ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরলাম আজ অনেক ক্লান্ত লাগছে প্রেসেন্টেশন ছিল ঘরে ফ্রেশ হয়ে এসে বসতেই মা এলো
----সুবাহ কিরে কেমন গেল তোর প্রেজেন্টেশন?
-----ভাল। এখন একটু ঘুমাবো আমি।
----আচ্ছা ঠিকাছে তবে একটা কথা শোন।
---কি?
----ডাক্তার সাহেব ফোন করেছিলেন বলেছে তোর সাথে একবার কথা বলতে চাই।
কথাটা শুনেই যেন আমার হার্ট বুক থেকে পেটে নেমে এলো।যেমন টা নাগরদোলায় উপর থেকে নিচে নামার সময় হয়।
ভাবলাম কি বলতে চাই উনি? বিয়ের তারিখ কি এই মাসেই ফেলবে?
----কি হল?
--না কিছু না।
----তোকে যে কোন সময় ফোন করতে পারে তোর বাবা বলেছে তুই ভার্সিটিতে আছিস,বিকেলে করতে পারে হয়ত।
:
মনটা বেশ উড়ু উড়ু হয়ে আছে, আমি আর কিছু না ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সন্ধ্যায় ফোন এলো কথা বললাম ডাক্তার সাহেব এর সাথে।
আমি উপরে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি আজ হালকা বাতাস বইছে সবকিছু নীরব।
আমি আকাশের পানে চেয়ে রইলাম।
কারণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাও সুন্নত।
রাসূল(সাঃ) মাঝে মঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।(সূরা বাকারা-১৪৪)।
বড় ভাই এসে কাধে হাত রাখলেন।
---সুবাহ?
---জ্বি ভাইয়া।
---তোর বিয়ে তিন মাস পর ঠিক হয়েছে।
---হুম, ঠিকাছে।
---তবে ডাক্তার সাহেব এর শর্ত বিয়ে খুব সাধাসিধে হবে বাড়িতে আর উনারা বড় করে ওয়ালিমার আয়োজন করবে।
---আচ্ছা।
---আর হ্যা বলেছে আমরা যেন চট্টগ্রাম এর কোন রীতি প্রথা অনুসরণ না করি।(যৌতুক,খাওয়া-দেওয়া, অতিরিক্ত নিয়ম পালন)।
----ভালই হল। আমি এটাই চাইতাম, এসব কালচার এর নামে মেয়ে পক্ষকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
----এসব বন্ধ করা আসলেই জরুরি কত মেয়ের যে প্রাণ হানি হয়েছে এসবের কারণে।
---আসল কথা কি জানো ভাইয়া এসব শুরু করেছে বড় লোকেরা,তারা তাদের আধিখ্যেতা দেখাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত আর গরীব মেয়েদের জীবন শেষ করেছে।তবে সমস্যা হল আমরা কেউই কাউকে ছাড় দেওয়ার নই।মেয়ের বাপ যখন দেই অন্যকে আবার ঠিক সে একই ভাবে আদায় ও করে পরের মেয়ে থেকে।জানিনা কখন এসব বন্ধ হবে, যুগ পাল্টাচ্ছে কিন্তু এসব প্রথা এখনও অটল।আমি ঘৃণা করি এই চলিত প্রথা কে।
---ঠিক বলেছিস সুবাহ। শুরুটা আমাদেরই করতে হবে।
:
মা একটু অসন্তুষ্ট বিছানার চাদর বদলাতে বদলাতে বাবা কে বলছে তিন মাস পর বিয়ে, এত দেরি করার কি দরকার ছিল?
আমি বসে আছি টিভি দেখছি।
বাবা বলল...
----উনি আমেরিকা যাচ্ছে কাজ ফেলে বিয়ে কি করে করবে?
---তারপর ও বিয়েটা যেহেতু ঘরোয়া হবে সেরেই চলে যেত পারতো। (মা)
বাবা হাতের পেপার টা রেখে বলল,,
----দেখো উনি কোন ইমমেচইউর ব্যাক্তি নন,বুঝে শুনেই করছে।
----বুঝলাম কিন্তু আমার ছেলের জন্য চিন্তা করছি আর কি।বিয়েটা হয়ে গেলে ইরাম এর জন্য একটা মেয়ে দেখতাম।
আমি এবার বললাম
----মা এটা তো চাইলে আমরা এখনও দেখতে পারি।
---কিভাবে?
