বাবা কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বের হয়ে যাচ্ছিলেন দরজা খুলে দেখেন এহতেশাম দাঁড়িয়ে আছেন উনি বাবা থেকে অনুমতি নিয়ে বললেন
---আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই।
আমি উনার উপস্থিতি টের পেয়ে ওড়নাটা ঘোমটার মত নামিয়ে নিলাম।বাবা বললেন জি আসলে ব্যাপার টা এমন হবে ভাবিনি আপনি কিছু মনে করবেন না।
এহতেশাম বললেন
না,না প্লিজ আগে আমার কথাগুলো শুনুন।
---আজ দুপুরেই আমার কথা হয়েছিল সুবাহর সাথে যা আমি আপনাদের ও বলতে চাই সব।
মূলত সুবাহর সাথে কথা বলে আমি প্রথম দিনই বুঝতে পারি উনি বিয়ে নিয়ে আগ্রহী নন। তারপর আবার মনে হলো উনি কারো উপর জেদ করে আছেন, আর তাই বিয়ে টা না সেড়েই আমি বিদেশ চলে যাই। চাইলে আমি বিয়েটা করেই যেতে পারতাম। আমি উনাকে সময় দিয়েছিলাম কারণ আমি হুট করেই কোন সিদ্ধান্ত নিই না।আজ আমি সুবাহর উপর মুগ্ধ হয়েছি উনি আমাকে খুব সৎ সাহস নিয়ে জানালেন আমার ধারণা ঠিক ছিল উনি সত্যিই কাউকে চান।তবে তাই বলে আমাকে আসতে মানা ও করেননি, সুবাহ বলেছিল সে আল্লাহ্র উপর সব ছেড়ে দিয়েছে যদি আজ আমার সাথে বিয়েটা ভাগ্যে থাকে তাহলে সে মেনে নিবে আর না থাকলে তাও মেনে নিবে।আমি একবার ভেবেছিলাম তাহলে আর আসবো না কিন্তু আবার মনে হলো সুবাহ তো আমাকে ঐ ব্যক্তির কথা কিছুই জানান নিই, সে ও কি সুবাহ কে চাই?
আর আমার পেশাগত সুবাদে আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারি তাই এটাও বুঝতে পেরেছিলাম যে,সুবাহর ফিজিক্যাল লেকিংস এর কারণেই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে। আর কোন পুরুষ নিশ্চয় তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করতেই পারে এতে কোনো দোষ নেয়।তাই আমিও আজ ভাগ্যের উপর বিশ্বাস করে এখানে চলে এসেছি ভেবেছি যদি একজন সৎ নারী আমার জীবনে আসে এর চাইতে ভাল কি হবে?দেখি কি হয়।
আর ফলাফল এখন আপনাদের সামনেই আছে যতটা বিশ্বাস সুবাহর মনে ছিল ঠিক ততটা ব্যাকুলতা নিয়েই সাদিক সাহেব হস্পিটাল থেকে ছুটে এসেছেন তার জন্যে।এত সাহসী একটা মানুষ কিভাবে হতে পারে সব জেনেও, আপনারায় ভেবে দেখুন সুবাহর তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে চাইলেই কি সাদিক সাহেব এড়িয়ে যেতে পারতো না?তার কি কোনো দাই আছে?
