আমার ঝামেলা রানী

পর্ব - ৭

🟢

রাতে আর খায় না রাহা । জোর করেও তাকে কিছুই খাওয়ানো যায় না পানি ব্যাতিত । রাহার সাথে সাথে অসীম ও কিছু খায় না ।

বাড়ির সকলে খাবার খেয়ে নিজেদের রুমে চলে যায় শোয়ার জন্য । আকাশের ফ্রেন্ড নীলয় আর রাফি রাহা দের বাড়ি থেকে ফিরেই নিজেদের বাড়ি ফিরে গেছে ।

আকাশ রাহা কে সাথে নিয়ে নিজের রুমে আসে । ডোর লক করে রেখে বেড ঠিক ঠাক করে দেয় শোয়ার জন্য ।

রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ শুয়ে পড়ো ।

_ আপনি কোথায় যাবেন ?

_ কোথাও যাবো না ।

_ তাহলে আপনিও আসুন ।

_ ফ্রেস হয়ে আসছি তুমি শুয়ে পড়ো ।

রাহা বেডে উঠে বসে । ব্ল্যাঙ্কেট উচু করে ভেতরে ঢুকে যায় । হাত পা উসখুশ করছে কাউকে জড়িয়ে ধরার জন্য । ঘাড় কাত করে ওয়াসরুমে দিকে তাকায় ।

এই আকাশ এখনো আসছে না কেনো ?

এপাশ ওপাশ করতে শুরু করে ।

আকাশ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে । বেডের দিকে এগিয়ে আসতেই দেখে রাহা এখনো নড়া চড়া করছে ।

লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে । বেডে এসে শুতেই রাহা আকাশের দিকে এগিয়ে যায় । আকাশ রাহার দিকে কাত হয়ে শুতেই রাহা আকাশের বুকের সাথে লেপ্টে হাত পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে ।

মুচকি হেসে আকাশ নিজেও পেঁচিয়ে ধরে রাহা কে ।

_ এতক্ষণ ঘুম আসছিল না ?

_ হুম ।

_ এখন ঘুমাও ।

_ গল্প বলুন ।

_ আমি গল্প বলতে জানি না ।

_ এত বড় একটা মানুষ হয়ে গল্প বলতে জানেন না ?

_ নাহ্ । তুমি বলো আমি শুনি ।

_ আমিও তো বলতে পারি না ।

_ তাহলে চুপ চাপ ঘুমাও ।

_ না না ঘুম আসবে না আপনি গল্প বলুন ।

_ আমি সত্যি গল্প বলতে পারি না ।

_ কেনো পারেন না ?

_ কখনও শুনিনি তাই ।

_ তাহলে আমি বলি ?

_ হুম বলো ।

রাহা গল্প বলতে শুরু করে ।

"এক দেশে এক রাজা আরেক দেশে এক রানী "। দাদীর কাছ থেকে শোনা রূপকথার গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে যায় রাহা । মনোযোগ দিয়ে রাহার গল্প শুনছিল আকাশ। ভালোই গল্প বলতে পারে । আকাশ হাসে ।

এই মেয়ে নাকি ওর বউ । যে কিনা এখনো বাচ্চাদের মত রূপকথার গল্প শোনে । আবার আরেক জন কেও শোনায় ।

চোখ দুটো বন্ধ করে নেয় ।

চোখ বন্ধ করতেই অন্য রকম এক অনুভূতির সাক্ষী হয়। বুকের ভেতর জোড়ে জোড়ে শব্দ হচ্ছে । আকাশ শুনতে পাচ্ছে নিজের হার্ট বিটের শব্দ । অস্বাভাবিক গতিতে বিট করছে । কি এক অনুভুতি । এভাবে নতুন বউ জড়িয়ে ধরে রাখলে কোনো নতুন জামাই কিভাবে ঠিক থাকবে ? আকাশের শ্বাস ভারী হয়ে আসে ।

রাহা কে দূরে সরানোর চেষ্টা করে । নড়া চড়া হতেই রাহা আরো ভালোভাবে জড়িয়ে ধরে । আকাশের ঘাড়ে ঠেকে যায় রাহার মুখ । আকাশ উপরের দিকে মুখ করে তাকায় ।

