আমার প্রিয়তা

পর্ব - ২৫

🟢

দরজায় ঠকঠক শব্দে ঘুম ভেঙে গেল,ডায়েরী পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই ঘড়িতে দেখি ১১ টা আমি এতক্ষণ ঘুমিয়েছি?তবে ফজরের নামাজ টা পড়েই ঘুম এসেছিল ভাগ্যিস না হয় মিস হয়ে যেত।তাড়াতাড়ি দরজা খুললাম

মা বললেন দরজা কেন বন্ধ করে রেখেছিস?কতবার ডাকলাম।

না মা চেঞ্জ করতে গিয়ে বন্ধ করেছিলাম পরে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম তাই।

----আচ্ছা ঠিকাছে।

আমি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেতে বসে দেখলাম ঘরে অনেক মেহমান এসছে খালারা, মামারা হঠাৎ মনে পড়লো আজ তো আমার হলুদ অনুষ্ঠান।একটু পরেই দেখি খাবারের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে,বরের বাড়ি থেকে মেহমান আসবে সন্ধ্যায়।

দুপুর বেলায় উপরের সিঁড়িতে বসে আছি দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে,,,

একটা হলুদ আর কমলা মিশ্রিত রং এর পোশাক পড়েছি মা গলায় একটা স্বর্ণের চেনহার পড়িয়ে দিয়েছে,,,,,

আমার কিছুই ভাল লাগছে না।আনমনে দূরে কোথাও তাকিয়ে আছি,,

সাদিক লিখেছিল।

"""আর যাই হোক আমি আর এই বাড়িতে থাকতে পারব না,স্বজনপ্রীতি আমি কখনো দেশান্তর হব ভাবিনি।

এইখানে থাকলে এই জীবনে ও তোমাকে ভুলা হবে না,অবশ্য এমনিও ভুলে যাব তা নয়। যেখানেই যাব জীবনে অন্য যেই আসুক না কেনো তুমি সর্বদা তোমার জায়গায় থাকবে।

তবে মনে একটাই সুখ তুমি তো জানোই তুমি আমার

প্রিয়তা। যদি ভাগ্যে থাকে

আমার প্রিয়তা একান্তই আমার হয়ে থাকবে এটাই আমার বিশ্বাস।"""

এই আপু?

তুমি এখানে বসে আছো কেন এভাবে?

লুবনার কথায় ধ্যান ভাঙলো।

---আপু তোমাকে না হলুদ পরী লাগছে এই উজ্জ্বল দিনের বেলায় জ্বলজ্বল করছো তুমি?

আরও এক খালাতো বোন লিনা বলল

---বিয়ের পানি পড়ার আগেই এত সুন্দর লাগছে।না জানি বিয়ের পর কেমন লাগবে।হাহাহাহা,,

উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ আমার, হয়তো হলুদ রঙা কাপড়ে ভাল মানায় আর বাকিটা ওরা বাড়িয়ে বলছে।

ওরা নিচে নিয়ে গেল আমাকে,শুরু হয়ে গেল হলুদ মাখামাখি চাচী, দাদি, ফুফি,খালা,ভাবী সবাই মিলে আমাকে ঘিরে আছে উপটান মেখে সারা গায়ে ভূত বানিয়েছে।

আমার মাথায় ঘুরছে শুধু একটা মানুষের কথা।

সবাই যে আনন্দে মেতে আছে তা কিন্তু নয় অনেকেই আবার নিজ নিজ নিন্দা কথায় মজা পাচ্ছে।

দুই ভাবী বলা বলি করছিল

---গত বিয়েতেও কত আয়োজন করেছিল, আহারে বেচারির কিসমত খারাপ ছিল।

যাক বাবা ভাল ঘর পেয়েছে এত দিন পর।

অন্য একজন বলল----কি আর করা ও কি আর অবিবাহিত ছেলের যোগ্য আছে?

