বড্ড অস্থিরতায় ভুগছি আমি সাদিক কে এইভাবে দেখার পর। আচ্ছা ও কি একটু বেশিই ভাবছে না আমাকে নিয়ে?
আমাকে নিয়ে কেনই বা ভাবছে?আমার মত মেয়ে কারও সুন্দর পরিবার এর স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনা।আমার মত মেয়ে শুধুই কারও প্রয়োজনে ব্যবহার হতে পারে । আমি যে কারও স্বপ্ন নয় কেবল প্রয়োজন হতে পারি এটা কি সে জানেনা?নাকি,,,,,,,
না, না এ হতে পারেনা আমি কিছুতেই এটা হতে দিতে পারিনা,সাদিক এর ভবিষ্যৎ আছে একটা।
পরক্ষণেই আমার আত্মা বলে উঠলো
---তাহলে এহতেশাম এর কি ভবিষ্যৎ নেই??
---হ্যা আছে কিন্তু উনার তো বউ ছিল দুটো বাচ্চা ও আছে।
কিন্তু সাদিক কতদিন শুধু আমাকে নিয়েই কাটাবে? নিশ্চয় একটা সময় ওর আর ভাল লাগবে না আমাকে।
----আর যদি এটাই ওর ইচ্ছা হয়, তুমি কি করবে সুবাহ।
----আমি,,আ আমি ওকে দূরে সরিয়ে দিব।আমি পালাতে চাই ওর থেকে।
----কেন পালাতে চাও? কিসের ভয় তোমার?
----যদি ও আমায় ভালবাসে সে কারণে পালাতে চাই।
আমি ওর যোগ্য নই,এটা ওর বুঝতে হবে।
----আর তোমার? তোমার মনের কি হবে??
---আমার মনে ওর জন্য কিছুই নেই,আমি এহতেশাম কে নিয়েই সুখী থাকব।
----ঠিকাছে তবে তাই হোক।
এক ঝটকায় কল্পনা গুলোয় ছেদ পড়লো।
কি ভাবছি এসব আমি, আমার স্বত্বা কেন লড়াই করছে নিজেদের মধ্যে? বিয়েটা তো আমার মতেই হচ্ছে তবে আজ আমি দুটানায় ভুগছি কেন??
বারান্দায় বসে আছি তার মধ্যে ইফাদ এসে বলল,,, চলো না ভাইয়ার ঘরে।
আমরা ভাইয়ার ঘরে গেলাম,,,,
আমি বললাম,,,,
ভাইয়া তুমি শুয়ে আছো??
ভাইয়া হঠাৎ বিছানায় পাশ ফিরে বলল
----কেন কি হয়েছে?
----তুমি কিছুই জানো না??
ভাইয়া একটু হতচকিয়ে উঠে বসলো
---বাবা মার কিছু হয়নি তো??
ইফাদ বলল
---না ভাইয়া, হয়েছে তো তোমার।
---আমার? আমার কি হল?
আমি বললাম
ভাইয়া সুসংবাদ আছে,তোমার না,,,,
---কিহ আমার?
---বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
ভাইয়া বলল
----তা পাত্রী কে?
---টপ ক্লাস সুন্দরী।
----কি বলিস তাই বলে কি আমাকে না জানিয়েই ঠিক করবে।
ভাইয়া তুমি তো জানো মায়ের পছন্দ ছিল দিপ্তি কে কিন্তু,,
ভাইয়া একটু চিন্তায় পড়ে গেল।
----কিন্তু কি??ওরা কি রাজি নেই?
---না ভাইয়া, ওরা রাজি আছে কিন্তু মা উল্টে গেছে।
---কেন?
----দিপ্তির চেয়ে ও সুন্দরী পেয়েছে তাই।
ভাইয়া একটু রাগ করে বলল
---সুন্দর দিয়ে কাজ কি? মানুষ টা তো ভাল হতে হবে তাইনা,মা এমন টা করবে আমি কখনো ভাবিনি।
----ভাইয়া তুমি নিজেও হবু ভাবির ছবি দেখলে টাস্কি খাবে।
---আমি??? হতেই পারেনা।
আমরা বললাম
---ঠিকাছে লিভিং রুমের টেবিলে ছবি রাখা আছে দেখে আসতে পারো।
ভাইয়া বিড়বিড় করে নিচে নামলো। লিভিং রুমে গিয়ে উল্টো পিঠে রাখা ছবিটা তুলে নিল।
আমরা পুরো পরিবার দাঁড়িয়ে আছি।ভাইয়া ছবি দেখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
মা কান ধরে বলল
---আমি অনেক খারাপ না??
---তোমরা সবাই মিলে আমার মত একটা নিরীহ কে ???
ভাইয়া কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,,
---যাও আমি খেলবো না।পুরো পরিবার মিলে কি একজন কে বোকা বানায়? এটা কোন কথা হলো???
