ছাদে দোলনায় বসে আছে রাহা আর মিলা। মিষ্টি রোদ উঠেছে দুজনেই রোদ পোহাচ্ছে ।
একটা বাটিতে বরই রয়েছে বসে বসে রোদ পোহানোর পাশাপাশি বরই খাচ্ছে আর গল্প করছে ।
মিলা ওর আর সমুদ্রের একে অপরের প্রেমে পড়ার গল্প গুলো বলছে । কিভাবে দুজন পরিবারকে রাজি করিয়েছিল বিয়ের জন্য সে সব বলছে ।
মিলা আর সমুদ্রের কাহিনী শুনতে রাহার বেশ ভালো লাগছে । এরকম গল্প এর আগে আর শোনা হয়নি কখনো ।
,
অফিস থেকে ফিরে আসে আকাশ । সোফায় বসে আছে রাহা । আকাশ এক নজর সোফার দিকে তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় ।
অসীম ভাইয়ের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বলে ,
_ ঝামেলা রানী তোমার রাজা এসে গেছে রুমে যাও এখন । সেবা যত্ন করে আসো একটু ।
মিলা অসীমের মাথায় চাটি মে*রে বলে ,
_ রাহা তোর ভাবী হয় অসীম ।
_ তো কি হয়েছে ? বয়সে আমার থেকে পাঁচ বছরের ছোট ।
_ তাই বলে তুই আকাশের মত ঝামেলা রানী বলে ডাকবি ?
_ ঝামেলা রানী কে ঝামেলা রানী ডাকলে সমস্যা কোথায় ? ঝামেলা রানী তোমার কোনো সমস্যা আছে ?
রাহা দুদিকে মাথা নাড়ায় ।
_ দেখলে ঝামেলা রানীর সমস্যা নেই ।
_ তোর সাথে কথা বলে তর্ক করে কখনোই পারা যাবে না ।
_ কথা বলতে তর্ক করতে আসো কেনো ?
_ কান ধরে মাফ চাইছি তোর সাথে মনের ভুলেও আর কথা বলবো না ।
_ হুম মনে থাকে যেন ।
_ রাহা আকাশের জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে রুমে যাও ।
রাহা সোফা ছেড়ে উঠে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায় । নরমাল পানি গ্লাসে ঢেলে রুমের দিকে এগিয়ে যায় ।
________________________
কে*টে যায় অনেক গুলো দিন । রাহার মায়ের ব্রেন সার্জারি সফল হয়েছে । এখন কিছুটা সুস্থ্যও হয়েছে । নেক্সট সার্জারি এক মাস পর ।
রিশাদ বাংলাদেশে ফিরে এসেছে সার্জারির পর ।
অফিস কত দিনই বা অন্যের ভরসায় ফেলে রাখবে ।
নেক্সট সার্জারির আগে আবার চলে যাবে ।
,
রাহা রুম থেকে বের হয় । এক পা আগাতেই দেখে অসীম নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসছে ।
তাই দ্রুত আবার নিজের রুমে ঢুকে যায় । ডোরের পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে ।
ক্রমেই এগিয়ে আসছে অসীম , পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ।
আকাশের রুমের কাছে আসতেই রাহা গলার সব শক্তি দিয়ে জোড়ে ভাঁও করে ওঠে । সাথে সাথেই ধপাস করে নিচে কিছু পড়ার শব্দ হয় । রাহা তো হু হা করে হাসছে। হাঁসি চেপে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে এত অসীম না আজলান শেখ নিচে পড়ে আছে । চারো দিকে হাজার টাকার নোট ছড়িয়ে রয়েছে । আজলান শেখ কোমরে হাত দিয়ে উঠে বসে ।
রাহা অসীমের জায়গায় চাচা শশুর কে দেখে থ হয়ে গেছে । করেছে টা কি ! চোরের মত চোখ মুখ বানিয়ে চারো দিকে নজর বুলায় । ততক্ষণে কিছু পড়ার শব্দ শুনে নিচ থেকে সবাই উপরে উঠে এসেছে । সবাই ভাবছে রাহা পড়ে গেছে ।
উপরে এসে দেখে উল্টো কাহিনী । রাহা সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর বাড়ির বড় কর্তা দুই পা ছড়িয়ে মাজায় হাত দিয়ে বসে আছে । চারো দিকে টাকার ছড়াছড়ি ।
সায়মা শেখ স্বামীর এমন অবস্থা দেখে বলে ,
_ আল্লাহ গো এভাবে পড়ে আছো কেনো ? কি হয়েছে ?
