আমার প্রিয়তা

পর্ব - ৩৫

🟢

ছাদে আমি ছাড়া কেউ নেই। ইফাদ কে হয়তো সাদিক পঠিয়ে দিয়েছিল, কতক্ষণ নিজের মতো করে কাঁদলাম।মনটা হালকা করে চলে গেলাম নিচে।

ভেবেছি ভালই হলো রাগ করে চলে গেছে,,,,

জ্বালাবে না অন্তত কয়েকদিন কিন্তু ঐ যে সুখ কপালে সই না।

পরেরদিন খালা আর লাবিনা এলো। আমাকে দেখে তাদের সাথে যেতে জোর করলো।আমিও রাজি হয়ে গেলাম খালু ও বিদেশ থাকে ঘরে ওরা দু ভাই বোন ছাড়া আর কেউ নেই।

ভাবলাম ঘরে থাকলে মা-বাবা টেনশন দিবে আর তাছাড়া কবে আর যাওয়া হয় তাই চলে গেলাম ওদের বাসায়।

কোনভাবে একদিন কাটলো পরেরদিন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। সকাল টা কেও সন্ধ্যা লাগছে দেখতে।লাবিনা বলল

----চলো ছাদে যায়, বৃষ্টিতে ভিজি?

----আচ্ছা! তবে আমি না তুই ভিজবি।

---ঠিকাছে।

ঝুম বৃষ্টি আমি দাঁড়িয়ে আছি লাবিনা ভিজছে, কেন যেন সাদিক কে মনে পড়ে গেল।

ওর সেই বৃষ্টি ভেজা শরীর, হঠাৎ আমিও চলে গেলাম ভিজতে।চোখ দুটো খোলা রেখে মুখে পানির স্পর্শ পেতে বড়ই ভাল লাগে।কখনো না ভেজা আমি কী যে হয়ে গেল আজ। ছেলেটা নিজেও পাগল, আমাকে ও পাগল করেছে।

::::::::::::::::::

নিচে নেমে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছি।মনে মনে বকছি কী দরকার ছিল এই ঠান্ডা পানিতে ভেজার উফ।

লাবিনা এসে বলল

---আপু? ঘর থেকে কল এসেছে।

মোবাইল টা কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই চুপ হয়ে আছে দেখি।

আমি ও বুঝতে পারছিনা কে? কারণ কোন শব্দ নেই ওপাশে।

হ্যালো হ্যালো করে একটু পর মনের গভীর থেকে অনুভব করলাম এটা সাদিক।

ফোন রেখে দিলাম, চুপিচুপি আমার কন্ঠ শুনতে চাই সে।লাবিনা কে বললাম

----সাদিক ফোন করলে দিবি না আমাকে।

----কেন? রাগ করেছো নাকি?

---হুম।

লাবিনা একটু হেসে চলে গেল।

খাওয়ার টেবিলে বসলাম সবাই চুপচাপ খেয়ে নিলাম,সময় যেন কাটছেই না।

একটা ইসলামীক বই নিয়ে পড়তে বসলাম মাগরিব এর পর।

বাইরে আবার বৃষ্টি নেমেছে তাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু পর খেয়াল করলাম রাস্তায় কেউ পাইচারী করছে একটু পর পর উপরে তাকাচ্ছে।আমিও একটু ভাল করে দেখতে চাইলাম কে সে?

হালকা আলোর ছটায় চোখে পড়লো সেই চিরচেনা অবয়ব।আমি বারান্দার গ্রীল আঁকড়ে ধরলাম আরো ভাল করে দেখার জন্য

----পাগল টা এখানে ভিজছে কেন?ডাকতে গিয়ে মনে পড়লো, না ওর সাথে আমি কথা বলিনা।পেছন ফিরে গেলাম ততক্ষণ এ ও আমাকে দেখে ফেলেছে।

আমি নিষ্ঠুর হয়ে রুমে চলে এলাম।হাতে বই নিয়ে আবার বসে পড়েছি কিন্তু একটা লাইন ও যেন পড়তে পারছিনা,মন টা বাইরেই রয়ে গেছে।এইবার ভাবলাম আরেকবার দেখে আসি, তবে লুকিয়ে দেখলাম ও এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

কী এই ছেলে,এত জেদি কেন?আমি একটু শান্তি চাই তাও দিচ্ছে না।

লাবিনা কে বললাম

----প্লিজ ওকে না ভিজে, চলে যেতে বল।

---আপু তুমিই বলে দাও।

---না,পারব না আমি, তুই যা।

---আচ্ছা।

বই পড়া কালীন নজরে পড়লো।

"""আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।(সূরা আল আরাফ: ১৯৯)""