এখন আমার লজ্জা লাগছেনা??
আমরা একটু চুপ থেকে তারপর একে অন্যের দিকে চেয়ে খিলখিল করে হেসে দিলাম পুরো ঘর মুখরিত হয়ে গেল।
এবার বলি দিপ্তি কে____
দিপ্তি হলো মায়ের বান্ধুবির মেয়ে,সে আমার এক বছর জুনিয়র, মায়াবী মুখ হলদে রঙা রূপসী তার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো খুবই ধার্মিক একটা মেয়ে,ছোট বেলায় প্রায় আসতো কিন্তু বড় হওয়ার পর থেকে আসা বন্ধ করে দিয়েছে একবার এসে ভুলে ক্রমে ভাইয়ার সামনে পরেছিল তাই আর আসেনা।
মা প্রায় ওর গুণগান গাই যার ফলে মেয়েটা ভাইয়ার মনে ধরেছে।মা তার বান্ধুবিকে ও প্রায় বলতো তার মেয়েকে বউ বানাবে তাছাড়া রুনা খালামনি ও আমাদের খুব আদর করে।
দুই তিন আগে মা তার বান্ধুবি কে প্রস্তাব দিলে তিনি ও ভেবে চিনতে আজ খবর পাঠালেন।
তার মতে নিজের প্রিয় বান্ধুবি মেয়ের শ্বাশুড়ি হবে এর চেয়ে ভাল আর কি হয়।
আমরা ও খুব খুশি দিপ্তির মত একটা অমায়িক মেয়ে পেয়ে আর ভাইয়া তো মহাখুশি।
আমার ভাই ও কম কি পড়ালেখা শেষ করে নিজের পছন্দে দুবাই গিয়ে ভাল জব করে সে একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। সে চাইলে কানাডায় যেতে পারতো সেখানে আমার ফুফির পরিবার রয়েছেন কিন্তু ভাইয়া একটা মুসলিম দেশে থাকতে চেয়েছিল।
:
এখন পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ভাইয়ার আক্দ কয়ে যাবে এক সপ্তাহ পর যেহেতু ওকে আবার দেশের বাইরে চলে যেতে হবে তাই আমার বিয়ের পর বউ উঠিয়ে আনা হবে অনুষ্ঠান করে।
আমি রুমে বসে আছি হাতে বানর টা নিয়ে,,,,
----জানি তোর মন ভাল নেই কিন্তু তুই একদিন খুব ভাল থাকবি।
এই বাঁদর থাকবি আমার সাথে সবসময়?
আমার বিয়ের পর ও তোকে আমার সাথে নিয়ে যাব।
বলেই জড়িয়ে ধরলাম ওটা কে।
দুইদিন পর-:-:-
আমার মামাতো বোন লুবনা এসেছে।
ভাইয়ার বিয়ের আগে কিছু শপিং দরকার তাই ওকে বলেছি থেকে যেতে বেশিদিন। লুবনা মাত্র ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ে।
আমার খুব আনন্দ হচ্ছে ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে আমি সবসময় চাইতাম ভাইয়ার বিয়ে আমার আগে হোক তাই হয়ত আল্লাহ ইচ্ছে পূরণ করেছে।
এমন একটা দিন আসবে ভাবিনি মা বাবারা ও খুব খুশি।
[আল্লাহ বলেন -তুমি আস্থা রাখো আমার প্রতি।(আল-ইমরান-১৫৯)]
যারা শুধু আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেন তিনি তাদের নিরাপত্তা দেন।(সূরা-নূর-৫৫)।
এই ভাল কথা গুলোর সাথে খুব মিল পেলাম।
সন্ধ্যার পর। বড় ভাইয়া বলল
--- চল উপড়ে যাই।এই লুবনা তোকে নতুন জায়গায় নিয়ে যাব।
লুবনা খুশি হয়ে বলল
---তাই কোথায় যাব?
