কদম ফুল গুলো আমার টেবিলেই সাজানো রয়েছে।
দুইদিন পর,,,
আমি মা কে বললাম তুমি কখন তৈরি হবে? ভাইয়ার আক্দ আজ আর তুমি এখনো পুরানো কাপড় পড়ে বসে আছো।
মা বলল
----আমি কেন তৈরি হব?আমি কি মেয়ের বাড়ি যাব নাকি?আর আক্দ হবে মসজিদে।
---হ্যা কিন্তু ঘরে মেহমান আসছে ভাইয়া কে হলুদ এর গোসল দিতে হবে তারপর মসজিদে পাঠাতে হবে কত কাজ।আজকের দিনে আলসেমি করো না নতুন একটা শাড়ি পরে নাও।
----আচ্ছা যাচ্ছি।
মা কে পঠিয়ে এবার গেলাম ভাইয়ার কাছে
---ভাইয়া কই তুমি তোমাকে নিচে ডাকছে সবাই।
ভাইয়া বলল
---এসব মেয়েলি কাজ আমি করছিনা তাছাড়া এসব ধর্মের কোথায় আছে??
----নেই শুধু আমি আর মা তোমাকে হলুদ মাখাবো ঠিকাছে?
---আরেহ আমি কেন হলুদ মাখবো?
আমি দুষ্টু হেসে বললাম
---ওমা কি আর সুন্দর লাগার জন্য।
চলো তো তাড়াতাড়ি তোমার জন্য পাড়া পড়শি অপেক্ষা করছে।
----সুবাহ ম্যাডাম সামনে কিন্তু আপনার পালা,,,তখন দেখে নিব।
ভাইয়ার কথা শুনে বুকটা ধপ করে উঠলো
একটু নিচু গলায় বললাম
----সে জন্যই তো তোমার টা তে কোন কমতি রাখবো না, আমার অনেক দিনের আশা।
----আশা পূরণের গল্প শেষ হলে শোন, আমি তো মসজিদে চলে যাব সব মেয়েদের নিয়ে তৈরি হয়ে থাকিস ফিরে এসে যেন দেরি না হয়।
----ঠিকাছে যাও এবার।
ভাইয়া নিচে চলে গেল আর আমি ওর বিছানা গুছিয়ে দিলাম দরজা লক করে নিচে নামার সময় ভাবলাম
বিয়ের কথা বললেই যেন আর ভাল লাগেনা কিছু। খুব ভয় হয় অজানা ভয়, ডাক্তার সাহেবের কথা মনেই পড়েনা আমার কি এক অদ্ভুত ব্যাপার যার কথা মনে পড়ে তার সাথে কোন সম্ভাবনায় নেই।
যাক এসব ভেবে কাজ নেই,,,,,,
নিচে চলে গেলাম দেখি ভাইয়াকে মাঝখানে বসিয়ে সবাই আনন্দ করছে মুখে কি যেন বলি গাইছে আমাকে ডেকে হাতে রাখি পড়িয়ে দিতে বলল,,,
তারপর হলুদ আর চন্দন মিশ্রিত পেস্ট লাগিয়ে দিলাম সব ভাবিরা ভাইয়া কে মজা করে ভয় দেখাচ্ছে বউ আসলে আর স্বাধীনতা নেই এসব নিয়ে এরপর ভাইয়া গোসলে চলে গেল।
আমার কেন যেন কান্না পাচ্ছিল শুভ্র পাঞ্জাবি ক্রিম রং এর কোটি পড়ে ভাইয়াকে একেবারে নতুন নতুন লাগছে।
আমি টুপি টা মাথায় পড়িয়ে দিয়ে ফিআমানিল্লাহ বলে ভাইয়া কে বিদায় দিলাম। ঘর ভর্তি মানুষ আর সবাই গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে ওদের যাওয়া দেখছে সেই মানুষের ভীরে যেন আমি হাড়িয়ে যাচ্ছি কোথাও কারণ এত ভীরের ফাঁকে আমি এমন একজন কে দেখতে পাচ্ছি যাকে ছাড়া আপাতত সব আউট অব ফোকাস হয়ে গেছে।বটল গ্রীন পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা, সাদা টুপি পড়া সাদিক ।পুরুষরা সবাই বাইরে হাইএস গাড়িতে উঠছে আর মহিলারা ঠালাঠেলি করছে ঘরের ভেতরেই।
গাড়ি ছেড়ে দিল আর আমি এখনও সেখানেই রয়ে গেছি, লুবনার ডাকে চেতনা ফিরল।
লুবনা, লাবিনা আরও অনেক খালাতো ভাই বোন এসেছে কারণ আক্দ শেষে আমরা দিপ্তি কে দেখতে যাব ভাইয়ার সাথে।
শুধু কিছু চাচাতো ভাই এর বউ, আমরা কাজিনরা আর বড়রা বাদ।
বড়রা যাবেনা এই কারণে লুবনা,লাবিনা,মনি,মুক্তা সবাই অনেক খুশি।
মাগরিব এর পর ভাইয়ারা ফিরে এলো আক্দ সম্পন্ন করে আর আমরা তৈরি হয়ে বসে আছি।
এমন সময় আমি নিজেকে আড়াল করে ফেললাম আজ অনেকদিন পর হাল্কা সেজেছি, বেগুনি জামার সাথে হিজাব পড়েছি আপাতত মুখের কাপড় টা নিচে নামানো কিন্তু খুব লজ্জা লাগছে কেন জানিনা।ভাইয়া আমাকে দেখে বলল
---মাশা আল্লাহ তোকে বেশ ভাল লাগছে।
----জাযাকাল্লাহু খাইরান।
----আর হ্যা বেচারা ডাক্তার সাহেব মিস করলো এত বড় সুযোগ তাই না?