_ আল্লাহ ধৈর্য্য দাও, না হলে বউ টাকে আর একটু বড় করে দাও ।

নিজে বলে নিজেই হাসে আকাশ । বউটা কিভাবে বড় হবে ? বড় হতে তো সময় লাগবে । বললেই তো বড় হয়ে যাবে না ।

,

সকালে আটটায় ঘুম থেকে ওঠে রাহা । বেডে শুয়েই এদিক ওদিক মোচড়ামুচড়ি করে । চোখ মেলে তাকায়।বেডে আকাশ নেই । আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো রুমে কোথাও নেই । ঠাণ্ডার মধ্যে বেড থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না । মাথা ঢেকে আবার শুয়ে পড়ে ।

ঘুমোনোর জন্য চোখ বন্ধ করতেই স্মরণ হয় দাদীর বলে দেওয়া কথা "ওটা তোর শশুর বাড়ী বাপের বাড়ী না । সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে নামাজ আদায় করবি । তাঁর পর বড় জা আর শাশুরির কাছে জাবি । কোনো কাজ করতে হবে নাকি জিজ্ঞেস করবি। যা যা করতে বলে দেখিয়ে দিতে বলবি কিভাবে করতে হয় । শুধু শুয়ে বসে থাকবি না । মনে থাকে যেন আমার কথা "

ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও শোয়া থেকে উঠে বসে । অনেক ঠান্ডা পড়েছে ।

বেড থেকে নেমে ওয়াসরুমে প্রবেশ করে ।

ফ্রেস হয়ে এসে তৈরি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে । সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় খেয়াল করে বাড়ির সবাই ড্রইং রুমে উপস্থিত আছে ।

রাহা কে নিচে আসতে দেখে সমুদ্রের মেয়ে সারাহ্ তুতলে তুতলে বলে ,

_ ওই তো ছোত মা আছতে ।

সবাই সিঁড়ির দিকে তাকায় । নীল রঙ্গা থ্রী পিসের উপরে ব্ল্যাক কালার জ্যাকেট পড়ে নিচে নেমে আসছে রাহা । আকাশের চোখ আটকে যায় রাহার দিকে ।

নিঝুম রাহাকে সোফায় বসার জন্য জায়গা করে দিয়ে বলে ,

_ ভাবী তুমি এখানে বসো ।

রাহা নিঝুমের পাশে বসে । সকলের হাতেই চায়ের কাপ। মিলা রাহার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসে ।

_ রাহা চা খাও ।

_ আমি চা খাই না ভাবী ।

_ চা খাও না ?

রাহা মুচকি হেসে বলে ,

_ না ।

_ আজ খাও ।

রাহা হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে তুলে নেয় ।

এক চুমুক দিতেই লাফিয়ে ওঠে । চায়ের কাপ হাত থেকে নিচে পড়ে ভেঙ্গে যায় । গরম চায়ে চুমুক বসিয়ে দিয়েছে । নিঝুম নিজের কাপ টা রেখে দাঁড়িয়ে রাহা কে ধরে বলে ,

_ কি হয়েছে ভাবী ?

_ গরম লেগেছে । জিহ্ববা পুড়ে গেল আপু ।

মিলা দৌড়ে গিয়ে পানি নিয়ে আসে ।

আমজাদ শেখ আজলান শেখ সহ সবাই তাকিয়ে আছে রাহার দিকে । আকাশ তো থ হয়ে তাকিয়ে আছে । এই মেয়ে কি কোনো কিছুই ঠিক ঠাক করতে পারে না ?

সব কিছুতেই কিছু না কিছু ভুল করেই । চা টা একটু ঠাণ্ডা করে খাবে না ? গরম চা ঢেলে দিয়েছে মুখের মধ্যে । পা*গ*ল মেয়ে একটা ।

পানি খেয়ে সোফায় বসে আবার ।

কাজের বুয়া এসে ভাঙ্গা চায়ের কাপ আর জায়গা টুকু পরিষ্কার করে ফেলে ।

_ এত গরম চা মুখে দিয়েছো কেনো মা ? ফু দিয়ে ঠান্ডা করে খাবে না ?

_ আমি তো বুঝতে পারিনি চা এত বেশি গরম ।

রাহার কথা শুনে ফিক করে হেসে ওঠে অসীম । গরম ধোঁয়া ওঠা চা দেখেও বুঝতে পারেনি চা এত গরম ?

