা কিনে একটা চারতলা বাড়ি করেন কিন্তু ফুফি কোন ভাবেই সেখানে থাকতে রাজি হয়নি,তাই বাধ্য হয়ে ফুফা বিদেশ ফেরত হওয়ার পর থেকে এইখানেই ফুফির ঘরকে নতুন করে বেধে থাকতে শুরু করে।ফুফার চার তলা বাড়ি ভাড়াই দিয়েছেন।উনার বিশ্বাস তার যেহেতু তিন ছেলে নিশ্চয় পরবর্তীতে সবাই একসাথে থাকবে না তখন তারা চাইলে ওখানে নিজেদের সুবিধা মত থাকতে পারবে।

এবার আসি জোহরা ফুফির কথায়__

ফুফি খুবই আন্তরিক ছোট বেলা থেকেই আমাদের খুব আদর করে ঘরে ঢুকলেই হয় কখনওই খালি হাতে বের হতে দেয় না একটুকরা মাংস কিংবা আপেল,কলা, বিস্কুট হাতে ধরিয়ে দিত।ফুফি সবসময় তার আপন মানুষদের নিয়েই থাকতে চেয়েছেন। উনি যেমন এ বাড়ির সবাইকে ভালবাসেন তেমনি উনার পরিবার কেও সবাই ভালবাসে।

যাক এবার ফিরে আসি,,,,,,,,,,,

দেখলাম ফুফি নামছে উপর থেকে সবুজ একটা শাড়ি পরেছে একেবারে ফিটফাট উনি তবে ধার্মিক ও বটে।

আমাকে দেখে একটা সুন্দর হাসি দিল ফুফি আর সাদিক এর চেহেরায় অনেক মিল সেই বড় চোখ ছোট ঠোঁট। ফুফি কাছে আসতেই সালাম দিলাম।

উনি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন

----কেমন আছিস??কতদিন পর এলি।

---ভাল আছি।হ্যা মা কিছু জিনিস পাঠিয়েছে ওগুলো দিতে এলাম।

ফুফি টেবিলে গিয়ে খাবার গুলো ঢেলে রাখার জন্য অন্য পাত্র নিল আর খাবার দেখে বলছে,,

----বাহ! বিরিয়ানি, মিষ্টি, ছাচের পিঠা এত কিছু?

----হ্যা ভাইয়ার আক্দ এর উপলক্ষে মিষ্টি আর ঘরে একটা ফাতেহা করেছে আজ।

----আলহামদুলিল্লাহ খুব খুশি হয়েছি ইরাম এর কথা শুনে। তা ও দেশে কতদিন আছে?

----ছয় মাসের জন্য এসেছে,,,,,

বাবা মায়ের ইচ্ছা ছিল ভাইয়া কে এবার বিয়ে করিয়ে দেবার,তাই ছুটিটা বেশিদিন এর নিল।

----তোর ও তো বিয়ে ঠিক হয়েছে।

আমি একটু লজ্জা পেলাম তাই কিছু বললাম না।

ফুফি বলল

---আচ্ছা শোন একটা কথা রাখবি?

---কি কথা?

----তুই আগামীকাল দিনে চলে আসিস এখানে।

----কিন্তু,,,,

----আসতে বললাম ব্যাস আসবি বিয়ে হয়ে যাবে মাস খানেক পর আর তো পাব না তাই কালকে অবশ্যই আসবি।

----আমার যে ক্লাস আছে??

---তো কি হয়েছে দুপুরে তো বাসায় ফিরবি তাই না? তখন চলে আসিস।

----আচ্ছা ঠিকাছে।

আমি খাবারের বক্স গুলো হাতে নিয়ে ফুফিকে বিদায় দিলাম কিন্তু আমার মনে হলো ঐ সোফায় বসা মানুষটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

সাথে সাথে ফিরলাম কিন্তু না ও টিভি দেখছে, এই অনুভূতি টা আগেও একবার হয়েছে আমাদের ঘরে।

তারপর বাসায় ফিরে এলাম।

রাতে খাবার সেরে বিছানায় শুয়ে আছি।

লুবনা বলল

----আপু আমি তো কাল চলে যাচ্ছি তোমার একটা জিনিস নিয়ে যাব।

---কেন চলে যাচ্ছিস? আর কটা দিন থাক।

---না আপু কলেজ খুলেছে যেতে হবে। বল না নিব কিনা?

