এক দফা কান্না শেষে বের হলাম গোসল করে,দরজায় নক হতেই দেখি ইফাদ ঢুকলো ও আবার দরজা লাগিয়ে দিলো।
----আপু?
আমি উওর না দিয়ে ওর দিকে তাকালাম।
---আপু তুমি সত্যিই বিয়ে টা করবে?
---হু-ম
---দেখো তোমার অবস্থা কি হয়েছে,এখনো বলবে তুমি ওকে চাওনা।আমার বিশ্বাস ভাইয়া মুখে না বললেও তোমাকে অনেক চাই।
আমি ফোলা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম
--হ্যাঁ জানি।
একটা কাজ করে দিবি?
---কী?
উঠে গিয়ে ডায়েরী টা আনলাম
---শোন এটা সাদিক এর ঘরে রেখে দিবি তবে ও যেন না জানে।
----এটা ভাইয়ার ডায়েরী?
--হ্যাঁ।
---আপু আমার একটা কথা রাখবে প্লিজ।
--কী?
----ভাইয়া কে একটা বার ফোন কর।
প্লিজ আপু প্লিজ।আমি আর কিছু চাইবো না তোমার থেকে।
অন্তত একটা বার চেষ্টা করে দেখো।
আপু তুমিই তো বলতে
"জীবন সহজ না,জীবন কে সহজ বানিয়ে নিতে হয়, কখনো দোয়া করে,কখনো সবর করে,কখনো মাফ করে আবার কখনো বা এড়িয়ে চলে।"(তারিক জামিল)।
আর এখন তুমি নিজেই এতোটা কঠিন পদক্ষেপ কেন নিচ্ছো?
একবার নিজেকে সুযোগ দাও জানোই তো যে নিজেকে সাহায্য করে তাকে আল্লাহও সাহায্য করেন।অন্তত আজীবন আফসোস তো থাকবে না।
---কী করতে বলছিস? ওর অসুস্থ শরীরে আমার বিয়ে ভাঙতে আসতে বলবো?
---না,তবে বাবা-মা কে জানিয়ে দাও।
---না এটা সম্ভব না,আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাইনা।
----তুমি সবচেয়ে বড় কষ্ট দিতে যাচ্ছো সবাইকে।
--আমি?
---হ্যাঁ আপু নিজে ভাল না থাকলে আশেপাশের কাউকে সুখী রাখা যায় না।
----এসব সময়ের ব্যাপার, সময় সব ঠিক করে দিবে।
---একদম না আপু।
ঠিকাছে তোমার নিয়ম অনুসরণ করি,এক বার চেষ্টা করে দেখি বাকিটা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলাম।
ইফাদের কথায় সাই দিতে খুব ইচ্ছে করছে কারণ আমার মনেও রয়েছে সুপ্ত অনুভূতি, যদি সত্যিই কোন চমৎকার হয়ে যায়।
ইফাদ বলল আপু আমি ভাইয়া কে কল দিচ্ছি।
চোখের পানি মুছে বললাম
---না, না ফুফি কে কল দে।
---তুমি কথা বলবে?
---না আগে তুই বল?কিন্তু কি বলবি?
---আপু, ওটা পরে ভেবো, দাঁড়াও রিং পড়ছে।
---আসসালামু আলাইকুম ফুফি?
---হ্যা, কে?
--ইফাদ বলছি,সাদিক ভাইয়া কেমন আছে এখন?
---আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছে।
---ঘরে বিয়েতো তাই আর দেখতে ও যেতে পারিনি।
---ও হ্যাঁ,,! সুবাহর বিয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম তোর বাবা বলে ছিল পরশু আমাকে।
---ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলা যাবে?
