ধুমধাম করে ভাইয়ার বউ নিয়ে এলাম ঘরে আর তার দুই দিন পর আমার আর সাদিক এর ওয়ালিমা টা ও সম্পূর্ণ হয়ে গেল ঠিক যেমন টা আমরা চেয়েছিলাম।আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব,কলিগ সবাই উপস্থিত ছিল। সত্যিই সাদিক এর ব্যবস্থায় আমি সহজ ভাবেই সব করতে পেরেছি।
রাতের বেলায় রুমে কাপড় গুছাচ্ছিলাম সাদিক শুয়ে আছে। আমি বিছানায় বালিশের পাশ থেকে মোবাইল টা নিতে গিয়ে ও আমার হাত ধরে ফেললো।
ও শুয়ে আছে এক হাত উল্টো ভাবে চোখের উপর রেখে আর সোজা শুয়ে দু পা ক্রস করে নাড়াচ্ছে।
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললাম
---কী ভাবছেন এতো ?
ও চোখের উপর থেকে হাত নামিয়ে বলল
----দেখেছো না দেখেই ধরে ফেলেছি।
----তো অলিম্পিক এ নাম লিখিয়ে নাও না।এত প্রতিভা ঘরে বসেই নষ্ট করবে?
---কী?
----হাহাহা,,,,হাহা।
---তুমি আমার উপর হাসছো? আমার এই টেলেন্ট এর উপর?
---হ্যাঁ,,,,, তো?
ও মুখ ভেংচি কেটে বলল
---সাহস বেড়েছে না?
---ও হ্যালো! আমি অলওয়েজ সাহসী ছিলাম।আর তোমাকে তো ভয় কখনওই পাইনি।
ও আমার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে এনে মুখোমুখি হয়ে বলল
----হুম সেই জন্যই তো ছাড়তে পারিনি।তাই তো ভেবেছিলাম তোমাকে তো আমার চাই ই চাই।
----আচ্ছা কে আসবে তোমার কাছে? আমি তো না,,,,,
এই বলে পালাতে চাইলাম কিন্তু ফাজিল টা ধরে ফেললো। ছেলেদের বুঝি এত জোর থাকে, সড়াতেই পারলাম না তাকে।
ঘুম ভাঙলো হঠাৎ! হালকা আলো জ্বলছে রুমে আমি পাশে রাখা মোবাইল টা হাতে নিয়ে সময় দেখলাম রাত দুইটা।
অবাক হলাম পাশ ফিরে, সাদিক আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
---একি! তুমি জেগে আছো?
--হুম! দেখছিলাম তোমাকে।
---বুঝলাম এ জন্যই আমার ঘুম ভেঙে গেল।
---কী জন্য?
---কেউ এইভাবে থাকিয়ে থাকলে, সিক্স সেন্স তো বিপদ মনে করে জাগিয়ে দিবেই।তাইনা?
সাদিক আমার গাল টেনে দিয়ে বলল
---ও মোর জ্ঞানী।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কেমন যেন খুব ভাল লাগছে। এতো আত্ম তৃপ্তি আগে কখনো বুঝিনি।হঠাৎ করেই সাদিকের আগমনে জীবন টাই যেন পালটে গেল আমার।
সাদিক আমাকে ধরে রেখেই বলল
----জানো আমি কিভাবে প্রেমে পড়েছিলাম?
আমি ছেড়ে দিয়ে বললাম
----হ্যা এটাই তো জানতে চাই? ঐ প্রিয়ার কী হলো তারপর?
----পুরোটা বলি আগে শোনো,,,
তখন মসজিদের পরে একটা মাদ্রাসা ছিল অবশ্য এখনো আছে, ওখানে ছোট ছোট বাচ্চারা পড়তো। আমার ওদের দেখতে ভাল লাগতো কারণ ওদের বেশিরভাগ ই ছিল এতিম। ওদের দেখভাল করতো সেলিম ভাই । আর সেলিম ভাই ছিল আমার প্রায় এক বছর সিনিয়র তাবে ওর সাথে ভাল বন্ধুত্ব ছিল তাই প্রায় যেতাম।
একদিন গিয়ে দেখি বাচ্চাদের হাতে চকলেট আর চিপ্স। আমি সেলিম ভাই কে বললাম আজ কীসের বোনাস পেলে?