আকাশ রাহার মুখের দিকে তাকায় । রাহার চোরের মতো চোখ মুখ দেখেই বুঝতে বাকি নেই কি ঘটেছিল এখানে ।
_ ভাইজান কি হয়েছে কথা বলেন না কেনো ?
সমুদ্র আর আকাশ দ্রুত আজলান শেখ কে টেনে দাঁড় করায় ।
আজলান শেখ দুই ছেলের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে বলেন ,
_ বাবা গো মাজা শেষ ।
সমুদ্র বলে ,
_ কিভাবে পড়লে বাবা ?
আকাশ বলে ,
_ কিভাবে আর পড়বে ? এই ঝামেলা রানীর ভাও বলা চিৎ*কার শুনতে পাও নি ? এই ঝামেলা রানীই কিছু করেছে নিশ্চই ।
সকলেই রাহার মুখের দিকে তাকায় । রাহার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে দোষ টা ওর নিজেরই ।
সায়মা শেখ স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ কি হয়েছে বলছো না কেনো ?
_ আমি করিডোর দিয়ে আসছিলাম টাকা গুনতে গুনতে । এখান অব্দি আসতেই রাহা চিৎ*কার করে ভাও বলে ওঠে । যেহেতু আমি টাকা গোনায় মগ্ন ছিলাম তাই রাহার আচমকা চিৎ*কারে ভয় পেয়ে পড়ে গেছি ।
অসীম এদিকেই আসছিল । কাকার কথা শুনে ফিক করে হেসে ওঠে । সকলেই ওর দিকে তাকায় ।
আকাশ রেগে গিয়ে বলে ,
_ তোর হাসি পাচ্ছে কাকার অবস্থা দেখে ?
অসীম টাকা গুলো তুলতে তুলতে বলে ,
_ কাকার অবস্থা দেখে হাসি পাচ্ছে না , হাসি পাচ্ছে কাকার কথা শুনে । এত বড় একজন পুরুষ মানুষ হয়েও ছোট একটা মেয়ের চিৎ*কারে ভয় পেয়ে চিৎপটাং হয়ে গেছে । পুরুষ মানুষের মান ইজ্জত শেষ ।
আকাশ আজলান শেখ কে ছেড়ে এসে অসীমের মাথায় একটা মে*রে দেয় ।
_ মা*র*ছো কেনো ?
_ উল্টা পাল্টা কথা বলিস কেনো ?
_ উল্টা পাল্টা কোথায় ? ঠিকই তো বললাম ।
আকাশ রাহার দিকে তাকায় ।
_ কাকা কে ভয় দেখিয়েছো কেনো ? তোমার জন্য পড়ে গিয়ে মাজায় ব্যাথা পেল ।
_ আমি তো অসীম ভেবে ভয় দেখিয়েছিলাম ।
_ অসীম আর কাকা কে কি একই রকম দেখতে ?