---আমি তো ডাক্তার এর সাথে কথা বলতে এসেছিলাম দাঁড়া কেবিনে গিয়ে দেখছি।
ইফাদ আর আমি অপেক্ষা করছি, সাথে আমার বুক ঢিপঢিপ করছে কী বলবো ওটা ভেবে।
---ফুফি বলল একটু পর কল দিচ্ছি।
পাঁচ মিনিট অপেক্ষার পর কল এলো।
ফুফি বলল
---ইফাদ তোর মাস্টার তো ঘুম।
--ওহ! তাহলে থাক।তা ফুফি আপনি বাসায় কয়টায় ফিরবেন?
----আমার হয়তো আসা হবে না রে, কাল সাদিক কে রিলিজ দিতে পারে, একেবারে তখন আসবো।
আমি ইফাদ কে ইশারা করলাম জিজ্ঞেস করতে,
----ভাইয়া কি এখন সুস্থ হয়েছে?
---হ্যা কিছুটা ভাল হয়েছে তবে বাসায় গিয়েও রেস্টে থাকতে হবে।
---আচ্ছা তাহলে রাখি।
আমি খুব দুঃখ পেলাম সাথে ইফাদ ও।
----দেখেছিস চেষ্টা করে?আমার ভা-গ্যে এটাই,, ছিল। গলা ধরে গেছে কথায় বের হচ্ছে না।
হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।এমন সময় আমার ঘরের দরজায় আবার নক, ইফাদ গিয়ে খুলে দিল আমি মুখ লুকিয়ে কথা বললাম।
মা তাড়াহুড়োই দেখেনি ভাগ্যিস ভাত দিয়ে গেছে আমার জন্য।
ইফাদ অনেকটা জোর করেই খাওয়ালো।
আপু তুমি না আমাকে বলেছিলে----
আল্লাহ্ বলেন "মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব ।(আর রুম-৪৭)।""
---হুম।
ইফাদ অসহায় ভাবে তাকিয়ে চলে গেল।
আমি আল্লাহর উপর সব ছেড়ে দিলাম দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে আজকের দিন টা যেন আমার জীবন থেকে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে কিন্তু আমি যে চাই না।
মা এসেছে সাথে কাজিনরা।
আমি বলেছিলাম মায়ের শাড়ী পড়বো ।
বোনরা মিলে আমাকে তৈরি করে দিচ্ছে,কষ্ট শুধু একটাই আজকের পর সব চাওয়া বদলে যাবে, ইচ্ছা থাকুক কিংবা না থাকুক আমি যে অন্যকারো ঘরোনি হয়ে যাব।
বেগুনী বেনারসি পড়েছি মায়ের, বাবা আমার জন্য গহনা রেখেছিল ওগুলোই পড়লাম,আমি ফুল খুব পছন্দ করি তাই আজ খোপার দুপাশে সাদা ফুল পড়েছি, মেহেদীর গারো রঙ এ আরো পরিপূর্ণতা পাচ্ছে বউ সাজ টা।বেগুনী চুনরি দিয়ে ঘোমটা নামিয়ে রেখেছি।
বাবা এসে বললেন
---তোকে আমার মায়ের মত লাগছে।
আমি কাঁদোকাঁদো মুখে বললাম
---এটা তো সবসময় বলো।নতুন কিছু বলো।
---আমার মায়ের চাইতে সুন্দর কী আছে আমার জন্য।
---বাবা কিন্তু এটা তো তোমার বউ এর শাড়ী।
----হাহাহাহাহাহা
আমিও হাসতে হাসতে কেঁদে দিলাম বাবা কে জড়িয়ে ধরে।
আমি দোতলায় বড় ভাইয়ার রুমে বসে আছি কাজিনদের নিয়ে যেহেতু নিচে মেহমান। আর মেহমান বলতে নিকট আত্মীয়রা কেবল।
একটু পরেই শুনলাম বর যাত্রী চলে এসেছে।
আমার শুন্য দৃষ্টি কোথায় ঘুরপাক করছে নিজেও জানিনা।এ সময় টা কি না এলেই হতো না?