হাই আল্লাহ আমি ওর উপর রাগ করে আছি ওকারণেই।ওর তো কোনো দোষ নেই, ও আমাকে পছন্দ করে আর আমিও তো করতাম।তাহলে

কেন?কেন আমি ওকে এমন বললাম।

"অতন্ত ক্রোধ পরায়ণ ব্যাক্তি আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক অপ্রিয়(-আল হাদিস)"

সত্যিই রাগ মানুষকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়, আর শয়তান, এর সুযোগ নিয়ে নেয়।

লাবিনা এসে বলল

---ভাইয়া চলে গিয়েছে,,,,,

---কিছু বলেছে?

---না আপু।

আমি লাবিনা থেকে ফোন নিয়ে কল করলাম কিন্তু সাদিক এর মোবাইল অফ পেলাম। হয়তো ভেজার কারণে অফ করে রেখেছে, কাল কথা বলবো।

::::::::::::::

পরেরদিন সকালে ফুফি কল দিলো

----সুবাহ? সাদিক কী তোর সাথে আছে?

---না আম্মা। কেন? অফিসে যায়নি আজ?

----কই ও তো কাল রাত থেকেই ঘরে আসেনি। এতবার ফোন করেছি তোদের দুজনকেই, কিন্তু মোবাইল বন্ধ পেয়েছি।

----ঘ,,ঘরে ফিরে নি! কিন্তু ও তো চলে গিয়েছিল,,,,

আমি আমতা আমতা করছিলাম আপন মনে।

ফুফি বলল

----অফিসেও যায়নি ফোন করেছিলাম।তোর সাথে দেখা করবে বলেছিল গতকাল বিকেলে। এরপর তো আর ফিরলো না।

ফোন রেখে দিতেই মাথাটা চক্কর মেরে উঠলো। কোথায় হতে পারে ও? বাসায় কেন গেল না?

আমি খালা কে বললাম আমার এক্ষণি বাসায় যেতে হবে।

গাড়িতে অস্থির লাগছিল

ও এতো ইরেস্পন্সিবল তো নয়। কোনো বিপদ হয়নি তো?

এতো ভয় আগে কখনো লাগেনি দুটো দিন ছেলেটা শান্তিতে থাকতে দিলো না।

এবার পেলে আমি ওকে,,,,,,,,,,

বাসায় পৌছে গেলাম,ফুফি আম্মা কাঁদতে বসেছে উনাকে ঘিরে আছে বাকিরা।

আমাকে দেখে বলল

----সুবাহ? তুই এসে গেছিস?আমার ছেলেটা কে একটু খুঁজে দে না।আল্লাহ ওকে ভাল রাখবে আমি জানি।

---আম্মা! একটু শান্ত হোন।ওকে পেয়ে নিই একবার! আপনি খুব বকে দিয়েন।

ফুফিকে কী শ্বান্তনা দিব, আমি নিজেই অস্থির হয়ে আছি। কান্না লুকিয়ে রেখেছি বহু কষ্টে।

চুপচাপ সামনে বসে ভাবছি কোথায় হতে পারে ও।

অন্যরা বন্ধুবান্ধব দের ফোন করে খবর নিচ্ছে।হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো, আমি ফুফিকে বললাম

----আমি একটু আসছি।

ফুফি কেঁদে কেঁদে বলল

----তুই আবার কোথায় যাচ্ছিস?

---ওকে আনতে।

এখানেই আছে একটু ভরষা করুন।

ফুফি শুধু মাথা নাড়ালেন।

আমি তাড়াতাড়ি চলে গেলাম আমাদের বাসার ছাদে,,,,,,,,

যেটা ভেবেছিলাম সেটাই, জনাব শুয়ে আছে সেখানে।

আমি পাশে গিয়ে বসলাম,

হা করে ঘুমাচ্ছে সে,আমি জোরে জোরে বললাম

----ঘর বাড়ী কী নেই?নাকি মাথা উলটে গেছে ঝড়ের বাতাসে?

ও একটু নড়ে উঠলো তারপর আস্তে আস্তে আস্তে চোখ টেনে টেনে দেখছে

----এই আলো তে ঘুমাচ্ছো কীভাবে?

