আমার ঝামেলা রানী

পর্ব - ৮

🟢

রুমে ফিরে আসে আকাশ । চায়ের কাপ টা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে রাহার দিকে তাকায় । রাহা ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে । গরম চা পড়ার কারণে লাল হয়ে আছে । তবে শীতের দিন থাকার কারণে খুব বেশি পুড়েনি ।

আকাশ রাহার পাশে বসে । পা টেনে নিজের কাছে এনে ভালো ভাবে দেখে । তার পর রাহার মুখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে ,

_ কেনো গিয়েছিলে রান্না ঘরে ?

_ ভাবী কে সাহায্য করতে ।

_ সাহায্য করেছো ?

রাহা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বলে ।

ঠোঁট উল্টে দিয়ে বলে ,

_ আমি কিছু করতে গেলেই গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেই শুধু ।আমাকে দিয়ে কিছু হবে না । যা করতে যাই সেটাতেই ঝামেলা করে বসি ।

আকাশ রাহার গালে হাত রেখে বলে ,

_ তোমাদের বাড়িতে তো কিছু করতে না । পানিটাও অন্য কেউ গ্লাসে ঢেলে দিতো তোমাকে । তাই যা করতে যাও ভুল হয়ে যায় । কোনো কিছু খুব দ্রুত শেখা যায় না সময় লাগে । তুমিও আস্তে আস্তে শিখে যাবে । এখন আগ বাড়িয়ে কিছু করতে হবে না । আস্তে আস্তে মা চাচী ভাবী শিখিয়ে দেবে । তত দিনে একটু বড় আর ম্যাচিউর হও ।

_ কেনো আমি কি বড় হইনি ?

_ হ্যাঁ বড় হয়েছো তো , শুধু হাতে পায়ে লম্বা হয়ে গেছো তোমার বুদ্ধি শুদ্ধি এত টুকুও বড় হয়নি ।

_ সবাই বলে আমার মাথায় বুদ্ধি নেই ।

_ ঠিকই বলে । তুমি এখানেই বসে থাকো আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি ।

_ নিচে গিয়ে খাই সকলের সাথে ।

_ একদম না । বিছানা থেকে নামবে না তুমি ।

_ আচ্ছা ।

আকাশ চায়ের খালি কাপ আর পানির জগ টা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে । রাহা পা দুটো ভাজ করে বসে । এখন আর জ্বালা করছে না ।

একটু পরেই আকাশ এক হাতে খাবার প্লেট আর অন্য হাতে পানির জগ নিয়ে রুমে ফিরে আসে ।

পানির জগ সেন্টার টেবিলের উপর রাখে । খাবারের প্লেট টা দেয় রাহার সামনে । খাবারের প্লেটের উপর থেকে ঢেকে রাখা প্লেট তুলে পাশে রাখে ।

_ হাত ধুয়ে খাওয়া শুরু করো ।

রাহা খাবারের প্লেটের দিকে তাকায় । আবার তাকায় আকাশের মুখের দিকে । আকাশও রাহার দিকে তাকিয়ে আছে ।

_ কি হলো খাও ।

_ তুমি খাইয়ে দাও ।

আকাশ চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকায় । এ কোন মুসিবতরে বাবা । এখন খাইয়ে দিতে হবে ? বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত নিজের মুখে খাবার দেওয়া ছাড়া অন্য কারো মুখে দেয়নি । সেই ছেলে এখন আরেক জন কে কিভাবে খাইয়ে দেবে ?

