আমার প্রিয়তা

পর্ব - ২১

🟢

সাদিক হাত নাড়ছে আমার সামনে

---কিরে আর কত ঘুমাবে?এত ঘুমিয়ে কি হবে শুনি?

আমি চোখ খুলে বললাম

----সাদিক?

ও হেসে বলল

---হুম আমি, তোমার একমাত্র সাদিক।

----হ্যা কিন্তু তুমি যে বড্ড জ্বালাও আমাকে?

ও মুচকি হেসে বলল

---তাতে কি? এখন তো আর জ্বালাব না,থাকতে পারবে তো?

---হুম খুব পারব।

ও হেসে বলল,,,

ঠিকাছে এবার বিদায় পালা

বলেই দেখি হনহন করে হাটা দিয়েছে

আমি এক দৌড়ে গিয়ে ওর ডান হাত ধরে ফেললাম।

----কোথায় যাচ্ছ?

---দূরে।

আমি ওর ডান বাহুটা ঝাপটে ধরে জড়িয়ে বললাম

----তুমি কি কিছুই জানো না?

ও সামনের দিকে মুখ করা অবস্থাতেই বলল,,,

---কি?

----সুবাহ কে ছাড়া যেমন সাদিক হয়না তেমনি সাদিক কে ছাড়াও সুবাহ হয়না।

ও হেসে বলল,,,

---তাই বুঝি?

আমি ওর বাহু থেকে মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে বললাম।

---আমি তো তোমাকে যেতে দিতে পারব না।

----এবার ও আমার হাত ছাড়িয়ে আমার দিকে ফিরে চোখে চোখ রেখে বলল

----কেন বলো তো??

---কারণ আমি যে তোমাকে,,,,,,

---আপু, আপু?

আপু দরজা খুলো।

ইফাদ এর আওয়াজ এ চেতনা ফিরে পেলাম, হাই আল্লাহ জায়নামাজ এ বসে বিছানায় হেলান দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। এখনো চোখেরজল শুকাইনি, ইফাদ কে আওয়াজ দিয়ে দরজার পাশে গেলাম।

----ইফাদ আমি ঠিকাছি ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম একটু পর আসছি তুই এখন যা।

---আচ্ছা।

বাইরে কি বলব গিয়ে বুঝছিনা তখন মা ছিল না বলে কোন উত্তর দিতে হয়নি তার উপর ঘর ও নোংরা করে ফেলেছি,কি যে গুনাহ হবে এত গুলো ভাত এভাবে,,,,

আমি ভয়ে ভয়ে দরজা টা খুলে বাইরে গেলাম মা আর বাবা চিন্তিত মুখে সোফায় বসে আছে আমি আগে ফ্লোর চেক করলাম দেখি সব ঠিকঠাক গুছানো।

মা আমাকে দেখে বলল

----সুবাহ আমরা হস্পিটাল যাচ্ছি সাদিক কে দেখতে চল।ইশ ছেলেটা কি বিপদে পড়লো এইভাবে কেউ গাড়ি চালাই?

বাবা বলল,,,

----বিপদের কি হাত পা আছে নাকি?আর কেউ কি ইচ্ছে করে এক্সিডেন্ট হয় ?তুমিও কি আবলতাবল বলো।

---আমার চিন্তা হচ্ছে তাই বললাম আর কি।

----মা তোমরা যাও।

আমি চট করে কি বলে ফেললাম নিজেও জানিনা।

----কেন তুই,,,,, , যাবিনা কেন?

----জানোই তো আমার ভাল লাগেনা হস্পিটাল।

---আচ্ছা তাহলে ঘরে থাকিস।ইরাম তো আছেই।

বাবা মা তৈরি হয়ে চলে গেলেন।আমি এখনো একটা দানা ও মুখে দিতে পারিনি। স্বপ্নের ঘোর যেন এখনো কাটেনি আমার, ওটা কি ছিল? সাদিক কে আমি এতটা আপন কিভাবে ভাবতে পারি?

স্বপ্নের অনুভূতিটা অনুভব করতেই কলিজাই কাটা বিঁধল তখন মনে হয়েছিল সাদিক শুধুই সেই সাধারণ মানুষ টা না, যাকে আমি প্রতিদিন দেখি সে আমারই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ছিঃ ছিঃ কি ভাবছি আমি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে শুরু করলাম শুনেছি মানুষের ছোট বড় গুনাহ তে আস্তাগফিরুল্লাহ ইরেজার এর মত কাজ দেয়।পেন্সিল এর লিখা যেমন ইরেজার মুছে দেয় ঠিক তেমন।

আমার মাথাটা ভীষণ ভনভন করছে স্বাভাবিক ব্যাপার। খবরটা শোনার পর থেকেই কেঁদেকেটে একাকার জায়নামাজ এ বসে শুধুই বলেছি আল্লাহ তায়ালা কে সাদিক কে যেন তার মায়ের বুকে ফিরিয়ে দেয়।

একটু পর ইফাদ এলো আমি দরজা খুলে বললাম

---- কেমন আছে ও?