---আচ্ছা কি নিবি নিয়ে যা,,,,,

এটা বলতেই দেখি ওর হাতে বাঁদর টা। আমি এক ঝটকায় ওর হাত কে নিয়ে ফেললাম।

---কি হলো আপু?এটা আমাকে দিবেনা?

বিজ্ঞাপন

---এটা?তুই কি এটার কথা বলেছিলি?

---হ্যা আপু এটা খুব কিউট,তোমার স্মৃতি হিসেবে রেখে দিব।

-----কিন্তু এই সামান্য চাবিরতোড়া দিয়ে কি করবি?

---এটা সুন্দর লেগেছে তাই,,,,

----এটা না তুই আমার ভাল কাপড়,দুল,কস্মেটিক্স, জুতো যা ইচ্চা নিয়ে যা। সামান্য জিনিস টা নিয়ে গেলে আমার ভাল লাগবে না।

----ওহ বুঝলাম এটা দিতে চাইছ না।

----এটা আসলে আমাকেও স্মৃতি দিয়েছে তাই।

---ঠিকাছে আপু নো প্রবলেম।আমি তোমার অন্য জিনিস নিব।

লুবনা কিছু না ভেবে খুশি মনে আমার কাপড় আর অর্নামেন্টস দেখছে কিন্ত আমি? আমি কেন এমন আচরণ করলাম আমার অন্য সব বস্তু থেকে এটার প্রতি এত মায়া কেন?

----------

পরেরদিন ভার্সিটি থেকে ফিরেছি ১২ টায়। গোসল, নামাজ সেরে মা কে বলে ফুফির বাসায় চলে গেলাম।

ফুফি আমাকে দেখে অনেক খুশি হলো হাতে দেখি কি মাখানো।

----কি করছেন ফুফি?

ফুফি আমাকে চোখ দিয়ে ইশারা করল আমি তো অবাক,,,,,

দশ রকমের ভর্তা করেছে আর ও একটা করছে,,,

---আলু ভর্তা,শুটকি ভর্তা,বেগুন ভর্তা,পুদিনার চাটনি, টমেটোর চাটনি, শুকনো মরিচের ভর্তা,কালোজিরা ভর্তা,রায় রসুনের ভর্তা,সিদ্ধ ডিমের ভর্তা,কাকরল ভর্তা।

এতগুলো ভর্তা কেন করছেন ফুফি?

----তোর জন্য, আজ তোকে দাওয়াত করেছি না?

---এত কিছু কেন?

----বিয়ের আগে মেয়েদের দাওয়াত করতে হয়। ভাল মন্দ যা আছে খাবি আমাদের সাথে।

----আর এখন এটা কি করছেন?

---এটা বরবটি কে সিদ্ধ করে ভর্তার মত মেখে আবার একটা ডিম ফেটে তেলে দিব।

---বাহ আজ তো বাম্পার অফার পেলাম মনে হচ্ছে।

---হুম।

ফুফি এবার যুনি কে ডেকে একটা টিফিন ক্যারি দিয়ে বলল

----যা এটা সুবাহ দের ঘরে দিয়ে আই।

----ফুফি??

----প্রতিদিন কি দেওয়া হয় নাকি? তবে ভর্তা গুলো দেই নি এগুলো তোর।

আমি হাসলাম। ফুফি বলল সাদিকের ও অনেক প্রিয় এসব।

ছেলেটা ও চলে যাবে দু মাস পর ভাবলেই চিন্তা হয়।

জানিস আমি কখনো চাইনা সন্তানরা চোখের আড়াল হোক। আগে খুব আফসোস হত আল্লাহ আমাকে কেন একটা মেয়ে দিলেন না কিন্তু এখন ভাবি ভালই হলো না হয় মেয়েকে বিয়ে দিতে পারতাম না।

---আচ্ছা ফুফি শুনেছি তোমার দেরিতে সন্তান হয়েছিল।খুব জানতে ইচ্ছে করছে তোমার মা হওয়ার গল্প।

