দিন দিন যেন মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো আমার।সবকিছু উলোট পালোট করার জন্য একটা দিনই যথেষ্ট ছিল। সাদিক এখন প্রায় ব্যস্ত থাকে ওর অফিসের কাজে, তাছাড়া ওর বিদেশ যাওয়ার সময়ও প্রায় নিকটে চলে এসেছে।
এমন সময় একদিন ও ফুফি আর আমাকে ডেকে বলল ওর দুই দিনের জন্য ঢাকা যেতে হবে অফিসিয়াল কাজে। আমাকেও সাথে নিতে চেয়েছিল কিন্তু আমি রাজি হইনি। ভাবলাম দুইদিন এর জন্য কাজে যাচ্ছে, ওখানে আমার কী কাজ?
তাই ও ফুফি কে বলে গেল আমার যেন খেয়াল রাখে। ঘরে যেহেতু মেহমান আছে কারণ ও জানে কিছু মানুষ অকারণেই কষ্ট দিয়ে মজা পায়। ওরা ভুলে যায় ওরা নিজেও কারো দ্বারা সৃষ্টি। ওদের জ্ঞান এতই লোপ পায় দুনিয়াতে শুধুই আনন্দ খুঁজতে থাকে হোক সেটা অন্য কে কষ্ট দিয়ে।
অথচ আল্লাহ বলেছেন:
"আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।
(সূরা আল আরাফ: ১৭৯)"।
সাদিক ঘর থেকে বিদায় নেওয়ার পর সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে যায়।আমি উপরে রুম ঘুছিয়ে যাবতীয় কাজ সারলাম। দুপুরে নিচে রান্নার কাজ শেষ করেই ফুফি বলল
----সুবাহ? আমার একটু ইমারজেন্সি বাইরে যেতে হচ্ছে রে দুই আড়াই ঘন্টা লাগতে পারে।
আমি প্রশ্ন করলাম,
---কী হলো? কোনো সমস্যা?
---হ্যাঁ,,, ঐ আমার মামাতো বোন আবার বান্ধুবী ও লাগে শামীমা ওর এক্সিডেন্ট হয়েছে।
----হাই! আল্লাহ বলেন কী!
---হ্যাঁ তাই একটু দেখে আসি এখান থেকে বেশ দূরে আছে, হস্পিটাল আগ্রাবাদ এ তাই দু ঘন্টা তো লাগবেই।
---একা যাবেন?
---না তোর ফুফা কে নিয়েই যাব।
---ঠিকাছে।
---থাকতে পারবি তো সাবধানে?
--হ্যাঁ! আর সবাই তো ঘরেই আছে।পারব।
----ঠিকাছে তাহলে আমি বের হই।
---খাবার খেয়ে যাবেন না?টেবিলে দিয়ে দিয়েছি তো।
----হ্যাঁ খাব।তুই ও খেয়ে নে?
---না পরে খাব। কাজ আছে।
সবাই খেতে বসলো আর আমি উপরে চলে গেলাম।গোসল সেড়ে বের হয়ে, কিচ্ছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকলাম কখন ঘুমিয়ে গেছি জানিনা। ঘুম থেকে উঠে যেই নিচে যাব দেখি রাইহান আমার রুমে ঢুকেছে।আমি উনাকে দেখে থতমত খেয়ে গেলাম, ভাবলাম উনি আমার রুমে কেন ঢুকছেন?ভাগ্যিস আমি নিচে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ছিলাম।
আমি বললাম
---আপনি এখানে কেনো?সাদিক নেই।
---হ্যাঁ জানি।তোমার সাথে কথা বলতে এসেছিলাম।
---নিচে চলুন আগে।
---সুবাহ দাঁড়াও।
---না,না এখানে কথা বলতে পারব না। যা বলার নিচে গিয়ে।
রাইহান আমার কাছেই এসে যাচ্ছে প্রায়, তখন আমি পাশ কাটিয়ে বের হতে গেলেই আমার ওড়নায় টান লাগে। আমি পেছন ফিরতেই রাইহান সরি বলে ছেড়ে দেই।
---সুবাহ প্লিজ বসো, আমি জাস্ট কথা বলতে এলাম।
আসলে আমি তোমাকে খুব পছন্দ করতাম এখনো করি।
----এসব কী বলছেন আপনি? অপ্রয়োজনীয় কথা শুনতে চাইনা আমি প্লিজ, এখান থেকে চলে যান।
ওর কোন পদক্ষেপ না দেখে, আমিই বের হয়ে যাচ্ছিলাম আর বের হতে নিলেই সে আমার পথ আটকিয়ে দরজায় চলে যায়।ভীষণ ভয় লেগে উঠলো আমার। এই ছেলে চাই কী? বুঝলাম না।
----করছেন টা কী আপনি?