আমজাদ শেখ রেগে তাকাতেই মুখে আঙ্গুল চেপে মুখ বন্ধ করে নেয় ।

আজলান শেখ রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ মুখে জ্বালা করছে মা ?

_ বেশি না আব্বু একটু একটু ।

_ ঠান্ডা পানি খাও মা । এর পর থেকে চা খেলে ফু দিয়ে ঠান্ডা করে খাবে ।

রাহা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে ।

বুয়া কিচেনে যেতেই অনন্যা শেখ বলে ,

_ ড্রইং রুমে কি পড়ার শব্দ হলো ?

_ নতুন বউ গরম চা মুখে দিয়া মুখ পুড়াইয়া ফালাইছে । হাত থেইকা চায়ের কাপ পইড়া ভাইঙ্গা গেছেগা ।

অনন্যা শেখ বিচলিত হয়ে বলে ,

_ রাহা কান্না করছে কি ?

_ না ।

অনন্যা শেখ রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । সমুদ্রের মা চুলা থেকে তরকারি নামিয়ে বাটিতে ঢেলে নেয় ।

খাবার টেবিলে সাজিয়ে মিলা সবাই কে ডাকে খাওয়ার জন্য ।

,

খাবার খেয়ে সমুদ্র বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় টিউশনি পড়ানোর জন্য । সকালে এক ব্যাচ পরিয়ে এসেছে ।

সমুদ্র কলেজের ইংরেজি প্রফেসর । কলেজের পাশাপাশি দুই ব্যাচ টিউশনি পড়ায় ।

আমজাদ শেখ আর আজলান শেখ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় । তারা দুই ভাই মিলে ছোট খাটো একটা ব্যবসা করে । ব্যবসার পাশাপাশি তাদের বাজারে চারটে দোকান ভাড়া দেওয়া আছে ।

আকাশ মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করে ।

সব মিলিয়ে খুব ভালো ভাবেই দিন কে*টে যায় শেখ পরিবারের ।

আকাশ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিল বিয়ে উপলক্ষে । ছুটি এখনো শেষ হয়নি । আরো তিন দিন আছে ছুটি ।

অসীম অনার্স প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট । নিঝুমের বিয়ে হয়ে গেছে । চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে ।

সমুদ্রের বউ মিলা সমুদ্রের ফুপাতো বোন । প্রণয়ের মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়েছে ।

অনন্যা শেখ আর সমুদ্রের মা সায়মা শেখের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক । দুজন জা হলেও তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক আপন বোনের মতোই ।

,

মিলা রাহা আর নিঝুম কে সাথে নিয়ে ছাদে যায় ।

চারো দিক এখনো ঘন কুয়াশায় ঘেরা । সূর্য উঁকি দিচ্ছে একটু একটু করে । হয়তো কিছু সময়ের মধ্যে কুয়াশা কে*টে যাবে ।

রাহা ছাদের রেলিং ঘেষে দাড়িয়ে আশে পাশে চোখ বুলায় । আকাশ দের বাড়ির সামনে ডান দিকে গাছের বাগান । নানান রকমের ফল গাছে ভরা । সব কিছু ছাপিয়ে রাহার চোখ আটকে যায় বরই গাছের দিকে ।

থোকায় থোকায় বরই ধরে আছে । তবে বরই গুলো এখনো ছোট ছোট । খাওয়ার উপযুক্ত হয়নি ।

মিলা এসে দাঁড়ায় রাহার পাশে ।

রাহা ঘাড় ঘুরিয়ে মিলার দিকে তাকায় । মিলা মুচকি হাসে । রাহাও মুচকি হাসে । নিঝুম এসে দাঁড়ায় রাহার অপর পাশে ।

মিলা রাহা কে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেও করে না ।

নিঝুম চোখের ইশারায় বলছে বলার জন্য ।

_ রাহা ?

_ জ্বি ভাবী ।

_ রাতে ঘুম কেমন হয়েছে ?

_ খুব ভালো ।

_ শীত করেনি রাতে ?

_ না ।

_ আকাশ তোমাকে আদর করে না ?

_ না ।

_ সত্যি আদর করে না ?

_ না ।

_ তুমি আদর করতে বলো না ?

_ না ।

_ কেনো ?

_ আমি কি ছোট বাচ্চা যে আদর করতে বলবো ?