_ অসীম আসছিল এদিকে তাই আমি ডোরের পাশে লুকিয়ে ছিলাম । কিন্তু অসীমের বদলে বড় আব্বু চলে এসেছে বুঝতে পারিনি ।
আজলান শেখ বলেন ,
_ যা হয়েছে হয়েছে ওকে আর বকাবকি করিস না । মানুষ মাত্রই ভুল ।
অসীম টাকা কুরোনো বন্ধ করে রাহার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ।
_ আমি তো এই অব্দি এসে আবার রুমে গিয়েছিলাম পি করতে । যাই হোক না কেনো কাকার জায়গায় আমি থাকলে জীবনেও ভয় পেতাম না । কাকা ভীতু মানুষ কিনা তাই ভয় পেয়ে গেছে ।
আকাশ অসীমের পিঠে আরেক টা বসিয়ে বলে ,
_ বীর পুরুষ যেই কাজ করছিস সেটা কর তারাতারি ।
_ কথায় কথায় মা*রো কেনো ? সব কটা ভাই বোনের এক অভ্যাস ।
আজলান শেখ সমুদ্র কে ছেড়ে দাঁড়ায় । রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ মা জীবনেও আর এই কাজ করো না হুম ।
_ আচ্ছা আব্বু । সরি ভুল হয়ে গেছে ।
_ ঠিক আছে নিচে যাও সবাই ।
অসীম টাকা গুলো তুলে আজলান শেখের হাতে দেয় ।
সবাই নিচের দিকে এগিয়ে যায় । রাহা তখনো ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে । আকাশ রাহার হাত ধরে টেনে রুমের ভেতরে চলে আসে ।
আকাশের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে । রাহার একটু একটু ভয় করছে আকাশকে দেখে । নিশ্চই ওকে এখন বকবে। ওকে কি জানতো নাকি অসীমের বদলে আজলান শেখ চলে আসবে । জানলে তো জীবনেও এমন কিছু করতো না ।
_ তুমি কবে ঝামেলা করা বন্ধ করবে ?
_ আমি ইচ্ছে করে ঝামেলা করি নাকি ?
_ ইচ্ছে করে করো না ?
_ না ।
_ অসীম কে তুমি ইচ্ছে করে ভয় দেখাতে চাওনি ?
_ অসীম কে ইচ্ছে করে ভয় দেখাতে চেয়েছি বড় আব্বু কে তো না ।
_ যাকেই দেখাতে চাও না কেনো । এই সব অকাজের বুদ্ধি কবে শেষ হবে তোমার ? ভালো বুদ্ধি তো একটুও নেই মাথায় । পড়তে বললে পড়বো না , কিছু করতে দিলে ঠিক ভাবে করতে পারো না । সব সময় শুধু অকাজ তাইনা ?
_ আর করবো না ।
_ আর করবো না আর করবো না বলেও তো কত কিছু করো ।
_ সত্যি বলছি আর করবো না ।
_ মনে থাকে যেন ।
_ হুম মনে থাকবে ।
_ পড়তে বসো এখন ।
_ এখন ?
_ তো কখন ?
_ পড়ে ।
_ বসছি তো রেগে যাওয়ার কি আছে ?
_ বেশি কথা না বলে ম্যাথ বই নিয়ে বসো আমি নীচ থেকে আসছি ।
রাহা ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলে । আকাশ রুম থেকে বেরিয়ে যায় । আকাশের যাওয়ার পথে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কা*টে রাহা ।
তার পর স্টাডি টেবিলের দিকে এগিয়ে যায় । চেয়ার টেনে বই খাতা নিয়ে বসে যায় ।
,
রাতের খাবার খেয়ে যার যার রুমে চলে যায় সবাই ।
রাহা শোয়ার জন্য নিজেই বেড তৈরি করে ।
আকাশ দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখে ।
বেড ঠিক করা হয়ে গেলে লাইট অফ করে বেডে এসে শুয়ে পড়ে ।
,
আজলান শেখ উপুড় হয়ে শুয়ে আছে । সায়মা শেখ হট ওয়াটার বোতলে গরম পানি তুলে শেক দিয়ে দিচ্ছে মাজায় । বেশ ব্যাথা পেয়েছে । মাজা গরম হয়ে আছে ব্যাথার কারণে । পেইন কিলার খেয়েছে তাই ব্যাথা একটু কমেছে । সায়মা শেখ হেঁসে হেঁসে বলেন ,
_ আকাশ রাহার একদম ঠিক নাম দিয়েছে আসলেই ঝামেলা রানী ।