---সে অনেক দুঃখের কথা, আল্লাহর ইচ্ছায় আমার বিয়েটা ১৮ বছর বয়সে হয়ে যায় যদিও আমার বাবা মা এত তাড়াতাড়ি দিতে চাননি।বিয়ের পাঁচ বছর পর ও আমার সন্তান হচ্ছিল না আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদে কেটে আমি সুসংবাদ পাই কিন্তু তা বেশিদিন টিকলো না শ্বশুর বাড়িতে পান্ডুশ্রম করে বাচ্চাটা টিকেনি আর এরপর বাবা আমাকে এই ঘরে নিয়ে আসে তখন আমার অবস্থা নাজেহাল মনের অবস্থা ভীষণ খারাপ তার উপর তোমার ফুফা থাকতো বিদেশে এর আরও চার বছর পর আবার আমি সুসংবাদ পাই এবার বাবা মা খুব যত্ন করে রাখে আমাকে।সাদিক আমার কোল জুরে আসার পর আস্তে আস্তে আমি দুঃখ গুলো ভুলতে শুরু করি।

ফুফি বললেন

" নিশ্চয় আল্লাহতালা সবচেয়ে উত্তম পরিকল্পনাকারী (আনফাল-৩০)"

এই কথাটা আমি তখন না বুঝলেও এখন খুব বুঝি।

ফুফির কথায় হঠাৎ আমার কাছে আসা সেই প্রথম চিরকুট এর কথা মনে পড়ে গেল।""আমার প্রিয়তা""

ফুফি আবার বলে উঠলো জানিস আমি খুব খুব আল্লাহর কাছে চাইতাম আর কোরআন এ পেয়েছিলাম একটা কথা যা আমাকে অনেক শক্তি দিয়েছে।

"""ধৈর্য ধর, শক্ত হও, সময় সর্বদা এক অবস্থায় থাকেনা আর ভরষা কর সেই জীবিত স্বত্তার উপর যিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না।(আল ফুরকান-৫৮)

শোন মা একটা কথা বলি তুই ও কখনো দুঃখ করিস না আল্লাহ কাকে কোন নেয়ামত দেই কেউ জানেনা শুধু ভরষা টা অটুট রাখতে হবে।

তুই ও দেখিস আল্লাহ কখন কিভাবে তোর কোল ভরে দিবে তুই টেরই পাবিনা।

একটু পর দরজায় বেল বাজলো ফুফি গিয়ে দেখল যুনি এসেছে।খালি টিফিন টা নিয়ে

এরপর যুনি বিদায় নিল।

আমি বললাম

----উনি চলে গেল, আপনি একা কিভাবে করবেন?

----আরেহ কাজ তো শেষ আর যুনি দুপুরে চলে যায় তাছাড়া ঘরের বাকিরা তো আছেই।

তোমার ফুফা আর আমার ছেলেরা সব কাজ পারে।

আমি হেসে বললাম

---রান্না ও পারে?

---উম,,,অন্তত উপোষ মরবেনা।

----হাহাহা

দুজনেই হাসছিলাম আবার দরজায় বেল পড়লো।

ফুফি বলল সাদিক এসেছে

----আপনি কি করে বুঝলেন?

---- বুঝি ওদের সবার নিজস্ব অভ্যাস আছে।

ফুফি চুলায় রান্না কষাচ্ছিল বলে আমাকেই পাঠালেন।

আমি গিয়ে দরজার লক খুললাম বুক টা কেমন দুরুদুরু করছে।

সত্যিই দেখি ও ক্লান্তি নিয়ে,জুতো খুলছিল,,,

আমি একটু মজা নিলাম।

বললাম

-----আজকে মাফ করুন।

সাদিক চমকে উঠে আমার দিকে তাকাল।

---কেন মাফ করব?এসেছি যখন কিছু তো নিয়ে যাব।

আমি মুড নিয়ে বললাম

----ঘরের বড় ছেলে নেই।

----তা ওর সাথে আমার কি??

আমি এবার দুষ্টু হেসে বললাম

----না মানে ওর সাথে ভিক্ষুক দের খুব যায় তো।থাকলে আপনার সাথেও বন্ধুত্ব করে নিত।

ওকে কিছু বলতে না দিয়েই আমি পালালাম।

ফুফি বলল এসেছে সাদিক?

--জ্বি।

----এখন শুরু হবে তাড়াহুড়ো।

---কেন?

---ও দুপুরে আসলে এত অস্থির থাকে,যেন দুইমিনিট দেরি হলে খাবার হজম হবেনা।

---হাহাহা,,,

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প