আমি এখন বড় হয়ে গেছি ।

_ রাতে তোমাদের মধ্যে কিছু হয়না ?

_ কি হবে ?

নিঝুম চোখের ইশারায় মিলা কে না করে আর কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য । মিলাও কিছু বলে না আর ।

মিলার চোখ নিচের দিকে যেতেই দেখে অসীম বাড়ি থেকে বের হচ্ছে । ছাদের উপর থেকে ডেকে বলে ,

_ অসীম ।

_ কি হয়েছে চ্যাচাচ্ছো কেনো ?

_ পেয়ারা পেরে দিয়ে যা ।

_ পেরে খাও আমি পারবো না ।

_ আমি গাছে উঠতে পারি ?

_ তো আমি কি এখন এই শীতের মধ্যে সকাল সকাল গাছে উঠবো নাকি ?

_ তুই ছেলে মানুষ তোর আবার শীত করে নাকি !

_ নাহ্ ছেলেদের শীত করে না ।

_ পেরে দিয়ে যা ।

_ নিচে আসো তাহলে ।

_ তুই পেরে উপরে ডিল ছুঁড়ে দে ।

_ ওভাবে দিলে নষ্ট হয়ে যাবে ।

_ হবে না তুই দে ।

অসীম আশে পাশে তাকিয়ে বাঁশ খুজতে শুরু করে ।

পেয়েও যায় । বাঁশ টা হাতে তুলে নিয়ে পেয়ারা গাছের নিচে গিয়ে দাড়ায় । খুঁজে খুঁজে বের করে পাকা পেয়ারা। বেশ কয়েক টা পেয়ারা পেরে কুড়িয়ে নেয় ।

হাতে নিয়ে ছাদে উঠে যায় ।

মিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ,

_ ধরো তোমার পেয়ারা । আমার লেট করিয়ে দিল ।

_ এমন ভাবে বলছিস যেন তোর গার্লফ্রেন্ড তোর জন্য ওয়েট করছে । আর তুই সময় মত পৌঁছাতে পারবি না ।

_ এই পোড়া কপালে গার্লফ্রেন্ড জুটবে নাকি ?

_ কে জানে হয়তো দশ বারোটা জুটিয়ে রেখেছিস । দেখতে তো মন্দ না তুই ।

বিজ্ঞাপন

_ ওই দেখতে মন্দ না বলেই গার্লফ্রেন্ড জোটে না ।

নিঝুম বলে ,

_ আহারে কি কষ্ট আমার ভাইটার ।

_ তোমার ননদ টাকে তো বলতে পারো আমার সাথে প্রেম করার জন্য ।

_ ভুলেও ওদিকে নজর দিস না ভাই ।

_ কেনো তোমার হিটলার হাসবেন্ড কি আমাকে উপরে পাঠিয়ে দেবে ?

_ নাহ্ । আমার ননদিনীর অলরেডি বয়ফ্রেন্ড আছে । আর বাড়ির সবাই জানেও ।

_ আল্লাহ আমি যেদিকে তাকাই সেদিকেই বুকিং হয়ে যায় ।

তার পর রাহার দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ ছোট ভারীরও তো ছোট একটা বোন নেই থাকলে নাহয় কথা ছিল ।

রাহা হেসে বলে ,

_ আমার মামাতো বোন আছে ছোট ।

_ ওটাও বুকিং গো ভাবী ।

রাহা বড় বড় চোখ করে তাকায় । বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে যায় । অবাক কন্ঠেই বলে ,

_ তামিমা প্রেম করে ?

_ হ্যাঁ, কেনো আপনি জানেন না ?

_ নাহ্ । তামিমা তো সব সময় বলে ও প্রেম করে না । কি মিথ্যাবাদী মেয়ে রে ।

অসীম রাহার পাশ ঘেষে দাড়িয়ে আস্তে আস্তে বলে ,

_ কেনো ভাবী আপনি প্রেম করতেন না ?

রাহা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে "আস্তাগফিরুল্লাহ বলে। বেশ জোরেই বলে আস্তাগফিরুল্লাহ ।

তিন জন এক সাথে তাকিয়ে আছে রাহার মুখের দিকে।

অসীম আবার বলে ,

_ ভাবী আপনি প্রেম করতেন না ?

_ না না না এসব কি বলছেন ?