_ তা যা বলেছো । মেয়েটা একদম সহজ সরল বোকা সোকা । তাই তো এমন সব কাজ করে ঝামেলা করে বসে ।
_ হুম । বাবা মায়ের আদরের মেয়ে তো তাই আরো এমন হয়েছে বেশি ।
_ শেক দেওয়া বন্ধ করে মুভ মলম টা দিয়ে মালিশ করে দাও আবার । তার পর ঘুমাও সকালে আবার উঠতে হবে ।
সায়মা শেখ হট ওয়াটার বোতল টা রেখে মুভ মলম টা নিয়ে মাজায় মালিশ করতে থাকে ।
___________________
দেখতে দেখতে রাহার অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা এগিয়ে আসে । রাতে দুই ঘণ্টা সমুদ্র রাহা কে পড়ায় সাত টা থেকে নয়টা পর্যন্ত ।
আকাশের কাছে পড়তে বসলে শুধু তালবাহানা করে তাই আকাশ ভাইয়ের উপর দিয়েছে রাহা কে পড়ানোর দায়িত্ব ।
সমুদ্রের হাতের বড় লাঠিটা দেখে টু শব্দ না করে পড়া কমপ্লিট করে রোজ । সমুদ্র এমনি সময় হাঁসি খুশি থাকলেও পড়ানোর সময় গম্ভীর হয়ে যায় । ওর গম্ভীর চোখ মুখ দেখেই রাহা ভয়ে পড়া কমপ্লিট করে । যেই বড় লাঠি নিয়ে বসে পড়া না পারলেই ঠাস করে লাগিয়ে দেবে ।
আগের থেকে রাহার পড়ার উন্নতি হয়েছে ।
পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি খুব ভালো হয়েছে ।
এত কিছুর পরেও রাহার দুষ্টামি আর ঝামেলা পাকানো কমেনি । আগের মতই আছে এখনো বিন্দু মাত্র পরিবর্তন হয়নি । অসীমের সাথে মিলে যত ধরনের অকাজ সব করে ।
আকাশ মাঝে মধ্যে ভীষণ রেগে যায় রাহার উপর ।
একটা ষোলো বছরের মেয়ে এতটা অবুঝ কিভাবে হয় আকাশের মাথায় ঢোকে না ।
রাহার মায়ের তিন টা অপারেশন কমপ্লিট হয়েছে ।
হার্ট সার্জারি সাকসেস হলে এক মাস পর দেশে ফিরে আসবে ।
পাঁচ দিন পর থেকে রাহার পরীক্ষা শুরু ।
দুদিন পর রাহা কে ওর বাপের বাড়ী রেখে আসবে ঠিক করেছে আকাশ ।
এখন বিকেল । আকাশ অফিস থেকে ফিরে এসেছে ।
আকাশের পিছু পিছু রাহা রুমে চলে যায় ।
সোফায় বসে থাকা অসীম মিলা আর সমুদ্র হাসে ।
রুমে এসেই রাহা কে জড়িয়ে ধরে আদর করে আকাশ ।
অফিসে যাওয়ার আগে আর আসার পর আদর না করলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে রাহা ।
রাহার এই ছোট ছোট আবদার গুলো ভালোই লাগে আকাশের কাছে । তাই নিজেও রাহার আবদারে সায় দেয় ।
রাহা কে ছেড়ে ড্রেস চেঞ্জ করে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে।
রাহা ফোন হাতে নিয়ে ওর বাবার ফোনে কল করে ।
রেজওয়ান মাহবুব মেয়ের কল পেয়ে রিসিভ করে মুখের সামনে ধরে ফোন ।
হাঁসি মুখে কথা বলে দুজনেই । তার পর মায়ের সাথে কথা বলে । মায়ের মুখ দেখেই মুখের হাঁসি চওড়া হয় রাহার ।
দুই মাস আগে মায়ের কাছে গিয়েছিল । এক সপ্তাহ থেকে এসেছে । মেয়ে কে দেখার জন্য ছোঁয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন আয়শা খানম ।
আকাশ শাওয়ার নিয়ে ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে ।
কোমরে টাওয়াল পেঁচানো । চুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়িয়ে পড়ছে । ফর্সা উদাম গা চকচক করছে ।
রাহা এগিয়ে গিয়ে দাড়ায় । মুখ উচু করে ঠোঁট দেখায় । আকাশ হেসে ঝুঁকে চুমু খায় ঠোঁটে ।
_ কবে বড় হবে ঝামেলা রানী ?