সময় আস্তে আস্তে বেড়েই যাচ্ছে একটা সময় ডাক পড়লো আমার,ইরাম ভাইয়া এসেছে আমাকে নিচে নিয়ে যেতে অন্য কাজিনরা নিচে চলে গেল।
লাবিনা, লুবনা,ইফাদ আর ইরাম ভাইয়া আছে শুধু।
ভাইয়া ডাকল সুবাহ নিচে চল কাজী সাহেব ডাকছেন।
আমি মাথা তুলে ভাইয়ার দিকে তাকালাম।
ভাইয়া অবাক হলো
---এ কি এভাবে কাঁদছিস কেন?
বিদায় আরো দেরি আছে।
কিন্তু না আমার কান্না আস্তে আস্তে আরো বেড়ে গেল,ভাইয়া কাজিনদের কে নিচে যেতে বলল
আমার পাশে ইফাদ দাঁড়িয়ে আছে।
ভাইয়া বলল----এভাবে কাঁদছিস কেন,এটা তো স্বাভাবিক না, কী হয়েছে বল তো?
ভাইয়া একবার ইফাদ থেকে জিজ্ঞেস করলো তবে ও কিছু বলেনি এবার আমি ভাইয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে খুব বেশি কান্না করে দিলাম জোরে জোরে।
কি করছি নিজেও জানিনা হয়তো শেষ মুহূর্তে এসে আবেগে কান্ড জ্ঞান হাড়িয়ে ফেলেছি।
----সুবাহ?ঘটনা কী বলবি তো? তবেই তো কিছু করতে পারবো।
আমি আস্তে আস্তে শান্ত হলাম ইফাদ পানি এনে দিলো, আমার কিছু বলতে হয়নি তার আগেই নিচে কেমন হট্টোগোল শোনা গেল।
ভাইয়া রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে দেখতে গেল।
আমিও হকচকিয়ে গেলাম ইফাদ আর আমি একে অপরের দিকে তাকিয়ে উঠে পড়লাম।
উপর থেকে কিছু দেখা যাচ্ছে না প্যান্ডেল দিয়ে সাজানো হয়েছে বলে।
ভাইয়া আর ইফাদ চলে গেল।আমিও নিচে নেমে গেলাম দেখতে চাইলাম কি হচ্ছে কিন্তু ঘরে কেমন ভীর হয়ে আছে জানালা ঘেঁষে সবাই দাঁড়িয়ে আছে কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা।ভীরের মধ্যে যেতেই একটা নাম কানে আসতে লাগলো,,,,
টুকরো টুকরো কিছু কথা কানে আসছে, মহিলারা বলছে
---সাদিক না এটা?
---হ্যাঁ
---ও এত হাত জোর করে কি বলছে??
এরকম কথার টুকরো কানে আসতেই আমি থমকে গেলাম আর পা বাড়ালাম না।আমার হৃদয় যে এখন বের হয়ে যাবে,,,,,,,
আমি হা হয়ে রইলাম নাম টা শুনেই আর সামনে কি হচ্ছে দেখার প্রয়োজন অনুভব করলাম না।খুশী আর কান্না মিশ্রিত একটা অনুভূতি হচ্ছে, এ অজানা অনুভূতি আগে কখনো হয়নি।
কান্না করতে গিয়েও পারলাম না মনে শুধু একটা কথায় বাজছে ও এসে গেছে,ও আমার জন্য এসে গেছে,ও আমাকে কোথাও যেতে দিবেনা।
ছলছল চোখে,
সেই আয়াত টা মনে পড়ে গেল
"শীঘ্রই তোমার রব তোমাকে এত দিবেন যে,তুমি খুশি হয়ে যাবে (সূরা-আদ-দুহা:৫)
:
বাবার রুমে বসে আছি শুধুই আমার পরিবার উপস্থিত দরজা লক করা একজন খালা আর মামা ও আছে।
মাথা তুলতেই ভয় লাগছে সামনে বাবা, ভাইয়া, মা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ভাইয়া আমার উপর রাগ করেছে ওর চেহেরায় বুঝতে পারছি আর বাবা আশ্চর্য ভাবে তাকাচ্ছে।
বাবা নীরবতা ভেঙে বলল
---এসব হচ্ছে টা কি?আজকে এত গুলো মানুষের সামনে এসব কেন বলতে হলো আগে বললে কি পারতো না?
আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে আছি,,,,
তারপর বাবা বলল
----সাদিক নাকি তোকে চাই।
বাবার কথা শেষ হতেই আমি চোখ তুলে তাকালাম।এ কি শুনলাম আমি?কথাটা
আমার কানে শ্রুতিমধুর শুনালো।উফফ সাদিক বলেছে সে আমাকে চাই?তাও আবার সবার সামনে?
বাবা আবার বলল
----বিয়ের দিন বর পক্ষের এতগুলো মানুষের সামনে এসব বলার কি দরকার ছিল?তিন মাস ধরে কী নিয়ে ব্যস্ত ছিল ও।
আমি মনেমনে বললাম বাবা বেশ ভাল বলেছে এমনিতে মুখ ফোটে না আর আজ সবার সামনে বলতে হলো। এটিটিউড এর গুল্লি মেরেছে একেবারে।
ভাইয়া আমার দিকে কড়া চোখে চেয়ে আছে বুঝলাম আমার কান্নার রহস্য বুঝতে পেরেছে তাই এত রাগ।
ভাইয়া বাবা কে বলল,,,
----বাবা তুমি কি চাও সেটা বলো,মানুষের কথা নাকি সুবাহর খুশী কোনটা তোমার জন্য বেশি জরুরী?
---আমি বুঝলাম না এ কেমন পরিস্থিতি সাদিক হঠাৎ সুবাহ কে বিয়ে করতে চাইছে কেন?
আর এটা তো অসম্ভব ও জেনে শুনে এটা কিভাবে ভাবতে পারে?
ভাইয়া বলল
---বাবা ও তো সব খুলে বলেছে আমাদের। এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা আমাদের।
----না না এটা হতে পারে না।
আমি অবাক হলাম বাবার কথায়।বাবা রাজি নেয়।
বাবা আবার বললেন
---এটা কোন ছেলে খেলা না।বিয়ে না হয় হলো কিন্তু এরপর?দশ,পনেরো, বিশ বছর?পারবে এতদিন আমার মেয়েকে ভালবাসতে?দশ বছর পর নিশ্চয় আর এই আবেগ থাকবে না?তখন আমার মেয়েকে দোষারোপ করবেনা এটা আমি মানতে পারছিনা।
জীবন এতটাও ছোট না যে খেলতে খেলতে পার হয়ে যাবে।আর তাছাড়া এহতাশেম এর ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ও আমার মেয়েকে সবচেয়ে ভাল রাখতে পারবে।কারণ ওরা দুজনই একে অপরের পরিপূরক।
আমি বাবার দিকে অসহায় মুখে চেয়ে রইলাম।
ভাইয়া বলল,,,
---বাবা তাহলে কী,,,,
---হ্যাঁ, সাদিকের সুন্দর ভবিষ্যৎ আছে ওকে ফিরে যেতে বল।এহতেশাম ই সুবাহর জন্য সঠিক।
সুবাহ আর সাদিক কখনো একে অপরের জন্য ঠিক হবে না।আমার আজীবন চিন্তা লেগেই থাকবে।সাদিক না ভাবুক কিন্তু ওর পরিবার?ওদের ও তো অনেক আশা থাকতে পারে।আমার মেয়েকে কেউ অবহেলা করুক তা আমি চাইনা।
আমি কিছুতেই এটা মেনে নিয়ে ভুল করতে পারব না।
আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।আমরা কি দূরেই থেকে যাব তাহলে।