_ রাহা তুমি হাত দিয়ে খেয়ে নাও হ্যাঁ ।

_ না আজকে তুমি খাইয়ে দেবে নাহলে আমি খাবো না ।

বলেই গাল ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো ।

_ রাহা বুঝতে পারছো না তুমি । আমি কখনো কাউকে খাইয়ে দেইনি ।

_ কখনো কাউকে দাওনি তাইতো আজকে আমাকে দেবে ।

এ তো বিরাট মুসিবত ।

_ রাহা খেয়ে নাও ।

_ বললাম তো তুমি না খাইয়ে দিলে খাবো না ।

_ আমি কাউকে খাওয়াতে পারি না ।

_ আজকে পারবে ।

শেষ পর্যন্ত রাহার জেদের কাছে হার মেনে নেয় আকাশ। ডোর লক করে হাত ধুয়ে আসে । রাহার সামনে বসে বলে ,

_ তারাতারি খাবে আর বড় বড় হা করবে ।

_ আচ্ছা ।

ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে দেয় রাহার । রাহা বড় হা করে মুখে নেয় ।

মাছের কাঁ*টা বেছে বেছে ভাত দিয়ে মাখিয়ে রাহার মুখে তুলে দেয় আর রাহা খেতে খেতে আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

_ তুমিও খাও ।

_ আমি নিচে গিয়ে খাবো এখন তুমি খাওয়া শেষ করো।

_ একবার খাও ।

_ রাহা ।

_ খাও না প্লিজ একবার ।

রাহা এমন ভাবে বলে কথা গুলো যে আকাশ হেসে ওঠে। নিজের মুখে খাবার পুরে দিয়ে বলে ,

_ খেয়েছি এখন খুশি? তারাতারি খাও এখন।

_ খাচ্ছি তো এর থেকে তারাতারি কিভাবে খাবো ?

_ আস্তে আস্তেই খাও নাহলে আবার গলায় আটকে যাবে ।

কথা বলতে বলতে রাহার খাওয়া শেষ হয়ে যায় ।

আকাশ হাত ধুয়ে রাহার ঠোঁট জোড়া ধুয়ে দেয় । টিস্যু পেপার নিয়ে রাহার ঠোঁট মুছিয়ে দিয়ে নিজের হাত মুছে নেয় । রাহা কে ওয়াসরুমে পাঠিয়ে শোয়ার জন্য বেড তৈরি করে দেয় ।

রাহা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই বলে ,

_ চুপ চাপ শুয়ে থাকবে আমি খাবার খেয়ে আসছি ।

_ আমার একা একা ভয় করবে । আমি তোমার সাথে নিচে যাবো

_ ভয় কেনো করবে ? এই বাড়িতে কিছুই নেই । তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো তাহলে আর ভয় করবে না ।আর তুমি যদি নিচে যেতেই পারবে তাহলে আমি কার জন্য রুমে খাবার নিয়ে আসলাম ? খালি পায়ে ফ্লোরে হাঁটতে হবে না ঠান্ডা লেগে যাবে । এখন তো মোজা জুতা কিছুই পড়তে পারবে না জ্বলবে পায়ে।

_ চোখ বন্ধ করলে আরো বেশি ভয় করে । মনে হয় ভূ*ত এসে আমার চোখের সামনে উড়ছে । আর খালি পায়ে গেলে কিছু হবে না ।

আকাশ মুচকি হেসে রাহার কাছে এগিয়ে যায় । দুই হাতে রাহার মুখ আগলে ধরে বলে ,

_ এত ভয় পেলে চলবে ? বড় হয়েছো না এখন অনেক সাহসী হতে হবে এখন ।

_ তুমিই তো বলো আমি এখনো অনেক ছোট ।

_ তুমি ছোট আবার বড়ও । এখন বেডে শুয়ে শুয়ে ফোনে গেম খেলতে থাকো তাহলে আর ভয় করবে না ।আমি খেয়ে দ্রুত চলে আসবো ।

_ আচ্ছা । দ্রুত আসবে কিন্তু ।

_ হুম । এখন গিয়ে শুয়ে পড়ো ।

রাহা বেডে উঠে শুয়ে পড়ে । আকাশ ওকে ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে নিজের ফোন টা দিয়ে খালি প্লেট নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ।

,

খাবার খেয়ে রুমে এসে দেখে রাহা গেম খেলছে এখনো। কফির মগ টা টেবিলের উপর রেখে রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ ভয় করেছে ?

ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ উঁহু ।

_ দেখেছো ভয় পেলেই ভয় করে । শুধু শুধু ভয় পাও তুমি । তুমি গেম খেলতে থাকো আমার অফিসের কাজ আছে শেষ করে আসছি ।

_ আচ্ছা ।

আকাশ কফির মগ হাতে নিয়ে সোফার কাছে এগিয়ে যায় । ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কাজ করতে শুরু করে।

কাজ শেষ করতে করতে রাত দশটা বেজে যায় । ল্যাপটপ বন্ধ করে চার্জে লাগিয়ে ওয়াসরুমে যায় । ফ্রেস হয়ে এসে রাহার কাছ থেকে ফোন নিয়ে চার্জে লাগায় । রাহা বেড থেকে নেমে আবার ওয়াসরুমে যায়।

দুজনেই শুয়ে পড়ে । প্রতি দিনের মতো রাহা আকাশের বুকের সাথে লেপ্টে শুয়ে পড়ে । আকাশও রাহা কে জড়িয়ে ধরে প্রতি দিনের মতোই ।

___________________________

অফিস শেষ করে বাড়ি ফেরে আকাশ । বাইক পার্ক করে রেখে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে । ড্রইং রুমে আসতেই দেখে রাহার বাবা রেজওয়ান মাহবুব সোফায় বসে সকলের সাথে হাসি মুখে কথা বলছে । রাহা বাবার গা ঘেঁষে বসে আছে ।

আকাশ এগিয়ে এসে শ্বশুরের পাশে দাঁড়ায় ।

_ আসসালামু আলাইকুম বাবা, ভালো আছেন ?

_ ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা , আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি তুমি ভালো আছো ?

_ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো । কখন এসেছেন বাবা ?

_ এইতো ঘণ্টা খানিক হলো । তুমি যাও ফ্রেস হয়ে আসো ।

_ জ্বি, বাবা আপনি খেয়েছেন ?

_ হ্যাঁ খেয়েছি ।

আকাশ রাহার দিকে তাকিয়ে উপরে চলে যায় নিজের রুমে ।

,

ফ্রেস হয়ে নিচে আসতেই আমজাদ শেখ আকাশ কে বলেন ,

_ আকাশ বেয়াই তোমাকে আর রাহা কে নেওয়ার জন্য এসেছেন । আজকে তুমি আর রাহা ওই বাড়ি যাচ্ছো ।

_ কিন্তু বাবা আমার অফিস ? বিয়ের জন্য এক সপ্তাহ ছুটি দিয়েছিল এখন আর ছুটি দেবে না ।

_ কাল তো ছুটির দিন । আজকে যাও আগামী কাল বিকেলে ফিরে আসবে ।

রেজওয়ান মাহবুব বলে ,

_ পনেরো দিন পর তো আয়শা কে ইংল্যান্ড নিয়ে যাবো। আমি চাইছি এই পনেরো দিন রাহা আমাদের বাড়িতে থাকবে । আয়শা চাইছে এই পনেরো দিন রাহা কে যেন ওর কাছে থাকতে দেওয়া হয় । আমি জোর করছি না আপনারা যদি অনুমতি দেন তো ।

অনন্যা শেখ বলে ,

_ কেনো অনুমতি দেবো না বেয়াই সাহেব ? আপনি নিয়ে যান ওদের । রাহা বেয়ানের কাছে থাকলে বেয়ানেরও ভালো লাগবে রাহার ও ভালো লাগবে ।

আকাশ নাহয় কাল চলে আসবে ।

সায়মা শেখ বলেন ,

_ বেয়াই আপনি তো বলছেন দেরি করবেন না । তাহলে এখনই খাবার খেয়ে নিন ।

_ খিদে তো নেই পেটে । আসার পর থেকে যা যা খাওয়ালেন পেট ফুল হয়ে গেছে ।

_ তা বললে তো হবে না বেয়াই সাহেব । বেশি না খান অল্প হলেও খেতে হবে ।

_ আচ্ছা তাহলে অল্প করেই দিন ।

অনন্যা শেখ আর সায়মা শেখ ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে যায় খাবার বাড়ার জন্য ।

