আমার প্রিয়তা

পর্ব - ৩০

🟢

"""পাও বা না পাও আল্লাহ্‌র কাছে চাওয়া বন্ধ করো না,তিনি যখন দিবেন তখন শুকরিয়া আদায় করেও শেষ করতে পারবে না।

কারণ তিনি প্রাচুর্য্যময়।""

সাদিক আর আমি তিন দিন পর ডাক্তার এর কাছে গিয়েছিলাম ওকে চেকাপ করাতে।

বাসায় ফিরে দেখি সবাই বসার ঘরে বসে আছে, ফুফা সংবাদ দেখছেন টিভি তে। বাকিরা বসে আছে কেউ মোবাইল নিয়ে আর কেউ কথা বলছে।সাহের আর সাবিল এর সাথে মেহমান দুজন ও আছেন।ফুফা আমার সাথে আর সাদিক এর সাথে কথা বলে না। ফুফি এসে জিজ্ঞেস করলো ডাক্তার কী বলেছেন?

সাদিক উনার সাথে কথা বলছে তাই আমি উপরে চলে গেলাম।ফ্রেশ হয়ে এসে সবাই খাবার টেবিলে বসলাম।আমি সাদিকের পাশে বসলাম এক কোণায়।

রীতি আমার দিকে খুব রুক্ষতা নিয়ে আড় চোখে দেখছে।ও আসার পর থেকে কেমন যেন আমার সাথে খুব কম কথা বলে কিছু লাগলেও বলেনা।

পরেরদিন আমি পাকঘরে চা বানাচ্ছি এমন সময় রীতি ও গেল ফ্রিজ থেকে পানি নিতে।বোতল হাতে নিয়ে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি বুঝতে পেরে বললাম

---কিছু লাগবে?

ও আমার দিকে আগাগোড়া নজর বুলিয়ে বলল

---কিসের আশায় এসে গেলে তুমি?

--- সরি?

---মানে কত বছর এভাবে থাকবে? বড্ড ভুল করেছো।

---কী বলতে চাও তুমি?

----বোকা মেয়ে।

ও চলে গেল।আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে।আমার খারাপ লাগলেও মন কে বুঝালাম ও হিংসে করেই বলেছে কথা গুলো।

জানি আমার দূর্বলতা আমার এই অভাব নিয়ে অনেকেই উপরে আফসোস দেখালেও ভেতরে কেন যেন আনন্দ পাই দুঃখিত হওয়ার ভান করে।

কিন্তু আমি ভেঙে পড়তে চাইনা। আমি তো জানি আল্লাহ বলেছেন:

""যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন।

(সূরা আল ইমরান: ১৩৪)

তাই আমি কারো সাথে রাগ করে আমার পুরষ্কার হারাতে চাইনা।

আর ওদের কথার প্রত্যুত্তর এ আল্লাহ বলেছেন:

""আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।(আল আরাফ:১৯৯)"""

এর চেয়ে বেশি আর কী লাগে মনের আঘাত কে শান্ত করতে?

::::::::::::;:;;:;

আমি বারান্দায় আনমনে দাঁড়িয়ে আছি।খেয়াল ই নেই আশেপাশের কথা। বৃষ্টি দেখছিলাম আর মনে চলছিল ভাবনার রেলগাড়ি হঠাৎ রেলিং এ রাখা হাতের উপর অন্য হাতের স্পর্শ পেলাম।সাদিকের উপস্থিতি বুঝতে পেরে নিজেকে খুব হালকা লাগছে।

আমি ওর কথা বার্তা না শুনে ওর দিকে একটু পেছন ফিরে তাকালাম।

দেখি দূরে তাকিয়ে আছে আত্ম তৃপ্তি নিয়ে।আমি বললাম

---কী ভাবছো?

ও আমার ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল

---শসসসসসসস্।কথা বলো না শুধু অনুভব করো।

ওর কথায় আমি আবার ফিরে বৃষ্টি দেখছি আর পেছনে ওকে অনুভব করছি সত্যিই খুব ভাল লাগছে পরিবেশ টা।

আসলে সাদিক পাশে থাকলে মনে হয় আমি নিজেকে ছেড়ে দিই কারণ ওতো আছেই আমাকে সামলানোর জন্য।সাদিক একটা ভরষার নাম ভালবাসার নাম।

একটু পর ও বলল

---কেনো মন খারাপ?

ওর কথায় চোখ খুললাম।

---কই নাতো।

----শোনো! যে যাই ভাবুক আমাদের কিছু যায়ে আসেনা। ওটা একা তোমার সমস্যা না এখন থেকে তুমি নিজেকে এই সব পরিস্থিতি তে "আমি" ভাববেনা "আমরা" ভাববে।আর খবরদার যে যাই বলুক বা করুক কখনো আমার থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করবে না।যদি মহৎ দেখাতে গিয়ে আমাকে আলাদা করতে যাও নিজের থেকে মনে রেখো তোমাকে আমি,,,,

না তোমাকে কিছুই করতে পারব না আমি কিন্তু নিজেকে তিলেতিলে শেষ করে দিব।

আমি অবাক হয়ে বললাম

---এই পাগল কী বলছো এসব?