মিলা রাহার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে ,

_ এমন ভাবে বলছো যেনো প্রেম করা মহা পাপ ।

_ হ্যাঁ প্রেম করা পাপ তো ।

_ কে বলেছে তোমাকে ?

_ আম্মু বলেছে আব্বু বলেছে ভাইয়াও বলেছে ।

_ কি বলেছে ?

_ বলেছে "কোনো ছেলের সাথে কথা বলবি না । কোনো ছেলে কিছু দিলে নিবি না । কোনো মেয়ে প্রেম করলে তার সাথেও মিসবী না । কেউ আজে বাজে কথা বললে তাদের সাথেও মিসবি না । প্রেম করা পাপ আল্লাহ গুনাহ দেয় ।

_ ফেসবুকে তোমার কোনো ছেলে ফ্রেন্ডের সাথে কথা হয়নি ।

_ আমার তো ফোন নেই ।

_ তোমার ফোন নেই ?

_ নাহ্ ।

_ তোমাকে ফোন কিনে দেয়নি ?

_ নাহ্ । ভাইয়া বলেছিল এসএসসি তে ভালো রেজাল্ট করলে কলেজে উঠার পর ফোন কিনে দেবে ।

_ ওহ , তোমার কোনো ছেলে ফ্রেন্ড নেই ?

_ না । ছেলেদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করলে ভাইয়া আমাকে মেরেই ফেলবে ।

_ তোমার ভাইয়া অনেক রাগী ?

_ হুম ।

_ তোমাকে অনেক বকা দেয় ।

_ উহু আমাকে একটুও বকে না । আমাকে তো ভাইয়া অনেক ভালোবাসে । প্রত্যেক দিন স্কুলে নিয়ে যায় আবার নিয়ে আসে । আবার খাবার খাইয়ে দেয় । আমার ভাইয়া অনেক ভালো ।

_ তোমার ফ্যামিলি ঠিকই বলেছে প্রেম করা ভালো না । ওসব করতে নেই ।

_ হুম ।

_ অসীম পা*গল মাথায় সমস্যা হয়েছে তাই প্রেম করতে চায় ।

অসীম মুখ বিকৃতি করে বলে ,

_ তাহলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পা*গল তুমি ।

_ পা*গল বলেই তোর ভাইয়ের মত বড় পা*গলের সংসার করছি এখন ।

,

পেরিয়ে যায় কয়েক দিন ।

আকাশ অফিস জয়েন করেছে । বাড়ির সবাই ভীষণ ভালোবাসে রাহা কে । রাহার উল্টা পাল্টা কথা কাজে বেশ মজা পায় সকলেই ।

রাহাও শেখ পরিবারের সাথে বেশ হাসি খুশি আছে । খুব বেশি বাবার বাড়ির কথা মনে পড়ে না । অসীমের সাথে বেশ বনিবনা হয়েছে রাহার ।

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বাড়ির সকল সদস্য বাড়ি ফিরে এসেছে । সবাই উপস্থিত ড্রইং রুমে । নাতনিকে নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছে দুই ভাই । সায়মা শেখ আর অনন্যা শেখ রান্না করছে রাতের খাবার ।

মিলা চা বানিয়ে কাপে ঢেলে নেয় ।

রাহা কিচেনে দাঁড়িয়ে আছে । কাজ করতে চাইলেও কেও তাকে কাজ করতে দিচ্ছে না । মিলার চা ঢালা হয়ে গেলে রাহা ট্রে নিজের হাতে নিতে নিতে বলে ,

_ চা আমি নিয়ে যাই ভাবী ।

_ তোমার নিতে হবে না রাহা আমি নিয়ে যাচ্ছি ।

বলেই রাহার হাত থেকে ট্রে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় ।

দুজনের টানাটানিতে ট্রে থেকে ফোসকে চায়ের কাপ পড়ে যায় রাহার পায়ের উপর । সাথে সাথেই চেঁচিয়ে ওঠে রাহা । অনন্যা শেখ আর সায়মা শেখ দ্রুত এগিয়ে আসে । মিলা ভয়ে চুপ হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে ।

ড্রইং রুমে উপস্থিত সকলে দৌড়ে আসে রান্না ঘরে । রাহা কে নিচে বসে থাকতে দেখে আকাশ দ্রুত এগিয়ে এসে দেখে রাহার দুই পা লাল টকটকে হয়ে গেছে । পায়ের উপর আর ফ্লোরে চা পড়ে আছে । আকাশ বুঝতে পারে এখানেও ঝামেলা পাকিয়েছে । মিলা ফ্রিজ থেকে বরফ এনে রাহার পায়ে দেয় ।

আমজাদ শেখ বলে ,

_ কি হয়েছে আবার ?