----বললাম না জাস্ট কথা বলতে চাই।
----রাখুন আপনার কথা বার্তা।
আমি বের হয়ে যেতে চাইলেই সে আমার হাত ধরে টেনে বেডে বসিয়ে দেই।আমি হাত ছাড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে পালাতে গিয়ে খুব জোরে ড্রেসিং টেবিলের সাথে বারি লেগে পেটে ব্যাথা পাই।
সাথে সাথেই একটা মাগো বলে চিৎকার দিলাম।
রাইহান তাড়াতাড়ি আমার পাশে বসে বলল
----ওহ সরি সুবাহ। সত্যি আমি তোমাকে ব্যথা দিতে চাইনি,,,
আমি এবার হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে জোরে জোরে ডাকতে শুরু করলাম।
----সাবিল,,,,,সাহির,,,,,।
সাহির হয়তো ছিল না সাবিল দুই মিনিট পর দৌড়ে এলো সাথে রাইহান এর মা ও।
:::::::::::::::::::::
সামনের ঘরে সবাই উপস্থিত ফুফারাও চলে এসেছে রাইহান এর মা বললেন
----এসব মিথ্যে কথা! সুবাহ ব্যথা পেয়েছে তাই রাইহান ওকে দেখতে গিয়েছে।এটাকে এত বড় অপবাদ কীভাবে বানালো আপনাদের বউ?
----আমি কোনো অপবাদ দিচ্ছিনা সত্যি বলছি, আমি জানিনা উনি কী উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, সেটা খারাপ নাও হতে পারে কিন্তু আমি বার বার মানা করেছিলাম।
----বাহ! এই মেয়ে কী আছে তোমার? যে এই ঘরের সব ছেলে তোমার কাছে ছুটে যায়? নারী হওয়ার মর্যাদা তো আগে থেকে নেই, এখন অন্তত ভাল মানুষ হয়ে তো বাঁচতে পারো।
আমি অশ্রু চোখে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম
---কী বলছেন চাচী মা এসব? আপনি আমাকেই উল্টো দোষারোপ করছেন?
----চরিত্রহীন মেয়ে কোথাকার আগে সাদিক কে পটালে, এখন আবার এই বাড়ীর অন্য ছেলেদের ও হাত করছো। আবার কেউ দেখে ফেললে ওদের দোষ ও দিচ্ছো।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আশ্চর্য উনি আমাকে চরিত্রহীন বললেন আর ফুফি আম্মা কিছু বললেন না,সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সত্যিই দোষটা আমার।
তখন সাবিল বলে উঠলো,
----চাচীমা প্লিজ থামুন সুবাহ ভাবী এমন না, আমারা ওকে জানি।
---হাহ্ আমরাও জানি কী করেছে ও। আজ যদি সাদিক ওর ভাইকে পড়াতে ঐ ঘরে না যেতো তাহলে এমন টা কখনোই হতো না। ছেলেদের সামনে ঘুরে বেড়াবে আর কাজ শেষ হলে পরে পরহেজগার সাজবে।
আমার অশ্রু আর বাধ মানলো না, রেগে বলে ফেললাম।
---হ্যাঁ আমি সব শিখছি আস্তে আস্তে নিজের ধর্মকে জানছি।ভাল ছিলাম না এখন ভাল হতে চাই।
কিন্তু আপনি কী জানেন? আপনাদের মত মায়ের আশকারা পেয়েই ছেলেদের সাহস বেড়ে যায়?
