আমার প্রিয়তা

পর্ব - ২২

🟢

কুয়াশার ঘনঘটার মত জীবনে কি হতে যাচ্ছে সবই ঝাপসা লাগছে।

প্রতিটা ঘন্টায় অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে আমার।নাওয়া-খাওয়া, নিদ্রা সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।

মা এসে বলল

---কিরে এখনো বসে আছিস কেন??আজকাল দেখি তুই ভার্সিটি ও যাচ্ছিস না।

---আজ যাব মা।

---ঠিকাছে তৈরি হয়ে নে।

ভাইয়া বের হচ্ছিল তাই আমি বললাম আমাকে নামিয়ে দিতে।কিছুই ভাল লাগছেনা।

আমার বান্ধুবি রিকযা বলল

---কি হয়েছে তোর?এতবার নক দিলাম খবর নেই।কল করলাম তাও ধরলিনা।

মনেমনে বললাম কিভাবে ধরি গত দুইদিন ধরে আমি তো আমার মাঝেই নেই।

রিকযার সাথে কথা না বাড়িয়ে আমি ক্লাসে মন দিলাম কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার আমার সব ভাবনায় শুধু সাদিক ও কি বলেছে, আমি কি বলেছি হাজার হাজার মুহূর্ত খালি চোখের উপর ভাসছে আর মনে মনে কথা গুলো আওরাচ্ছি মনে হচ্ছে আমি ওকে ছাড়া কাউকেই দেখতে পাচ্ছিনা আবার মাঝেমাঝে হাত কে শক্ত করে বারি দিচ্ছি শক্ত বস্তুর সাথে।অস্থির লাগছে কেমন যেন।

ক্লাস শেষে দৌড়ে দিয়ে বসে আছি করিডোর এর শেষ প্রান্তে রিকযা আমাকে খুঁজে নিয়ে বলল এখানে কি করছিস একা?

----চল সামনে পরীক্ষা প্রিভিয়াস কোয়েশ্চেন গুলো কালেক্ট করি।

আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম পরীক্ষার কথা

---আচ্ছা চল।

বাসায় ফিরে ও নামাজ টা পড়ে কিছু সময় ছাদে গিয়ে বসেছিলাম সন্ধ্যার পর বারান্দায় আর রাতে নিজের রুমের কোনায় হাটু ভাজ করে মুখ গুঁজে ছিলাম।

---"তুমি সবর করো,নিশ্চয় শুভ পরিনাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য।(সূরা-হুদ-৪৯)"

মাথা তুলে দেখলাম ইফাদ।আমি সোজা হয়ে বসলাম

---আপু নিচে বসে কি করছিস?

---কিছু না।

ইফাদ আমার পাশে এসে বসলো। আপু ভরষা রাখ।

আমি জানি ইফাদ

"আল্লাহ ভরষাকারীদের কে পছন্দ করেন(আল-ইমরান-১৫৯)"

ইফাদ আমার হাত দুটো ধরে বলল---আপু

ভাইয়া তোমাকে অনেক পছন্দ করে।

আমি চমকে উঠে ওর দিকে তাকালাম।

---হ্যা আপু সত্যি বলছি তুমি ডাক্তার সাহেব কে বিয়ে করো না।

আমি ইফাদ এর দিকে উৎকণ্ঠা হয়ে বললাম "তুই কিভাবে জানিস?ও,,ও তোকে বলেছে?

ইফাদ মাথা নিচু করে বলল

---না আপু ভাইয়া আমাকে বলেনি।

আমি কান্না মাখা অভিমান নিয়ে বললাম

----তাহলে? ইফাদ প্লিজ চলে যা এখান থেকে, আমার ভাল লাগছে না।

ইফাদ আমার হাত ধরে বলল

----আপু তুমি ভুল করছ। ভাইয়া কে কষ্ট দিচ্ছো।

-----ও আমাকে কখনো কিছু বলেনি তাছাড়া দুই দিন পর আমার বিয়ে। তোকেও তো কিছু বলেনি।

----তুমি কি আমাকে বলেছ?

আমি ওর দিকে তাকালাম।

----তুমিও তো বলোনি তাহলে?আপু শোনো যেদিন তোমাকে ডাক্তার সাহেব দেখতে এসেছিলেন সেদিন দেখেছিলাম সাদিক ভাইয়ার অস্থিরতা। আমি ভাইয়াকে লক্ষ্য করেছিলাম ওর খেয়াল ছিল তোমাদের দিকেই তারপর আমার থেকে জিজ্ঞেস করলো উনি কে? আমি বলেছিলাম তোমাকে দেখতে এসেছে।