_ কোনো দিনও না ।
আকাশ ভ্রু কুঁচকে বলে ,
_ কেনো ?
_ বড় হলে তো আর আদর করবে না তুমি তাই ।
আকাশ রাহার কোমর জড়িয়ে ধরে মুখে ফু দিয়ে বলে ,
_ কে বললো বড় হলে আদর করবো না ?
_ আমিই বললাম ।
_ তুমি জানো সব কিছু ?
_ হুম ।
আকাশ হেসে ঠোঁটে আরো দুটো চুমু খেয়ে বলে ,
_ বড় হলে তো আরো বেশি বেশি আদর করবো । এখন ছোট বলে কম আদর করি । বেশি আদর তো এখন হজম করতে পারবে না ।
_ সবাই ছোট দের বেশি আদর করে আর বড় দের কম আদর করে ।
_ সবাই ছোট দের বেশি আদর করলেও আমি তোমাকে বেশি আদর করবো বড় হলেই ।
_ তাহলে তো তারাতারি বড় হয়ে যাবো আমি ।
_ বড় হওয়ার সাথে সাথে মাথার বুদ্ধিও বড় করো নাহলে আবার বড় হয়ে বড় বড় ঝামেলা ক্রিয়েট করবে।
_ ঝামেলা ছাড়া তোমার এই ঝামেলা রানীর আর কোনো কাজ নেই বুঝেছো পার্ফেক্ট রাজা মশাই ।
_ সেটা তো খুব ভালো করেই জানি আমি ।
রাহা কে ছেড়ে আলমারির দিকে এগিয়ে যায় ।
,
পড়া কমপ্লিট করে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যায় রাহা । আকাশ রাত জেগে বসে বসে অফিসের কাজ করে । তিন দিন পর একটা মিটিং আছে । সেখানে আকাশের প্রেজেন্টেশন দিতে হবে । কয়েক দিন ধরেই রাত জেগে এই প্রেজেন্টেশনের জন্য কাজ করছে ।
অফিসের ওনার আকাশের উপর ভরসা করে এই কাজটা ওকে দিয়েছে । ওর এই প্ল্যান সাকসেস হলে অফিস আর ওর দুজনেরই লাভ হবে ।
রাত তিন টা পর্যন্ত জেগে জেগে কাজ শেষ করে ।
ফাইল রেডি করে স্টাডি টেবিলের উপর রেখে দেয় ।
সব কিছু গুছিয়ে রেখে ফ্রেস হয়ে এসে শুয়ে পড়ে ।
আকাশ কে অনুভব করতেই চোখ খুলে তাকায় রাহা ।
_ কাজ শেষ হয়েছে ?
_ হুম । এত নড়া চড়া করছিলে কেনো একটু পর পর ?
_ তোমাকে ছাড়া ভালো ঘুম হয় না জানো না ?