ওর চোখে একটা জেদ দেখলাম, জেদ নিয়েই বলছে

----জানো না তুমি, কিছুই জানো না আমি কী পরিমাণ পাগল আর কী করতে পারি তোমার জন্য।

সাদিকের মুখে এমন কথা কখনো শুনতে পাবো, আমি বিশ্বাসই করাতে পারছিনা নিজের কান কে।

ওকে জিজ্ঞেস করলাম

----কি হয়েছে আজ বাচ্চামি করছো?

আমার হাত শক্ত করে ধরে ঠোঁটের সাথে স্পর্শ করিয়ে বলল

----তুমি শুধু আমার কথা ভাববে,এই হাত ধরেছি আজীবন এর জন্য।

----তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?

ও কেমন অসহায় চোখে বলল

----আজকের এই সময় টার জন্য আমি অনেক রাত কেঁদেছি, অপেক্ষা করেছি কোন কিছুকে আমাদের মাঝে আসতে দিও না প্রিয়তা।

আমি শান্ত ভাবে সাদিক কে জড়িয়ে ধরলাম ও ঝুকে আছে আমার দিকে আর আমি ওর মাথার চুলে হাত বুলাতে লাগলাম।

ও এতো আবেগী কখনো হয়না যাক আজ নিজের অনেক না বলা অনুভূতি বলে দিয়েছে।

এবার বললাম

---চলো বিশ্রাম নিবে।

---আরেকটু ধরে রাখো না।

আমি মৃদু হেসে বললাম

---ঠিকাছে তবে বিছানায় চলো আগে।তুমি ওষুধ খেয়ে নাও।

---আচ্ছা।

"""দুদিন পর

ভোরবেলায় নামাজ সেড়ে নিচে যেতেই ফুফা কে দেখতে পেলাম উনি আমাকে না দেখে কি যেন বলতে নিয়েছিল মনে হয়েছে চা কিন্তু আমাকে দেখে আর বললেন না।

আমি ও নাস্তা তৈরি করতে লাগলাম উনার জন্য।

বুয়া রুটি, পরোটা বানিয়ে রাখে শুধু ফ্রিজ থেকে নিয়ে সেক ছিলাম।

আস্তে আস্তে সবাই নাস্তার টেবিলে চলে এলো ফুফিও এসেছে বলল আজ উনার শরীর ভাল লাগছেনা তাই দেরি হলো।আমি বললাম

বিজ্ঞাপন

----আম্মা তাহলে আপনি নাস্তা করে আবার চলে যান উপরে। দুপিরের টা আমি করে নিব আর খালা তো আসবে একটু পর।

ফুফি অবাক হয়ে তাকালেন আমি আম্মা ডেকেছি বলে।তারপর একগাল হাসি নিয়ে বলল

---- না রে আমি ঠিকাছি তোর না পরীক্ষা আছে?

---জি।

---তো? পড়া ফাঁকি দেওয়া যাবে না কিন্তু।

আমি উপরে গেলাম তৈরি হতে সাদিক লেপটপে কাজ করছে আর অফিসে কথা বলছে।

আমি যাওয়ার আগে ইশারায় বললাম

আমি যাচ্ছি।

চেয়ারের পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ওর কপালে চুমু দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলাম দরজায় যেতেই ও আমার হাত ধরে ফেললো।

---কী?

---আমার টা যে বাকী।

আমার কপালে চুমু দিয়ে বলল

---আমি দিয়ে আসি?

---আরেহ না এটা তো কাছেই দূরে হলে নিয়ে যেতাম আর তুমি পুরোপুরি ভাল হও তারপর নিয়ে যেও।

আমি নিচে এসে নাস্তা করতে বসলাম টেবিলে আছেন ফুফা শুধু, আমি পরোটা ছিড়ে খাচ্ছিলাম ঐ সময় রীতি এসে ফুফা কে চা দিয়ে বললেন

---এই নিন বড় আব্বু আপনার চা।

আশ্চর্য চা তো আমিও করে গিয়েছিলাম তার মানে ফুফা আমার হাতের চা খাইনি।মন টা খারাপ হয়ে গেল তার উপর রীতি যেন আমাকে হিট লাগিয়ে কাজ টা করে বেশ আনন্দ পাচ্ছে।

ফুফা চা খেয়ে উঠে যাওয়ার পর রীতি আমাকে বলল

----বড় আব্বুই আমাকে চা করে দিতে বলেছে, তুমি আবার আমাকে ভুল বুঝো না।

তাছাড়া এই ঘরে চাচীমা যে ক'দিন একটু সাপোর্ট করে তোমাকে ততোদিনই তোমার ঠাই।

এবার খাওয়া বন্ধ করে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম

---কেন?সাদিক কে কি ভুলে গেছ?