ইফাদ মুখ নিচু করে বলল

----মাথায় ব্যথা পেয়েছে হাত আর পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত তবে মাথা থেকে রক্ত ক্ষরণ হয়েছে বলে এখনো জ্ঞান ফিরেনি।ডাক্তার বলেছেন বাহ্যিক ক্ষত গুলো সেড়ে যাবে কিন্তু মাথায় ইন্টারনাল ইঞ্জুরি না থাকলেই হয়, রিপোর্ট এখনো আসেনি।

আপু আমার অনেক খারাপ লাগছে এটা কি হয়ে গেল?

আমি ওকে বললাম

--""আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বিপদ আসে না,আর যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস পোষন করে তিনি তার অন্তর কে সঠিক পথের সন্ধান দেন।(তাগাবূন-১১)""

ইফাদ একটা কথা মনে রাখিস সব কাজের পেছনে একটা ভাল উদ্দেশ্য থাকে হোক সেটা খারাপ কিংবা আমাদের অপ্রিয় কিছু কিন্তু সময়ে সেটা আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায় অনেক কিছুই।

ইফাদ কে তো আমি শ্বান্তনা দিয়ে দিলাম কিন্তু নিজের মনকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছিনা।

রুমে গিয়ে চাবির বাঁদর টাকে হাতে জড়িয়ে ধরলাম।

----প্লিজ ফিরে এসো,

বিশ্বাস কর আমি যদি আর দশটা মেয়ের মত হতাম তাহলে আমি নিজেই তোমার কাছ থেকে নিজের সব প্রশ্নের উত্তর গুলো নিয়ে নিতাম কিন্তু আমি যে,,,,,

ইফাদ নক করে ঘরে এলো

পেছনে ফিরে দেখি ওর হাতে খাবার

---আপু এসো খেয়ে নাও।

বিজ্ঞাপন

আমি ইফাদ কে না বলতে পারলাম না কারণ ও দেখেছে সব তাই এখন না বললে অনেক প্রশ্ন করতে পারে।

আমি চুপচাপ খেয়ে নিলাম।ইফাদ বলল

----ঐ সময়ে ফ্লোরে পরা খাবার গুলো খালা এসেছিল কাজ করতে উনার দিয়েই মুছিয়ে নিয়েছি ভাগ্যিস মা আসার আগেই উনি এসেছিলেন।

আপু আর তিন দিন পর তোমার বিয়ে।

আমি চমকে উঠলাম হ্যা তো আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।হাই আল্লাহ এ কেমন পরীক্ষা।

পরেরদিন আমি দোতলায় গিয়ে বসে আছি পাশের টেবিলে তাকিয়ে মনে হচ্ছে এই বুঝি সাদিক এসে পরবে।

ছেলেবেলার অজস্র কথা মনে পড়ে যাচ্ছে দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া আর আমাদের কথা গুলো ভাবতেই কখনো রাগ হচ্ছে আবার কখনো হাসির সাথে কান্না পাচ্ছে। সত্যি বলতে আমি ভাবিই নি এই আমি ওকে কখনো মিস করব তাও এত টা।

ইরাম ভাইয়া উপরে এসেছে ওকে দেখে আমিও ভাইয়ার রুমে ঢুকলাম।

-----ভাইয়া।

----হ্যা বল।

---কিছুনা এমনি এসেছি

----কি ব্যাপার তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? রাতে ঘুমাসনি মনে হয়?

----কই নাতো।

----আচ্ছা ডাক্তার সাহেব ফোন করেছিল জিজ্ঞেস করতে বলেছে তোর কিছু লাগবে কিনা।

আসলেই লোকটা ভদ্র তোর নাম্বার আছে তারপর ও তোকে কল না করে আমাকে করেছেন।

----ভাল ।উনি ঠিক করেছেন।

----আচ্ছা তোর কিছু লাগবে নাকি বিয়েতে?

আমি বিরস মুখেই বললাম।

----আমি উনাকে বলে দিয়েছিলাম আমি মায়ের শাড়ি পড়তে চাই বিয়েতে।

----তারপর ও উনি বলেছেন বিয়ের আগের দিন নাকি ডালা পাঠাবেন।

---ওটা উনার ব্যাপার।

ভাইয়্যা এবার আমাকে খেয়াল করে বলল তুই এমন মনমরা হয়ে আছিস কেন?আমাকে বল কি হয়েছে?