আমি ভেবেছি উঠে বসবে কিন্তু না জনাব উল্টো আমার কোলের উপরেই মাথা রেখে আবার চোখ বন্ধ করে রইলো।

আমি হাত দিয়ে আস্তে করে ঠাস ঠাস করে দু গালে বসিয়ে দিলাম।এবার হুশ ফিরলো লাফিয়ে উঠে বসলো তাড়াতাড়ি।

ঠোট উলটে বলল

---মারছো কেন?

---এখানে এসে বসে আছো কেন?আম্মা বাসায় কাঁদছে তোমাকে না পেয়ে।

---বেশ করেছি।

---যাও এখান থেকে? আমাদের ছাদে কেন এলে?তোমাদের ছাদ নেই?

---উহু।

---উঠো এখন।

দেখলাম ও মিটমিট করে হাসছে আর আমার ওড়না ধরে পেছন পেছন নামছে। আমি তো রেগে আগুন।

আমার ঘরের মানুষরা ওকে দেখে অবাক।কাউকে কিছু না বলে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলাম ওদের বাসায়।

ফুফি কী করেছে জানিনা ওকে।

আমি সোজা পাকঘরে গিয়ে খাবার নিয়ে উপরে উঠে গেলাম।

সাদিক একটু পর মুখ ঝুলিয়ে রুমে এলো। বুঝলাম বেশ বকা খেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমার সামনে এসে বসলো বিছানায়।

আমি বললাম

---কিছু খেয়েছিলে?

না সূচক মাথা নাড়ালো।

----রাত থেকে?

---না বিকেল থেকে।

---কেন?

---তুমি নেই বলে।

আমি বলতে গিয়েও আর বললাম না কিছু।

সামনে প্লেট টা ধরে বললাম খেয়ে নাও

----পারব না।

--কেন?

---ইচ্ছে নেই।

আমি খাবার মেখে মুখে তুলে দিলাম,,,,,,খাওয়া শেষে।

ও আমার হাত দুটো ধরে বলল

----তুমি আমাকে ভালবাসো না?

---না।

---আমি সত্যিই দূরে চলে যাব।

---যাও।

---একা তো যাব না।

---তাহলে???

---তোমাকে সংগে নিয়েই যাব।ওখানে কথা না বললে বলো না কিন্তু চোখের আড়াল হতে পারবে না।

---কেন পারব না?

----কারণ যত দূরেই থাকো রবে আমার ই।

---হারিয়ে যেয়ো না, কখনো তুমি?

----হাহাহাহা,,,,,

---হাহাহ।

হাসতে হাসতে যেন কেঁদে দিলাম দুজনই ও আমার কপালে কপাল রেখে বলল।

----ঝগড়াটে একটা।

--তুমি।

---উহু তুমি।

তারপর একজন আরেকজন এর চোখের পানি মুছে দিলাম।সাদিক বলল

----আমি সব ঠিক করে ফেলেছি ব্যাস আর কিছুদিন পরেই আমরা হল্যান্ড শিফ্ট হচ্ছি।

----আমরা মানে?

---তুমিও। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি, এতদিন এটার জন্যই চেষ্টা করছিলাম,ভেবেছিলাম আমি যাওয়ার একমাস পর তোমাকে নিয়ে যাব কিন্তু না তোমাকে ছাড়া একদিন ও ভাল লাগে না আমার।এখানে রেখেও যেতে পারব না।

---আচ্ছা?

---আর সেই তুমি কী না! আমাকে ছেড়ে এভাবে থাকতে পারলে?

---থাকতে পেরেছি? কই ভাল তো ছিলাম না।

----বলেছিলাম না দূরে না যেতে? ভেবেছিলাম সেদিন ছাদে গিয়েই একটা থাপ্পড় দিব তোমাকে কিন্তু আমি যে তোমার কাছে হেরে যাই সেটা কী তুমি বুঝো?

---কেন? তুমি না এংরি ইয়াং ম্যান।

---হুম সে কেবল দুনিয়ার জন্য।

---তাই নাকি?ঠিকাছে আমি কাউকে বলব না এটা।

---আচ্ছা! আমিও কাউকে বলবো না তুমি যে ঝগড়া টে।

---কি,,,,

তারপর আবার মারামারি করলাম কিছুক্ষণ।

------------------+++---------------

পাতা উলটে দেখলো নাবা।

আর লিখা নেই।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাবা ডায়েরী টা হাতে নিয়ে সুবহার রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

গিয়েই দেখে একটা লোক তড়িঘড়ি করে চারপাশে কী যেন খুঁজছে।

নাবা বলল

----বাপি কী খুঁজছো?