---শুনেছি ঐ আগের পাত্র নাকি বিয়ে করে এক মেয়ের বাবা হয়েছে।

---যাক বাবা এখন আর বাচ্চার ঝামেলা নেই ওর হবু স্বামীর আগে থেকেই দু বাচ্চার বাপ।

--তাই নাকি?

---ভালই হলো ফ্রী তেই বাচ্চা পেয়ে গেল কোন কষ্ট ছাড়া।

ইফাদ ওদের পেছন থেকে বলল---

ওয়াইলুলিলকুল্লি হুমাঝাতিল লুমাঝাহ ।

অর্থঃপ্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ।( হুমাযাহ:১)

"কেউ সম্মান চাইলে জেনে রাখুন, সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। তাঁরই দিকে আরোহণ করে সৎবাক্য এবং সৎকর্ম তাকে তুলে নেয়। যারা মন্দ কার্যের চক্রান্তে লেগে থাকে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবে। (সূরা ফাতির : ১০)"

ইফাদের কথা শুনে ওরা কাচুমাচু করছে, আমার পেছনে থাকায় কথা গুলো সব শুনতে পেয়েছিলাম আমি।

ইফাদ আবার হেসে বলল

---টেনশন নিচ্ছেন কেন ভাবী এটা তো আমি বলিনিই আল্লাহ্‌ বলেছেন তাই করবেন ও উনি।

যান ননদিনী কে হলুদ মাখুন।

ওদের কথায় আবার মনে পড়ে গেল সাদিকের লেখা

বিজ্ঞাপন

""যোগ্য কারও প্রতি মন বসাতে পারিনি, ইচ্ছে করে তো আর মন বসানো যায় না। হয়তো "লোকের বলা" এই অযোগ্য মেয়েটার মধ্যে যা আছে তা আর কারও মধ্যে নেই।

ভেবেছিলাম আমি তার মোহে পড়েছি হয়তো এক সময় কেটে যাবে।

না তা আর হলো কই? বরং ধীরেধীরে তা আরও বেড়েই গেল।

প্রিয়তা যদি তুমি অপূর্ণ হয়ে থাকো জেনে রেখ আমিই তোমার পূর্ণতা।জীবনে কত কিছুর ত্যাগ করে নাকি মানুষ সফলতা পাই তাই যদি হয় একটু সুখ না হয় আমিও ত্যাগ করলাম তোমার জন্য।

তুমি না বড় বেশিই ভাবো, ভাল লাগে না আমার।একটা জীবন পার করতে দুজনের ভালবাসা কি যথেষ্ট নয়?একজন থেকেই কি তুমি সব পেতে পারো না?"

---এই সুবাহ?

ভাইয়ার ডাকে ভাবনা ভাঙলো

----হাহাহা হাহা।

---হাসছো কেন?

---তোকে কেমন লাগছে জানিস?হলদে ভূত।খুব না হেসেছিলি আমার বেলায়?

---যাও তো,,,,,

----হাহাহাহা,,,, হোহোহো,,,,

দাঁত চেপে ডাক দিলাম

---ভাইয়্যা।

ভাইয়া চলে গেল আমি হলুদ মারার আগেই।

এরপর মহিলারা মিলে আমাকে গোসল দিল।

সন্ধ্যায় আমি রুম থেকে বের হলাম তৈরি হয়ে মেহমানের সামনে এলাম।

ওরা কিছু ডালা সাজিয়ে এনেছে সব নতুন বউ এর সরঞ্জামাদি সবাই আমার সাথে কিচ্ছুক্ষণ কথা বলল।

আমি কি বলবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না, একে তো কাউকে চিনতে পারছিলাম না আবার তার উপর মাথায় শুধু সাদিক ঘুরছে।আচ্ছা আমি তো জানতামই না ও আমাকে এত টা,,,,,

আমি ভেবেছিলাম হয়তো প্রতি দিনের দেখাদেখি তে ভাল লেগে গেছে যা চলে যাবে কিন্তু,,,,,,