ছেলেরা শুধু অসৎ সংগে নয় আপনাদের মত পরিবারের সহযোগীতা পেয়েই আরো খারাপের দিকে এগিয়ে যায়।কোনো মেয়ের দিকে হাত বাড়াতে তাদের ভয় লাগেনা কারণ পরিবার তো আছেই যারা কখনোই বিশ্বাস করবেনা যে তাদের পুত্র এমন করতে পারে।শুধু কী তাই? বড়লোক এর বেটা হলে তো কথায় নেই। ক্রাইম করুক আর না করুক তাদের কিছুই যায়ে আসেনা, শুধু ছেলেকে বাঁচিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দিতে পারলেই হয়।
আজ আমাকে অপবাদ দিয়েছেন ঠিকাছে,তবে শুধু আমার না, খারাপ করেছেন নিজের আর নিজের ছেলের ও।
কারণ আপনি হয়তো জানেন না আল্লাহ বলেছেন:
"তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বে সত্যকে তোমরা গোপন করো না।(সূরা আল বাকারা: ৪২)"
আমি জানি আপনারা সবাই চুপ করে আছেন নিজের আত্মীয়তার বন্ধনে কিন্তু ন্যায়বিচার এ এসব দেখা যায় না।
"" হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।
(সূরা আন নিসা: ১৩৫)"
কথাটা শেষ করতেই চাচী সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমাকে কষে থাপ্পড় মারে।
ফুফি এগিয়ে এলেন
----রাইহানের মা করছো কী?ঠিক করো নি এটা।
আমি থাপ্পড় খেয়ে জায়গা থেকে নড়ে গেলাম।
তারপর ফুফি হাত জোর করে চাচীর উদ্দেশ্যে বলল
----দয়া করে আপনারা চলে যান এখান থেকে।সাদিক আসার আগেই,জানিনা ও জানলে কী করে বসবে।
আমি সরে এলাম আস্তে আস্তে। মনে মনে ভাবছি কীসের এত অহংকার মানুষের?আমি তো জন্মগত ভাবে এমন নই, আমার সাথে যদি এমন টা হতে পারে তাদের সাথে হতে কতক্ষণ? আল্লাহ মুহূর্তেই আমির, মুহূর্তেই গরীব বানাতে পারেন।তাহলে মানুষ কেন অহংকার করে?অহংকারী কে তো আল্লাহ পছন্দ করেন না।
পেটে খুব ব্যাথা করছে,,,
অপারেশন এর পর থেকেই আমি নিজেকে সামলে চলতাম।এখন
আমাকে সবর করতে হবে কঠিন সবর।
ফুফি আম্মার দরজার সামনে যেতেই শুনতে পাই
ফুফি কেঁদে ফুফাকে বলছেন
----কেনো আপনি আমাকে থামিয়ে দিলেন? কিছু বলতে দিলেন না?
---ওরা আমার বাড়ীর লোক তুমি কিছু বললে অনেক কান্ড ঘটাবে, আর আজ যা হয়েছে তাতে তো,,,
---তাই বলে সুবাহর জন্যে আপনি একটা কথাও বললেন না?
----তোমাদের আগেই বলেছি, আমার থেকে জিজ্ঞেস না করে তোমরা বিয়েটা সম্পন্ন করেছো। আমি এতে কখনওই রাজি ছিলাম না।তারপর ও সাদিক কে এখানে থাকতে দিচ্ছি তোমার কারণে।
আমি ওদের কথার মাঝখানে নক করে বললাম
----আম্মা এদিকে একটু আসবেন?
ফুফি উঠে এলো।আমি উনাকে বললাম বাপের বাড়ি যেতে চাই কিছুদিনের জন্য।
----ঠিকাছে সাদিক যেহেতু নেই তুই ঘুরে আই।
---আমি কি কিছুদিন থাকতে পারি?