খাবার বেড়ে ডাক দেয় অনন্যা শেখ আমজাদ শেখ কে।

আমজাদ শেখ রেজওয়ান মাহবুব এর দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ বেয়াই সাহেব উঠুন এবার । খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে ।

_ হুম চলুন সবাই ।

বলেই উঠে দাঁড়ায় ।

আজলান শেখ বলে ,

_ আমরা এখন খাবো না বেয়াই । আপনি রাহা আর আকাশ যান ।

আকাশ বলে ,

_ আমি এখন খাবো না কিছু । অফিস ক্যান্টিনে লাঞ্চ করেছি আমি ।

রেজওয়ান মাহবুব বলে ,

_ না বললে চলবে না সকলেই খেতে হবে । আমিও অফিসে লাঞ্চ করেছিলাম । আবার এখানে এসেও এত এত খেলাম । আবার এখন খেতে বলছেন ।

_ আপনি আমাদের বাড়ির গেস্ট । আপনার তো খেতেই হবে । আমরা আবার আপনার বাড়িতে গিয়ে খাবো ।

_ তা বললে হবে না । আপনারা না খেলে আমিও খাবো না ।

বলেই আবার সোফায় বসে পড়ে ।

বাধ্য হয়েই সকল কে খেতে যেতে হয় ।

শুধু আকাশ যায় না । আকাশ সমুদ্রের মেয়ে কে কোলে নিয়ে সোফায় বসে খেলতে থাকে । ওর এখন মোটেও খিদে নেই আর খেতেও ইচ্ছে করছে না ।

রেজওয়ান মাহবুব ও জোর করে না । এখানে খেয়ে পেট ভরিয়ে গেলে শশুর বাড়িতে গিয়ে কি খাবে ?

,

রাহা নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নেয় ।

আকাশ নিজের ড্রেস নিজেই ব্যাগে রাখে । রাহা কে রাখতে দিলে সেই দলা মোচড়া করেই রাখবে ।

আকাশ রাহা দুজনেই তৈরি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ।

সকলের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয় ।

ত্রিশ মিনিট পর রাহা দের বাড়ির গেটের ভেতর প্রবেশ করে কার । কারের হর্ন শুনেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে রাহার মা দাদি আর ভাবী ।

রাহা কার থেকে বেরিয়ে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। আদরের মেয়ে কে জড়িয়ে ধরতেই আয়শা খানমের চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে ।

সেই বিকেল থেকে মেয়ের অপেক্ষায় বসে ছিল কখন আদরের মেয়ে টা আসবে তাকে আম্মু বলে ডাকবে জড়িয়ে ধরবে ।

_ আম্মু কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি মা তুই কেমন আছিস ?

_ আমিও ভালো আছি আম্মু ।

_ দাদি তুমি কেমন আছো ?

বলেই মাকে ছেড়ে দাদি কে জড়িয়ে ধরে ।

_ ভালো আছিরে বুবু তুই কেমন আছিস ?

_ খুব ভালো দাদি ।

বিজ্ঞাপন

_ ভাবী তুমি কেমন আছো ?

_ আমিও ভালো আছি রাহা তুমি কেমন আছো ।

আকাশ শাশুরি মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলে ,

_ আসসালামু আলাইকুম মা ,কেমন আছেন ?

_ আলহালদুলিল্লাহ বাবা ভালো আছি, তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ । দাদি ভাবী কেমন আছেন ?

দুজনেই একসাথে আলহামদুলিল্লাহ বলে ।

সকলেই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে ।

রাহা নিজের রুমে চলে যায় ফ্রেস হওয়ার জন্য । রেজওয়ান মাহবুব রাহার ব্যাগ সাথে নিয়ে এগিয়ে যায়।

আকাশ সোফায় বসে তিন জনের সাথে কথা বলতে থাকে । কথা বলতে বলতে বলে ,

_ রিশাদ ভাইয়াকে দেখছি না যে । ভাইয়া বাড়িতে নেই ?

