রাতের বেলায় চোখ বুজে একবার ভাবলাম মা যেমন টা বলেছে কথা টা ঠিক। ডাক্তার সাহেব যথেষ্ট ভাল পাত্র দেখতে সুদর্শন কিন্তু তার চাইতেও লোকটার চাল চলনে ভীষণ মার্জিত একটা ভাব বিশেষ করে কথা গুলো মুগ্ধকর। সব শিক্ষিতরা কিন্তু মার্জিত হয় না,এই যেমন সাদিক ভাবলেই রাগ হয় আমার ছোটবেলা থেকেই।
বলতে গেলে ডাক্তার এর চাইতে ভাল পাত্র আমার জন্য হয়ত হতে পারে না।
::::::পরেরদিন
আমি ভার্সিটি থেকে এসে দৈনিক কাজ সেরে বিকেলে উপরে গেলাম পড়ার ঘরে। ঘন্টা খানিক পর ভাইয়া ইফাদের ঘরে এসে আমার সামনে বসল।
আমি বললাম
----কিছু বলবে?
---হ্যা।
-----জানি কি জানতে চাও।
----তাই,,?এবার আমাকেও জানা।
---ভাইয়া সব ঠিকঠাক, শুধু একে অপরকে জানিনা এই আর কি।প্রথম দেখাতে তো কাউকে জানা সম্ভব না।
----ঠিক।
----হয়ত এটাই নিয়ম এরেঞ্জ মেরেজ এর, ভাগ্য ভাল হলে টিকে গেলাম আর না হলে নাই।
-----এখন কি তোর ভাল লেগেছে?
---তোমার কেমন লেগেছে?
---আমার তো বেশ মার্জিত মনে হল।পরিবার ও ভাল আধুনিক এবং পরহেজগার।
----তোমরা আমার চাইতে ভাল জানো কারণ আমি ওতো মিশিনি বাইরের কারও সাথে।
তাই,,,
----দেখ জীবন টা তোর আর আমি তোকে কোন কম্প্রোমাইজ করতে দিবনা।
আমি কষ্টকর হাসি দিয়ে বললাম
---ভাইয়া আমার জীবন টাই এখন কম্প্রোমাইজ এর হয়ে গেছে।
দুইদিন পর,,,,
সন্ধ্যায় কলিংবেল বাজাতেই আমি খুলতে গেলাম কারণ বসার ঘরে আমি ধর্মীয় বই পড়ছিলাম,বাবা তখন ও মসজিদ গিয়ে আর ফিরেনি আর মা নাস্তা তৈরি করছে কাজের মেয়ে শম্পা আপা কে নিয়ে।
আমি দরজা খুলতেই দেখি এক রুপবতী মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন কালো বোরকায় চোখে দামি গ্লাস পড়া হাতে একটা বাচ্চা তার পেছনে আরও একজন মহিলা তার হাতেও একটা বাচ্চা।
আমি সালাম দিতেই উনি জবাব দিয়ে বললেন,,
---আমি ডক্টর এহতেশাম এর ছোট বোন।
আমি উনার কথা শুনেই ভেতরে আসতে বললাম তাদের, তারপর মা কে ডেকে আমার ঘরে চলে গেলাম।
একটু পর নামাজের হিজাব খুলে আবার সব পরিপাটি করে আসলাম।শম্পা আপা দেখি দরজা থেকে অনেক প্যাকেট নিয়ে যাচ্ছে ভেতরের ঘরে।
আমি এসে বসলাম ওদের সামনে
সুন্দর মহিলা টি বলল,,,
----আমি ডক্টর এলিজা। আর পাশের মহিলা কে দেখিয়ে বললেন উনি বেবিদের ন্যানি মিসেস শিপ্রা।
যদি আমার ভুল না হয় তাহলে আপনি সুবাহ?
---জ্বি।
এলিজা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,,
---আপনার মিষ্টি চেহারায় বুঝতে পেরেছি আপনিই পাত্রী।
আমি একটু হেসে বললাম
----ধন্যবাদ।
আমি উনাদের কোলে থাকা বাচ্ছা গুলোর দিকে আকর্ষিত হচ্ছিলাম বার বার। নাদুস নুদুস এক বছর বয়সী একটা ছেলে এবং মেয়ে।
আমি বললাম আমি কি একটু নিতে পারি
-- হ্যা অবশ্যই। আপনি ওদের দেখতে চেয়েছেন বলেই এনেছি।
আমি বাচ্চা গুলোকে দেখে খুব অবাক হলাম এত আদুরে বাচ্চা গুলোর মা নেই?
