আমার প্রিয়তা

পর্ব - ৩১

🟢

আমি কোলে বালিশ নিয়ে হাতের উপর মুখের ভার রেখে শুনতে বসলাম আর সাদিক হেলান দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।

ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমিও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি।একটু পর বললাম

----কি ব্যাপার বলছো না কেন?

সাদিক মিটমিট করে হেসে বলল

---তোমাকে দেখতে গিয়ে ভুলে গেলাম, কি যেন বলতে বসেছি?

----চুপ!

---ওমা চুপ থাকলে বলো কথা বলতে, আর কথা বললে বলো,,,

আমি ওর মুখে আঙুল দিয়ে বললাম

---তুমি খুব প্যাঁচাল পারো।

ও আমার আঙুল এ চুমু দিতেই আমি আঙুল সরিয়ে নিলাম।

আমি একটু লজ্জা পেলাম। সাদিক দুষ্ট হেসে বলল

----আহা! কি লজ্জাবতী লতা রে আমার।ছুঁয়ে দিলে নুয়ে যায়।

----উফফ চুপ,,, না,না,বলো প্লিজ।

সাদিক হেসে দিলো জোরে।

আমার খুব রাগ হলো এতো ভণিতা কেউ কেমনি করে?

তারপর ও বলল

---এই যেমন আমি করছি তেমনি করে।

----মনের কথা এতো বুঝো যখন জ্বালাচ্ছো কেন?

----এমনি ঢং করছি।

---ধুরর! আমি যাচ্ছি।

---আরেহ শোনো না আমি ভয় কাটাচ্ছি এসব করে।

---কিসের ভয়?

----আছে একটা বলবো।

আচ্ছা শুরু করি।

---হুম।

----তখন অনার্স এ পড়ছিলাম হয়তো সেকেন্ড ইয়ার এ ।ঐ যে আলতাফ ভাই এর একটা বুক শপ ছিল মনে আছে?

--হুম, (আমাদের এলাকাতেই পাড়ার একজন বড় ভাই একটা ছোট লাইব্রেরী দিয়েছিল যেখানে ছোট,বড় সবাই গিয়ে পড়তো নতুন খোলাতে সবাই একটু আগ্রহী ছিল। আর আমাদের বাড়ী থেকে কাছেই ছিল।একটা পাঁচশো টাকা দিয়ে কার্ড করেছিলাম লাইব্রেরী তে বই পড়ার জন্য। কার্ড এর মেয়াদ ছিল সাত মাস।আমি বই পড়াতে তেমন আগ্রহী ছিলাম না তারপর ও জবার সাথে যেতে হতো।পরে আমিও কার্ড বানিয়ে পড়তে শুরু করেছিলাম।)

----হ্যাঁ, সেখানে প্রায় বই পড়তে যেতাম আমি, ওখানের বই গুলো যেহেতু ঘরে আনা যেতো না তাই একটা বই শেষ করতে দুই-তিন তো লাগতোই।তবে আমি রেগুলার যেতাম।তারপর এক সময় একটা বই পড়ছিলাম নাম ছিল প্রিয়তা। একদিন

ঐ বইটা হাতে নিয়ে ভাবছিলাম কোন পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়েছি মনে নেই কারণ পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম কিছুদিন ,তাই পাতা উলোট পালোট করতে গিয়ে নজরে পড়লো একটা চিকন করে ভাজ করা কাগজ হয়তো আমার মতো এই বইটা কেউ পড়ছিল আর পেইজে চিহ্ন রেখে গেছে।

সেদিন মন টা ভাল ছিল না তাই আমি অত সব না ভেবে বই পড়তে থাকলাম ঐ কাগজ টা বার বার চোখে পড়ছিল বলে শেষে হাতে নিয়ে কেন যেন ভাজটা খুলে দেখলাম।

ِ

"" সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্নীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।(সূরা আল বাকারা: ১৭৭)""

আমি এটা পরে অবাক হলাম কেউ বুঝি আয়াত ও লিখে রাখে এভাবে?