----একটু অপেক্ষা কর।
আমি বললাম ভাইয়া আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
---তুই না একটা বুড়ি কোথাও যেতে চাস না,সাদিক যেন কি বলে কুনো ব্যঙ্গ এর ছা।
----ও তো বাঁদর এরকম বলবেই।
----আচ্ছা হয়েছে এবার চল তো।
ভাইয়া আমাকে হাত ধরে টেনে উপড়ে নিয়ে গেল।
দেখলাম খোলা ছাদে উঠছে আমরাও উঠলাম।
লুবনা বলল
বাহ সত্যিই এখানে কোনদিন আসা হয়নি।
হালকা বাতাস আর জোৎস্নায় প্রাণবন্ত হয়ে আছে জায়গাটা।
আমি সেই জায়গায় দাঁড়িয়েছি, সাদিক এর কথা মনে পড়ে গেল।
কিচ্ছুক্ষণ এভাবেই থাকার পর দেখলাম লোহার সিঁড়ি বেয়ে ইফাদ উঠলো আর ওর পেছনে সাদিক উঠে প্রথমে আমাকে খেয়াল করেনি পরে আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
আমি ওকে দেখে তাড়াতাড়ি আবার পেছনে ফিরে ওড়না টা হিজাব এর মত পেঁচিয়ে নিজেকে ঢেকে নিলাম।
লুবনা ওর দিকে এগিয়ে গেল।
সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলল ওরা।
এরপর ভাইয়া বসে সবাই কে ডাকল।
আমরা বসে ভাইয়ার বিদেশের গল্প শুনছিলাম
ভাইয়া বলল,,,
----জানিস বিদেশে একটা কমন সমস্যা হয় তাও দুবাই মুসলিম কান্ট্রি হিসেবে কম হয়,,,,ইউরোপ কান্ট্রিতে
বেশির ভাগ মেয়ে ছেলেদের প্রথমে চেনা মুশকিল তাও আগে সিওর হতে হয় কে ছেলে আর কে মেয়ে।
একটা ঘটনা বলি,
এক বাঙালি পার্কে গিয়ে দেখল দুটো বাচ্চা বেশ ঝগড়া করছে তা দেখে বেটা গেল তাদের ঝগড়া মেটাতে।
বলল----ভাল ছেলেরা এমন মারামারি করেনা।
বাচ্চা গুলো মুখ কুঁচকে বলল
--প্রথমত আমরা ভাল না, দ্বিতীয়ত আমরা ছেলে না।
লোকটা বিষম খেয়ে বলল
-----ঠিকাছে । তা তোমাদের গার্জিয়ান কই?
ওরা এক লোক কে দেখিয়ে দিল
এই ব্যাটা তার কাছে গিয়ে বলল
-----ভাই তাদের মা কেমন পোশাক পড়ালেন মেয়েগুলোকে ছেলের মত লাগছে।
সামনের জন তার কথা শুনে চমকে বলল আরেহ আমিই তো তাদের মা।"
----হাহাহাহাহ,,,,আমরা সবাই হেসে দিলাম।
ইফাদ বলল সাদিক কে উদ্দেশ্য করে ভাইয়া তোমার নিউজ টা তো কাউকে দিলে না।
সাদিক বলল,,,
---কি আশ্চর্য কাউ কে কেন খবর দিতে যাব?তুই কি কাউ কে জানিয়ে সব কাজ করিস নাকি?
ইফাদ বোকাবনে গেল,,,
সাদিক বলল
কাউ এর বাংলা কি?
---গরু।
---গুড।
এতক্ষণে ইফাদ বুঝল সাদিক কি বলেছে।
ইরাম ভাইয়া ইফাদের দিকে তাকিয়ে কতক্ষণ হাসলো।
তারপর ইফাদ বলল
------সাদিক ভাইয়া বিদেশ পারি দিচ্ছে তাও ইউরোপে।
----কি বলিস সত্যি নাকি সাদিক??
আমি সাদিকের দিকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইলাম।
ও মাথাটা তুলে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল।
----হ্যা সত্যি দুইমাস পর চলে যাচ্ছি আমি।
ওর কথা শুনে আমি কি এক্সপ্রেশন দিব বুঝছিনা হাসিও আসছেনা খুশিও দেখাতে পারছিনা।আমার তো খুশি হওয়ার কথা এটাই তো চেয়েছি আমি পালাতে অনেক দূরে পালাতে।
---বাহ খুবই সুসংবাদ তা কোন দেশে যাচ্ছো?
---সাউথ আফ্রিকা, অষ্ট্রেলিয়া,হলেন্ড, ফিনল্যান্ড এগুলোর মধ্যে যে কোন একটা তে।
অফিস থেকে তিন জন কে পাঠানো হবে ছয় মাসের জন্য ট্রেইনিং আছে কে কোন দেশে যাবে জানিনা এখনো।
এরপর দেশে ফিরে আবার অন্য এক জায়গায় পাঠাবে।
লুবনা বলল
----বাহ বেশ মজার চাকরি তো। খালি ঘুরাঘুরি।
----কষ্টও আছে বটে,আপনদের থেকে দূরে গিয়ে যতই সুন্দর জায়গা হোক না কেন তাতে আমার আনন্দ লাগে না। এর চাইতে তো প্রিয়জনকে নিয়ে ছাদে বৃষ্টি দেখা আরও বেশি মজার।
একপলক আমার দিকে তাকাল সে।
আমি হঠাৎ বললাম
-----এমন কি আছে যা মানুষ কে মুহূর্তেই সুখী করতে পারে?
সাদিক ও আমার মত অজান্তে বলে ফেলল
----প্রিয়জনের সাথে গড়া সব প্রিয় মূহুর্ত।