---হ্যাঁ মা! যা।
তোর ভাল লাগলে চলে আসিস।
:::::::::::::::::
আমি চলে এলাম বাসায়,সবাই খুব খুশি বিয়ের এতোদিন পর আজ থাকতে এলাম এখানে।
এখন তো নতুন ভাবী ও আছে। আমি মোবাইল অফ করে রেখে দিলাম।
নিজেকে সাদিক থেকে গুটিয়ে নিলাম কেনো যেন দূরে যেতে ইচ্ছে করছে। ভালই হলো ও এখানে নেই থাকলে হয়তো আসতে দিতো না।
জানি বলা উচিত ছিল কিন্তু আমার সাথে যা হয়েছে ওটা থেকে কেটে উঠতে পারছিনা।পুরুষ দের উপর ঘৃণা হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমার আত্মসম্মান কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে।
জানিনা ধর্ষিতা মেয়ে গুলো কীভাবে বাঁচে উফ এতো অসহ্যকর অনুভূতি আগে কখনো হয়নি।
কেউ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্পর্শ করলে নিজের প্রতিই যেন ঘৃণা চলে আসে।
পরেরদিন সন্ধ্যার পর ইফাদ কে নিয়ে ছাদে উঠলাম। একপাশে গিয়ে আনমনে দাঁড়িয়ে আছি।
পেছনে কী মনে করে ফিরতেই দেখি সাদিক দাঁড়িয়ে আছে।
আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম ও আমাকে ধরে ফেললো তারপর ছেড়ে দিয়ে আবার সেই পরিচিত রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
সাদিক বলল
-----আমাকে বললে কী আসতে মানা করতাম?
অবাক হচ্ছো না আমাকে দেখে?
আমি কিছু বললাম না।ও আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল
---আমার তো আগামীকাল আসার কথা ছিল।জানতে চাইবে না,আজ কীভাবে এলাম?
আমি মাথা নিচু করে আছি, চোখ ভরা পানি ওকে দেখাতে ইচ্ছে করছে না।
----কী হলো কথা কেনো বলছো না?সুবাহ কথা বলো?
আমি তারপর ও কিছু বললাম না।
ও আমাকে ঝাঁকিয়ে বলল
---চুপ করে আছো কেনো? আমি তোমার জন্য কাজ সেড়েই দৌড়ের উপর বাড়ী ফিরেছি।তোমার ফোন বন্ধ, আমার সাথে কথা বলতে চাইছো না,এখানে চলে এলে।হয়েছে কী তোমার?
আমি ওর দিকে তাকাতেই পানি গাল বেয়ে পরতে শুরু করলো।
ও আমার মুখ দেখে বলল
-----তুমি ভাল নেয়।কে? কী বলেছে? আমাকে বলো।
ধমক দিয়ে বলল
---তুমি না বললে কী আমি জানবো না?
আমি তারপরেও চুপ ছিলাম
সাদিক আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল
----তুমি কষ্ট পেয়ো না সব ঠিক করে দিব আমি, তোমাকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না।
আমি নীরবতা ভেঙে কান্না করে দিলাম শব্দ করে।ও আমার কপালে চুমু দিয়ে বলল
---আমি এসে গেছি আর একটুও কাঁদবে না বলে দিলাম।
আমি ওকে বললাম
----কেনো এলে আমার জীবনে? আমার কী দোষ ছিল? আমি কেনো আজীবন এসব শুনে যাব?
আর তুমি,,,,,, আমার ভুল হয়েছে,তোমাকে বিয়ে করা।
সাদিক আমার দিকে তাকালো তবে তখনো ধরে ছিল।
তারপর আমি বললাম
----বড় ভুল করেছি। ভালই হতো আমি ডাক্তার সাহেব কে বিয়ে করতাম অন্তত এসব কথা থেকে মুক্তি পেতাম।ভাল লাগছে না আর এসব। তুমি কেনো ভেঙে দিলে বিয়েটা।
সাদিক হঠাৎ করে আমাকে ছেড়ে দিলো।পিছু হাটতে লাগলো মুখে বিষণ্ণতা এনে।
আর কিছুই বললনা আমাকে
আমি সাদিকের দিকে তাকিয়ে রইলাম চলে যাচ্ছিল ও তবে নিচে নামার আগে আমার দিকে একবার তাকালো চোখ লাল হয়ে গেছে কপাল এর রগ ফুলে উঠেছে।