অনন্যা শেখ বলে ,

_ রাহার পায়ের উপর চা পড়ে গেছে ।

_ কিভাবে ?

মিলা মিন মিন করে বলে ,

_ আমি চা কাপে ঢেলে নিয়ে যাবো তখন রাহা নিয়ে যেতে চায় । ওর পায়ে পড়ে যাবে সেজন্য আমি নিয়ে যেতে চাই । যে ভয় করছিলাম সেটাই হয় । দুজনের টানাটানিতে ট্রে থেকে ফোসকে চায়ের কাপ রাহার পায়ের উপর পড়েছে ।

সমুদ্র মিলা কে বলে ,

_ রাহা নিত চাইছিল নিতে দিতে , আবার টানাটানি করেছো কেনো ?

মিলা কিছু বলে না । আকাশ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ মিলা কে কিছু বলবে না ভাইয়া । সব দোষ এই ঝামেলা রানীর । সব সময় ঝামেলা করে সব জায়গায়।

ঝামেলা করতে উস্তাদ । ওকে কে রান্না ঘরে আসতে বলেছে ? মা তো তখন ওকে বার বার বললো ড্রইং রুমে যাওয়ার জন্য । ঝামেলা রানীর ঝামেলা না করলে পেটের ভাত হজম হয় না বোধহয় ।

সায়মা শেখ বলে ,

_ আহ আকাশ কি শুরু করলি । মেয়েটাকে তোল ওখান থেকে পায়ে পানি দিতে হবে ।

_ ওকে কোলে তুলে তোর রুমে নিয়ে যা ।

বাড়ির সকলের সামনে রাহা কে কোলে নিতে আকাশের কেমন অসস্তি হচ্ছে । লজ্জাও করছে ।

সায়মা শেখ আবার একই কথা বলে ।

আকাশ রাহা কে কোলে তুলে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় ।

অনন্যা শেখ রান্না ঘরের মেঝে পরিষ্কার করতে শুরু করে । মিলা আবার চা বসায় । সায়মা শেখ রান্নার কাছে এগিয়ে যায় ।

সবাই আবার ড্রইং রুমে ফিরে আসে ।

আকাশ রাহা কে ওয়াসরুমে দার করিয়ে পায়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে দেয় ।

_ রান্না ঘরে আর যাবে না মনের ভুলেও ।

_ না গেলে কাজ শিখবো কিভাবে ?

_ কাজের থেকে তো অকাজই বেশি করো তুমি ।

এত ঝামেলা তুমি একা কিভাবে করো বলতো ? একটা মানুষ একা এত ঝামেলা করতে পারে ?

_ করতে চাই না তো । হয়ে যায় ।

_ কিছুই করবে না তাহলে ঝামেলাও হবে না ।

_ আচ্ছা ।

পানি দেওয়া শেষ করে রাহা কে রুমে এনে বেডে বসায়।

টাওয়াল এনে পা মুছিয়ে দেয় । বার্নিং মলম আনার জন্য রুম থেকে বের হওয়ার সময় দেখে মিলা রুমে আসছে । হাতে চায়ের কাপ অন্য হাতে বার্নিং মলম ।

_ তুই নিয়ে আসলি কেনো আমি যাচ্ছিলাম তো ।

_ নিয়ে এসেছি তো কি হয়েছে ?

_ কিছু হয়নি ।

চায়ের কাপ আকাশের হাতে দিয়ে রাহার সামনে এসে দাঁড়ায় । ফর্সা পা দুটো লাল হয়ে গেছে । মিলা নিজেই রাহার পায়ে মলম লাগাতে গেলে রাহা আটকে দিয়ে বলে ,

_ কি করছেন ভাবী ? আমার কাছে দিন আমি

লাগাচ্ছি ।

_ কোনো সমস্যা নেই । আমি লাগাচ্ছি তুমি চুপ হয়ে বসো ।

রাহা চুপ হয়ে বসে থাকে । মিলা যত্ন সহকারে মলম লাগিয়ে দেয় ।

_ সরি ভাবী ।

_ সরি বলছো কেনো ?