----ভালই হল ভাইয়্যা না হয় আমি অস্বস্তিতে ভুগতাম।
---বোকা! এই যুগে মানুষ হবুদের কে জানার জন্য ফেইসবুক এ চ্যাট করে আর তুই কিনা কিসে ভুগছিস।জীবন কাটাবার আগে এক আধটু জানতে পারলে মন্দ কি?
----তোমার বউ থেকে জেনে নিও ও আমার চাইতে ভাল জানে।
:
আমরা গাড়িতে বসে পড়লাম দিপ্তিদের বাসায় যাচ্ছি আজ থেকে ও আমার ভাবি ভাবতেই ভাল লাগছে।
ড্রাইভার এর পাশের সিট এ সাদিক বসেছে আর আমরা কয়েকজন মেয়ে প্রথম শারি তে ভাইয়ারা মাঝখানে।
আমি জানালার বাইরে দেখছি ফ্লাইওভার টাতে ভীষণ ভাল লাগে অন্ধকার এ রাস্তার সোডিয়াম লাইট এর আলো আর নিজের ভাবনার ভেতর মগ্ন হয়ে আছি সবাই টুকিটাকি কথা বলছে কিন্তু আমার ভাল লাগছে চুপচাপ থাকতে।
সাদিক এর দিকে একটু একটু দেখলাম তবে কেবল তার উপস্থিতি টা কেই শরীর এর দিকে নয়।
"" আমি রুমে বসে আছি সুন্দর বউ সেজে অপেক্ষার চেয়েও বেশি ভয় লাগছে এই বুঝি এহতেশাম আসবে,মনে মনে অনেক কথা কিন্তু শুরুতে আমি কি বলব তাকে?লজ্জা লাগছে ভীষণ,,,,,,
এমন সময় দরজা খুললেন কেউ আমি ভয়ে আরও গুটিয়ে ঠিক বাচ্চাদের মত চোখ বন্ধ করে নিজেকে লুকাতে চাইলাম কিন্তু একটুপরে ও কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে চোখ খুললাম মাথাটা তুলিনি এমন সময় সে তার হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাত চাইলো আমি হাতে হাত রাখতেই উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে পেছনের দরজা খুলে বারান্দায় নিয়ে গেল।আমি অবাক হয়ে সুন্দর প্রকৃতি দেখছিলাম এমন সময় আমার সামনে সে একগুচ্ছ কদম ফুল ধরল।
আমি ঠোঁটে হাসি এনে তার দিকে তাকালাম একি সাদিক কেন?
আমি বললাম তুমি???
সে হঠাৎ মুখ কে কঠিন করে ফেলল হয়ত পছন্দ হয়নি প্রশ্ন!
রাগ করে বলল
-----ও আমাকে দেখে ভাল লাগেনি না? আমি তো কাঁটাবন তাই না? গায়ে লাগলেই ফালা হয়ে যাবি।
হঠাৎ চমকে উঠলাম ডাকে, এত গভীর ভাবনায় চলে গিয়েছিলাম গাড়ি কখন থেমেছে জানিনা শুধু তাই ই না সবাই নেমেও গেছে ভাইয়্যা আমাকে ডাকছে।
----কিরে তোর কি শরীর খারাপ নাকি?