আমি ইফাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি অবাক হয়ে।

----জানো আপু এরপর থেকেই সে কি অস্থিরতা সাদিক ভাইয়ার। আমি অংক করছিলাম তাই ভাইয়া কে জিজ্ঞেস করছিলাম কিন্তু ভাইয়া আমাকে বারবার উল্টাপাল্টা জবাব দিচ্ছিল তোমরা নিচে চলে যাওয়ার পর ভাইয়া বলল ওর শরীর ভাল লাগছে না তাই আর পড়াবেনা।

এরপর যেদিন তুমি মিষ্টি এনেছিলে সেদিন ও ভাইয়ার চোখ কেমন লাল হয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছেলেদের কান্না পেলে চোখ লাল বর্ণ ধারণ করে আমার মনে হয়েছিল ভাইয়া সেদিন প্রচন্ড আঘাত পেয়েছে।মিষ্টি খাওয়া তো বাদ এরপর থেকেই ভাইয়া কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে, আগে পড়ানোর ফাঁকেফাঁকে অনেক দুষ্টুমি করতো কিন্তু মাস খানেক ধরে তেমন কিছুই করে না।আমি অনেক বার দেখেছি ভাইয়া এখন আড্ডা না দিয়ে একা একা বড় মাঠ টার বেঞ্চে বসে থাকে।

কখনো দেখি মসজিদে সবাই চলে আসার পরও ভাইয়া আনমনে বসে আছে।

ওকে দেখলেই আমার কেমন দুঃখি লাগে।আর এই পরিবর্তন গুলোর কারণ হিসেবে আমি তোমাকেই পেয়েছি।

তারপর ও কি বলবে তুমি কিছুই বুঝতে পারছো না এখনো?

আমি শান্ত গলায়, দু ফোটা জল ফেলে বললাম

----কি আসে যায় তাতে? ওর সাথে আমার মিল সম্ভব না।

---আপু,,

আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম

----এটা নিছক পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয় আর জেনে শুনে আমি এমন করতে পারিনা ওর সাথে।

---আর যে কষ্ট টা দিচ্ছো ওটা কি ঠিক?

----পরে ও বুঝতে পারবে এটাই ঠিক ছিল,সব ভুলে যাবে একদিন।

----আর তুমি?

বিজ্ঞাপন

আমি মুখ ফিরিয়ে বললাম

----মনে রাখলেই তো ভুলবো! আমার কিছু অনুভব হয়না ওর প্রতি।

---একটু ও না?

---না।তাছাড়া সাদিক ও সব ভুলে যাবে শিঘ্রই এসব কেবল মোহ ।

----কাকে শ্বান্তনা দিচ্ছো জানিনা।নিজেকে নাকি আমাকে। ভাইয়া হয়ত তোমার মন বুঝতে পেরেছে তাই তো বিদেশ চলে যাবে।

ইফাদ উঠে চলে গেল। আমি বিছানায় উঠে শুয়ে পরলাম।সাদিক হয়ত কিছুটা পছন্দ করে আমাকে তাতে কি, সব ঠিক হয়ে যাবে আমি জানি।

পরেরদিন ভোরে বারান্দার পিলারে পিঠ ঠেকিয়ে রেলিং এ বসে আছি দূরে পাহাড় দেখা যায় ছোট ছোট পাহাড়। আমি বারবার চাইছিলাম মন থেকে এসব ঝেড়ে ফেলতে কিন্তু আমার অবস্থা এমন "যাও পাখি বলো তারে সে যেন ভোলে না মোরে, চোখ জ্বলে যায় দেখব তারে,,,,

জানিনা সাদিক এর এখন কেমন লাগছে? কেমন আছে ও? ও কি খুব ব্যাথা পেয়েছে?ওর কি আমাকে মনে পড়ছে?

চোখ জ্বলে যায় দেখব তারে, মন চলে যায় অদূর দূরে।।।

পরক্ষণেই ভাবলাম ছিঃ ছিঃ এসব ভাবা চলবে না আস্তাগফিরুল্লাহ।দ্বীনের পথে শয়তান এত বাধা দেয় উফ্।

মা আমাকে ডাকলেন,হাতে ছোট টিফিন ক্যারি দেখতে পেলাম

----সুবাহ শোন তুই এটা তোর জোহরা ফুফি কে দিয়ে আই তো।

আমি একটু ঢোক গিললাম মা কি আমাকে হস্পিটাল পাঠাচ্ছে নাকি?

কিন্তু আমি যে ওকে এই অবস্থায় দেখতে পারব না।

মা বলে উঠলো তোর ফুফি ঘরে এসেছে যা তুই সহ গিয়ে সাদিক কে দেখে আই কিন্তু মা আমি,,,,

---সুবাহ কাল বাদে পরশু তোর বিয়ে, এই ঝামেলায় তুই ওকে আর দেখতে ও যেতে পারবি না তাই বলছি আজ গিয়ে দেখে আই, তোর ফুফির ও ভাল লাগবে আর কখন দেখা হয় না হয়।

----না মা আমি যাব না,দাও এগুলো দিয়ে আসি।

সাদিকের বাসায় গিয়ে ফুফিকে দেখলাম চিন্তায় যেন এই তিন দিনে চেহেরা পালটে গেছে।

আমি বললাম ফুফি

----আপনি কি কিছু খুঁজছেন?