----মা,,,! আমার টা যেহেতু তিন মাস পর ফিক্সড হয়েছে এখন না হয় ভাইয়ার জন্য মেয়ে দেখা শুরু করে দেই। পছন্দ হলে এনগেইজমেন্ট করে রাখবো।
বাবা বলল,,,
---ভেরি ওয়েল সেইড,,,,এটা করাই যাই। দেখলে রাহেলা তোমার মাথায় খালি টেনশন ঘুরে ভাল কোন বুদ্ধি না।
----হয়েছে হাহ।আমি বললেও নিশ্চিত আপনার ভাল লাগতো না,মেয়ে বলেছে তাই এত চমৎকার লেগেছে।
বাবা-মায়ের খুনশুটি দেখে খুব শখ হয় নিজের ও যদি এমন একটা সংসার হত।চাইনা টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি শুধু চাই কারও মূল্যবান সময়।
আমি চার থেকে পাঁচদিন যাবৎ সাদিকের সামনে যাইনি।বিশেষ করে কয়েকদিন আগে আমি নাস্তা বানিয়েছিলাম গ্রিল চিকেন এবং পরোটা উপরে গিয়ে ভাইয়া কে ডাকতে গেলাম আর ভাইয়া কে হাত ধরে টেনে ইফাদ এর রুমে ঢুকে বললাম একটু নিচে আসার জন্য কিন্তু ভাইয়া সাদিক কেও ডাকছিল আর ও আসবেনা বলল।
আমি ইফাদ আর ভাইয়াকে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বললাম
---ভাইয়া এটা আমাদের পারিবারিক নাস্তার সময় শুধুই পরিবার থাকবে বাইরের কেউ নয়।
বাইরের কাউকে তুমি বাইরের মানুষদের সাথেই দাওয়াত দিও।
এমন টা বলে নিচে চলে গেলাম ইচ্ছে করেই গলা বড় করে বলেছি।
আজ মা থেকে শুনলাম সাদিক কয়েকদিন যাবৎ চা -নাস্তা খাইনা দিলে খাবে না বলে ফেরত পাঠাই।
আর কেউ না বুঝলেও আমি ঠিকই বুঝি।
ইফাদ পড়ছে আমি ওর পাশে বসে আছি সন্ধ্যায় সাদিক আজ দুপুরেই চলে গেছে পড়িয়ে।
আমি মাথা টা টেবিলে রেখে হাতে টিপটপ করছিলাম কলমের পেছনের অংশে।
ইফাদ একটু চুপ হয়ে বলল,,
---কি হয়েছে আপু??
তোমার কি মন খারাপ?
---না।
---জানি তোমার বিয়ে হয়ে যাবে আর হয়ত আড়াই মাস আছে, তাই তোমার খারাপ লাগছে সবার জন্য।
----জানিনা।
টেবিলে মাথা টা তুলে একটা বই দেখলাম এটা সাদিকের হাতে দেখেছিলাম হয়ত রেখে গেছে।আমি বইটা হাতে নিয়ে খুলে খুলে দেখছিলাম।
---আপু?
---কি?