আর এটার নিচে কলমে আঁকা একগুচ্ছ কদম ফুলের ছবি ছিল।

কিছুই বুঝলাম না আগের পাতায় কাগজ টা রেখে চলে এলাম।তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয় এ পড়ছিলাম। পড়ালেখা,আড্ডাবাজি সবই চলছিল মেয়ে ফ্রেন্ড ও ছিল অনেক তবে স্পেশাল কেউ ছিল না।

পরেরদিন আবার লাইব্রেরী গেলাম বই পড়তে, আমি প্রিয়তা নামের বই টা নিয়ে কেন যেন কাগজ টা খুঁজলাম কিন্তু না পেয়ে আরো দুটো সেইম বই খুলে দেখলাম তার একটা তে পেলাম সেই কাগজ।আমি কাগজ রাখা বইটা ই হাতে নিলাম।

আবার বই পড়া শেষ করে কাগজ টা খুলে দেখলাম আজ আরো কিছু লিখা ছিল।

"তুমি যাকে ভালবাসো তার সাথেই তোমার হাশর হবে।(বুখারী-৬১৭১)"

আমি অবাক হলাম বাহ্ এটা তো জানতাম না?আমি তো আরো কতকাল দুঃখ পেয়েছি এটা ভেবে মৃত্যুর পর কী মানুষ দুনিয়ার প্রিয়জন দের ভুলে যাবে?আর পরিবার ছাড়াও তো এমন অনেকেই আছে যাদের পৃথিবীতে এক হওয়া সম্ভব হয়নি।অনেকেই আল্লাহকে ভালবেসে অপ্রিয় মানুষের সাথে থেকে জীবন কাটাচ্ছে।

লাইন টা সত্যিই এত ভাল লেগেছিল যে, সেদিন ডায়েরীতে লিখে রেখেছিলাম।

তারপর থেকে কেন জানিনা আমার এক অদ্ভুত আকর্ষণ হয়েছে আমি লাইব্রেরী গেলেই কাগজ খুজঁতাম এবং সুন্দর সুন্দর আয়াত পেতাম।কিন্তু প্রিয়তা বইটা পড়া শেষ হওয়ার পর আর কাগজ পেলাম না, আমার সিক্স সেন্স বলছিল এটা কোনো মেয়ের কাজ।

---কেন মনে হলো? ছেলেও তো হতে পারতো?

---হ্যাঁ হতে পারতো কিন্তু ছেলেদের এত ধৈর্য কই?আর ছেলেরা ফুল পছন্দ করে ঠিক তবে এমন সুন্দর করে লিখার নিচে নিজের প্রিয় ফুলটার ছবি কখনো আঁকবে না।

সাদিকের কথায় আমিও যেন হারিয়ে গিয়েছি পুরোনো দিনে।

তখন সাদিক বলল প্রিয়তা আমার না ঘুম পাচ্ছে অনেক, বাকিটা কাল বলি?

----আচ্ছা শুয়ে পড়ো।

---একা?

---হুম।

---কেন?

---কেন কি? রাতের খাবার না খেয়ে তুমি ঘুমালেও বাকিরা ঘুমাবে না।

--ওহ হ্যাঁ তো।আচ্ছা যাও।

আমি নিচে এসে দেখি বাবা বসে আছেন। আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম

---বাবা কখন এলে?

---হয়েছে কিছুক্ষণ।

বিজ্ঞাপন

দেখলাম বাবা কে চা নাস্তাও দেওয়া শেষ।ফুফি কে বললাম

----আম্মা আমাকে ডাকেন নি কেনো?

---তোরা রেস্ট নিচ্ছিলি তাই।আর ভাইজান তো দূরের কেউ না।এখান থেকে এখানে যখন মন চাইবে আসা যাওয়া করবে।তুই ও যাবি।

বাবা হেসে বললো যাই হোক তোদের দাওয়াত করতে এসেছি

ِ----সুবাহ? ইরামের বিয়ে ৭ দিন পর ঠিক করেছি।ভেবেছিলাম একসাথে তোদের ও অনুষ্ঠান করবো কিন্তু তোর ফুফি বললো তোদের ওয়ালিমা করতে চাই সাদিক পুরোপুরি সুস্থ হলে।

----বাবা? আমাদের কিছু বলোনি কেন?

---সাদিক এর শরীর সুস্থ হলে বলতাম আর এখন তোর দায়িত্ব আগে সাদিক কে দেখা।

তাছাড়া ছেলের বিয়ে দিচ্ছি ইরাম তো আর মেয়ে না ও নিজেও বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারে,তোর খালু, মামা ওরা ও যে যার মত করে সব ম্যানেজ করে ফেলেছে।তোদের তো বলতে এলামই এখন।

---আচ্ছা যাক, সব ঠিকঠাক হলেই হলো।

---হ্যাঁ।যাই হোক আজ আমি চলি পরে আসবো আবার।

বাবাকে বিদায় দিয়ে আমি পাক ঘরে গেলাম, খাবার গরম করছিলাম হঠাৎ কানে এলো ফুফি রীতি কে বলছে

---এক কাজ করো তোমার যখন ওদের কে নিয়ে এতই চিন্তা তুমি সারোগেট মাদার হয়ে যাও।

ফুফি রীতি কে এটা বলেই হনহন করে উঠে গেল উপরে।আমি পাকঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

রীতি আমাকে রাগ দেখিয়ে সিঁড়ির পাশের ঘরটাই চলে গেল।তারপর আমি ফুফা কে বসার ঘরে দেখে উপরে ফুফির ঘরে গেলাম

---আম্মা আসবো?