লোকটা চমকে গিয়ে ওর দিকে ফিরলো

----উফ! আমি ভেবেছি এসে গেছে ও।

---কে তোমার প্রিয়তা?

---হ্যাঁ।

---বাপি আমি না বলতাম সাদিকের সাথে সুবাহ মানায় তুমি প্রিয়তা কেন ডাকো? কিন্তু আজ বলবো, তুমি তাকে আজীবন প্রিয়তায় ডেকো।

লোকটা বলল

----আমি জানি। সুবাহসাদিকের প্রিয়তা।

---আচ্ছা কী করছিলে?সব কেন উলোট পালোট করছো?

----সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য।

---বুইড়া এখনো মেরেজ ডে পালন করো?

---হ্যাঁ।

---তা কাল আর কী, মনে আছে?

সাদিক ভুলে যাওয়ার ভান করে বলল

----তোমার জন্মদিন?

---বাহ কীভাবে মনে করলে এবার?

----আমি কখনোই ভুলিনি দুষ্টুমি করি তোমার সাথে।

---আচ্ছা আক্দ এর দিন বেগুনী পাঞ্জাবী কেন পড়েছিলে?

---তোমার ফুপুর সাথে ম্যাচিং করার জন্যে ইফাদ কে চুপিসারে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

---ও আচ্ছা!হাউ রোমান্টিক।

নাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল

----তোমরা এতো আলাদা কেন?তুমি তো একটা হিরো বাপি। যাই হোক অপি (সুবাহ) কই?

----ও তো "আলোর ঘরে "গেছে।ঐ টাই তো ওর প্রিয় ঘর, আমাকে সময় দেয় নাকি তোর ফুপু।

----ওহ! এতিম খানায়! "তুমি ডিসার্ভ করো এটাই।"

---তাই নাকি?

---ফিরবে কখন?

---একটু পর হয়তো।তুমি কী এখন চলে যাবে?

----না,আহিল আর আমাকে ইফাদ চাচু নিতে আসবে।

---আর ক' টা দিন থেকে যাও মা।

---তোমরা কাল আমাদের বাসায় চলে আসবে বাপি।আমি আর কেন থাকবো?

---তা তো আসতেই হয় পঁচিশ বছরের সংসার হবে "সিলভার জুবিলী "আমাদের।

----ভুলে যেওনা আমার তেইশ তম জন্মদিনও কিন্তু।

---হাহাহা,,,

সুবাহ এসে বলল

----কীসের এত জন্মদিন হ্যা?এটা কোনো মজার বিষয় হলো,খালি বয়স টা বাড়তে থাকে।

---অপি এসে গেছো?

---কই নাতো,,,,,

---উফ! তুমিও না বাপির সাথে থেকে দুষ্ট হয়ে গেছো।

সুবাহ হেসে বলল, মা আগামীকাল ও খাবারের আয়োজন করেছে তাই না? আজই চলে যাবি?

----জানোই তো অপি দাদী মা খুশি হয়।কিছু মানুষ একটু ভাল খাবার খেতে পেলে খারাপ কী?তাই আমিও খুশি।

---অপি এত লাভিং, কেয়ারিং মানুষ কীভাবে পেয়ে গেলে?

----আল্লাহ তালা ই তো বলেছেন:

"ওয়া খালাকনা-কুম আঝওয়া-জা-

অর্থ:আমি তোমাদেরকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি,(সূরা আন নাবা : ৮)""।

----ইউ আর রাইট! আচ্ছা একটা বাচ্চা দত্তক নিলেই তো পারতে।

সুবাহ কাজের ফাঁকেফাঁকে বলল

---সাদিক কখনো চাইনি।ওর একটাই কথা, কিছু চাওয়া অপূর্ণ থাকায় ভাল।

---হুম।

----তাতে কী ও আমার ইচ্ছে তো পূরণ করেছে,,,আমার গড়া "আলোর ঘরে" ত্রিশ টার বেশি বাচ্চা আছে।ওরা সবাই আমার আপন।

----তুমি বিদেশ থেকে চলে এলে কেন?

----নিজের দেশেরটান এ।

নাবা তার অপি সুবাহ কে জড়িয়ে ধরলো,আর মনে কারো স্বপ্ন বুনতে শুরু করলো।

বিজ্ঞাপন
আমার প্রিয়তা গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও জাগরনী গল্প