---হ্যা এসেছিলাম কিছু কাপড় আর একটা ফাইল নিতে কিন্তু মাথাটা ঘুরছে।

আচ্ছা ফুফি একটা কাজ করুন আপনি গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নেন আর কি লাগবে আমাকে বলুন আমি নিয়ে নি।

----তাহলে তুই একটু বস আমি গোসল করে নামাজ টা সেড়ে নি।

আমি ফুফিকে থামিয়ে বললাম,,,

ইন্না আল্লাহা মাআস্ সবিরিন

‘‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”

(আল বাকারাহ্ -১৫৩)

ফুফি ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,,,

----ঠিক বলেছিস মা, কি যে চিন্তায় গেছে গত দিন গুলো এখন স্বস্থি পেলাম।

---ও কেমন আছে?

---আলহামদুলিল্লাহ ভাল।

---কি অবস্থা এখন শরীরের?

---মাথায় ইন্টারনাল আঘাত পাইনি তবে শরীর থেকে রক্ত গেছে প্রচুর তাই খুব দূর্বল জ্ঞান ফিরতেও দেরি হয়েছিল।এখনও ওষুধ দিয়ে রেস্টে রেখেছে।

আমি গলা কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করলাম

----ও,,,ও কি কিছু বলেছে? মা,,মানে কিভাবে ঘটেছে এসব?

----নারেহ এখনো তেমন কিছু বলেই নি ও। ডাক্তার কথা বলতে মানা করেছে যেহেতু মাথায় আঘাত আর বেশির ভাগ ঘুমের মধ্যেয় থাকে। ডাক্তার বলেছে দু চার দিন ভালভাবে রেস্ট নিলেই সুস্থ হয়ে যাবে ঘরে নিয়ে আসতে পারব।

তারমানে সাদিক এর জ্ঞান ফিরলেও এখনও তেমন একটা ঘুমের প্রভাব কাটেনি ওর।ভালই হলো আমার বিয়েটা ওর দেখতে হবে না কষ্ট ও পেতে হবে না।

ফুফি বলল আমি কাজ সেড়ে নিই তারপর একসাথে বের হয়ে যাব চল।তুই ওর জন্য খাবার এনেছিস দেখলে ওর ভাল লাগবে।

হাই আল্লাহ ফুফি ভেবেছে আমি উনার সাথে যেতে এসেছি।না কি করে বলি।

আচ্ছা আগে ওর কিছু কাপড় নিতে হবে আর কি যেন একটা প্রোজেক্ট ফাইল ওসব নিয়ে নি আবার না হয় ভুলে যাব।

আমি সহ সাদিকের রুমে ঢুকলাম একটা তাক এ কিছু বই আর কিছু ফাইল আছে।ফুফু বলল নীল ফাইল টা নিতে "এইচ,আর" প্রোজেক্ট নামের।

আমি ফাইল খুঁজছিলাম আর ফুফি ওর কাপড় নিচ্ছিল।

----ফুফি, ফাইল টা কিসের জন্য?

---ওর অফিসের কলিগ ফোন করেছিল ফাইল টা নাকি দরকার তাই ওখানে এসে নিয়ে যাবে।

---ওহ।

হঠাৎ ফাইলের সাথে হুড়মুড় করে আরও কিছু বই, খাতা পড়ে গেল আমি নিচে বসে সব উঠিয়ে নিলাম যেই কালো ডায়েরীটা তুলতে যাব খুলে পড়ে থাকা ডায়েরী টার কিছু পাতা ফ্যান এর বাতাসে উল্টে গেল।

আমি হাত দিতেই হাত পড়লো একটা পেইজে যেখানে বড় করে লেখা

।। আমার প্রিয়তা।।

চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেছে নাকি শুধু আমিই কিছু শুনতে পারছিনা জানিনা।

---ফাইল পেয়েছিস?আচ্ছা তুই একটু অপেক্ষা কর আমি আসছি বলে ফুফি চলে গেল তার কাজে। আমি হাতের সব বই,ফাইল গুলো তুলে তাক এর মধ্যে রাখলাম তারপর ডায়েরী টা হাতে নিয়ে আবার খুলতেই লেখাটা দেখতে পেলাম।

মুহূর্তেই চোখ ঝাপ্সা হয়ে গেছে আমার মুখ থেকেও ঐ একটা কথাই বের হলো।

"""আমার প্রিয়তা""""

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প