রিশাদের বউ বলে ,

_ অফিস মিটিং এ আটকে গেছে । একটু পরেই চলে আসবে ।

,

রাতের খাবার খেয়ে রাহা ওর মায়ের রুমে চলে যায় মায়ের সাথে গল্প করার জন্য ।

রাহার দাদি নিজের রুমে চলে যায় ।

সোফায় বসে থাকে রেজওয়ান মাহবুব, রিশাদ , রিশাদের বউ আর আকাশ । চার জন কথা বলছে আয়শা খানমের অসুস্থতা নিয়ে ।

আকাশ বলে ,

_ ডক্টর কি বলেছে বাবা ?

_ বললো উন্নত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হতে পারে । তবে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি কেউ । এখন দেখা যাক আল্লাহ তায়ালা কি করেন । হায়াত যত দিন আছে তার বেশি তো আটকে রাখতে পারবো না । তবে চেষ্টা করি যদি কোনো ভাবে আল্লাহ তায়ালা মীরাক্কেল ঘটায় ।

_ আল্লাহ তায়ালা নিশ্চই ভালো কিছুই করবেন । মায়ের কিছু হবে না ইনশা আল্লাহ ।

_ একটা বছর আগেও যদি বুঝতে পারতাম আয়শার শরীরে এত গুলো রোগ বাসা বেঁধেছে তাহলেও বোধহয় এত খারাপ অবস্থা হতো না । সাত মাস আগে হুট করে অসুস্থ্ হয়ে পড়লো। ডক্টর দেখিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর ধরা পড়লো চারটা অসুখ বাসা বেঁধেছে । দোয়া করো বাবা আল্লাহ যেন সুস্থ অবস্থায় আবার ফিরিয়ে দেয় আমাদের মাঝে ।

_ সব সময় দোয়া করি বাবা । মাকে কত তারিখে ইংল্যান্ড নিয়ে যেতে চাইছেন ?

_ বিশ তারিখের টিকেট কে*টে রেখেছি ।

_ ওহ ।

_ আমার বোকা মেয়েটাকে দেখে রেখো বাবা । এখন ওর সবচেয়ে আপন তুমি ।

_ টেনশন করবেন না বাবা । রাহার দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন ওকে আগলে রাখবো । আপনারা ওর জন্য চিন্তা না করে মায়ের সুস্থতার কথা ভাবুন । ওকে নিয়ে ভাবার জন্য আমি আছি ।

রেজওয়ান মাহবুব হেসে আকাশের হাতের উপর নিজের হাত রেখে বলে ,

_ আমরা জানি বাবা তুমি রাহা কে আগলে রাখবে । তবুও চিন্তা এসে যায় , মেয়েটা এখনো ছোট বাচ্চাদের মত । কাজ কর্ম ও করে সেরকম । ইংল্যান্ড যাওয়ার পর তারাতারি তো আসতে পারবো না । তখন রাহা কে তোমাদেরই দেখে রাখতে হবে । চারটা অপারেশন ছয় মাস সময় লাগবে বাংলাদেশে ফিরতে ।

_ আপনার রাজকন্যাকে আগলে রাখবো বাবা । আপনারা টেনশনফ্রি থাকুন ।

রিশাদ বলে ,

_ রাহা তোমাদের বোধহয় অনেক জ্বালাতন করে আকাশ ।

_ না ভাইয়া সেরকম কিছু করে না । ওই মাঝে মধ্যে কাজ করার ভূ*ত চাপে মাথায় তখন কাজ করতে যেয়ে উল্টো অকাজ করে বসে থাকে । আর নিজে বিপদে পড়ে ।

রিশাদ হেঁসে বলে ,

_ রাহা এমনই । দুনিয়ার সব উল্টা পাল্টা অকাজ সবই ওকে দিয়ে করানো যাবে শুধু সঠিক কাজ আর পড়াশোনা করানো যাবে না । এই দুটো জিনিসের সাথে ওর ছোট বেলা থেকেই আড়ি ।

আকাশের সাথে সাথে বাকি তিন জন মুচকি হাসে । এতক্ষণের বিষন্নতা একটু কমে যায় রাহার কথা উঠায়।