ও হেসে বলল
---আরেহ না ভাই আল্লাহর মেহেরবানি তে এক আপু কিছুদিন পর পর বাচ্চা গুলো কে যা পারে দিয়ে যায়।আর বলে বাচ্চা বয়সে যদি চকলেট, চিপ্স না খায় তবে কি বুড়া বয়সে খাবে?
---কে সে?
---আমি নাম জানিনা, সে কখনো নাম বলেনি।তবে একটু আগেই এখান থেকে বের হলো সাদা জামা পড়েছিল মনে হয়।
---অবাক হলাম একটু আগেই প্রিয়া নামের মেয়েটি কে দেখেছিলাম এই রাস্তায় আসার সময়।সে ও হয়তো সাদা কালো কিছু পড়েছিল।
এরপর থাকে আমি একটু একটু খোঁজ খবর রাখতে শুরু করেছিলাম, শুনেছি কলেজে পড়ে। এখানে বেড়াতে এসেছে, নাকি কী এক কাজে জানিনা।তবে বিশ্বাস করো আমি মেয়েটার চেহেরাও দেখিনি ভাল করে, শুধু তার আচরণ ভাল লেগেছিল।মাস খানেক পর আমি সেই এতিমখানায় যায় ততদিনে সেলিম ভাই একটা এক্সিডেন্ট এ মারা গিয়েছিল, খুব খারাপ লাগতো ভাবলেই। তখন একটা ছোট্ট বাচ্চা এসে আমায় বলল
---ভাইয়া জানেন:
""আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে। বস্তুতঃ যে লোক দুনিয়ায় বিনিময় কামনা করবে, আমি তাকে তা দুনিয়াতেই দান করব। পক্ষান্তরে-যে লোক আখেরাতে বিনিময় কামনা করবে, তা থেকে আমি তাকে তাই দেবো। আর যারা কৃতজ্ঞ তাদেরকে আমি প্রতিদান দেবো।(সূরা আল ইমরান: ১৪৫)।""
বাচ্চাটার এত সুন্দর শ্বান্তনা দেওয়া দেখে বললাম
----কে শিখিয়েছে এত সুন্দর কথা?
---ভাল আপু আমাদের।
---কে এই ভাল আপু টা?
---দেখো আমাদের জন্য চকলেট এনেছে।
---ওহ।
আমি আবার মুগ্ধ হলাম আর সিউর হলাম লাইব্রেরী আর এইখানে আসা মেয়েটা একজনই কিন্তু কে সে?
কারণ আমার জানা মতে প্রিয়ারা চলে গেছে সপ্তাহ খানেক আগেই।তাহলে এখেনে এলো কে?
আর অপেক্ষা না করেই অংক টা মিলালাম আর নামটা বের হলো তোমার।আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি সেটা তুমি হবে।
কারণ আমি তো তোমাকে জানতাম ছোট থেকেই।আর তুমি তখন হয়তো ক্লাস টেন এ পড়তে। আর এত অল্প বয়সে এত কিছু তুমি কীভাবে জানতে ভাবছিলাম।
তারপর তোমাকে বেশ ফলো করতাম, কত ছেলেই যে আমার হাতে ধরা খেয়েছে অকারণেই।
---হাহা,,,হাহাহা। বেচারা আহা। তুমি আমার প্রেমিকদের ভাগিয়েছো হাহ্।
---কচুর প্রেমিক সব গুলো শয়তানের ষড়যন্ত্র ছিল।
---তা ঠিক তখন কী আর এত বুঝতাম! উরু মন, প্রেমের আবহাওয়া চারিদিক।আসলে ভাল কথা গুলো মা থেকে শিখা, মা জোর করে পড়াতো আবার আমার ও ভাল লাগতো।
----তবে জানো আরো দু বছর লেগেছে বুঝতে যে,আমি তোমার প্রতি দূর্বল।
----এবার বলো, আমাকে প্রিয়তা ডেকে মেসেজ কেনো দিতে?
----তোমার কষ্ট কমানোর জন্য।
----তো প্রিয়া কে মিস করোনি?
---একটু ও না। আমি তো কারো মন কে ভালবেসেছি মুখ কে নয়।সুরাত এর চেয়ে সিরাত বেশি প্রয়োজন। বুঝলে? আচ্ছা রাগ করেছো?
----একদম না। ভালই হতো যদি,,,,,
----চুপ।
----তুমি তো জানো আমি অপারগ তারপর ও কেনো আমার কাছে আসতে গেলে?