----তোমাকে নিয়ে যে কোনো ভবিষ্যৎ নেই ও সেটা শীঘ্রই বুঝতে পারবে।তাছাড়া কয় বছর ভাল লাগে দেখো।

আমি হেসে বললাম

---ততোদিন অপেক্ষা করে বোকামি করো না প্লিজ তখন আমার অপেক্ষায় নিজের যৌবন না হাড়িয়ে যায়।

এনিওয়ে গুডলাক। আল্লাহ হাফেজ বলে চলে এলাম।

:::::::::::::::

আমার পরীক্ষা চলাকালীন সময় রীতি প্রায় এসে সাদিকের সাথে কথা বলে বসার ঘরে, আবার ওর কাছে পড়ার সাজেশন নিতে গিয়ে গল্প করতে যায়।আমি সব বুঝতে পারছি ওর মূল চাওয়া টা কী।

দশ পনেরো দিন হয়ে গেল ওরা ভাই বোন এখনো আছে। রীতি ও নাকি দু এক জায়গায় জব এর জন্য এপ্লাই করেছে। ও প্রায় আমাকে নিয়ে উপহাস করে।যেমন একদিন বলল

---সাদিক ভাই আপনাকে আমি অনেক স্মার্ট ভেবেছিলাম কিন্তু আফসোস।

---কেন?

---আপনি দেখি খুব দ্রুত ডিসিশন নিয়ে ফেলেন।

---কই নাতো,,,

---এই যে হুট করে বিয়ে করে ফেললেন। সময় তো আরো ছিল তাই না?একটু আশেপাশে তাকালে কি হতো না?

আমি তখন নাস্তার টেবিলে ওদের নাস্তা বেড়ে দিচ্ছিলাম সাদিক আমার হাত টেনে ধরে পাশে বসালো।

আর আমার দিকে তাকিয়ে হাতের আঙুল জড়িয়ে বলল

---এইটা তো আশেপাশে তাকানোর ই ফসল।তাই দূরে কোথাও মন দিতে পারনি।তাছাড়া কে বলেছে দ্রুত ডিসিশন নিয়েছি?

আমার লজ্জা লাগছিল তাই ওকে সামনে তাকাতে বললাম।

বিকেলের নাস্তায় টেবিলে আমরা তিনজন আর সাবিল ছিল। তবে সাবিল খেতে বসেও ট্যাব এ কি যেন পড়ছিল তাই ওতো খেয়াল করেনি।

তারপর সাদিক রীতি কে উদ্দেশ্য করে বলল

---তা তোমার ইন্টার্ভিউ কখন শেষ হবে? তোমরা নাকি ফিরে যাচ্ছো?

----হ্যা আর একটা আছে দুদিন পর।আর তারপর,,

---তারপরেই চলে যাবে? আচ্ছা তাহলে তবে আবার এসো।

সাদিক এটা বলেই নাস্তা শেষ করে উপরে চলে গেল।রীতি তো আমার দিকে রেগে তাকিয়ে আছে,ও ভাবছে আমি কিছু বলেছি সাদিক কে।

তারপর আমিও কাজ শেষ করে উপরে উঠে গেলাম।সাদিক লেপটপ নিয়ে কাজ করছে।

আমি পাশে গিয়ে বললাম

---এভাবে কেউ বলে?

---কী বললাম?

---রীতি কে।

---ওহ।কই তেমন কি বললাম।

---সাদিক?

ও লেপটপ পাশে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল

----ও তোমার সুযোগ নিচ্ছে আর আমি আমার প্রিয়তার সুযোগ কাউকে নিতে দিবনা।

---কিন্তু কারো উপহাস করা উচিত না।

সাদিক বলল হ্যাঁ জানি তাই তো করিনি শুধু জবাব দিয়েছি।উপহাস তো ও করেছে।

আল্লাহ বলেছেন:

" মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম।"(সূরা আল হুজুরাত: ১১)।

----আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম বাহ কী চমৎকার বললে।

আচ্ছা, তোমার কেন মনে হলো এটা?

সাদিক আমার মুখটা ধরে বলল

---তোমার কী মনে হয়? আমি আমার প্রিয়তার খবর রাখিনা?

আমার চোখে পানি চলে এলো।তারপর বললাম আচ্ছা তুমি আমাকে প্রিয়তা কেন বলো?

---বলবো কিন্তু যদি তুমি রাগ করো।

---ওহ এই ব্যাপার? তাহলে তো শুনতেই হয়।

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প