ওর ডায়েরীর শেষে লিখা ছিল

""ইনশাল্লাহ দেখবে একদিন এভাবেই তুমি আমার পরিবারের সদস্য হয়ে যাবে,যেমন টা আজ ছিলে ঠিক তেমন করেই সারাজীবন থেকো।জানো

আমি যখন ভাবি সুখ কখন আসবে?তখন আল্লাহ বলেন

"আল্লাহ্‌ কষ্টের পরেই সুখ দিবেন।(আত-তালাক-৭)"

আমি যখন বলি কখনো কি বিজয়ী হব? এভাবে আর কতদিন মনের সাথে যুদ্ধ করব?

আল্লাহ বলেন "আমার সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী। (আল-বাকারা-২১৪)।

প্রিয়তা জানোই তো

"বিশ্বাসীরা সফল হয়। (আল-মুমিনূন-১)""

চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে গেল।দুহাত ভর্তি মেহেদী আমার, সবার মাঝখানে বসে আছি আর না পেরে বসা থেকে উঠে চলে এলাম।মা কে বললাম ওয়াশরুমে যাব।

রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিনা জোরে কান্না করতে গিয়েও পারলাম না।

ওয়াশ্রুমের কল টা ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম।না আমার দ্বারা এ বিয়ে হবে না।দুনিয়ার যেখানেই যাই , যার সাথেই যাই না কেন আমি ওকে ভুলতে পারব না।

:

আবার খানিক বাদে ভাবলাম না এসব আবেগ কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।আমাকে ওর কতদিন এভাবে ভাল লাগবে? একটা সময় নিশ্চয় চাইবে ওর নিজের সন্তান থাকুক তখন? তখন কি হবে আমার?আমি কীভাবে ওর অবহেলা সহ্য করব।

না না আমি ওর থেকে দূরে থাকবো, ওকে ভুলে যাব।একটুও মনে করব না আর।

হলুদ আর মেহেদীর পর্ব শেষ হলো ঘুমিয়ে পড়লাম কাঁদলে যে ঘুমটাও বেশি আসে তাই হয়তো কাঁদা ও ভাল।

ফজর এর নামাজ টা শেষ করে সেই অভ্যাসগত ভাবে উপরে চলে গেলাম আজকের পর হয়তো এভাবে আর আসা হবে না।হয়তো আজ থেকে আমি এই ঘরের চির মেহমান।হয়তো বাপের বাড়ি আসলেই সবাই কথার ছলে জিজ্ঞেস করবে আর কতদিন থাকবো , কখন যাব?আমার ঘরে আমিই মেহমান।জানিনা আর কখনো নিজের মনের মতো করে একা থাকা হবে কিনা,সেই অলস দুপুর গুলো,সুন্দর বিকেল গুলো আর পাবো কিনা।

এক পশলা অশ্রু বয়ে গেল, ভাবতে গিয়েই এত কষ্ট না জানি বাস্তবে কেমন লাগবে।সত্যিই পর হয়ে যাব আজ,পরের ধন পরের কাছেই চলে যাব।

রাস্তার দিকে তাকাতেই মনে পড়লো এই বুঝি সাদিক আসবে নামাজ শেষ করে। আজ ওকে আর দেখি নি একটা দুঃখের হাসি দিয়ে নিচে নেমে গেলাম।

শুরু হলো আমার বিদায়ের আয়োজন মা এসে আমাকে নাস্তা করিয়ে অনেক ভবিষ্যৎ বার্তা বলে গেল।

মনমরা হয়ে বসে আছি দেখি মা আবার এসে মোবাইল টা দিয়ে গেল,ডাক্তার সাহেব ফোন করেছে।

আমি উনার সাথে কথা বলে সোজা চলে গেলাম শাওয়ার এর নিচে।আজ বৃষ্টি হলে ভাল হতো, ধুর ছাই তাতেও সাদিক কে মনে পড়ে গেল ওর সেই বৃষ্টি বিলাস।

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প