আংকেল সত্যি বলতে এত সাহস আমার নেয়। আমি হয়তো সব মেনে নিয়ে এতো সহজে কাউকে এইভাবে ভালবাসতে পারতাম না।সাদিক সাহেব যেটা করেছেন সেটার কোন তুলনা হয়না এতগুলো মানুষের তোয়াক্কা না করে নিজের মনের মানুষকে চেয়েছেন আর এই চাওয়াতে কোন ছলনা নেই কপটতা নেই।
ডাক্তার সাহেবের কথা শেষ হওয়ার পর সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। শুধু অবাক হইনি আমি কারণ আমি ডায়েরী পড়ার আগে থেকেই জানতাম সাদিক আমাকে পছন্দ করে, আর ডায়েরী পড়ার পর বুঝলাম ও আমাকে ভালবাসে।ও কিন্তু কোন কিছুর বিনিময় ছাড়াই আমাকে চেয়েছে জেনে, শুনে, বুঝেই আমাকে ভালবেসেছে আমাকেও কখনো বুঝতে দেইনি, নিজের মন কে পবিত্র রেখেছে।
"যারা পবিত্র থাকেন, তাদের আল্লাহ্ ভালবাসেন (বাকারা-২২২)।""
পবিত্রতা শরীর মন দুটোরই দরকার।
বাবার দিকে তাকিয়ে এহতেশাম বললেন
----আংকেল আপনার চেহারায় আমি অনিশ্চয়তার ছাপ দেখতে পাচ্ছি। সত্যি বলতে আপনার চিন্তিত হওয়া জায়েজ আছে কিন্তু আল্লাহতালা এমন অনেক কিছুই করেন যা বোঝার সাধ্য আমাদের নেই।জীবন গল্পের চাইতে ও জটিল কারণ আল্লাহ্র চাইতে বড় লেখক কে হতে পারেন।আমি এমন ও ঘটনা দেখেছি যা সুবাহ সাদিকের বিষয় টা কেও হার মানিয়েছে।
"আল্লাহ ন্যায়বিচারকারী দের ভালবাসেন।(মায়িদাহ-৪২)।""
তাই বলবো এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিবেন না যেটা কারো প্রতি অন্যায় হয়ে যায়।আর ভরষা কেবল আল্লাহ্ কে করুন ভবিষ্যৎ কারো হাতে থাকেনা।
ভাইয়া বাবাকে ধরে বিনা বাক্যে আশ্বাস দিল।
বাবা বললেন ঠিকাছে ইফাদ যাও তোমার জোহরা ফুফি কে ডেকে আনো।
এহতেশাম বিদায় নিতে গেলে বাবা তাকে আরো একটু অপেক্ষা করতে বলেন।
তারপর ফুফি রুমে আসেন,,,,
বাবা শান্ত কন্ঠে বললেন
---দেখ জোহরা তোরা তো সবই জানিস। আমার মেয়ে কখনো মা হতে পারবে না। এখন তুই বল আমার কি করা উচিত? সাদিক কে নিয়ে নিশ্চয় তোদের ও অনেক আশা আছে?যেমন টা ইরাম আর ইফাদ কে নিয়ে আমরা ভাবি সাদিক ও তো এই বাড়ীর ই ছেলে। ওকেও ছোট বেলা থেকে জানি, কিভাবে ওকে জেনে শুনে এমনটা করতে দেয়।
ফুফি কেঁদে বললেন
--ভাইজান আমার ছেলেটা কে আমি হারাতে হারাতে ফিরে পেয়েছি, ওর খুশীর চেয়ে বেশি আমার জন্য আর কি আছে?ওর যেটা তে খুশী লাগে আমিও তাতে খুশী হয়েছি সবসময়, এইবার ও ব্যাতিক্রম নয়।
আর একটা কথাই বলতে চাই ও দায়িত্বের প্রতি গাফেল না,,
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার শিক্ষা আমি ওকে দেয় নি। তাছাড়া সুবাহ ও আমার প্রিয়
কারণ আমি সর্বদা এটাই জেনে এসেছি ""আল্লাহ নেককার দের ভালবাসেন (আল-ইমরান:১৩৪)।""
তাহলে আমি কে? ওদের দূরে সরানোর?
বাবার কথায় আমরা চমকে উঠলাম।ইফাদ তো মহাখুশী ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
বাবা বললেন কিরে মা তুই রাজি তো?
ভাইয়া বললেন বাবা ও রাজি না হলেও দিও দাও।আমি ওর সাথে আর একটা কথাও বলবো না, তাড়াতাড়ি বিদায় করো ওকে।
ভাইয়া আমার উপর রেগে আছে তাকে কিছু বলেনি বলে,এহতেশাম ও বিদায় নিলেন।
এবার ভাইয়া বললেন সব যখন তৈরি আছেই তাহলে বিয়ের আর দেরি কেন হবে?