----আজকাল না সাদিক ভাইয়ার মন ও খুব খারাপ থাকে।
আমি ওর দিকে তাকাতেই বলল,,,
---জানো আজ খুব অবাক হলাম,ভাইয়া সব সময়ের মত আজও রুমে এসে বসেছিল আমি যখন এসে ভাইয়া কে ডাকলাম কিন্তু তখনও সে মাথা নিচু খুব গভীরতা নিয়ে কিছু ভাবছিল আমি আরেকবার যখন ডাক দিলাম দেখি ও মাথা তুলতেই চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে আবার তাড়িতাড়ি মুছে ফেললো।
আমার মনে হয় ভাইয়া কান্না করছিল।
----কি যে বলিস না। ও কেন কাঁদবে? হয়ত মাথা ব্যাথা কিংবা ঘুম হয়নি।
---- হতেও পারে।
পরেরদিন রাতে আমি বারান্দার লাইট অফ করে দিয়ে রেলিং এর পিলারে হেলান দিয়ে দেওয়ালে পা তুলে বসে রইলাম, দূরে রাস্তায় যতটুক দেখা যায় তাকিয়ে রইলাম।
ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন উনি দেশে ফিরেই বিয়ে করবে যদি আমার কোন আপত্তি না থাকে।উনি চাই আমাদের বিয়ে সুন্নতি ভাবেই হোক তাতে আমিও মতামত দিয়েছি তবে একটা শর্ত দিয়েছি,উনি অবাক হলেন আমার শর্ত শুনে কারণ আমি বলেছি আমি বিয়ের দিন আমার মায়ের বেনারসি পড়তে চাই।
এত কিছুর মাঝেও আমার সাদিকের কথা মনে পড়ছে ভাবছি ও আমাকে যত যাই বলুক না কেন আমি রাগ হয়েছি ঠিক কিন্তু আসলে খারাপ কিছু ই বলেনি, যেমন অপারেশন এর পর ঐ ই বলেছে ভাল করে পড়তে তারপর বাবা মা দের নিজের রান্না করে খাওয়াতে এসব বলার ভাবটা খারাপ লাগলেও মূলত এর কোনটাই খারাপ ছিল না বরং আমি উপকৃত হয়েছি। এর আগেও অসংখ্য বার সাহায্য করেছে।
হঠাৎ দূরে রাস্তায় দেখে সাদিক মনে হল,,,
আমি নেমে পিলার এর সাথে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম।
সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি পড়ে আছে খুবই পবিত্র লাগছে ওকে আমি একবার দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলাম ও খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে মাথা নিচু করে হাটছে এক হাত পকেটে আর এক পা দিয়ে রাস্তার ছোট ছোট পাথর গুলো কে কিক করছে।
সপ্তাহ খানেক পর.,,
আমি ওকে এখন প্রায় এড়িয়ে চলি কিসের ভয়ে নিজেও জানিনা।ও ভুলে ক্রমেও আমার সামনে পড়লে আমি তাড়াতাড়ি সরে পরি।এই যেমন গতকাল আমি উপরে ছিলাম ওকে উঠতে দেখেই আমি তাড়াতাড়ি ভাইয়ার ঘরে চলে যাই কিন্তু পাঁচ মিনিট পর বের হতেই দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে হয়ত আমাকে দেখেছিল, আমার বুক ধক করে উঠেছে ওকে এভাবে দেখে মনে হয়েছিল এই বুঝি ধরা খেলাম।আমি তড়িঘড়ি করে দৌড়ে নেমে গেলাম।
আস্তে আস্তে একটা একটা দিন চলে যাচ্ছে সাথে আমার বিয়ের ও আর দুই মাস বাকি।
ডাক্তার সাহেব আমাকে আরও দুইবার কল করেছেন এর মধ্যে উনি ব্যস্ত থাকে আর তাছাড়া কিই বা কথা বলবেন?
:
আজ ভার্সিটি যাচ্ছিলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি আগে নিকাব করতাম না, তবে এখন মাস খানেক ধরে শুরু করেছি বোরকা আগেও পড়তাম।
একটু পর আমার পাশে সাদিক কে দেখলাম আমি ওর দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে ফিরে গেলাম আর ও আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,,,
----আমার থেকে আর পালাতে হবে না, ব্যবস্থা আমি করে নিয়েছি।
যেতে চাইলে যাও।
আমি ওর মুখে এমন কথা শুনে অবাক হলাম।এমন কথা ও কখনো বলেনা আই মিন এত স্বাভাবিক ভাবে।
ও সবসময় অস্বাভাবিক আর আমি এতেই অভ্যস্ত।
আমি ভাবতে ভাবতেই একটা রিক্সা ঠিক করে দিল।
আমি রিক্সায় উঠে বসতেই কিসের টান খেলাম নিচে দেখি বোরকার এক পার্ট পা রাখার স্টেনে কিছুর সাথে আটকে গেছে আমি নিচু হতেই দেখি সাদিকের হাতে ওটা খুলে দিচ্ছে, আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম আর ও আমার দিকে।
চোখাচোখি হতেই দেখি ওর চোখে পানি টলমল করছে।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আর রিক্সা চলতে শুরু করলো পাশ দিয়ে আরেকবার মাথা বের করে দেখলাম ওকে, মেরুন শার্ট কালো প্যান্ট ফরমাল গেটআপ এ দাঁড়িয়ে আছে এক হাতে কাঁধের ব্যাগ ধরে আছে আর অন্য হাতে চট করে চোখ মুছে ফেললো।