আমি ভাইয়ার দিকে আকুল মিনতি নিয়ে তাকিয়ে আছি কিন্তু আমার হৃদয় যে তালাবদ্ধ কিভাবে বলি।

আমি বললাম

---সাদিক!

ভাইয়া আমার দিকে চেয়ে বলল

---সাদিক? আরেহ হ্যা ওর তো জ্ঞান ফিরেছে ডাক্তার বলেছে এখন আশংকা মুক্ত।

----আলহামদুলিল্লাহ। শোখর আলহামদুলিল্লাহ । এইবার আমার মুখে কিছুটা হাসি ফুটে এলো।

---তবে ও এখন পুরোপুরি বিশ্রামে আছে ডাক্তার কথা বলতে বারণ করে দিয়েছে। আঘাত ও কম পাইনি তাই দুই তিনদিন এভাবেই থাকবে।

----রিলিজ কখন দিবে?

---জ্ঞান যখন ফিরেছে নিশ্চয় বেশিদিন রাখবে না ঘরেই চিকিৎসা নেবে।

আমি আর কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে এলাম।

"আল্লাহ বলেন,আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।( মুমিন-৬০)"

আমার ডাকেও তিনি সর্বদা সাড়া দেন আর আমার বিশ্বাস কে আরো মজবুত করে দেন।যাক সাদিক এর জ্ঞান ফিরেছে।

সন্ধ্যায় বারান্দা থেকে কাপড় গুলো নিয়ে বিছানায় রেখে আসলাম ভাবছি সামনের তিন টা দিনই আছে যেটা কেবল আমার তারপর, দুঃখের শ্বাস ছেড়ে বললাম সব বদলে যাবে।

:::::::::::::::::::::

ভোরে নামাজ শেষে উপরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বড্ড ভাল লাগছে এই নিশ্চুপ জায়গা টা তার সাথে আরো বেশি পারফেক্ট হয়ে গেল যখন বৃষ্টি নামা শুরু করল।

আমি হাত দিয়ে পানি ছুঁয়ে দেখলাম শীতল একটা অনুভূতি কিন্তু আমার মন সে তো ছটফট করছে। হঠাৎ মনে হলো কেউ পেছন থেকে বলল,,,

ওয়া হুওয়াল্লাযী ইউনাঝঝিলুল গাইছা মিম বা‘দি মা-কানাতূওয়া ইয়ানশুরু রাহমাতাহূ ওয়া হুওয়াল ওয়ালিইয়ুল হামীদ।

অর্থঃ মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পরে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই কার্যনির্বাহী, প্রশংসিত।

সূরা আশ্‌-শূরা (الشّورى), আয়াত:২৮

আমি ফিরে তাকালাম ভাইয়্যা?

----হুম।তুই কি খুব উদাস?

আমি মাথা নিচু করে রইলাম কারণ মিথ্যা আমি বলতে চাইনা।

---আচ্ছা বিয়ের জন্য মন খারাপ? পাগলি আমরা কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি নাকি।তুই হুকুম করবি আর আমরা হাজির।

আমি একটু হাসলাম

----তবে আমার কি মনে হয় জানিস? তুই বিয়ের পর আমাদের কে ভুলেই যাবি।

----এটাই চাও তাই তো?

---সত্যি বলতে হ্যা।

ডাক্তার সাহেব এর কল এলো মায়ের মোবাইলে

মা রিসিভ করে একটু পর আমার হাতে ধরিয়ে দিল

----নে কথা বল।

উনি সালাম দিয়ে বললেন

---কেমন আছেন?

---ভাল।

----আচ্ছা আপনার কোন রং টা প্রিয় একটু বলবেন?

----সাদা।

----ওকে আর?

---মানে?

---রঙিন কিছুতে,,,,

----সব রং ই সুন্দর আপনার যেটা ভাল লাগবে ওটাই নিবেন।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম উনি আমার জন্য কিছু নিচ্ছেন তাই ভনিতা না করেই বলে দিলাম।

----আমার পছন্দে পড়বেন?

---হুম।

----ঠিকাছে ভাল থাকবেন।

ফোন রেখে দিয়ে আবার আলু ছিলতে লাগলাম ভাবলাম এই লোকটা কত ভদ্র কিন্তু তারপর ও আমি ঐ (অ)শরিও ভদ্র টা কে মিস করি কেন?

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প