আমি আমতা আমতা করে বললাম
----না,না সবাই কে নামার সুযোগ দিচ্ছিলাম।
গাড়ি থেকে নেমে দেখি সাদিক হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে হয়ত আমার কান্ড দেখছিল।
ভাইয়ার সাথে সাথে পা মিলালাম কিন্তু বার কয়েক সাদিক এর দিকে তাকালাম।ভাবছি কি অদ্ভুত ভাবনা এই ছেলে কল্পনাতেও আমাকে ধমকাচ্ছে।
ওর সাথে আসলেই আমার কখনওই যাবে না। বাস্তবে যদি এমন টা হয় হয়ত আমরা মারামারি থেকে কাটাকাটি পর্যায়ে পৌছে যাব।
ডাক্তার সাহেব কত নম্রসুরে কথা বলে ভাগ্যিস বিয়েটা তার সাথেই হচ্ছে।
আমার আজেবাজে ভাবনার ইতি টেনে নতুন ভাবির সাথে দেখা করলাম, ছবি তুললাম তারপর ভাইয়া আর ভাবি কে আংটি বদল করালাম, মালা পড়ালাম তারপর একে অপরকে মিষ্টি মুখ করিয়ে আমরা কিচ্ছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম।রুনা খালামনি অনেক আদর করলেন আমাদের যেহেতু আগে থেকেই পরিচিত তাই সবকিছুই আনন্দের সাথে শুরু হল।তারপর রাতে খাওয়া দাওয়া সেড়ে সবাই আবার রওণা দিলাম নিজ বাড়িতে।
তিন দিন পর আমি পড়ার টেবিলে বসে আছি লুবনা ও আছে আমার পাশে ও গান শুনছিল বসে।
আমাকে মৃদু হাসতে দেখে বলল
----কি হয়েছে আপু হাসছো যে?
----ভাল লেগেছে একটা ব্যাপার তাই।
----কি জিনিস আমাকে একটু বল না।
---আচ্ছা শোন একজন নারী লিখেছেন তার বাবা বিয়ের সময় মোহরানা হিসেবে তার মাকে সূরা আল ইমরান মুখস্ত করে সবার সামনে তিলাওয়াত করে শুনিয়েছিল ঠিক মেয়েটির হবু বর যখন তাকে প্রোপজ করে তখন তার বাবা সেই পাত্র কে বলেছিল কোরআন এর একটি সূরা যেন তার মেয়েকে মোহরানা হিসেবে দেয় আর যেদিন সে তা পারবে ঐ দিনই তার মেয়ের সাথে ছেলেটিকে বিয়ে দেবে।তখন মেয়েটি তার মোহর হিসেবে সূরা নূর বেছে নিয়েছিল।
----কি বলো তারপর?
----তারপর তাদের বিয়ের যখন আয়োজন হচ্ছিল মাসখানেক ধরে সবাই ব্যস্ত কিন্তু তার হবু বর হাত থেকে কোরআন রাখেনি। ঠিক একমাস কিছুদিন পর তার হবু বর সবার সামনে খুব সুন্দর করে সূরা নূর তিলাওয়াত করেন এবং সেদিনই তাদের বিয়ে হয়ে যায় মেয়েটির নাম '"হিবা আম্মার"" সে তার বিয়েতে কোন রকম পয়সা, গহনা না নিয়ে আল্লাহর কালাম নিয়েছিলেন তার স্বামীর কাছ থেকে ওয়াদা হিসেবে।
----বাহ এমনটা হয় বুঝি?
---হ্যা হয়। ইচ্ছা থাকলেই করা যায় এমন।
---তুমি কি এমন কিছু চাও নাকি আপু?
আমি মুচকি হেসে বললাম
----একটা ইচ্ছে তো আছে বাবা কে বলব আমার দেন মোহর যেন স্বল্প টাকার হয় যা সহজেই দেওয়া যায় কারণ এত লাখ লাখ টাকার দেনমোহর কখনও কারও দাম্পত্য জীবনে সুখ আনতে পারেনা,আর যদি কেউ মোহর দিতে না পারার কারণে স্ত্রী কে ছাড়তে নাই বা পারে তাতে ও কি কোন সার্থকতা আছে?