মেড এসে চা কফি দিয়ে যায় চার জন কে ।

চা কফি খেতে খেতে কথা হয় আয়শা খানমের চিকিৎসা নিয়ে ।

,

আকাশ রাহার রুমে চলে আসে । রাহা এখনো মায়ের কাছে রয়েছে ।

রিশাদ আর ওর বউ নিজেদের রুমে চলে গেছে ।

রেজওয়ান মাহবুব নিজের রুমে এসে দেখে রাহা মাকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনছে । আয়শা খানম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গল্প শোনাচ্ছে ।

রেজওয়ান মাহবুব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ,

_ রাহা নিজের রুমে যাও আকাশ তোমার জন্য ওয়েট করছে ।

_ আর একটু আব্বু ।

_ তোমার আম্মুর ঘুমের সময় পেরিয়ে গেছে মা । এখন তোমার আম্মুকে ঘুমোতে দাও । সকালে এসে গল্প শুনো আবার ।

_ আচ্ছা ।

বলেই শোয়া থেকে উঠে বসে । মায়ের গালে চুমু দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় । রেজওয়ান মাহবুব হেসে বলে ,

_ মেয়েটা বোধহয় জীবনে বড় হবে না ।

_ আমি তো চেয়েছিলাম আমার মেয়েটা কখনো বড় না হোক । আবার সেই আমিই মেয়েটাকে ধরে বেঁধে বড় বানিয়ে দিলাম ।

_ আয়শা এমন কথা কেনো বলছো ? রাহা ভালো আছে ওই বাড়িতে । ওই বাড়ির সবাই রাহা কে অনেক ভালোবাসে ।

_ সেজন্যই তো আমি নিশ্চিত আছি রেজওয়ান ।

_ আর কোনো কথা নয় এখন ঘুমাও । বাকি কথা সকালে হবে ।

বলেই ওয়াইফ কে ঠিক ঠাক ভাবে ঢেকে দেয় । বেড থেকে নেমে ডোর লক করে । ফ্রেস হয়ে এসে লাইট অফ করে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে ওয়াইফ কে বুকে আগলে নিয়ে ।

,

রাহা রুমে এসে দেখে আকাশ বেডে বসে বসে ফোনে কথা বলছে । রাহা কে দেখে একবার সেদিকে তাকায় । তার পর আবার সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে । যেখানে রাহার বড় একটা ছবি দেওয়ালের সাথে টাঙ্গানো রয়েছে । হাস্যোজ্বল মুখশ্রী আর খোলা এলোমেলো চুলে অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগে রাহা কে এই ছবিটিতে । আকাশ এই রুমে যে কয়েক বার এসেছে বার বার ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে ।

রাহা ফ্রেস হয়ে আসে । বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে আকাশ শোয়ার জন্য বেড তৈরি করে রেখেছে ।

রাহা হাত মুখ মুছে ক্রিম লোশন লাগিয়ে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে । আকাশ রাহার উপর ব্ল্যাঙ্কেট ভালো ভাবে দিয়ে দেয় । ডোর লক করে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে টিশার্ট ট্রাউজার নিয়ে ।

ফ্রেস হয়ে চেঞ্জ করে আসে । লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে । রাহা নিজে থেকে আকাশের দিকে এগিয়ে যায় । আকাশের এক হাত সোজা করে বাহুর উপর মাথা রেখে বুকে মুখ গুঁজে দেয় । আকাশ মুচকি হেসে অন্য হাত রাহার উপর দিয়ে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে ।

_ তোমার শরীর সব সময় এমন গরম হয়ে থাকে কেনো ?

_ আমার শরীর টা তো জানে আমার বাচ্চা বউ ঠান্ডা হয়ে আসবে । তাই তাকে উষ্ণ করার জন্য সব সময় গরম হয়ে থাকে ।

_ মিথ্যা কথা ।

_ সত্যি বলছি ।

_ একটুও না ।

_ পুরোটাই । এখন ঘুমাও অনেক রাত হয়েছে ।

আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ একটা গল্প বলো ।

_ এতক্ষণ মায়ের কাছে কি করলে ?

