গত ছয়দিন এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম ভাই এর বিয়ে নিয়ে, তারমধ্যেই আবার সাদিক ঠিক করেছে ভাই এর বিয়ের দুদিন পর আমাদের ওয়ালিমা। এই কয়দিন বাপের বাড়ী আসা যাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।আর আমার ফুফি আম্মা যে আমাকে নিয়েই ব্যস্ত।উনার মতে আমাকে কিছু দেওয়া হয়নি তাই আমার জন্য শপিং করতে শুরু করে দিলো।আমি খুব একটা মার্কেট যাওয়া পছন্দ করিনা দরকার ছাড়া তো একেবারেই না, তারপর ও যেতে হয়েছে লাস্ট ছয় দিন। একদিকে ভাই আর অন্যদিকে আমার নিজের জন্য।
সাদিক ও বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ওয়ালিমা নিয়ে আবার অফিস এর কাজেও মন দিতে হচ্ছে।
রাতে রুমে এসে দেখি সাদিক খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে চোখ বন্ধ করে।
আমি আস্তে করে বাম এর কৌটা নিয়ে খাটে বসলাম।ওর কপালে হাত বুলাতেই চোখ খুললো পাশে আমাকে দেখেই কোলের উপর শুয়ে পড়লো।
আমি আস্তে আস্তে কপাল টিপে দিয়ে বললাম ব্যাথা করছে?
---হুম।
---আচ্ছা শুয়ে থাকো।
একটুপর ও আমার হাত টা ধরে মৃদু হেসে বলল
----তোমাকে অনেক সুন্দর লেগেছিল বউ সাজে।আবার বউ সাজবে আমার জন্যে?
---যতবার বলবে ততবার সাজবো।তবে একটা কথা রাখবে?
--বলো?
---ওয়ালিমা টা সুন্নত, সবাইকে জানানো ও দরকার কিন্তু আমি বউ সেজে বসে না থাকলে কী হয়না?
---ওসব তুমি ভেবো না আমি জানি আমার প্রিয়তা কী চাই।
--কী চাই??
---তোমার জন্য কমিউনিটি সেন্টার এর উপরে ব্যবস্থা করেছি সেখানে শুধু মহিলারা যাবে আর নিচে পুরুষ মানুষ। সুতরাং তোমাকে বউ সেজে এক জায়গায় বসেও থাকতে হবে না।
আমি হেসে বললাম
---আ-চ্ছা! আর কী জানো?
সাদিক দুষ্টু হেসে বলল
---প্রিয়তা চাই আমি সারাদিন ওকে নিয়ে বসে থাকি।এমন কি কাজ টাজ না করে ওকেই সময় দিই।দিন রাত খালি আমি আর প্রিয়তা। প্রিয়তা আর আমি।
আমার চোখ আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো বিষ্মিত হয়ে বললাম।
---এটা কী ছিল?
ও অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলল
---জোক্স অব দ্যা ডে ছিল।হাহা হাহাহা।
--শাট আপ।
আচ্ছা ঐ যে,,, না থাক তুমি রেস্ট নাও।
সাদিক চোখ ছোট করে চট করেই বলল
---কী প্রিয়তার গল্প?
---না থাক।
---আচ্ছা বলি।
তো,,,প্রিয়তা নামক বইটা তো শেষ হয়ে গেল পড়া দুজনেরই। এখন ঐ কাগজ ওয়ালী কে পাই কই?
আমি কেন যেন বই এর মধ্যে কাগজ মিস করতাম কিন্তু এক সপ্তাহ কেটে গেল।তারপর হঠাৎ একদিন না চাইতে ও "অলৌকিক প্রেম "ধাঁচের একটা বই নিলাম।আমি সাধারণত এমন গল্প পড়িনা তারপর ও ইচ্ছে হলো বইটা পড়ে দেখতে।বই এর কয়েক পাতা পড়ার পর অনুভব হলো কিছু একটা আছে পাতা অনুসরণ করে উলটে দেখলাম চিকন ভাজ এর কাগজ।খুললাম দেখি
কাগজে লিখা
"তুমি তো দিয়েছিলে মোরে কৃষ্ণচূড়া ফুল"
এবার দেখি কৃষ্ণচূড়া ফুল এঁকে রেখেছে।ভাবলাম আনকমন মেয়ে দেখি? এতো এতো সুগন্ধি ভরা ফুল থাকতে এ মেয়ের গন্ধহীন সব ফুল কেন পছন্দ?
যাই হোক আজ হঠাৎ কাব্যিক লিখা কেন? গল্প পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে নাকি!