---হ্যাঁ আই।

খেয়াল করলাম ফুফির মেজাজ তেমন ভাল না। বোতাম বের করে একটা পাঞ্জাবী তে লাগাচ্ছেন।আমাকে বলতে বলল। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম,

----কী হয়েছে আম্মা?

---কিছু না, কিছু মানুষ এত পাগল হয় কীভাবে বুঝিনা।

---রীতির উপর রাগ করেছেন?

--হ্যাঁ ওর বেশ চিন্তা তোদের নিয়ে।

---ওটা আমিও খেয়াল করেছি কিন্তু আমাদের তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখন এসব ভেবে,,,,

ফুফি আমার দিকে তাকিয়ে বলল

----ওর মা, মানে আমার জা অনেক আগেই সাদিক আর ওর ব্যাপারে ভাবতে বলেছিল। তবে আমি কান দেয়নি ভেবেছি সাদিকের ওকে ভাল লাগলে ও নিজেই বলবে আমাকে।

---বুঝলাম কিন্তু এখন কী চাই?

---ও ভাবছে তোদের বিয়ের কথা এই বাড়ী ছাড়া আর তেমন কেউ জানেনা।তাই সবাই জানার আগেই যদি,,,,,,

উফ জানিনা কী করতে চাইছে বোকা মেয়ে।

আমি একটু ইতস্তত ভাবে বললাম

---আম্মা? আপনার ও কী আমাকে,,,

----একদম না।আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে অত ভাবিনা কে দেখেছে ভবিষ্যৎ? আজ আছি কাল নেই,যা হবার হবে। তাছাড়া আমার আফসোস ও হয়না কিছুতে কারণ ভুল থেকেই যে আল্লাহ্‌ শিক্ষা দেয়।আর আমি নিজেই তো একটা সময় নিরুপায় ছিলাম কীভাবে ভুলে যায় সেসব দিন?

আল্লাহ বলেন:

" তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং ঐ অঙ্গীকারকেও যা তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন।(সূরা আল মায়িদাহ:৭)।

--সুবাহ জানিস তোর বিয়ের দিন কী হয়েছিল?

আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম

----হস্পিটালে আমি সাদিকের পাশেই বসে ছিলাম আর ও ঘুমাচ্ছিল হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে যায়। ও চোখ খুলতেই বলে

----সুবাহ,,

---সাদিক কী হয়েছে বাবা?

---মা,,,,,,,সুবাহ?

---সুবাহ?ও হ্যাঁ আজ তো ওর বিয়ে, একটু আগে ইফাদ কল করছিল, তুই ঘুম ছিলি তাই দেয় নি।

---বন্ধ করো।

---কী?

---মা,,,বিয়েটা বন্ধ করো।

---বলছিস কী এসব? আজেবাজে স্বপ্ন দেখেছিস নাকি?

----মা,,

--কী বলতে চাস?ওর বর এ কী কোন সমস্যা আছে?

--মা আমি নিঃস্ব হয়ে যাব।

আমি সাদিকের কথায় যেন থমকে গেলাম। কী বলছিস বাবা?

---মা, থাকতে পারব না। দ্বিতীয় বার সুযোগ পেয়েছি এটা চলে গেলে চিরতরে হারিয়ে ফেলবো ওকে।

সাদিকের কথায় আমি আর প্রশ্ন না করে ওর রিলিজ নিয়ে চলে এলাম বাড়ী।আমার বিশ্বাস ছিল সাদিক যেহেতু তোকে পছন্দ করেছে তাহলে নিশ্চয় তুই ওর কাছে অনেক আলাদা একজন।"আমার সাদিক তোকে ভালবাসে তাও অনেক বেশি আর ও জেনে শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এতক্ষণ ফুফির কথা আমি পলকহীন ভাবে শুনে গেলাম।সাদিক এমন কেন?

ধীর পায়ে রুমে গেলাম এসব ভাবতে ভাবতে, দেখলাম সাদিক ঘুমাচ্ছে।

ওর প্রতি যেন ভালবাসা আরো একগুণ বেড়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প