আমি তাড়াতাড়ি ডায়েরী টা রেখে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়লাম আমার হাত কাঁপছিল খুব। একবার ইচ্ছে করছিল ডায়েরী টা পড়ি আরেকবার ভাবলাম না আমার সিদ্ধান্ত অটল।এসব কিছুই যায়ে আসে না।
আমি সোফায় বসে রইলাম ভাবতে ভাবতেই প্রায় ২০ মিনিট পর ফুফি এসে বলল যা এবার তুই তৈরি হয়ে আই।
----ফুফি আমি তো,,,
ফুফি সব ঘুছিয়ে নিতে নিতে বলল ভাগ্যিস তুই এসেছিলি আমি একা কিভাবে সামলাতাম। সাহের,সাবিল ওরাও নেই তোর ফুফা ও হস্পিটাল আমি গেলেই উনি আসবে।ভাবী এত কিছু পাঠিয়েছে অনেক ধন্যবাদ না হয় আমারই করে নিতে হতো।তাছাড়া আমি আসলেই ভাগ্যবান বাপের বাড়ির সবাই এত সাহায্য করেছে আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি রাত দিন সবার জন্য।
ফুফি আমাকে বলল ফাইল টা পেয়েছিলি?
হ্যা ফুফি আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি। সাদিকের রুমে গিয়ে ফাইল টা নিলাম আর আরেকবার ডায়েরী টা হাতে নিয়ে ওড়নার ভেতর লুকিয়ে ফেললাম।
সামনের রুমে এসে ফুফিকে ফাইল দিতেই উনি বললেন চল।
আমি বললাম ফুফি আমি,,,,
উনি মুখ গম্ভীর করে বললেন
---কি যেতে পারবিনা?
---না না বলছি বোরকা টা পড়ে আসি।
---আচ্ছা।
বাসায় এসে ডায়েরী টা রুমে রেখে দিলাম মাকে বললাম আমি যাচ্ছি
----আমি তো বলেই ছিলাম আর কখন দেখা হয়।
----হ্যা মা ফুফি কে না বলতে পারিনি।
সি.এন.জি থামতেই মনে হলো এত তাড়াতাড়ি কেন চলে এলাম?
সত্যি বলতে আমার বিন্দু মাত্র যাওয়ার ইচ্ছে নেই ভেতরে।মনে হচ্ছে কেউ আমাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।সাদিক কে দেখতে ইচ্ছে করছে না তা নয় কিন্তু ওর মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছেনা।
হাই প্রতিটা কদম যেন বুক এর ধুকধুকী বাড়িয়ে দিচ্ছে কেবিনের দরজার সামনে যেতেই আমার দম বন্ধ হয়ে এলো।সে কি অস্থিরতা কাউকে বুঝাতে পারব না।আমি দাঁড়িয়ে রইলাম মনে হচ্ছে এই বুঝি সাদিক দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবে।
ফুফি বলল ভেতরে ঢুক,,,
আমি ঢোক গিলে ভেতরে গেলাম,
অন্তর কেঁপে উঠলো বেডে পড়ে থাকা মানুষ টা কে দেখে ঘুমিয়ে আছে নিষ্পাপ চেহারা নিয়ে মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ মোড়ানো ডান হাতে প্লাস্টার আর বাম পায়ে ও ব্যান্ডেজ দেখছি।
বেখবর ঘুমে আছন্ন।
যাক বাবা ও ঘুম এই সুযোগে দেখে চলে যেতে পারলেই হলো।
ভেতরে থাকা ফুফা কে সালাম দিয়ে বসলাম সোফায়।
তারপর ফুফি সবকিছু রেখে ফুফা থেকে জিজ্ঞেস করলেন ও কখন ঘুমিয়েছে?