_ হুম জানি বলেই আজকে কাজ শেষ করেছি । এখন ঘুমাও রাত শেষের দিকে ।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই গভীর ঘুমে বিভোর হয়ে যায় ।
,
আজ ছুটির দিন ।
সকালে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে রাহা । বেড থেকে নেমে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।
ফ্রেস হয়ে এসে নিচে নেমে আসে ।
মিলা অনন্যা শেখ আর সায়মা শেখ রান্না করছে । সোফায় বসে আছে আমজাদ শেখ আর আজলান শেখ । সন্ধ্যার সাথে খেলায় মেতে উঠেছে দুই ভাই ।
সন্ধ্যার বিড়াল মিটি সোফার এক কোণে বসে আছে ।
রাহা গিয়ে মিটির পাশে বসে ।
রাহা কে দেখে বসা থেকে উঠে রাহার কোলে চড়ে বসে মিটি ।
ছুটির দিন হওয়ায় সমুদ্র আর অসীম ও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে আজকে ।
সকালের খাবার খেয়ে দুই ভাই বেরিয়ে যায় ।
রাহা আকাশ কে ডেকে তুলে নিয়ে আসে । মিলা সমুদ্র আর অসীম কে ডেকে তোলে ।
বাকি সবাই এক সাথে খেতে বসে ।
খাওয়ার মাঝে অসীমের উল্টা পাল্টা কথার বিপরীতে দুই ভাইয়ের কাছে খায় দুঘা করে । দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ তোমরা দুজন কোনো কালেই আমার ভাই হতে পারো না । তোমরা দুজন কোনো এই বাড়ির কেউই আমার কিছুই হয় না শুধু ঝামেলা রানী বাদে । একমাত্র ঝামেলা রানীই আমাকে ভালোবাসে ।
আকাশ বলে ,
_ রাহা হচ্ছে ঝামেলা রানী আর তুই অকাজের রাজা । তোরা দুজন তো মেলায় হারিয়ে যাওয়া যমজ ভাই বোন। তোদের দুজনের তো এক বাড়িতে জন্ম হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ভুল করে আমিই এই বাড়িতে জন্মে গেছি ।
অসীম সেই একটা অস্থির ভাব নিয়ে বলে ,
_ ঝামেলা রানী যদি আমার যমজ বোন হতো আর তোমার যদি অন্য বাড়িতে জন্ম হতো বিশ্বাস করো আমি জীবনেও তোমার কাছে আমার বোন কে বিয়ে দিতাম না ।
অনন্যা শেখ ধমক দিয়ে বলেন ,
_ খাওয়ার মাঝে কিসের এত কথা তোদের ? আর আকাশ তুই তো এমন ছিলি না দুই ভাইয়ের সাথে দিন দিন তুইও এমন হয়ে যাচ্ছিস ?
_ সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে ।
ছেলের উত্তর শুনে অনন্যা শেখ বলেন ,
_ আগে কি ওরা তোর সঙ্গে ছিল না ? নীলয় আর রাফি ওরা তো অসীমের থেকেও দুই কাঠি উপরে । তাও তো তোর মাঝে কোনো পরিবর্তন ছিল না ।
_ চুপ চাপ খাও তো মা । আর কথা বলো না ।
অনন্যা শেখ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো ।
খাওয়া দাওয়া শেষে রুমে ফিরে আসে রাহা । আকাশ বড় ভাইয়ের সাথে গল্প জুড়ে বসেছে ।
রাহা রুমে এসে বেলকনিতে গিয়ে দাড়ায় । ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ জনমানব । কারেন্ট চলে গেছে । বেলকনি দিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস আসছে । সেই বাতাস গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে রইলো রাহা ।
কারেন্ট চলে আসায় রুমে ফিরে আসে ।
চোখ যায় স্টাডি টেবিলের উপর । বই খাতা সব এলোমেলো করে রেখেছিল কাল । সে সব আর গোছানো হয়নি ।
টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে । নিজের বই খাতা সব কিছু গুছিয়ে রাখে । চোখ যায় দুটো ফাইলের উপর ।
ফাই দুটো হাতে তুলে নেয় । খুলে খুলে দেখে ।
ফোন বেজে ওঠায় একটা ফাইল খুলে রেখেই ফোনের কাছে এগিয়ে যায় । কাস্টমার কেয়ারের কল দেখে বিরক্ত হয়ে আবার এগিয়ে আসে টেবিলের কাছে । ফোন রাখতে গিয়ে পানির গ্লাসে ধাক্কা লাগে । আর গ্লাসের পানি ফাইলের উপর পড়ে যায় । কাচের গ্লাস পড়ে ভেঙ্গে যাবে তাই আগে গ্লাস ধরে ঠিক করে রাখে । তখনই চোখ পড়ে ফাইলের উপর । তড়িঘড়ি করে ফাইল হাতে নিয়ে পানি ঝাড়ার চেষ্টা করে । ঝাঁকির কারণে ভেজা পেপার মাঝ খানে ছিঁড়ে নিচে পড়ে যায় । দুটো পেপার কুচকে যায় ।
ফাইলের এমন চেহারা দেখে রাহার চোখ মুখ শুকিয়ে যায় । আকাশ ওকে আজ কি করবে আকাশ নিজেও জানে না । সকালে বার বার বলেছে ফাইল গুলোতে যেন হাত না দেয় । হাজার বার বলেছে স্টাডি টেবিলের উপর যেন পানির জগ গ্লাস না রাখে কখনো । রাহা বার বার রাখলেও আকাশ সরিয়ে রেখতো । পই পই করে বলেছিল ফাইল দুটো ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট । ফাইলের যেন কিছু না হয় । ও যেন ভুলেও ফাইলে হাত না দেয় ।
কিন্তু আকাশের এত সাবধান বাণীর পরেও ফাইলের নাজেহাল অবস্থা করেছে আজ ।
কি করবে বুঝতে না পেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো ।
কিছু সময় পড়েই রুমে ফিরে আসে আকাশ । রাহা কে স্টাডি টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যায় । নিজের এত পরিশ্রমের ফল কে এরকম অবস্থায় দেখে আকাশের দিন দুনিয়া ওলট পালট হয়ে যায় । পায়ের র*ক্ত ছলকে মাথায় উঠে যায় । মেজাজ হারিয়ে রাহার হাত থেকে ফাইল নিজের হাতে নেয় । আকাশের এমন রাগে লাল মুখ দেখে রাহার আ*ত্মায় পানি নেই ।
উল্টে পাল্টে ফাইল টা দেখে শান্ত কন্ঠে বলে ,
_ ফাইল টা এমন হলো কিভাবে ?
রাহা তুতলে তুতলে বলে ,
_ ওই ওই
আকাশ ভীষণ রেগে যায় ,
_ ফাইল টা এমন হলো কিভাবে জিজ্ঞেস করেছি ।
_ ওই ভুল করে পা
আকাশ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সজোড়ে থাপ্পড় বসায় রাহার গালে ।
চিৎ*কার করে বলে ,
_ কত বার বলেছি ফাইলে হাত দেবে না । ফাইল থেকে দূরে থাকবে । তার পরেও এটা ধরেছো কেনো ? ধরেছো তাও আবার এমন অবস্থা করে ছেড়েছো । তোমার মাথায় কি আল্লাহ তায়ালা এতোটুকুও জ্ঞান বুদ্ধি দেয়নি ? কবে বুদ্ধি হবে ? আগামী কাল আমার প্রেজেন্টেশন আছে । আমার গত এক সপ্তাহের সব পরিশ্রমে পানি ঢেলে শান্তি হয়েছে তোমার ? আগামী কাল বস কে আমি কি উত্তর দেবো ? কোন মুখে দাঁড়াবো তার সামনে ? তোমার সব ছেলে মানুষি মেনে নেই বলে যা ইচ্ছে তাই করবে ?
আকাশের চিৎ*কার শুনে বাড়ির সবাই চমকে ওঠে । একটু আগেই তো রুমে গেল । এত তারাতারি কি হলো চিৎ*কার করছে কেনো ? আর আকাশ শান্ত স্বভাবের ছেলে । সহজেই রাগে না আর রাগলে তার যথাযথ কারণ থাকে । এর আগে আকাশের এমন চিৎ*কার খুব কমই শুনেছে শেখ বাড়ির সদস্যরা ।