আমিও ডুব দিলাম গল্পে "রুপকথার প্রেমে" বাহ মহী আর রুদমিলার প্রেম। এটা পড়ে যেন মোহে চলে গেলাম।মহী আর রুদমিলা কত আলাদা জগতে বাস করে কিন্তু তাদের মন যে এক সুতোই বাঁধা নিজেরাও বুঝেনা।
হঠাৎ নিজের মধ্যেও কিছু মিল পেতে শুরু করলাম বই টা পড়তে পড়তে। প্রতিদিন আসি বই পড়তে কিন্তু ঐ কাগজের প্রতি আকর্ষণ বেশি ছিল।
পরে একদিন মেজাজ টা বেশ খারাপ ছিল ভার্সিটি তে ঝগড়া করে এসেছিলাম।বই হাতে নিয়ে পড়ার চাইতে ভাবনা ছিল বেশি হঠাৎ লাস্টের দিকে কাগজে চোখ পড়লো।
",মুসিবতে অস্থির না হয়ে আল্লাহ কে ভয় কর ও উত্তম প্রতিদানের আশায় সবর কর। (বুখারীঃ১২৮৩,মুসলিমঃ৯২৬)"
আমি ভাবলাম এ বুঝি সে আমাকেই বলল।
তারপর পরের বার আবার পেলাম কাগজের লিখা তখন ওটা যেন আর কাগজ নয় আমার জন্য প্রতিদিন রেখে যাওয়া একটা চিরকুট।
ভার্সিটিতে ঝামেলায় বার বার ওর লেখা গুলো মনে পড়ছিল আর নিজে কেও সহজে শান্ত করতে পারছিলাম ওগুলোর প্রতিদানে।
"মহানবী বিপদগ্রস্ত কে সবরের পুরষ্কারের কথা জানিয়ে দিতেন।
আবু হুরাইরা রা.থেকে বর্নিত,রাসূল সা.ইরশাদ করেছেন,"আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,দুনিয়া তে আমার মুমিন বান্দার কোনো নিঃস্বার্থ আপনজনকে যখন আমি মৃত্যু দান করি,আর সে সবর করে, প্রতিদানের আশা রাখে,তখন আমার কাছে জান্নাত ই তার একমাত্র প্রতিদান"(বুখারীঃ৬৪২৪)"।
আসলেই আমরা যখন প্রিয় মানুষ কে হারায় কত টা ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরি কিন্তু এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের জন্য কত বড়ই না প্রতিদান রেখেছেন।
যাই হোক এভাবেই অনেক ছোট ছোট বিষয়ে আকর্ষিত হতাম কিন্তু ধৈর্য ধরে আমি কখনো খুঁজিনি তাকে।
কিন্তু একদিন আর না খুঁজে পারলাম না, লাইব্রেরী তে পনেরো দিন পর একটা কুইজ খেলা হতো যেটাতে মনের মতো উত্তর দিয়ে বিজয়ী হলে পুরষ্কার এ একটা বই দিতো।
----হ্যা মনে আছে।আমি একটু হাসলাম।
---তারপর সেই বার আমাকেও আলতাফ ভাই বসালেন সবচেয়ে ভাল লিখা কোনটা বেছে নিতে।আমরা কথা বার্তার পাশাপাশি হাসছিলাম সবার লিখা পড়ে পড়ে।
হঠাৎ আলতাফ ভাই বলল
----এই লেখা টা দেখতো।
"দুনিয়াতে তো সবাই বাঁচে, আমি বাঁচতে চাই পরপারে, থাকতে চাই সবার দোয়ায়।ছোট ছোট কাজ গুলো পরপারে অফুরন্ত পুরষ্কার এর কারণ হবে।চাওয়া শুধু এই টুকুই"।
প্রশ্ন টা ছিল--"দুনিয়ায় আপনার বড় স্বপ্নটি কি?
কিন্তু এমন একটা উত্তর আমাদের মনকে নাড়া দিয়ে গেল।
এই উওরের মালিক কেই বিজয়ী করা হলো।আমি কিছুদিনের জন্য বাড়িতে গিয়েছিলাম তাই জানা হয়নি কে ছিল সে।
পরে আবার বই এর দোকানের ছোট কর্মচারী রতন কে জিজ্ঞেস করাই সে বলল।
--সাদিক ভাই আপনাদের বাড়ীর পিছে এক বিল্ডিং আছে না ঐ খান থেকে দুইটা আপু আসে বই পড়তে, ওদের কেউ হবে।
ভাবলাম বাড়ীর পিছে মানে তো সায়েরা বিল্ডিং ওখানে তো কোন মেয়ে নেই।
পরে শুনলাম কয়েকজন মেয়ে নাকি বেড়াতে এসেছে সেখানে।
এরপর ভাবলাম আসলে আসবে তাতে আমার কি?একদিন বই পড়ছিলাম হঠাৎ দুইটা মেয়ে হাসাহাসি করে বের হয়ে যাচ্ছিল লাইব্রেরী থেকে একজনের নাম ছিল প্রিয়া। আমি ফিরে তাকালাম নামটা কানে আসতেই।
তারপর ওরা চলে যাওয়ার সময় রতন বলল
----ভাইয়া উনারায় বেশি আসে এখন হয়তো আপনার বইটা প্রিয়া আপু পড়ছিল।
---তাই?
হঠাৎ মায়ের ডাকে আমি আর সাদিক নড়ে উঠলাম। সাদিক এর কথা অর্ধেক এ বন্ধ করে দিয়ে মায়ের রুমে চলে গেল।
আর আমি ভাবছিলাম আগামীকাল ভাইয়ার বিয়ে আর আমি এখনো কিছু ঠিক করিনি।
::::::::::::::::::::::::::
পরেরদিন বিয়ে নিয়ে আমরা বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমি একটা পার্টি বোরকা পড়েছি আর সাদিক ধূসর রঙা পাঞ্জাবী।
দুজনেই ব্যস্ততায় কয়েকবার মুখোমুখি হলাম। সাদিক সুযোগ পেলেই আমার সাথে ইশারা ইশারায় কথা বলে, ফাজিল একটা।
আজ ভাইয়াকে তো দারুন লাগছে বরের সাজে।পুরোপুরিভাবে সবাই আনন্দে নিয়োজিত হলাম।
ভেবেছিলাম আমার জীবনে হয়তো সুখের দিন চলে এসেছে কিন্তু ঐ যে, সুখ যেন কপালে বেশিদিন সয় না আমার।