----এইতো একটু আগে।
আমি ভাবলাম ভাল হয়েছে ও উঠার আগে যেতে পারব।ফুফি বললেন আমি নার্স এর সাথে কথা বলে আসি ফুফা ও বাসায় চলে যাচ্ছেন তাই ওরা দুজনই একসাথে কেবিন থেকে বেড়িয়ে গেলেন কথা বলতে বলতে।
আমি একবার সাদিকের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম মা ঠিক বলেছেন পরশু আমার বিয়ে জানিনা ওকে আর কখন দেখি, হয়তো ও নিজেই আমার সামনে আসবে না আর।এরপর আমি নিশ্চিন্তে সোফার পাশ থেকে একটা ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে খুলে খুলে দেখছিলাম।
একটু পর ম্যাগাজিন থেকে চোখ উপরের দিকে উঠতেই দেখি সাদিক আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমার বুকের শব্দ খুব জোরে শুনতে পাচ্ছি।
হাই আল্লাহ ও কখন উঠলো। ও আমার দিকে তাকিয়েই আছে আমি সোফা থেকে উঠে আস্তে আস্তে ওর সামনে গেলাম।
চোখেচোখে তাকিয়ে বললাম
----খুব ব্যাথা পেয়েছ না??
ও মুখটাকে করুন করে অপলক দৃষ্টিতে হ্যা সূচক মাথা নাড়ল।
আমার ইচ্ছে করছিল ওর মুখটা ছুঁয়ে দিই, হাত ও বাড়িয়ে ছিলাম এতক্ষণের সব সংকোচ যেন কোথায় গাইয়েব হয়ে গেল।
সাদিক ও যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আমার ছোঁয়ার। ভাগ্যিস এমন সময় ফুফি এসে গেল দরজা খুলতেই বলল
---বাবা উঠে গেছিস?
আমিও সরে আগের জায়গায় চলে এলাম। কি করতে যাচ্ছিলাম আমি?
এমন টা আমি কিভাবে করতে পারি? নিজের উপর ধিক্কার দিলাম।কাল বাদে বিয়ে আমার আর আমি কিনা,,,,
ফুফি আমার অপর পাশে ছিল মানে মাঝখানে বেড আর আমার দুজন দুই পাশে।ফুফি বলল সুবাহ চল এবার খেয়ে নিই।
সাদিক আবার আমার দিকে ফিরলো ওর চোখে একটা বিষ্ময় দেখতে পেলাম।অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
ফুফি বলল তোর ছোট মামী খাবার পাঠিয়েছে তোর জন্য।
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
সাদিক আস্তে আস্তে ওর মায়ের সাথে কথা বলছে আর ফুফি ওকে খাইয়ে দিচ্ছে।
আমি সোফায় বসে আছি ও সবসময় এর মত আমার দিকে রুষ্ট ভাবে দেখছে চোখে কিসের রাগ বুঝতে পারছিনা তবে এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম ও তখন ভেবেছিল আমি ওর কল্পনায় এসেছি, তাই এত কোমল ভাবে তাকিয়ে ছিল।
আমার মনেমনে হাসি পাচ্ছে কারণ ব্যাপার টা আসলেই স্বাভাবিক হয়তো ওর জায়গায় আমি থাকলেও এমন ভাবতাম।চোখ খুলেই রুমে শুধু আমাকে দেখতে পেলে এমনটা তো ভাববেই।
কিন্তু আমি বুঝছিনা ওর এত রাগ কেন আমার প্রতি?আমরা দুজনেই কোন কথা বলি নি আর।
তারপর আমি বললাম ফুফি আমি যাচ্ছি,,,,
---এখনই চলে যাবি?
---হুম।
সাদিক আড়চোখে আমার দিকে তাকাল।
তারপর আমি দরজায় দাঁড়িয়ে একবার পিছনে ফিরলাম কিন্তু ও সোজা তাকিয়ে আছে আমি ওকে দেখছি জেনেও আমার দিকে তাকাইনি।
আমার খুব খারাপ লাগছিল আসার সময়।কি অদ্ভুত ব্যাপার এতক্ষণ আসতে ইচ্ছে করেনি আর এখন যেতে ইচ্ছে করছে না।
রাতে বাসায় সবাই একসাথে খেতে বসেছি,,
বাবা বললেন
----ইরাম বিয়ের ব্যবস্থা কেমন হলো?