----ভাল থাকার জন্য এত কিছু ভাবতে হয়না।এত ভেবে কে কী করেছে?হুম?
---খারাপ লাগেনা এত বড় একটা ত্যাগ ভাবতে?
---উহু,,,
""যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্যে সেই ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু দিয়ে দেই এবং পরকালে তার কোন অংশ থাকবে না।(সূরা আশ্-শূরা: ২০)।""
বাকী চাওয়া গুলো না হয় পরকালের জন্য রেখে দিলাম।সব পেয়ে গেলে হয় নাকি?জীবন এতটাও বড় নয় তাই কিছু উপহার অনন্ত কালের জন্যই থাক।
::::::::::;;;;;;;;;;;:::::::::::
বিয়ের প্রায় এক মাস কেটে গেল আমাদের কিন্তু ফুফা এখনো সাদিক আর আমার সাথে কথা বলেন না।
একদিন খাবারের টেবিলে রাতের বেলায় ফুফার গলায় ছোট একটা হাড় আটকে যায় । তখন সামনে ফুফি আম্মা বসে ছিলেন আর আমি পাকঘরে।
ফুফার তো প্রায় নিশ্বাস যায় যায় অবস্থা আমি দৌড়ে গিয়ে উনার পিঠে জোরে চাপড় দিতেই হাড় টা বেড়িয়ে পড়লো। ফুফা -ফুফি দুজনেই বেশ ভয় পেয়েছিল, পরে আমি উনাকে পানি দিলাম এক গ্লাস।উনি পানি টা খেয়ে আমার দিকে তাকালেন তবে কিছু না বলেই চলে গেলেন।
:::::::::::::
এর মধ্যে অনেকেই আমায় দেখতে আসতো।কিন্তু নতুন বউ দেখার গিফ্ট হিসেবে আমি পেতাম এক গাল মন্দ কথা।কেউ কেউ আমার শ্বাশুড়ি কে আমার আড়াল হওয়ার সাথে সাথেই বলতো
----ছেলে না হয় জেদ করেছে,তাই বলে কী এনে দিতে হবে? তুই ও একটু জেদ করলে হয়ে যেত রে জোহরা। বড্ড ভুল করেছিস।
অনেকেই তো পরামর্শ দিতো বছর দু-এক পর ছেলে আর বউ কে বুঝিয়ে আরেকটা বিয়ে করিয়ে দিতে।নাতি -পতি ছাড়া জীবন যায় নাকি?
যে কারণে আমি এতো বছর এড়িয়ে চলতাম সবকিছু কে ধীরেধীরে ওগুলো আবার আমাকে গ্রাস করছে।নিজেকে আমি কোনভাবেই ঠিক রাখতে পারছিলাম না।
এর মধ্যেই আবার উপস্থিত হলো রাইহান আর তার মা।রীতি এবার আসেনি রাগ করে।
তার মা ও অনুষ্ঠানে আসেনি। আমাকে দেখেই তিনি বলল
----ভাবী! আমার রীতি কী ওর চাইতে কোনো দিকে কম নাকি? বরং এই মেয়ে তো বন্ধ্যা।
---ফুফি উনাকে বারণ করলেন। কিন্তু আমার মন খারাপ হয়ে গেল।
নিজেকে কোনো ভাবেই এখানে মানিয়ে নিতে পারছিনা।কিছুই ভাল লাগছেনা বিষণ্ণতা আমাকে জেঁকে ধরেছে।আস্তে আস্তে আমি সাদিক থেকেও মানুষিক ভাবে দূরে সড়ে যাচ্ছিলাম। সাদিক এখন অফিসে ব্যস্ত থাকে আর ও আসলে আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখি।
একদিন সাদিক আমাকে প্রশ্ন করলো
---চলো বারান্দায় বসি?
---তোমার ইচ্ছে হলে তুমি যাও।
ও আদর করে বলল
---একা যাব?ভাল লাগে না তো।
আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম
---লাগলে আর কাউকে নিয়ে এসো।
সাদিক রেগে গিয়ে পাশ থেকে চলে গেল আমার।আমি কেনো এমন করছি নিজেও জানিনা।বুঝলাম বিয়ে তো একদিন আমার হয়ে যেতোই কিন্তু আমার আসল পরীক্ষা তো এই সংসার টিকানো।