আর এই লিখা টা পড়ে মনে একটা ইচ্ছা জেগেছে আমি চাই আমার স্বামী আমাকে কোরআন থেকে সুন্দর একটা সূরা মুখস্ত করে উপহার দিক আর এটাই আমার জন্য প্রকৃত উপহার হবে।আমিই এর মাধ্যমে তার দেনা মাফ করে দিব।
----বাহ্ চমৎকার বলেছ,তবে ডাক্তার সাহেব কি জানে?
---না, উনার সাথে আমার খুব বেশি কথা হয়নি তাই জানাতে পারিনি।
তবে এটা আমার শর্ত নই শখ।
----হাই তোমার শখ।।
আমি লুবনা কে চাপড় দিয়ে বললাম চুপ একদম।
---আপু লজ্জা পেলে?হাহাহা।
আচ্ছা আপু একটা কথা জিজ্ঞেস করি তোমার কাছে?
আমি ব্যস্ততা দেখিয়ে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে বললাম
-- কি?
----তোমার কি অনেক খারাপ লেগেছিল ঐ মানুষটার জন্য?যার সাথে বিয়েটা হয়নি।
----না লাগেনি।
লুবনা অবাক হয়ে বলল
----কেন?
কারণ আমি জানতাম একটা আয়াত
""আমি তোমাদের কে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি(আন-নাবা:-৮)""
সুতরাং নিশ্চয় আমার জন্য যাকে ঠিক করা হয়েছে তিনি সে ছিলেন না তাই হয়নি।
----হুম সুবহানআল্লাহ ভাল বলেছ।
আমি বললাম আচ্ছা হয়েছে এবার চল ইফাদ এর পড়ার সময় হয়ে গেছে নিচে চলে যায়।
---ঠিকাছে।
রাতে মা আমাকে মিষ্টি আর কিছু খাবার নিয়ে ফুফির বাসায় পাঠালেন মানে সাদিক দের বাসায়।
আমি লুবনা কে নিয়ে সব ঘরে দিয়ে এসেছি কিন্তু ওর নাকি আর ভাল লাগছে না আর কল আসছে বার বার এটেন্ড করতে হবে বলে চলে গেল তাই আমি একাই এলাম।
নক করতেই দেখি খুলে গেল সাদিক তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুচছে আর দরজা খুলতেই আমাকে খেয়াল না করে হয়ত চলে যাচ্ছিল আবার হুট করে দাঁড়িয়ে গেল।
একটু অবাক হলো, আমি বললাম ফুফি আছে?
ও একটু বাকা হেসে বলল,,,
----আমি তো ভাবলাম চাঁদ আজ উল্টো উঠেছে,,,
আমি চোখ এদিকওদিক করে কিছুই না বুঝতে পেরে বললাম
----চাঁদ সোজা কোনদিকে উঠে??
----গাধী,,,, উঠে উঠে বুঝবেনা।
হোয়াট,,,!!গাধী তাও আমি মনেমনে খুব অবাক হলাম তারপর বললাম
---মানে??
----মানে আমি ভেবেছি কেউ আল্লাহর নামে কিছু চাইতে এসেছে থালা নিয়ে।
মুখ টিপে হাসলো তারপর আবার বলল
---এখন দেখি কেউ দিতে এসেছে,,,,,
আমি হা হয়ে গেলাম রেগে কিছু বলতে গিয়েও পারলাম না।
ও বলল
----দিতে যখন এসেছ ভেতরে আসতেই পারো।
ফুফি কে ডাকলাম কোন সাড়া না পেয়ে ভেতরে গিয়ে টেবিলে বক্স গুলো রাখলাম,রান্নাঘরে ও পেলাম না।
সাদিক লিভিং রুমে টিভি দেখছে টেবিলে পা তুলে বসে।
ওকে এসে বললাম ফুফি নেই?
----না।
---ঠিকাছে তাহলে আমি যাচ্ছি।
ওর হাতে আপেল ছিল খেতে খেতে বলল
----আমি লক করে দিয়েছি যেতে পারবেনা।
আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম।তারপর বললাম
----আমি যাচ্ছি তাহলে ফুফি কে তুমিই বলে দিও, বক্স গুলো পরে পাঠালে হবে।
----এসেছ নিজের ইচ্ছায় কিন্তু যাওয়া টা নিজের ইচ্ছামত সম্ভব না।
আমি ওর কথায় এবার সত্যিই অবাক হলাম।
চলবে,,,,,
(
আচ্ছা গল্পটা কি বাড়াবো নাকি তাড়াতাড়ি শেষ করে দিব।
yes or No,,,,,,,প্লিজ জানাবেন কমেন্টে।)