খুব খারাপ লাগলো দেখে।
এলিজা বলল,,,
-----মন খারাপ হচ্ছে? আসলে আল্লাহ্ ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে আমার ভাই থেকে হয়ত এর বিনিময়ে বড় কিছু পাবে সে।
----ঠিক বলেছেন আপু।আল্লাহ ধৈর্যধারণ কারি দের খুব পছন্দ করেন।
[আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বিপদ আসেনা,আর যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস পোষন করে,তিনি তার অন্তর কে সঠিক পথের সন্ধান দেন।(সূরা তাগাবুন-১১)।]
---বাহ চমৎকার বলেছেন।
----না আপু এটা আমার কথা নয়।এটা সেই চমৎকার কিতাব আর আমাদের প্রভুর কথা।
----মাশাআল্লাহ। ভাইয়ার কথা বুঝতে পেরেছি এখন আর হ্যা ভাইয়া বলেছেন তোমার মতামত ছাড়া কিছুই এগোবেনা তাই তুমি যা বলবে তাই হবে।
ওহ দুঃখিত তুমি করে বলে ফেললাম।
---ইট'স ওকে আপু।
মা কে উদ্দেশ্য করে বলল,,,
---আন্টি সুবাহ কে আমাদের পছন্দ হয়েছে আর যদি উনার ও ভাইয়া কে ভাল লাগে তবেই কথা টা এগুবে।
মা খুশি হয়ে বললেন,,
----আলহামদুলিল্লাহ।তুমি একটু বসো মা আমি আসছি।
আমি একটু চুপসে গেলাম। আমাকে লক্ষ্য করে এলিজা বলল,,,
----আসলে সব মেয়েরই একটু ভয় লাগে বিয়ের কথা ভাবলে তবে তা যেন শুধু এটাই হয় অন্য কোন ব্যাপার না থাকে।
আমি উনার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
তারপর সে বলল,,
----আসলে আমার লাভ মেরেজ বুঝলে কিন্তু যেদিন বিয়ের কথা হয়েছিল সেদিন সব ভুলে গিয়ে কান্না শুরু করেছিলাম।
এলিজা আমার সাথে আরও কিছুক্ষণ গল্প করল। বুঝলাম তারা খুব মিশুক।
বাচ্চাগুলো আমার কাছেই ছিল ওরা যাওয়ার আগ পর্যন্ত।
ওরা যাওয়ার একটু পর আমি,নাস্তা আর মিষ্টি নিয়ে উপরে উঠলাম।
ইফাদের টেবিলে ট্রে রেখে আমার টেবিলে চলে গেলাম।
সাদিক কে উদ্দেশ্য করে বললাম ইফাদ তোর ভাইয়া আর তুই মুখ মিষ্টি করে নে।
ইফাদ বলে উঠলো আমার জন্য ও এনেছ? বাহ।
--হুম।
ইফাদ খাচ্ছে আর আমি মুখের সামনে বই নিয়ে সাদিক কে দেখলাম ও মিষ্টি নাড়াচাড়া করে জিজ্ঞেস করল কিসের মিষ্টি ইফাদ?
---মেহমান এসেছে হয়ত!
আমি ওকে ভুল সংশোধন করে দিয়ে বললাম হয়নি।
তোরা দুইজন আমাকে অভিনন্দন জানাতে পারিস।
সাদিক আমার দিকে না ফিরেই বলল কি নিয়ে??
আমি খুশি আর লজ্জা মিশিয়ে বললাম
---আমার বলতে সংকোচ হচ্ছে আসলে এটা আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার মিষ্টি।
সাদিক খুব বেশি অবাক হয়নি তবে চেহারার রং উড়ে গেছে। চোয়াল শক্ত করে ফেলেছে।
ইফাদ বলে উঠলো তাই নাকি? কনগ্রাচুলেশন আপু, কখন হল?
---ধন্যবাদ।এই যে একটু আগে।
আমি এবার খাতায় লিখা শুরু করলাম।
একটুপর সাদিক পড়িয়ে চলে গেল,দেখলাম ও কিছুই খাইনি চা,ডিম পরোটা, মিষ্টি কিছুই না।
পরেরদিন দুপুর বেলায় আমি ইফাদের ঘর থেকে বের হচ্ছিলাম আর সাদিক ঢুকছিল অনেকটা সংঘর্ষ হয়ে গেল ভাগ্যিস বারি লাগে নি ও অনেকবার ক্ষমা চাইল বলল এ সময় আমি এই ঘরে থাকব খেয়াল করেনি।ওর স্বভাবের কিছু দিক খুব ভাল আমি ওকে কখনওই কোন মেয়ের সানিধ্য পাওয়ার জন্য ইচ্ছেকৃত ভাবে ঘুরঘুর করতে দেখিনি, সবসময় দুরুত্ব বজিয়ে চলে।
আমি নিচে নামার আগে ওকে বললাম,,,
---আমাকে একটু অভিনন্দন ও জানালে না,খুব খারাপ তুমি।
বলেই চলে আসলাম।
আমাদের ঘরে বিয়ের বেশ কথাবার্তা চলছে,,,
আমি স্বাভাবিক ভাবেই জীবন জাপন চালিয়ে যাচ্ছি, বড়দের উপর সব ছেড়ে দিলাম।
আমার ঘরে শুয়ে আছি আমি ভাবছি ভালই হবে,বাচ্চা গুলোকে দেখে ভীষণ মায়ায় পরে গেছি।আর লোকটা ও ভাল হবে যেমন তার বোন অনেক মিশুক।
চাবির রিং এর উপর চোখ পড়লো, বানর টা ঝুলে আছে এখন ও।
আমি বানর টা কে হাতে নিয়ে কতক্ষণ চেয়ে রইলাম।
---কি রে কষ্ট পেয়েছিস??