_ গল্প ।

রাহার নাকের সাথে নাক ঘষে বলে ,

_ তাহলে আরো কেনো গল্প শুনতে হবে ? এখন ঘুমাও সকালে উঠে গল্প শুনবে ।

_ একটা বলো না ।

_ রাহা ঘুমাও সকালে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করতে হবে কিন্তু ।

রাহা আকাশের বুকে মুখ গুজে দেয় । আকাশ মুচকি হেসে বলে ,

_ পড়া চোর মেয়ে একটা ।

রাহা বুকে মুখ গুঁজে রেখেই বির বির করে বলে ,

_ এত কেনো পড়তে হবে ? দুনিয়ায় পড়া ছাড়া আর কিছু নেই কি ? পড়তে একটুও ভালো লাগে না । সবাই শুধু পড়ো পড়ো করে ।

_ রাহা বির বির না করে ঘুমাও ।

_ ঘুমাচ্ছি ।

________________________

পরের দিন বিকেলে আকাশ নিজের বাড়িতে ফিরে যায়। আকাশ চলে যাওয়ায় রাহা বেশ খুশিই হয়েছে ।

এখন আর কেউ বলবে না "রাহা এটা করবে না একদম।ওখানে যাবে না, জুতা মোজা ছাড়া ফ্লোরে হাটবে না । আর লাফালাফি একদম করবে না পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গে যাবে । এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে ।

যদিও আকাশ কে ছেড়ে থাকতে ভালো লাগে না রাহার। আকাশ যতক্ষন অফিসে থাকতো ততক্ষণ রাহার একটুও ভালো লাগতো না ।

আকাশ চলে যাওয়ার পর মা দাদি ভাবীর সাথে গল্প জুড়ে বসে । শশুর বাড়িতে কে কে ওকে কতটা ভালোবাসে সবই বলতে শুরু করে ।

,

সন্ধ্যার পর পর বাড়ি ফিরে আসে আকাশ । সকলের সাথে কথা বলে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় । রুমে আসতেই রাহার কথা মনে পড়ে । এই সময় রাহা রুমে বসে থাকতো । ওর পাশে বসে ফোনে গেম খেলতো নয়তো ফ্যামিলির সকলের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতো ।

রাহা বিহীন রুমের চারো দিকে নজর বুলায় । বির বির করে বলে ,

_ ঝামেলা রানী আর কয়েক দিন ঝামেলা করবে না ।

ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে নেয় । অফিসের একটা ফাইল নিয়ে বসে চেক করার জন্য ।

,

রাতের খাবার খেয়ে দাদীর রুমে দাদীর সাথে শুয়ে আছে রাহা । নিজের জন্য আলাদা রুম বরাদ্দ থাকলেও রাতে দাদীর রুমে ঘুমাতো সব সময় । দাদীর কাছে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতো ।

গল্প শুনতে শুনতে রাত বেড়ে যায় অনেক ।

_ রাহা এখন ঘুমা ।

_ ঘুম আসছে না দাদি ।

_ চোখ বন্ধ কর আমি গল্প বলছি ঘুম চলে আসবে ।

কিছু সময় চোখ বন্ধ করে চুপ হয়ে শুয়ে থাকে তবুও ঘুম আসে না দুচোখে । নড়া চড়া করে বলে ,

_ দাদি জড়িয়ে ধরো আর গল্প বন্ধ করো ।

দাদি গল্প বলা বন্ধ করে রাহাকে বুকের সাথে মিশিয়ে জড়িয়ে ধরে । কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে যায় রাহার ঘুম আসে না ।

_ ঘুমাচ্ছিস না কেনো বুবু ?

_ ভালো করে জড়িয়ে ধরো আগে ।

_ ভালো করেই তো ধরেছি ।

_ এভাবে না ।

_ তাহলে কিভাবে ?

_ সুন্দর করে আগে যেভাবে ধরতে ।

_ আগের মত করেই তো ধরেছি ।

_ তাহলে ঘুম আসছে না কেনো ?