--জি বাবা সব ঠিকঠাক।
----আগামীকাল মেহমান আসবে জামায়ের বাড়ি থেকে ওদের জন্য খাবারের ব্যবস্থায় যেন কোন কমতি না থাকে।
---বাবা তুমি চিন্তা করো না আমি সব ব্যবস্থা করছি।
----আমিও কাজী,ডেকোরেশন এদের সাথে কথা বলে ফেলেছি।
ইফাদ আর আমি এসব কথা শুনে একে অপরের দিকে তাকালাম।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ থাকার পর মা বললেন
----সাদিকের কি খবর ইরাম? ঐ দিন ছেলেটা কে দেখে খুব মায়া হচ্ছিল, বড্ড ব্যাথা পেয়েছে।
বাবা বললেন
---ওর জন্য কিছু পাঠানো উচিত ছিল, ভুলেই গেলাম।
মা বলল
---আমি আজ খাবার পাঠিয়ে ছিলাম সুবাহ গিয়েছিল ওর ফুফির সাথে।
----বেশ করেছো।যাক বাবা শান্তি পেলাম।
মা বললেন জোহরা কে দেখে খুব কষ্ট হয়েছিল।
ইরাম ভাইয়া বললেন মা---
হাদীসে এসেছে – "একজন মুমিনের গায়ে কাঁটা ফুটলেও আল্লাহ-তা'আলা এর জন্য তার গুনাহ মাফ করেন।" (সহীহ বুখারী--৫৬৪০)
.
রাসূল ﷺ আরো বলেছেন – "যখন আল্লাহ কোনো বান্দার জন্য কল্যাণ চান, তখন তাকে দ্রুত তার গুনাহের জন্য এই পৃথিবীতেই শাস্তি দিয়ে দেন। আর যদি কল্যাণ না চান, তখন তাকে শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকেন। এভাবে সে কিয়ামতে তার সকল গুনাহ নিয়ে উপস্থিত হয়।” (তিরমিযী)
সে জন্যই কখনো খুব বেশি দুঃখিত না হয়ে আল্লাহ্র কাজে সর্বদা ভরসা করতে হয়।সর্ব অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহে আলা কুল্লিহাল বলা উচিত।
রাতে বিছানায় বসে ডায়েরী টা হাতে নিলাম।
আমি আলতোভাবে হাত ভুলিয়ে পাতা উল্টাতেই মুখে একটা মিষ্টি হাসি ফুঁটে উঠলো আমার।
লিখা ছিল
"প্রিয়তা হবে সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে ভাল আর সবচেয়ে মিষ্টি"
আমি হাসলাম কারণ একটা চাওয়াও আমার সাথে যায় না।
আবার এক পেইজ পরে দেখলাম
""পেয়ে গেছি তাকে,শীঘ্রই জেনে যাব কে সে?
আমি জানি সে ও আমার অপেক্ষায় আছে।এত অপেক্ষার পর তাকে খুঁজে পেয়েছি শুধু দেখার বাকি।
---এর মানে কি? সাদিক না দেখে কার প্রেমে পড়েছে?আমি কিছু বুঝলাম না।
আবার দু পাতা উল্টে দেখলাম।
"আমার চারপাশে তার বিচরণ কারণ
আমি তার কেন্দ্র বিন্দু।"
আমার চারপাশে শুধু সে থাকবে,আমি শুধুই তাকে দেখতে চাই আর তার মধ্যমণি হয়ে থাকতে চাই।
----এটা কি? ডায়েরীর সাথে একটা গাইড বই রাখলেই পারতো। এসবের কিছুই বুঝছিনা উল্টো আরও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে মনে।
এরপর আবার ও গেলাম অন্য পাতায়,,