একটু করে হাত বুলিয়ে ঘ্রাণ শুকলাম।
একটুপর মোবাইল টা হাতে নিয়ে সেই মেসেজ গুলো পড়তে লাগলাম এত বছর ধরে সাদিক আমাকে মেসেজ দিচ্ছে কিন্তু কেন?ওর সাথে তো আমার দেখা হয় সামনে বললেই তো পারে।
আচ্ছা ও কিন্তু এখনও আমার কাছে কিছুই স্বীকার করেনি।
আমি অনেকটা শিউর হলেও এটা এখনও বুঝতে পারছিনা ও আমাকে মেসেজ এ প্রিয়তা বলে কেন ডাকে?
তাও আবার "আমার প্রিয়তা"।
আর এত গোপনীয়তাই বা কেন? একটা ছেলে এত বছর ধরে ধৈর্য ধরতে পারে বলে আমার মনে হয় না।
তাছাড়া ওকে কখনো আমার দিকে লুকিয়ে দেখতে কিংবা চেহেরায় কোন রোমান্টিকতা নিয়ে তাকাতে দেখিনি, সবসময় একই ঝাঁজালো দৃষ্টি।
পরেরদিন সকালে লিলি এলো অনেকদিন পর দেখা।
আমি ওকে বিয়ের ব্যাপার নিয়ে বললাম
লিলি বলল,,
---আলহামদুলিল্লাহ খুবই ভাল সংবাদ পেলাম। লিলি সাদিক কে নিচে দেখে ডাক দিয়ে বলল
----এই চামচিকা কেমন আছো?? একটু উপরে এসো না।।
সাদিক বলল,,,
---পাজি কোথাকার বিয়ে করে বড় হয়ে গিয়েছিস না??
দাড়া আসছি।
আমি লিলিকে একটা চাপড় মারলাম
---উফফ আবার ওকে কেন ডাকতে গেলি??
---দেখ না কি বলি।
সাদিক উপরে আসার পর আমাদের সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে লিলির সাথে অনেক কথা বললো।
এরপর লিলি বলল,,
---ভাইয়া তুমি বিয়ে করবে কবে?
সাদিক চমকে উঠে বলল এখন কিসের বিয়ে?
----দেখো ভাইয়া আমাদের কে তো কম জ্বালাও নি বাকি আছে শুধু সুবাহ।
এবার ওর ও ঠিক হয়ে গেছে এখন তোমার ও তো কাউকে দরকার তাই না?
--কেন?
---কেন কি আবার? তুমি উঠতে বসতে কাকে জ্বালাবে বল?এছাড়া কি তোমার ভাত হজম হবে??
---কি!! ভারি বেয়াদব হয়েছিস তো।
--আচ্ছা সরি।
লিলি আমাকে প্রশ্ন করল এবার
----সুবাহ ডাক্তার সাহেব কে কেমন লাগলো তোর?
---হুম ভাল।
সাদিক আমার দিকে তাকাল একবার।
---উনার মধ্যে কোন লুকোচুরি দেখিনি, একবারে সোজা সাপটা।
সাদিক বলে উঠলো
----হ্যা হ্যা ওটা তো মানুষ নয়, যেন খাবার একবার চেখেই বুঝে গেছে লবন মরিচ ঠিকাছে কিনা।
আমি রাগ নিয়ে বললাম
---অন্তত মানুষের মত দুমুখো না, যা সামনে তাই পিছে।
ও আবার মুখ শক্ত করে বলল,,,
----থাক তোর পাটি সাপটা কে নিয়ে।
বলেই নেমে যেতে লাগলো কিন্তু যাওয়ার সময় আমাকে অগ্নি দৃষ্টিতে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে যেতে ভুল করেনি।
আমি রাগ করে বললাম
----বাঁদর একটা,,,,হাহ।
লিলি হেসে একেবারে কুটিকুটি।
---দেখলি কিভাবে জ্বলে পুড়ে ছারখার।
আমি বললাম,,
---তুই ও জবার মত শুরু করেছিস?তবে জবা ওর দুঃখ বুঝে কিন্তু তুই তো একেবারে মজা নিয়ে ছাড়লি।
---হাহা,হাহাহা।