_ আমি কিভাবে বলবো ? তুই চুপ করে শুয়ে থাক তাহলে ঘুম আসবে ।

_ তুমি ভালো করে জড়িয়ে ধরেছো না ।

_ আর কত ভালো করে জড়িয়ে ধরবো ? আগে তো এভাবেই ধরতাম তখন তো তারাতারিই ঘুমিয়ে যেতি ।

_ দাদি তোমার জড়িয়ে ধরা হচ্ছে না ।

_ কেনো ?

_ কেমন যেন খালি খালি লাগছে । তুমি ঠিক ভাবে জড়িয়ে ধরতে পারছো না ।

_ কি অদ্ভুত কথা । গত দশ বছর ধরে জড়িয়ে ধরে ঘুম পারাচ্ছি ভুল হচ্ছে না আর আজ নাকি ঠিক ভাবে জড়িয়ে ধরতে পারছি না ।

_ হ্যাঁ ঠিক ভাবে জড়িয়ে ধরতে পারছো না তুমি । উনি যেন কিভাবে জড়িয়ে ধরে যেটা তুমি পারছো না আর সেজন্যই আমার ঘুম আসছে না ।

এতক্ষণে দাদীর মাথায় আসে কেনো তার নাতনীর ঘুম আসছে না আর ওনার জড়িয়ে ধরা নাতনীর পছন্দ হচ্ছে না ।

_ আকাশ কে মিস করছিস ?

_ না ।

_ তাহলে ঘুম আসছে না কেনো তোর ?

_ তুমি ঠিক ভাবে জড়িয়ে ধরতে পারছো না সেজন্য ।

_ আকাশ কিভাবে জড়িয়ে ধরে তোকে ?

_ তুমি যেভাবে ধরে আছো সেভাবেই ।

_ তাহলে ভুল কোথায় ? ঠিকই তো আছে তাহলে ।

_ না ঠিক নেই দাদি । তোমার জড়িয়ে ধরা হচ্ছে না ।

দাদি মুচকি হেসে বলে ,

_ দশ বছর ধরে তোকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পারাই আমি । আর সতেরো দিন জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়িয়ে আকাশ তোর অভ্যাস চেঞ্জ করে দিয়েছে যে আমার দশ বছর ধরে জড়িয়ে ধরাও তোর কাছে আজ ঠিক মনে হচ্ছে না।

_ কি সব উল্টা পাল্টা কথা বলছো ? ঠিক ভাবে জড়িয়ে ধরো তো ।

_ আমি যত ভাবেই জড়িয়ে ধরি না কেনো তোমার ঘুম আসবে না বুবু । সতেরো দিনেই আকাশ তোর অভ্যাস হয়ে গেছে ।

_ ছাড়ো তোমার অভ্যাস । ঠিক ভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো তো । ভালো লাগছে না ।

দাদি আবারো মুচকি হেসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নাতনিকে ।

,

আকাশ বেডে শুয়ে একবার একাত তো আবার ওকাত হচ্ছে । কিছুতেই ঘুম আসছে না । বেড আর বুক দুটোই কেমন খালি খালি লাগছে । জীবনে কোলবালিশ জড়িয়ে না ধরা আকাশ কোলবালিশ টেনে এনে জড়িয়ে ধরে । কিন্তু তবুও ঘুম আসে না । কোলবালিশ দূরে সরিয়ে দেয় । চোখ বন্ধ করতেই চোখে ভেসে ওঠে রাহা ওর বুকে গুটি শুটি মে*রে শুয়ে আছে ।

দপ করে চোখ খুলে তাকায় । কোলবালিশ টেনে আবার জড়িয়ে ধরে । চোখ বন্ধ করে বলে ,

_ ঝামেলা রানী কোন ঝামেলায় ফেললে আমায় ? তোমাকে ছাড়া ঘুম কেনো আসছে না ?

তুমিও কি আমার মত ছটফট করছো ?

বিজ্ঞাপন
আমার ঝামেলা রানী গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক উপন্যাস