আমাকে বলল যা আরেকটু মেকআপ করে নে কি বাজে লাগছে দেখতে।
----এই ভাইয়্যা,,,
কেঁদে দিলাম আবার।
রুমে এসে আবার ফ্রেশ হয়ে নিলাম।উফফ কী যে খুশি লাগছে বাঁদর টা জিতে গেল। হাহ্
কী অসভ্য রে বাবা সবার সামনে নাকি বলেছে আমাকে চাই।মনে মনে অনেক হাসি পাচ্ছে।ঝুলন্ত বাঁদর টা নিয়ে বললাম তোর মাইর কিন্তু মিস যাবেনা তাই বলে।
:
কাজী এসেছেন অনুমতি নিতে। খুশী মনেই কবুল করে নিলাম সাদিক কে,,,,,,,,
ইফাদ ছবি দেখালো আমার কাবিনে সই করা সুন্দর মুহুর্তের।
---আপু এটা তোমার গিফ্ট।
---ধন্যবাদ।ভাইটা আমার তুই সত্যিই খুব ভাল ভাই।
কেমন কেমন যেন লাগছে মনে,,,,,,,,
ভাবলেই হার্টবিট ফার্স্ট হচ্ছে আজ অনেকগুলো নতুন অনুভূতি যোগ হলো কিন্তু একবার ও ওকে দেখিনি।
কোথায় ও?
বাবা মা ও খুশী আমাকে দূরে কোথাও যেতে হচ্ছে না তাই।খাওয়া-দাওয়া শেষে এবার বিদায়ের পালা,,,
সবাই চলে যাচ্ছে সাথে আমাকেও ফুফির বাসা পর্যন্ত দিয়ে এলো আমার ভাই রা। ফুফি আমাকে বরণ করে বলল সাদিক ঘরে আছে ও অসুস্থ তাই ওকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছি আই তোকে ঘরে দিয়ে আসি।দোতলায় উঠলাম সাদিকের রুমে ঢুকলাম।রুমে কেউ নেই। ফুফি বলল
---আজ একটু এডজাস্ট কর কাল সব ঘুচিয়ে দিব হঠাৎ করে হওয়াতে,,,,
আমি ফুফি কে থামিয়ে বললাম
---কোনো সমস্যা নেই আমার।
ফুফি বলল আচ্ছা ঠিকাছে ব্যাগ রেখে গেছি ফ্রেশ হয়ে যা।
ফুফি চলে গেল কিন্তু আমি? আমি কই লুকাব, আমার যে ভয় লাগছে। ও তো ভালভাবে কথা ও বলে না খালি ক্ষেপায় আমাকে।
আমি বসে আছি সেই বিছানায় যেমন টা কল্পনায় দেখেছিলাম।
উফফ অস্বস্থি লাগছে উঠে গিয়ে পাশে দরজা খুলে দেখলাম বারান্দা, আমি আগে কখনো আসিনি।
বারান্দায় এসে ভালই লাগছে কিন্তু বুকের দুরুদুরু ভাব এখনো আছে।
মেইন দরজার আওয়াজ শুনলাম বুঝলাম কেউ এসেছে কিন্তু মন চাচ্ছে কোথাও লুকিয়ে যায়।আমি এক পা ও নড়লাম না বারান্দায় হালকা আলো জ্বলে উঠেছে।
একটু পর অনুভব করলাম ও আমার পাশে এসেছে,,,,ফুলের গন্ধে ভরে গেছে চারপাশ
আমি মাথা নিচু করে আছি,,,,,দেখলাম একগুচ্ছ ফুল লাল সাদা গোলাপে মিশ্রিত আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমি আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে নিলাম। এইবার চোখ তুলে দেখলাম ওর দিকে।
বেগুনী পাঞ্জাবী পড়েছে অবাক হলাম একটু।
মাথায় ব্যান্ডেজ এখনো আছে তবে কিছুটা ছোট।সেই অমায়িক মুখ এত সুন্দর লাগছে ওকে,,,,,,গোল মুখখানি তে মন চাচ্ছে হাত বুলিয়ে দেয় কিন্তু,,,,,,,
চোখের দিকে তাকাতেই ভয় পেলাম কি কড়া করে তাকিয়ে আছে।