_ আমার জন্য চা নষ্ট হয়ে গেল আবার কয়টা কাপ ভেঙ্গে গেল । ভাইয়া আপনাকে বকা দিল ।

মিলা ফিক করে হেসে ওঠে । রাহার গাল টেনে বলে ,

_ তোমার ভাইয়া আমাকে বকা দেয়নি । শুধু বলেছে তোমাকে কেনো নিতে দিলাম না । শোনো রাহা বাড়িতে কাজ করার জন্য আমরা আছি । শুধু তো রান্নার কাজ বাকি সব কিছু তো বুয়া এসে করে দেয় । তুমি নতুন বউ এখন বেশি বেশি আকাশ কে সময় দেবে । ওর কাছে কাছে থাকবে । ওকে চুমুও খাবে ।

মিলার কথা শুনে আকাশ বিষম খায় । কাশতে কাশতে মিলার মুখের দিকে তাকায় । মিলা মিটিমিটি হাসছে ।

আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে ,

_ আকাশ যতক্ষণ রুমে থাকবে তুমিও রুম থেকে বের হবে না ততক্ষণ । ওকে জড়িয়ে ধরবে চুমু খাবে গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবে ।

আকাশ বড় বড় চোখ করে বলে ,

_ মিলা কি শেখাচ্ছিস ওকে এসব ?

_ তুই চুপ থাক ।

_ আশ্চর্য চুপ থাকবো কেনো ? এসব উল্টা পাল্টা কথা ওকে শেখাবি না একদম ।

_ শেখাবো তোর তাতে কি ?

আকাশ রুম থেকে বেলকনিতে এসে দাঁড়ায় । এই মেয়ে কে দিয়ে বিশ্বাস নেই যা শেখাবে তাই করবে ।

মিলার কথা শুনে যদি এই বেকুব রাহা কিছু করে কি হবে তাহলে ?

একটু পরেই মিলা এসে দাঁড়ায় আকাশের পাশে ।

_ উল্টা পাল্টা বুদ্ধি শেখানো শেষ ?

_ নাহ্ । ওকে শেখানোর আগে তোকে শেখানো উচিত ।

আকাশ চোখ ছোট ছোট করে তাকায় ।

_ কি বলতে চাইছিস ?

_ সমস্যা কি তোর ?

_ আমার আবার কি সমস্যা হবে ?

_ তোদের বিয়ের কত গুলো দিন পেরিয়ে গেছে অথচ তোদের মাঝে এখনো কিছুই হয়নি ।

_ কে বললো তোকে ?

_ আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি ?

_ আমার বয়স দেখেছিস ? সাতাশ বছর বয়স আমার ।আর রাহার ষোলো বছর । আমার থেকে এগারো বছরের ছোট ।

_ তো কি হয়েছে ?

_ কি হয়েছে বুঝতে পারছিস না তুই ?

_ বুঝতে পারছি সব । আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সে । তখন বাবার বয়স ছিল ছাব্বিশ বছর । ভাইয়ার জন্মের সময় মায়ের বয়স ছিল ষোলো বছর ।

আকাশ তাকায় মিলার মুখের দিকে । মিলা আগের মতই বলে ,

_ ছোট চাচীর ও সতেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল । আমার শাশুড়ি মায়ের ও ষোলো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল ।

এখন হয়তো সময়ের পরিবর্তনে মেয়েদের বয়স হয়ে বিয়ে হয় । আগে কিন্তু অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে বাচ্চা হতো । আমি তোকে সেভাবে কিছু বলছি না । এখন বাড়ির বড়রা কেউ যদি বুঝতে পেরে যায় তোদের মধ্যকার দূরত্ব তাহলে সেটা ভালো দেখাবে না আকাশ ।

তোর মত করে কেউ হয়তো ভাববে না । তোর দোষ ও হয়তো কেউ দেখবে না । আমি কি বলতে চাইছি নিশ্চই বুঝতে পেরেছিস ।

মিলা চলে যায় । আকাশ বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইলো একমনে । ভাবতে থাকে মিলার বলা কথা গুলো।

বিজ্ঞাপন
আমার ঝামেলা রানী গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক উপন্যাস